১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ও বিচারের দাবি ব্রিটিশ রাজনীতিক, আইনজীবীদের

“এটি একটি সুযোগ ছিল। সরকার দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য আইসিটি বিলুপ্ত করে অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশি আইনের অধীনে দেশি আদালতে মামলা করতে পারত।”

লন্ডন প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Nov 2025, 09:55 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:12 PM

বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য ও আইনজীবী।

বুধবার লন্ডনের হাউজ অব লর্ডসের সেমিনার কক্ষে ‘রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক ব্যবস্থা–পুনরুজ্জীবিত ও সংস্কার’ বিষয়ক সেমিনারে তারা এ দাবি তুলে ধরেন।

এতে ব্রিটিশ এমপি ইয়ান ডানকান স্মিথ এমপি, সাবেক এমপি সিমন ড্যানজুক, আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ লর্ড কার্লাইল কেসি, চিংফোর্ড ও উডফোর্ড গ্রিনের এমপি স্যার ইয়ান ডানকানের সিনিয়র নীতি নির্ধারক অ্যালিস স্টুটাফোর্ড বক্তব্য দেন।

আলোচনা সভায় অন্য বক্তারা বাংলাদেশে বিরাজমান অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক বিভেদ, সামাজিক উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে অগ্রাধিকারভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

তারা বলেন, শাসন ব্যবস্থার সংস্কার এবং লাইনচ্যুত অর্থনীতিকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত করতে একটি নির্বাচিত সরকার গঠন করা প্রয়োজন। বিদ্যমান রাজনৈতিক বিভেদ এবং জটিল অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সংশোধন ও সমাধান প্রয়োজন। 

সেমিনারে ‘পুনর্মিলন না প্রতিশোধ’ শীর্ষক আলোচনায় ব্রিটিশ আইনজীবী জন ক্যামেগ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান আইনের ক্রুটির কথা আবারও তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তির সুযোগ হাতছাড়া করেছে।

আরও দুই ব্রিটিশ আইনজীবীর সঙ্গে জন ক্যামেগ ২০১১ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতারবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার আইনজীবীদের একজন ছিলেন।

ওই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি সেই সময়ও এই আইসিটি আইনের গুরুতর ত্রুটি নিয়ে কথা বলেছি। আমি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন জায়গায় এটি নিয়ে কথা বলেছিলাম। বেশির ভাগ মানুষেরই এর সম্পর্কে ধারণা ছিল না “

অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে নতুন কিছু করার সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরে ক্যামেগ বলেন, এটি একটি সুযোগ ছিল। সরকার দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য আইসিটি বিলুপ্ত করে অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশি আইনের অধীনে দেশি আদালতে মামলা করতে পারত।

“দুর্ভাগ্যবশত মনে হচ্ছে এটি হাসিনার ওপর বিচার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমরা এটাকে বিজয়ীর ন্যায়বিচার বলি।” 

আইসিটিকে তারা ‘ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে’ অভিযোগ করে তিনি বলেন, “কিন্তু তাতে বাংলাদেশি জনগণের কাছে ন্যায়বিচার আসেনি। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ধর্মীয় স্থানগুলোর ক্ষয়ক্ষয়তি, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা ইঙ্গিত দেয় যে, ২০২৪ সালের বিদ্রোহ কেবল দুষ্টচক্রের আরেকটি মোড়, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের পরে কার্যকরভাবে আরেকটি একদলীয় সরকার হওয়ার সম্ভাবনা ফেব্রুয়ারির নির্বাচন।“

তার ভাষ্য, সহজ বাস্তবতা হল উন্মুক্ত ন্যায়বিচার ছাড়া গণতন্ত্র সম্ভব নয়। দরকার উন্মুক্ত রাজনীতি। যে সরকার তার বিরোধী দলকে চুপ করিয়ে ক্ষমতা অর্জন করে, ভিন্নমত পোষণকারী কণ্ঠস্বরকে ভয় পায় তারা একটি দুর্বল সরকার, যেটি কেবল দুর্বলই হবে। ভিন্নমতকে চুপ করিয়ে দিন, তা সে মধ্যপন্থি বাংলাদেশিদের মধ্যে যতই অপ্রিয় হোক না কেন।

ব্রিটিশ আইনজীবী জন ক্যামেগ বলেন, মতবিরোধ যত ব্যাপক হবে, একটি জাতি তত বেশি অস্থির ও হিংস্র হয়ে উঠবে। দেশ অস্থিতিশীল হলে বিনিয়োগ কমবে। বিনিয়োগ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। কম বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয়। আর কম প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য সৃষ্টি করে; যা ভিন্নমত বৃদ্ধি করে এবং চক্রটি সর্পিলভাবে নিচে নেমে আসে, যতক্ষণ না পরবর্তী সংকট দেশকে আরও অস্থিরতার মধ্যে ফেলে।

সেমিনারে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ‘সবসময় একটি পদ্ধতিগত নির্যাতনের’ ভুক্তভোগী হওয়ার কথা তুলে ধরে অন্য বক্তারা বলেন, সংখ্যালঘুদের তাদের জীবন, সম্পত্তি এবং জীবনযাত্রার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার আশ্বাস এবং নিশ্চয়তা দিতে হবে। যেকোন সভ্য সমাজের মত তাদের বিশ্বাস এবং তাদের বিশ্বাসের প্রতীকগুলোর সুরক্ষা প্রয়োজন।

তাদের মতে, গতিশীল অর্থনীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি এবং যত্নশীল সমাজ হিসেবে বাংলাদেশের পুনরুত্থান নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। দেশ ও সমাজের পুর্নগঠনের জন্য সব আদর্শ এবং রাজনীতির সব অংশকে এই ধারায় আনতে হবে।

সেমিনারে বব ব্ল্যাকমেন এমপি ও লর্ড কার্লাইল এর বাংলাদেশ প্রসঙ্গে দেওয়া পৃথক বিবৃতি পাঠ করা হয়। যাতে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা।

সেমিনারে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান, জামায়াত ইসলামের ইউরোপের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বক্কর মোল্লা, বিএনপিপন্থি অধ্যাপক আলিয়ার হোসাইন, ব্যারিস্টার প্রশান্ত বড়ুয়া, আইনজীবী পাপ্পু সাহা বক্তব্য দেন।