Published : 01 Sep 2026, 04:12 PM
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং পাসপোর্টের তথ্যের গরমিলের কারণে প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছেন গ্রিসে বসবাসরত হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশে গমনাগমনের সময় দালাল চক্রের প্রতারণা বা অসচেতনতাবশত ভুল বা ভিন্ন তথ্য দিয়ে তৈরি করা পাসপোর্টের কারণেই এ সংকটের সৃষ্টি। পরবর্তীতে দেশে ফিরে ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ, ই-পাসপোর্ট নবায়ন, ব্যাংক হিসাব খোলা কিংবা জমি বেচাকেনার মতো মৌলিক সরকারি-বেসরকারি সেবা নিতে গিয়ে আটকে যাচ্ছেন প্রবাসীরা।
হবিগঞ্জের মশিউর রহমান মুমিনের ঘটনাটি প্রবাসীদের এই ভোগান্তির একটি চিত্র। তার মূল এনআইডি অনুযায়ী জন্মসাল ১৯৯৫ সালের জুলাই। তবে বিদেশ যাওয়ার সময় এক দালালের মাধ্যমে তার তৈরি করা পাসপোর্টে নাম দেওয়া হয় ‘মশিউর মিয়া’ এবং জন্মসাল উল্লেখ করা হয় ‘১৯৯৯’।
ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইউরোপের দেশ গ্রিসে পৌঁছান মশিউর এবং পরবর্তীতে সেখানে রেসিডেন্স পারমিটসহ সব বৈধ নথিপত্র পাসপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতেই তৈরি হয়। সম্প্রতি দেশে ফিরে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি; কারণ তার এনআইডির তথ্যের সঙ্গে বিদেশে ব্যবহৃত পাসপোর্ট ও গ্রিক কাগজপত্রের কোনো মিল নেই। পরবর্তীতে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করলেও মাসের পর মাস পার হয়ে গেলেও মিলেনি সমাধান।
ভুক্তভোগী মশিউর বলেন, “বিদেশ যাওয়ার সময় দালালের মাধ্যমে আমার পাসপোর্টে নাম ও জন্মসালের তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছিল। ওই পাসপোর্ট দিয়েই গ্রিসে রেসিডেন্স পারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র করেছি। এখন দেশে এসে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়েও সমস্যায় পড়েছি। এনআইডি সংশোধনের জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু দীর্ঘদিনেও সমাধান হয়নি।”
একই ধরনের সংকটে পড়েছেন গ্রিসে দীর্ঘদিন প্রবাসজীবন কাটানো রফিকুল ইসলাম। পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে এনআইডির তথ্যের অমিল থাকায় তার আবেদন আটকে গেছে। ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। বিদেশে থাকা অবস্থায় যে পাসপোর্ট ব্যবহার করেছি, সেটির তথ্য অনুযায়ী আমার অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি হয়েছে। দেশে ফিরে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে দেখি এনআইডির তথ্যের সঙ্গে পাসপোর্টের তথ্যের মিল নেই। ফলে নবায়ন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।”
“তাই বিদেশে বৈধভাবে ব্যবহৃত নথিপত্র যাচাই করে এ ধরনের সমস্যার দ্রুত সমাধান করার আহ্বান জানাই। যেহেতু বিদেশে আমাদের ডকুমেন্ট তৈরি হয়েছে, তাই ওই তথ্য দিয়েই দেশে এনআইডি সংশোধনের অন্তত একবার সুযোগ দেওয়া দরকার,” যোগ করেন রফিকুল।
গ্রিসে কমিউনিটি নেতা জাহিদ ইসলাম বলেন, “বিদেশে যাওয়ার সময় অনেক প্রবাসী দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপে ভুল নাম, বয়স কিংবা জন্মতারিখের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে চলে যান। পরবর্তীতে ওই তথ্যের ভিত্তিতে রেসিডেন্স পারমিট, ব্যাংক হিসাব, চাকরির কাগজপত্রসহ বিভিন্ন বৈধ নথি তৈরি হয়ে যায়। দেশে ফিরে এনআইডির তথ্যের সঙ্গে গরমিল দেখা দিলে তারা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন। প্রকৃত পরিচয় ও বিদেশের বৈধ নথিপত্র যাচাই করে প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের জন্য বিশেষ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করে। পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে এনআইডির বড় ধরনের অমিল (যেমন- ৫ থেকে ১০ বছরের বয়সের পার্থক্য বা নামের বড় পরিবর্তন) থাকলে সেগুলোকে ‘গ’ বা ‘ঘ’ ক্যাটাগরির জটিল সংশোধন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বয়স প্রমাণের জন্য জন্ম নিবন্ধন, এসএসসি সনদ, বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অ্যাফিডেভিট চাওয়া হয়।
তবে বিদেশে তৈরি রেসিডেন্স পারমিটকে এনআইডি সংশোধন বা তথ্য প্রমাণের একক দাপ্তরিক ভিত্তি হিসেবে সরাসরি গ্রহণ করার স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় হাজার হাজার আবেদন ইসি কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন হয়ে আটকে রয়েছে।
প্রবাসীরা জানান, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের দেশগুলোতে থাকা কয়েক লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী এ ধরনের এনআইডি-পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতেও প্রবাসীরা এনআইডি সেবা পেতে বিলম্বের সম্মুখীন হন, যার মূল কারণ এই তথ্যের গরমিল।
বিদেশে অবস্থানকালে এনআইডির প্রত্যক্ষ প্রয়োজন না হলেও দেশে ফেরার পর ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংকিং লেনদেন, জমি ক্রয়-বিক্রয় ও কর সংক্রান্ত কাজ (টিন/রিটার্ন) করতে এনআইডি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। প্রবাসীরা মনে করেন, দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অবদান রাখা সত্ত্বেও এই ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তাদের জন্য একটি বড় বাধা।
এ সংকট নিরসনে প্রবাসীদের মূল দাবিগুলোর একটি হলো ‘বিশেষ সংশোধনের সুযোগ’। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের বৈধ ই-পাসপোর্ট, রেসিডেন্স পারমিট ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র সরজমিনে যাচাই-বাছাই করে অন্তত একবারের জন্য এনআইডি সংশোধনের বিশেষ সুযোগ দেওয়া।
তারা চান ‘পৃথক ডেস্ক ও দ্রুত নিষ্পত্তি’ সুযোগ। এনআইডি সংশোধনের আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে ডেডিকেটেড সেল বা পৃথক ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থা চালু করা। এছাড়া বিদেশে ব্যবহৃত বৈধ নথির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করারও দাবি জানান তারা।