‘মাকে বলেছিলাম, দেশে এসে রান্না করে খাওয়াব’

যে ছোট্ট ছেলেটা ডিম কিংবা ভাত রান্না করতে পারতো না সেই ছোট্ট ছেলেটা আজ মাংস রান্না করতে পারে। মাকে বলেছি, ইনশাআল্লাহ দেশে এসে আপনাকে রান্না করে খাওয়াবো। মা তো মহাখুশি।

মোহাম্মদ জোনাইদ, কাতার থেকে
Published : 6 Oct 2022, 09:15 AM
Updated : 6 Oct 2022, 09:15 AM

প্রবাস জীবনে দীর্ঘ ৭ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমার এই লেখা। আমি মোহাম্মদ জোনাইদ। কাতারের রাজধানী দোহা শহরে বসবাস করি। এখানেই আমার কর্মস্থল।

২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছিলাম মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ কাতারে। রাত সাড়ে ৮টায় আমিসহ প্রায় ১০০ যাত্রী নিয়ে একটি ফ্লাইট অবতরণ করে কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ নিয়ে বের হলাম। বাইরে বের হয়ে দেখলাম আমার প্রিয় একজন ভাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

দেখা হতেই বুকে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিয়ম হলো। কুশল বিনিয়ম শেষে গাড়িতে ওঠলাম, রওনা হলাম কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। কর্মস্থলে পৌঁছে সহকর্মীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে একজন সিনিয়র সহকর্মী আমাকে কাজের বিভিন্ন বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিলেন। ১০ ডিসেম্বর ছিল আমার প্রথম কর্মদিবস। ২০১৫ সালের সেই দিন থেকে শুরু করে কর্মস্থলে সততা ও দক্ষতার সাথে কাজ করছি।

আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো আমার প্রবাস জীবনের সুখ-দুঃখের কিছু বাস্তবমুখী কথা। কেমন গেলো দীর্ঘ ৭ বছর! প্রবাস জীবন আমাকে দিয়েছে অনেককিছু। আমাকে দিয়েছে ভাগ্যের খোঁজে ঘরছাড়া একটি জীবন। দিয়েছে পরিবার থেকে অনেক দূরে সরিয়ে। মা-বাবা, ভাই-বোনের শাসন থেকে অনেক দূরে রেখেছে।

পরিবার থেকে দূরে সরে না থাকলে হয়তো বুঝতে পারতাম না কতটা ভালোবাসি আমার পরিবারকে। কত রাত আসে যায়, মা আর ফোন দেয় না। বলে না বাবা তুই কোথায়? কখন আসবি? প্রবাস জীবনে প্রতি রাতে মায়ের সেই কথাটা ভেবে মনে মনে অনেক কেঁদেছি। মা-বাবা এখন আর আমাকে নিয়ে তেমন একটা চিন্তা করেন না। কারণ তাদের সেই ছোট্ট অগোছালো ছেলেটা আজ নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। যে ছোট্ট ছেলেটা ডিম কিংবা ভাত রান্না করতে পারতো না সেই ছোট্ট ছেলেটা আজ মাংস রান্না করতে পারে। মাকে বলেছি, ইনশাআল্লাহ দেশে এসে আপনাকে রান্না করে খাওয়াবো। মা তো মহাখুশি। আজ মা নেই, গত অগাস্টে মারা গেছেন।

প্রবাস জীবন আমাকে দিয়েছে এক অচেনা শহর। এক অচেনা শহরে মানুষ চেনায় ব্যস্ত আমি। এখানে চলতে হয় মানুষের মন বুঝে। এখানে চলতে হয় সবার সাথে তাল মিলিয়ে। অনেক সময় বুঝেও না বোঝার ভান করতে হয়। দীর্ঘ ৭ বছরে ছয়বার কর্মস্থল বদলি হয়েছে আমার। বদলির পাশাপাশি কর্মস্থলে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনে দ্বিতীবার পদোন্নতি হয়েছে আমার। এখানে কেবল ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা। মানুষ নামের ব্যস্ত একটা রোবট এখন আমি। রাত যতটায় ঘুমাই না কেন এর্লাম বেজে ওঠা মাত্রই ঘুমের বিদায়। প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায় করে কাজ শুরু করি। সেই সকাল থেকে শুরু করে দুপুর ১২টা পর্যন্ত।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রাম নয়তো মা-বাবা কিংবা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কথা বলি। কথাবার্তা বলতে বলতে বিশ্রামের সময় শেষ। আবার ৩টা থেকে শুরু করে রাত ৯/১০টা পর্যন্ত। কোনোদিন যদি বেশি ক্লান্ত হয়ে যাই তখন বিশ্রাম নিই। তার মাঝে আরেকটা টেনশন এসে বাসা বাঁধে, বাড়িতে কথা না বললে তো সবাই চিন্তা করবে। প্রবাসে না এলে হয়তো বুঝতে পারতাম না সবাই আমাকে এত ভালোবাসে।

প্রবাস জীবনে সবচেয়ে দারুণ সময় কেটেছে মহামারীতে। কর্মস্থলে একজনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় সবাইকে করানো হয়েছিলো টেস্ট। নেগেটিভ হওয়ার পরও কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়েছে একজন আক্রান্ত রোগী থাকার কারণে। হোম কোয়ারেন্টাইনের ১৪ দিন আমার ভালো সময় কেটেছে। তখন ভুলতে চেষ্টা করেছি প্রবাস জীবনের অতীতের সব দুঃখ-কষ্ট। প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, প্রবাস জীবন বড় কষ্টের, তা বোঝার ক্ষমতা সবার নেই। এই প্রবাস মানে সীমাবদ্ধ জেলখানা, প্রবাস মানে ত্যাগ, প্রবাস মানে পরিবারের ১০জনের সুখের জন্য নিজেকে বলি দেওয়া।

আমার মতো এ প্রবাস জীবনে পরিবারের সুখের জন্য অনেকে কাটিয়ে দিচ্ছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে অনেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাটিয়ে দেয় প্রবাসে। অনেক প্রবাসীকে মৃত্যুর পরও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে লাশটা পর্যন্ত পাঠানো যায় না দেশে। দেশে যেতে এত বছর অপেক্ষায় থাকা মানুষটাকে শেষে বিদেশের মাটিতে দাফন করতে হয়।

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ, আড্ডা, আনন্দ বেদনার গল্প, দেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সঙ্গে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!  
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক