১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আমিরাতে দেশি রেস্তোরাঁ: হারাতে বসেছে ‘তোলা দেওয়া’ ঐতিহ্য

মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো ভিনদেশি রেস্তোরাঁয় এমন চর্চা নেই।

আমিরাতে দেশি রেস্তোরাঁ: হারাতে বসেছে ‘তোলা দেওয়া’ ঐতিহ্য
‘তোলা দেওয়া’ বন্ধের নোটিশ, ছবি: লেখক।

বিডিনিউজ২৪

জাহাঙ্গীর কবীর বাপপি, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 09 Sep 2026, 02:32 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:57 AM

‘তোলা দেওয়া’, শব্দ দুটোর মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তৃপ্তি আর আপনত্বের ছোঁয়া। সহজ কথায় এর মানে হলো ‘বোনাস’ বা ‘অতিরিক্ত দেওয়া’। রেস্তোরাঁয় খেতে বসলে ভাত বা ডাল তো ফিনফিনে তৃপ্তিতে ফুরিয়ে যায়, কিন্তু গোল বাধে তরকারি নিয়ে। বাড়ির মতো পর্যাপ্ত না হওয়ায় খেতে খেতে একটু ঘাটতি পড়তেই পারে। 

ঠিক তখনই ডাক পড়ে সার্ভিস বয়ের, “ভাই, এক্কানা তোলা দেও!” এই এক ডাকেই প্লেটে এসে পড়ে দু-চার টুকরো বাড়তি মাংস আর এক হাতা ঝোল। আসলের চেয়ে সুদের মজা যেমন বেশি, তেমনি এই ফাওটুকুতে যে তৃপ্তি মেলে, তা যেন এক অনির্বচনীয় আনন্দের নাম। 

মাছের তোলা মানে একটু ঝোল আর আলু-পটল, বুটের ডালের তোলা মানে আরও দু’চামচ বাড়তি ডাল। মূলত চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই দারুণ কালচারটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে সব বাংলাদেশি হোটেলেই। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো ভিনদেশি রেস্তোরাঁয় এমন চর্চা নেই। ভারতীয় বা পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় অর্ডার দেওয়ার সময়ই জেনে নেওয়া হয় ফুল প্লেট নাকি হাফ প্লেট; শর্ট পড়লে সোজা হিসাব—আরেকটা কারি অর্ডার করতে হবে। 

কিন্তু প্রবাসের মাটিতে, বিশেষ করে প্রাচ্যের ম্যানহাটন খ্যাত আবুধাবি, সিটি অব গোল্ড দুবাই বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের পীঠস্থান শারজাহর মতো আমিরাতের শহরগুলোতে কবে যে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে চড়ে এই ‘তোলা দেওয়া’র সংস্কৃতি এসে ডেরা বেঁধেছে, তা আজ আর নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে এতোদিন তা বেশ বহাল তবিয়তেই চলছিল।

বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় প্রবাসী বন্ধুদের আড্ডা, ছবি: লেখক।

বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় প্রবাসী বন্ধুদের আড্ডা,

কিন্তু সময় বদলেছে, আর সেইসঙ্গে বদলে যাচ্ছে চিরচেনা দৃশ্যপট। সেদিন আবুধাবির পরিচিত দেশি খাবারঘর ‘শৈবাল হোটেল’-এ গিয়ে চোখে পড়লো এক বিষণ্ন নোটিশ—‘দুঃখিত, এখানে তোলা দেওয়া হয় না’। নোটিশটার একটা ছবি তুলবো, ঠিক তখনই পাশ থেকে এক কাস্টমার টেবিল বয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “ওয়া এক্কানা তোলা দেও ছাই..!” অর্থাৎ—ভাই, একটু তোলা দাও দেখি! 

শুনে মনে মনে কেবল হাসলাম। আসলেই কি এই প্রথা বন্ধ করা সম্ভব? এই নোটিশ ঝোলানোর পেছনের গল্পটা খুঁজতে গিয়ে জানা গেল প্রবাসের বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলোর টিকে থাকার এক লড়াইয়ের কথা। আবুধাবি সিটির খালিফা স্ট্রিটের ‘আল বোরাক রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড গ্রিল হাউজ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলমের কণ্ঠেও ঝরে পড়ল সেই অসহায়ত্ব। 

তিনি জানান, বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশি কাস্টমারদের সবসময় বাড়তি সুবিধা দিতে চান তারা। কিন্তু এখন সব ধরনের গ্রোসারি আইটেম—তেল, মশলা, সবজি, মাছ ও মাংস সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া। দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল থেকে শুরু করে বেড়েছে স্টাফ খরচও। আগে যেখানে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ৩০-৪০ শতাংশ লাভ হতো, এখন সেখানে ১০-১৫ শতাংশ তুলে আনাই দায়। কারণ ব্যয় বাড়লেও প্রান্তিক কাস্টমারদের কথা ভেবে খাবারের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না।

পরিস্থিতি কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা উঠে আসে আবুধাবির শিল্পনগরী মুসাফফাহ এম-১৬ এলাকার বাংলাদেশি মালিকানাধীন ‘গুড ব্র্যান্ড রেস্টুরেন্ট’-এর স্বত্বাধিকারী এস এম রফিকুল ইসলামের কথায়। তার রেস্তোরাঁর কাস্টমারদের বড় অংশই শ্রমজীবী। তাই সাশ্রয়ী মূল্যে, মাত্র ৭ থেকে ১২ দিরহামের মধ্যে দুপুর বা রাতের খাবার পরিবেশনের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে লাভের হার ৪০-৫০ শতাংশ থেকে সোজা ১৫-২০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী সংকট—প্রায় ১৪ বছরের বেশি সময় ধরে আমিরাতে বাংলাদেশিদের কর্মী ভিসা বন্ধ থাকা। 

১৪ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশিদের কর্মী ভিসা বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ে এভাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কর্মীদের আনতে হচ্ছে, ছবি: লেখক।

১৪ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশিদের কর্মী ভিসা বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ে এভাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কর্মীদের আনতে হচ্ছে,

এই জটিলতায় অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ে বাধ্য হয়ে অন্য দেশের কর্মী আনতে হচ্ছে। ফলে দেশ থেকে মনের মতো দক্ষ বাবুর্চি বা রন্ধনকর্মী আনা সম্ভব হচ্ছে না। আবুধাবির খালিদিয়া এলাকায় ২০১৬ সাল থেকে ‘বাংলা ফ্লাওয়ার রেস্টুরেন্ট’ চালিয়ে আসা তরুণ উদ্যোক্তা দেলোয়ার হোসেনও জানালেন একই আক্ষেপের কথা। একজন ভালো বাংলাদেশি শেফ আনতে পারলে তার ব্যবসার পরিধি আরও ২০ শতাংশ বেড়ে যেতো। ব্যবসা ভালো হলে কাস্টমারদের সন্তুষ্টির জন্য ‘তোলা’ বা অন্য যেকোনো সুবিধা দিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বাজারে টিকে থাকাটাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে মালিকপক্ষের এত শত হিসাব-নিকাশ আর সংকটের কথা মানতে নারাজ ভোজনরসিক প্রবাসীরা। একটি রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠা কাস্টমার তোফাজ্জল ইসলাম রাজু যেমনটা বলছিলেন, “এইসব শুধু বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টেই সম্ভব, অন্য কোনো দেশের রেস্টুরেন্টে তোলা দেওয়া হয় না।” আরেক প্রবাসী আলমগীর আজাদের সাফ কথা, “যতই বোর্ড লাগাও কোনো লাভ নাই, কাস্টমার তোলা খুঁজবেই খুঁজবে!” 

ওমর ফারুকের বিশ্বাস, কমবেশি সব দেশি রেস্তোরাঁতেই এই প্রথা চালু আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আর মোর্শেদ বিন ফায়জুল হক তো এক ধাপ এগিয়ে সোজাসাপটা জানিয়ে দিলেন, “যে হোটেলে তোলা দেবে না, সে হোটেলে টাকা দিয়ে খেতে যাব না!”

কাস্টমারদের এই নাছোড়বান্দা ভালোবাসাই হয়তো প্রবাসের মাটিতে বাংলাদেশি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই সব অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের শেষে হলফ করে বলা যায়—যত প্রতিকূলতাই থাকুক না কেন, যতদিন আমিরাতের বুকে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলো টিকে থাকবে, ততদিন প্রবাসীদের প্লেটে একটুখানি আপনত্বের স্বাদ হয়ে এই ‘তোলা দেওয়া’ প্রথাও বেঁচে থাকবে।