Published : 28 Apr 2026, 01:32 PM
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হিশাম আবুগারবিয়েহর অস্বাভাবিক আচরণের বিষয়ে অতীতে তার পরিবার পুলিশকে জানিয়েছিল।
সিবিএস নিউজের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ কথা জানিয়েছেন হিশামের ছোট ভাই ২২ বছর বয়সী আহমাদ আবুগারবিয়েহ।
তিনি বলেছেন, তার বড় ভাই অত্যন্ত রাগী স্বভাবের ছিলেন এবং রুমমেট হিসেবে তার অন্য কারও সঙ্গে থাকা ঠিক হয়নি।
“আমি জানতাম না যে তার কোনো রুমমেট আছে। তার হয় একা থাকা উচিত ছিল, নয়ত ঘরছাড়া থাকা দরকার ছিল।”
২৭ বছর বয়সী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির মৃত্যুর ঘটনায় ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত খুনের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
লিমনের মৃতদেহ শুক্রবার উদ্ধার করা হয়। আর বৃষ্টির মৃতদেহ খোঁজার মধ্যে কর্তৃপক্ষ রোববার দেহাবশেষ পেয়েছে। ওই দেহাবশেষ বৃষ্টির কি না তা যাচাই করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ বলেছে, দুই দেহাবশেষই টেম্পা বে-র হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর বা পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো লিখেছে, গোয়েন্দারা ১৭ এপ্রিল ভোরে হিশামের ফোনের অবস্থান হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে শনাক্ত করেছেন।
লিমন ও হিশামের আরেক রুমমেট জানিয়েছেন, তিনি ১৬ এপ্রিল রাতে এবং পরদিন সকালে হিশামকে একটি ট্রলি কার্ট ব্যবহার করে কক্ষ থেকে বেশ কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ডাম্পস্টারে (আবর্জনা ফেলার স্থান) নিয়ে যেতে দেখেছেন। হিশাম তাকে বলেছিলেন, যেসব পুরনো কাপড় আর ব্যবহার করেন না, সেসব তিনি ফেলে দিচ্ছেন।
আহমাদ আবুগারবিয়াহ জানান, গত শুক্রবার সকালে বড় ভাই হিশাম হঠাৎ করে পারিবারিক বাড়িতে হাজির হওয়ার পর তিনি নিজে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পুলিশ ডেকেছিলেন।
“তিনি খুব অদ্ভুত আচরণ করছিলেন, এ কারণে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য আমি পুলিশ ডাকি।”
আদালতের নথি অনুযায়ী, হিশাম ২০২৩ সাল থেকে তার পরিবার থেকে আলাদা থাকেন।

গ্রেপ্তারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিশামকে কেবল টাওয়েল পরে শয়নকক্ষে ভিডিও গেমস খেলতে দেখে প্রতিবাদ করেন তার ছোট বোন। হিশাম তার বোনের দিকে এগিয়ে যান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ভুক্তভোগীকে চুমু দেওয়ার চেষ্টা করেন আসামি। তখন ভুক্তভোগী ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন।”
শুক্রবার হিশামকে নাটকীয়ভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়। তিনি টাওয়েল পরেই দুই হাত উঁচু করে বাড়ি বাইরে এসে ধরা দেন। তাকে হেফাজতে নেন হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ দপ্তরের ডেপুটিরা। তাকে জামিন না দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে এবং মঙ্গলবার আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।
আহমাদ আবুগারবিয়েহ নিহতদের পরিবারের উদ্দেশে একটি বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আমি কিছুতেই তাদের সবাইকে নিয়ে ভাবা বন্ধ করতে পারছি না; আমার খুব খারাপ লাগছে। সবকিছুর জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি এবং আমার পুরো পরিবার অনেক লজ্জা ও অপরাধবোধ অনুভব করছি।”
তিনি এও বলেন, “আমরা অতীতে পুলিশকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলাম।”

আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী, হিশামের বিরুদ্ধে দুটি সুরক্ষা আদেশের আবেদন করেছিল পরিবার; একটি ২০২৩ সালে মঞ্জুর হয়েছিল এবং অন্যটি ২০২৫ সালে খারিজ হয়ে যায়। সুরক্ষা আদেশ হচ্ছে দেওয়ানি বিষয়, যা দিতে পারে হিলসবরো কাউন্টির ক্লার্ক অব কোর্টস।
শারীরিক আক্রমণের অভিযোগগুলো এগিয়ে নিতে না পারায় ২০২৫ সালের আবেদনটি খারিজ করে দেন একজন বিচারক।
আহমাদ জানান, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ২০২৩ সালে তিনি তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা এগিয়ে নিতে পারেননি।
“আমি মামলাটি বাদ দিয়েছিলাম, কারণ আমি ভেবেছিলাম এতে আমার অনেক টাকা খরচ হবে। সেই সিদ্ধান্তের জন্য তখনই আমি অনুতপ্ত হয়েছিলাম।”
২০২৩ সালের সুরক্ষা আদেশের আবেদনে আহমাদ লিখেছিলেন, “ভাই বারবার আমার মাথায় ঘুষি মেরেছে, আমার শার্ট ছিঁড়ে ফেলেছে এবং আমাকে রক্তাক্ত করেছে ও মুখে জখম করেছে। আমি পুলিশ ডাকতে বাইরে গেলে সে বাড়ির মিনিভ্যান নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে।”
অন্য একটি ঘটনায় আহমাদ অভিযোগ করেন, হিশাম তার মায়ের সঙ্গে সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে পুরো শয়নকক্ষ তছনছ করে ফেলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, তার ভাই মাঝরাতে চিৎকার করে বলতেন যে তিনি সৃষ্টিকর্তা এবং সবার উচিত তার সামনে মাথা নত করা।
হিশামের পক্ষে লড়া হিলসবরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিসের একজন মুখপাত্র সিবিএস নিউজকে বলেন, “আমরা এই মামলাটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ বুঝতে পারছি, তবে আমাদের পেশাগত বাধ্যবাধকতা এবং আমাদের মক্কেলের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রক্ষার্থে আমরা জনসম্মুখে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছি।
“আমরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মক্কেলের প্রতিনিধিত্ব করার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।”
আহমাদের বক্তব্য নিয়ে হিলসবরো কাউন্টি স্টেট অ্যাটর্নি দপ্তর সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে তারা ফেইসবুক পোস্টে লিখেছে, “হিশাম আবুগারবিয়েহ আমাদের সমাজের জন্য একটি বিপদ এবং বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাকে জামিন না দিয়ে আটকে রাখা উচিত।”
স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ বলেন, “এই অবিশ্বাস্য কঠিন সময়ে আমাদের হৃদয় দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের পাশে আছে। তারা উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন, এসময় আমাদের ভাবনায় তারা রয়েছেন।”
সিবিএস নিউজের মন্তব্যের অনুরোধে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস সাড়া দেয়নি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক লিমন ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন, আর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন।
২৭ বছর বয়সি লিমন ও বৃষ্টি ছিলেন পরস্পরের বন্ধু। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এসে তারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ বাংলাদেশ থেকে ফ্লোরিডার একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, লিমন ও বৃষ্টির প্রেমের সম্পর্ক সাড়ে চার বছরের। তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকেও দ্বিমত ছিল না। তবে উচ্চ শিক্ষা শেষ করেই তারা বিয়ের কাজটি সারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঘটল মর্মান্তিক ঘটনা।
১৬ এপ্রিল সকাল থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের ফোন বন্ধ পেয়ে এবং কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে পরিবারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবার।
গ্রেপ্তার হিশামও একসময় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ছাত্র ছিলেন।