‘এখনও বুকের মধ্যে দাউ দাউ আগুন জ্বলে’
২০১৩-১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের ‘আন্দোলনের’ সময় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহতদের স্বজন ও অগ্নিদগ্ধরা তুলে ধরনে তাদের দুঃসহ যন্ত্রণার কথা।
“মাইশা আমাকে আর মা বলে ডাকে না। আমি আমার সন্তানের ডাক আট বছর থেকে শুনতে পাই না।”
চোখের সামনে সন্তান ও স্বামীর আগুনে পুড়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন আর কাঁদতে কাঁদতে এমন স্মৃতিচারণ করছিলেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মাফুয়া বেগম। মিলনায়তন ভর্তি মানুষের চোখ তখন চিক চিক করছে।
রোববার মাফুয়ার মত প্রিয়জন ও স্বজন হারানো এবং শরীরে পোড়া ক্ষত নিয়ে নিদারুণ কষ্টে বেঁচা থাকা আরও কয়েকজনের এমন দুঃসহ যন্ত্রণার কথা আর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে ঢাকায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের মিলনায়তন। শ্রোতা-দর্শকদের নিরবতার মধ্যে দুঃসহ সেইসব দিন আর কষ্টের কথা তুলে ধরেন তারা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেককে অশ্রুসজল হতে দেখা যায়।
‘অগ্নি সন্ত্রাসের আর্তনাদ: বিএনপি-জামাতের অগ্নি সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের খন্ডচিত্র’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আওয়ামী লীগ।
এতে ২০১৩-১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের ‘আন্দোলনের’ সময় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত ও আহতদের স্বজন এবং অগ্নিদগ্ধরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের অনেকে স্মৃতিচারণও করেন।
বিএনপি-জামায়াতের সেই আন্দোলনের সময় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি চলন্ত বাসে হামলা করে অগ্নিসন্ত্রাসীরা। সমুদ্র সৈকত ঘুরে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে সেই বাসে কক্সবাজার ফিরছিলেন নুরুজ্জামান বাবলু।
বাসে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান বাবলু, তার কিশোরী কন্যা মাইশা। গুরুতর আহত হয়ে প্রাণে বেঁচে যান বাবলুর স্ত্রী মাফুয়া বেগম।
অনুষ্ঠানে মাফুয়া বলেন, "আমরা রাজনীতি করি না, আমরা রাজনীতি বুঝি না। পেটের দায়ে আমাদের স্বামী সন্তানদের রাস্তায় বেরুতে হয়। কেন আমরা এভাবে অগ্নি সন্ত্রাসের শিকার হবো। আমার সন্তান মাইশা কি অপরাধ করেছিল। আমার স্বামী কি অপরাধ করেছিল।“
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, "প্রাণে বাঁচাতে আমার স্বামী আমাকে জানালা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। আমি আমার সন্তানকে বাঁচাতে পারিনি, স্বামীকে বাঁচাতে পারিনি। চোখের সামনে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলেছে, আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি। এখনও আমার বুকের মধ্যে দাউ দাউ করে সেই আগুন জ্বলে।"
"আমি এখনও সারারাত ঘুমাতে পারি না। আমার চোখের সামনে সেই আগুনের শিখা দেখতে পাই। আমার মাইশা আম্মু বলে যে চিৎকার দিয়েছিল সেই ডাক এখনও আমার কানে বাজে। আমি ঘুমাতে পারি না। সারারাত আমি ঘুমাতে পারি না। আমরা কি অপরাধ করেছিলাম।"
এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর আর্তনাদ নিয়ে বেঁচে আছেন মাফুয়ার মত আরেকজন স্বামী হারা বীনা সুলতানা।
তিনি বলেন, "আমার সন্তানরা তাদের বাবাকে ডাকতে পারে না। কী অপরাধ করেছিল আমার স্বামী। সহিংসতায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"
নিহত পুলিশ সদস্য বাবলু মিয়ার স্ত্রী বলেন, "আমি স্বামী হারিয়েছি, আমার সন্তান বাবা হারিয়েছে। আর কেউ যেন স্বামী হারা-সন্তান হারা না হয়।"
সেসময় ককটেলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত চোখ নিয়ে বেঁচে থাকা শিক্ষার্থী অন্তু বড়ুয়া বলেন, "আমরা শিশুরা কি অপরাধ করেছিলাম। আমরা কেন রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার। পেট্রোল বোমা-ককটেল মেরে এটা কী ধরনের রাজনীতি। আমরা একটা সুষ্ঠু সুন্দর দেশ চাই। সুষ্ঠু সুন্দর দেশের স্বপ্ন দেখি।"
সরকারবিরোধী সেই আন্দোলনকালে শাহবাগে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নিহত নাহিদের মা রুনি বেগম বলেন, "আমার সন্তানের লাশ আমি দেখতে পারিনি। আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই। আপনি (প্রধানমন্ত্রী) আমার মা, আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই।"
যাত্রাবাড়ীতে বাসে পেট্রোল বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন সালাউদ্দিন ভূঁইয়া। শরীরের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে ঝলসে যায় পুরো মুখ। আগুনে পুড়ে পুরো চেহারা বিকৃত হয়ে যায়।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, "এখন আমাকে দেখে মানুষ ভয় পায়। আমার পাশে সিটে মানুষ ভয়ে বসতে চায় না। কেউ কাজে নেয় না। আগে যেখানে যেতাম চাকুরি হয়ে যেত।"
নিজের চোখের সামনে আগুনে পুড়ে মারা যান কর্ভাড ভ্যান চালক রমজান আলীর সন্তান মনির হোসেন।
রমজান বলেন, "আমার ছেলের কি অপরাধ। আমরা তো কোনো রাজনীতি করি না। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। পেটের দায়ে, এক মুঠো ভাতের জন্য টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া গাড়ি চালাই। কী অপরাধে আমার সন্তানকে পেট্রোল বোমা মেরে হত্যা করা হল।"
অনুষ্ঠানের শুরুতে একটি নাটিকার মাধ্যমে অগ্নিদগ্ধদের যন্ত্রণা চিত্র তুলে ধরা হয়। এরপর বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের সময় নিহত ও আহত অগ্নিদগ্ধদের ওপর এবং যানবাহনের অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকরা উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা নিহতদের স্বজন ও আহতদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। তাদের কথা শোনেন ও সমবেদনা জানান।
