২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সংবিধান সংশোধন কমিটিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তেই আছে বিরোধী দল

“আপনারা সবই জুলাই সনদের ভিত্তিতে চাইবেন, অথচ সনদ বাস্তবায়নের সহযোগিতায় আসবেন না, এটা বিপরীতমুখী,” বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Aug 2026, 09:54 PM

Updated : 16 Sep 2026, 05:11 PM

সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে বিরোধী দল। তবে জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংসদের আসনের অনুপাতে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদে নিজেদের অংশ চেয়েছে তারা।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বলেছে, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে তাদের আসনের অনুপাতে প্রায় ১০টি স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দিতে আপত্তি নেই।

এ নিয়ে রোববার জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়।

শেষ পর্যন্ত নতুন যেসব সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের কথা ছিল, সেগুলোর প্রস্তাব আর তোলা হয়নি। বিরোধী দলের সঙ্গে আরও আলোচনা করে পরের বৈঠকে কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম।

তবে আগে গঠিত আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত চারটি স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।

কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের কার্যক্রম শুরুর আগে বিষয়টি নিয়ে চিফ হুইপের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের কথা বলেন। 

দুই পক্ষের বক্তব্যের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল প্রয়োজনে সরকারি ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল নেতাদের ‘ক্লোজ ডোরে’ বসে মতপার্থক্য কমানোর আহ্বান জানান।

সভাপতির ২৬ শতাংশ পদ চায় বিরোধী দল

বিরোধীদলীয় উপনেতা তাহের বলেন, সংসদে তাদের সদস্যসংখ্যার অনুপাতে বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে প্রায় ২৬ শতাংশ সদস্যপদ দেওয়া হচ্ছে। একই অনুপাতে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদও বিরোধী দলকে দেওয়া উচিত বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কোনো স্থায়ী কমিটির সভাপতি এখন পর্যন্ত বিরোধী দল থেকে করা হয়নি।

এ বিষয়ে সরকারি দলের সঙ্গে আরও আলোচনা করে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রস্তাব দেন তাহের।

চিফ হুইপের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনে তিনি সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে যোগ দেওয়ার সম্মতি দিয়েছেন বলে সংসদে যে বক্তব্য আসে, তা প্রত্যাখ্যান করেন তাহের। 

তিনি বলেন, “আমাদের প্রিন্সিপাল ডিসিশন হচ্ছে...সংবিধান সংশোধন যে কমিটি, এই কমিটিতে আমরা অংশগ্রহণ করব না।”

তিনি বলেন, একটি কমিটিতে যোগ দেওয়ার শর্তে অন্য সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া ঠিক হবে না। 

তার বক্তব্য, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী বিরোধী দল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে আসন অনুপাতে অংশ পাওয়ার অধিকার রাখে।

অতীতে বিরোধী দলকে এসব কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হয়নি বলে সরকারি দলের যে যুক্তি, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেন তাহের।

তিনি বলেন, অতীতে অনেক ‘খারাপ নজির’ ছিল। সেসব অনুসরণ না করে বর্তমান সংসদে নতুন নজির তৈরি করা উচিত।

তাহের বলেন, “আমরা মনে করি যে একটা কমিটিতে জয়েন করানোর জন্য আমাদের ওপর শর্তারোপ করে জোর-জবরদস্তি করার যে একটা ট্রেডিশন বা যে কথা বলছেন, এটা আমরা সঠিক মনে করি না।”

তিনি আরও বলেন, সংসদের বর্তমান অধিবেশন ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এর মধ্যে আলোচনা করে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হলে তা সংসদের জন্য একটি ভালো নজির হবে।

কমিটিতে এলে ১০টি সভাপতি দিতে রাজি: চিফ হুইপ

চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বিরোধী দলকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দিতে সরকারি দলের নীতিগত আপত্তি নেই। বরং আসনের অনুপাতে প্রায় ১০টি কমিটির সভাপতির পদ দিতে তারা প্রস্তুত।

তবে তার বক্তব্য, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য যে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, বিরোধী দলকে তাতে অংশ নিতে হবে। 

তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সেখানে বিরোধী দলের জন্য পাঁচজন সদস্যের জায়গা রাখা হয়েছে।

তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে সেই সনদের ভিত্তিতে সভাপতির পদ দাবি করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তার বক্তব্য, বিরোধী দল যদি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদ পায়, তাহলে সরকারের কার্যক্রম তদারকির সুযোগ বাড়বে এবং সরকারের জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।

আগে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় আসুন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সদিচ্ছা সংবিধান সংশোধনের আগেই দেখিয়েছে।

স্পিকার নির্বাচনের আগে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেজন্য জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়নি।

তার ভাষ্য, বিরোধী দল তখন সেই পদ নিতে রাজি হয়নি।

এরপর সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সেখানে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হয়েছে।

বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন বলেন, কমিটির প্রথম বৈঠক ইতোমধ্যে হয়েছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতি, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সম্পাদক, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এসব মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি হবে। এরপর সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে আনা হবে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাবও রয়েছে।

তবে তার বক্তব্য, “সেজন্য তো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হতে হবে। সংবিধান সংশোধন করা হবে, তারপরে পাবেন।”

বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, সেখানে তারা দ্বিমত বা ভিন্নমত দিলে সেটিও প্রতিবেদনে থাকবে।

তিনি বলেন, “আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন। আপনাদের যা বক্তব্য আছে আমরা সেটা লিপিবদ্ধ করব। আপনাদের বক্তব্য জাতি জানবে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আপনারা সবই জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চাইবেন। অথচ সনদ বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতায় আসবেন না, এটা বিপরীতমুখী হয়ে যায়।”

‘ক্লোজ ডোরে’ আলোচনার পরামর্শ

দুই পক্ষের বিতর্কের এক পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। তবে দেশের স্বার্থে সেই মতপার্থক্য কমানোর সুযোগ এখনও রয়েছে।

প্রয়োজনে প্রকাশ্য আলোচনার বাইরে দুই পক্ষের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বসার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “ওপেন এভাবে ডিসকাস করতে না পারলেও ক্লোজ ডোরে... ব্যক্তিবর্গ বসেন।”

ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন’ ও ‘সংবিধান সংস্কার’ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কিছুটা শাব্দিক মতপার্থক্যও থাকতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে সেটি কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দল ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছিল। কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি।

বিরোধী দলের বক্তব্য, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে তারা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। তবে বর্তমান পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটি গঠনের সঙ্গে তাদের নীতিগত ও ধারণাগত মতপার্থক্য রয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি দলের বক্তব্য, জুলাই জাতীয় সনদের যেসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, সেগুলো কার্যকর করতেই বিশেষ কমিটি কাজ শুরু করেছে।

জুলাই জাতীয় সনদে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটিসহ কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

নতুন কমিটি গঠন স্থগিত

আলোচনা শেষে চিফ হুইপ বলেন, এদিন নতুন যেসব সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের কথা ছিল, সেগুলোর প্রস্তাব তিনি আর তুলবেন না।

বিরোধী দলের সঙ্গে আরও আলোচনার জন্য কমিটি গঠনের বিষয়টি আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে।

সংসদের কয়েক দিনের বিরতির মধ্যে আলোচনা করে পরবর্তী বৈঠকে আবার কমিটি গঠনের কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।

তবে আগে গঠিত চারটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠনের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।