শপথ নেওয়ার পর সুলতান মনসুরকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার

দলের সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সুলতান মো. মনসুর আহমেদকে বহিষ্কার করেছে গণফোরাম।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 March 2019, 11:23 AM
Updated : 7 March 2019, 01:55 PM

কামাল হোসেনের দল গণফোরামে সুলতান মনসুরের নাম সভাপতিমণ্ডলীর তালিকায় থাকলেও তিনি দাবি করে আসছেন, এই দলে তিনি যুক্ত নন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হয়ে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী এক সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান মনসুর বৃহস্পতিবার শপথ নেন।

শপথ নেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জোটের শীর্ষ নেতা অর্থাৎ কামাল হোসেনকে ‘জানিয়েই’ তিনি শপথ নিয়েছেন।

তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিকালে মতিঝিলে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসে সুলতান মনসুরকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, কামাল হোসেনের ‘নির্দেশেই’ এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বহিষ্কারের পর সন্ধ্যায় সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন সুলতান মনসুর। অধিবেশন কক্ষে স্পিকারের আসনের বাম পাশে বিরোধী দলের আসনের দ্বিতীয় সারিতে তাকে আসন দেওয়া হয়েছে।

সুলতান মনসুরকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্টু, যে জোটে গণফোরাম ছাড়াও রয়েছে বিএনপি, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে কামাল হোসেনের উদ্যোগে বিএনপিকে নিয়ে এই জোট গঠিত হয় এবং জোটের প্রায় সব প্রার্থী বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন।

সুলতান মনসুরও মৌলভীবাজার-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হন। তিনিসহ জোটের মোট আটজন জিতলেও হেরে যান বাকি সবাই।

ফল ঘোষণার পর ‘ভোট ডাকাতি’র অভিযোগ তুললেও কামাল হোসেন ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিজয়ীদের শপথ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে বিএনপির অনড় অবস্থানের মধ্যে জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত কেউ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না।

কিন্তু এর মধ্যে গণফোরামের হয়ে নির্বাচনে জিতে আসা সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান শপথ নেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে চিঠি দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে।

শেষ মুহূর্তে মোকাব্বির দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থেকে বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে না গেলেও সুলতান মনসুর গিয়ে শপথ নেন।

শপথ নেওয়ার ‘জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু’ বলেন আওয়ামী লীগের সাবেক এই সংগঠনিক সম্পাদক, যিনি ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় সংস্কারপন্থি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে দলে অপাঙক্তেয় হয়ে পড়ার কয়েক বছর পর ভিড়েছিলেন আওয়ামী লীগেরই এক সময়ের নেতা কামাল হোসেনের সঙ্গে।

স্পিকারের কাছ থেকে শপথ নেন সুলতান মো. মনসুর

ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে জয়ী হয়ে জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সুলতান মনসুর শপথ নেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ঘটনাটিকে ‘ছলনা’ বলেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তার পরপরই দুপুরে কামাল হোসেন মতিঝিলে তার পেশাগত চেম্বারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে বৈঠকে বসেন। তাতে মোকাব্বির হোসেন ও মন্টুও ছিলেন।

তারপর মতিঝিলে গণফোরাম কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে সাধারণ সম্পাদক মন্টু বলেন, “সুলতান মনসুর সাহেব আমাদের গণফোরামের সদস্য ছিলেন। আমরা মনে করি যে, গণফোরামের যে গণমুখী নীতি, আদর্শ যেটার সাথে উনি প্রতারণা করেছেন এবং গঠনতন্ত্রের পরিপন্থি কাজ করেছেন।

“আমাদের কর্মসূচি, নিয়ম-কানুন, আদেশ-নির্দেশ অমান্য করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তিনি (সুলতান মনসুর) জাতীয় সংসদে সদস্য হিসেবে আজকে শপথ নিয়েছেন। এই জন্য দল, জনগণ ও ঐক্যফ্রন্ট সবাই মর্মাহত এবং ক্ষুব্ধ।

“আমরা সুলতান মো. মনসুরকে, যিনি মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করছি।”

সুলতান মনসুরের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক, তবে কী ব্যবস্থা তা স্পষ্ট করা হয়নি।

গণফোরাম বহিষ্কার করলেও সুলতান মনসুরের সংসদ সদস্য হিসেবে টিকে থাকার ক্ষেত্রে তার কোনো প্রভাব না পড়ারই কথা।

কেননা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে- কেউ দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সদস্যপদ খারিজ হবে।

শীর্ষ নেতাকে জানিয়ে শপথ নেওয়ার বিষয়ে সুলতান মনসুরের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে মন্টু বলেন, “আজকে দুপুরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমি ও আমাদের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকা্ব্বির সাহেব ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে তার সভাপতিত্বে বৈঠক করেছি। সেখানেই অব্যহতির এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। সুতরাং এখানে আর কোনো অবকাশ থাকে না যে, উনি বলেছেন।”

৩০ ডিসেম্বর ভোটের পর সংবাদ সম্মেলন এবং সাম্প্রতিক গণশুনানিতে কামাল হোসেনের বক্তব্যের উল্লেখ করে গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক বলেন, “উনি এই নির্বাচন স্বীকারই করেননি, তাহলে তিনি কী করে প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত যে সংসদ, সেই সংসদে তাকে (সুলতান মনসুর) শপথ নিতে অনুমতি দেবেন?

“যেখানে ৮ জন জনগণের পক্ষে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে আর বাকি ২৯২ জন সংসদ সদস্য হচ্ছেন ভোট ডাকাতদের সংসদ সদস্য। তাদের পক্ষে ড. কামাল হোসেন কী করে রায় দেবেন?”

‘চিনে উঠতে পারিনি’

সুলতান মনসুরের এই অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে এক সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেছেন, তারা তাকে ‘চিনে উঠতে’ পারেননি।

সুলতান মনসুরকে জোটের প্রার্থী করাকে ভুল ছিল কি না- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “দেখুন আমি কিছু করার আগ পর্যন্ত কিন্তু বুঝতে পারবেন না আমার মনে ভেতরে কী আমি পোষণ করছি। আমার মনের ভেতরে যদি কোনো কালিমা থাকে, কোনো অভিসন্ধি থাকে, সেই ঘটনা ঘটানোর পর আপনার উপলব্ধিটা আসবে যে, বোধহয় না করলে আমরা পারতাম।

“আমাদের বেলা তাই হয়েছে। আমরা ঠিক চিনে উঠতে পারেনি।”

নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এক সংবাদ সম্মেলনে সুলতান মো. মনসুর (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)-ফাইল ছবি

গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমরা দুঃখিত জাতির কাছে যে, আমরা যে ওয়াদা করেছিলাম সেটা আমাদের ভেতর থেকে ভঙ্গ হল। সেজন্য আমরা আসলে দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।”

গণফোরামে যুক্ত নন, ছিলেন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায়- সুলতান মনসুরের এই দাবির পাল্টায় মন্টু ২০১৮ সালে ১০ নভেম্বর গণফোরামের সদস্য হওয়ার তার আবেদন ফরমটি সাংবাদিকদের দেখান।

“উনি আমাদের সদস্য ছিলেন। এই যে তার নাম ও স্বাক্ষর করা ফরম দেখুন,” বলেন তিনি।

সুলতান মনসুরকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে লেখা চিঠি পড়ে শোনান মন্টু।

এতে বলা হয়, “জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের নামে অসংখ্য গায়েবী মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, বাড়িঘর অগ্নিসংযোগ, আহত, নিহত, নেতা-কর্মীদের মুক্তি বা মামলার ফয়সালা হয়নি এবং ৩০ ডিসেম্বরের প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচন ইত্যাদি জাতীয় সংকট প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীনদের কোনো উদ্যোগ না থাকা সত্ত্বেও আপনি শপথ গ্রহণ করেছেন, যাতে দেশের মানুষ চরম হতাশ এবং বিক্ষুব্ধ।

“আমাদের দল গণফোরাম এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনে করে, গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধার ও ভোটের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে পদদলিত করে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে আপনি নৈতিকতাবিরোধী, জনবিরোধী এবং সংসদীয় রীতিবিরোধী কাজ করেছেন। আপনার বিরুদ্ধে দলের নীতিবিরোধী, আদর্শবিরোধী, জনবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে আপনার গণফোরামের প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করা হল এবং গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হল।”

‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি’

গণফোরাম থেকে নির্বাচিতরা যে শপথ নেবেনই না, সেরকম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান মন্টু।

মোকাব্বির খান বুধবার বলেছিলেন যে দলের পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি শপথ নিচ্ছেন না।

সেক্ষেত্রে শপথ নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা কি রয়েছে- সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল গণফোরাম সাধারণ সম্পাদকের কাছে।

জবাবে তিনি বলেন, “শোনেন, কনক্রিট এরকম কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্তটা এরকম হয়েছে যে, যদি আমরা ভবিষ্যতে সংসদ সদস্যরা যাই সময়সীমার ভেতরে। তাহলে একটা রীতি ও নীতি নির্ধারণ করেই তারা যাবেন। যেটা হচ্ছে সংসদের ভেতরে আন্দোলন, সংসদের বাইরে আন্দোলন।

“সেই আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা যদি যান সেখানে, সংসদে গিয়ে যে অবৈধ নির্বাচনের হয়েছে এটার ভাঙার দাবি তুলে ওয়াকআউট করে চলে আসেন এবং সেখানে তারা জনগণের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন, কর্মসূচি থ্রো করেন, এটা আমরা গ্রহণ করব। এটা পরবর্তী পর্যায়ে।”

“এটা সমস্ত রাজনৈতিক দল ও ঐক্যফ্রন্ট সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, আমাদের একক সিদ্ধান্তে কিছু হবে না,” যোগ করেন তিনি।

ইসি ইতোমধ্যে জানিয়েছে, নির্বাচিত কেউ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নিলে তার আসন শূন্য হয়ে যাবে।

৩০ জানুয়ারি একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছে। তার পরের ৯০ দিনের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের সাতজন শপথ না নিলে তাদের আসনে উপ-নির্বাচন হবে।