Published : 31 Aug 2026, 09:02 PM
সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের যোগ দেওয়া নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে বাকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠনে প্রয়োজনে সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মেয়াদ এক দিন বাড়ানোর কথা বলেছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
চলতি অধিবেশনেই এসব কমিটি গঠন করতে চান জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে অধিবেশনের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তার আপত্তি নেই।
তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসা ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রতিনিধিদল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবন পরিদর্শন করে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ হুইপ।
এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ও এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান।
সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী লুনাও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধান সংশোধন নিয়ে আইপিইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে আলোচনা হয়নি। তবে বৈঠকের বাইরে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বিষয়টি উঠেছিল।
চিফ হুইপ বলেন, আইপিইউ প্রতিনিধিরা বিষয়টি তুললে তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের বলেছেন, সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে বিএনপি ‘খোলা মন নিয়ে’ আলোচনা করতে চায়।
প্রথম অধিবেশনেই সব সংসদীয় কমিটি গঠনের পরিকল্পনা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দল দ্বিতীয় অধিবেশনের মধ্যে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির জন্য তাদের সদস্যদের নাম দেবে বলে ‘আশ্বাস’ দিয়েছিল। সেই আলোচনার কারণে বাকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনে দেরি হয়েছে।
নুরুল ইসলাম বলেন, “তৃতীয় অধিবেশনে এসব কমিটি গঠনে আর বিলম্বের সুযোগ নেই। প্রয়োজনে অধিবেশনের মেয়াদ এক দিন বাড়িয়েও কমিটি গঠন করা হবে।”
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার কথাও জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার সঙ্গেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
প্রকাশ্যে বিতর্ক না করে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের মতপার্থক্য নিরসনের ওপর জোর দেন চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ভিন্নমত থাকাই স্বাভাবিক। একজনের বক্তব্য অন্যজনের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। তবে যিনি বক্তব্য দিচ্ছেন, তার কাছে সেটি সঠিক। তাই ভিন্নমতকেও মূল্য দিতে হবে।
বিশেষ কমিটি নিয়ে টানাপড়েন
গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হয়েছে। বিরোধী দল সদস্যদের নাম না দেওয়ায় পদগুলো এখনও শূন্য রয়েছে। কমিটির প্রথম বৈঠকও হয়েছে।
রোববার সংসদে ওই কমিটিতে যোগ দেওয়া এবং মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়।
বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনার জন্য নতুন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তাব স্থগিত করেন চিফ হুইপ।
‘হাতি-পিঁপড়া’ তুলনায় ঐকমত্যের সমালোচনা
জুলাই জাতীয় সনদ তৈরির সময় অন্তর্বর্তী সরকারের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ারও সমালোচনা করেন নুরুল ইসলাম মনি।
তিনি বলেন, ঐকমত্যের আলোচনায় ৩২টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। বর্তমানে এসব দলের মধ্যে মাত্র তিন থেকে চারটির সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। প্রায় ২৫টি দলের কোনো সংসদ সদস্য নেই।
জনসমর্থন ও প্রতিনিধিত্বে বড় পার্থক্য থাকার পরও সব দলকে একই অবস্থানে রেখে আলোচনা করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন চিফ হুইপ। বিএনপিকে ‘হাতি’ এবং ছোট ও প্রতিনিধিত্বহীন দলগুলোকে ‘পিঁপড়া’র সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।
নুরুল ইসলাম বলেন, দুই পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি সমান না হলেও ঐকমত্যের আলোচনায় তাদের একই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ প্রক্রিয়া ঐক্য তৈরির বদলে অনৈক্য বাড়িয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ সংসদে থাকা দলগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, এসব দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘মতপার্থক্য কমানোর’ চেষ্টা চলছে।
সংবিধান সংশোধনের পক্ষে যুক্তি
সংবিধান সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ভারতের উদাহরণ দেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ১৯৫০ সালের পর ভারতে ১০৬ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর দেশটিতে নতুন করে সংবিধান লেখা হয়নি; প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যমান সংবিধানই সংশোধন করা হয়েছে।
বাংলাদেশেও জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন করতে হবে বলে মত দেন নুরুল ইসলাম মনি।
এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফা বা ১০ বছরে সীমিত করা এবং সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব পরিবর্তন সাধারণ আইন দিয়ে করা যাবে না; এগুলো সংবিধানে যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানে ১৫৩টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে মিলিয়ে যুক্ত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এবং সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবসহ চারটি মৌলিক ক্ষেত্র ছাড়া ৭০ অনুচ্ছেদের বিধিনিষেধ তুলে দিতে চায় বিএনপি।
সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাই শেষ কথা নয়: আখতার
সংবিধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিফ হুইপের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত জানান এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, সরকার পরিচালনার জন্য বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের সংবিধানের বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত শুধু সংসদের এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে না।
গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন আখতার। তার দাবি, দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় বাস্তবায়নের জন্য সরকারি দলের প্রতি তাদের আহ্বান অব্যাহত থাকবে।
তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে আইপিইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান তিনি।
আইপিইউকে ‘ভুল তথ্য’ দেওয়ার অভিযোগ
আখতার অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আইপিইউর কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ‘ভুল তথ্য’ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইপিইউকে দেওয়া বিভিন্ন চিঠিতে ২০২৪ সালের আগের সময়ের নিপীড়ন, গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। উল্টো বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশের জনগণকে দায়ী করার চেষ্টা হয়েছে।
এ সময় চিফ হুইপ বলেন, বর্তমান সরকারকে ‘সরাসরি দোষারোপ’ করা হয়নি। তবে সরকার ও বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
আখতার বলেন, আওয়ামী লীগের দেওয়া ‘ভুল বার্তা’ সংশোধনের চেষ্টা করেছেন তারা।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রনেতাসহ বিভিন্ন পক্ষ অতীতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেই নির্যাতনের কিছু তথ্য আইপিইউ প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে এবং প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পরবর্তী বৈঠকে আরও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হবে বলে জানান আখতার।
আইপিইউর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সোমবার জাতীয় সংসদে নারী ও তরুণ সংসদ সদস্যদের একটি মতবিনিময় সভাও হয়েছে। সেখানে আখতার হোসেনসহ কয়েকজন সংসদ সদস্য অতীতের ‘নির্যাতনের’ বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
দুই বিল নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে
সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তির বিষয়েও নুরুল ইসলামের কাছে জানতে চান সাংবাদিকেরা।
তিনি বলেন, বিল দুটি চলতি অধিবেশনের প্রথম দিন উত্থাপন করা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের সেগুলো পড়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর সংসদের বৈঠক শুরু হলে বিলগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে।