১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ছাত্রদলের দুই শীর্ষ নেতার বিদায়ী পোস্ট, এল ‘মব’ মোকাবেলা ও সাংগঠনিক ব্যর্থতার কথাও

সংগঠনের নতুন নেতৃত্বের পাশে থাকারও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

ছাত্রদলের দুই শীর্ষ নেতার বিদায়ী পোস্ট, এল ‘মব’ মোকাবেলা ও সাংগঠনিক ব্যর্থতার কথাও
ছবি: ফেইসবুক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Aug 2026, 09:46 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিদায়ী সাক্ষাতের পর নিজেদের ‘রাজনৈতিক সংগ্রাম’ নিয়ে ফেইসবুকে স্মৃতিচারণ করেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।

স্মৃতিচারণে তারা তুলে ধরেছেন জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকা ও সাংগঠনিক ব্যর্থতার কথাও।

শুক্রবার দুপুরে নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে নাছির লেখেন, “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। একটি দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। বিদায়ের এই মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে অসংখ্য স্মৃতি- সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা এবং সবচেয়ে বেশি করে আমার সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা।”

জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে তিনি লেখেন, “২০২৪ সালের ১লা মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমরা একটি কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলেছি। কিন্তু আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। সেই উত্তাল সময়ে নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো, সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা-এটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

“জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থেকেছেন। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ এবং চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্ব অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের প্রত্যেকের প্রতি আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা। তাদের অনেকের নাম হয়ত ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে না, কিন্তু একটি গণআন্দোলনের ইতিহাস কখনো শুধু কয়েকজন মানুষের নাম লিখে শেষ হয়ে যায় না। এর পেছনে থাকে হাজারো পরিচয়হীন, নির্ভীক ও দুঃসাহসিক তরুণের ত্যাগ।

“এই আন্দোলনের সময়ে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে অসাধারণভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। আন্দোলনের সময়ে তারা ছাত্রদলকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হয়ত ছাত্রদলের অবদান তারা সবসময় সমানভাবে স্বীকার করতে পারেনি; কিন্তু আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, সংকটের সময়ে যারা একসঙ্গে কাজ করেছে, ইতিহাসের বিচারে সেই সহযোগিতার মূল্য অপরিসীম।”

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ‘মব সংস্কৃতি’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ‘মব সংস্কৃতিকে’ চ্যালেঞ্জ হিসেবে মন্তব্য করেন নাছির।

তিনি লেখেন, “এই দীর্ঘ দায়িত্বকালে আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের আরেকটি কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেটা হলো মব সংস্কৃতি। চারদিকে নানা ধরনের প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিল না। সব প্রোপাগান্ডা কাটিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা ছিল প্রতিনিয়ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

২ হাজার বেশি সাংগঠনিক কমিটি

নাছির লিখেছেন, “আমাদের দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। এটি কোনো একজনের কৃতিত্ব নয়; এটি ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল। তবে আমাদের কিছু অপূর্ণতাও আছে।

“ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অল্প কয়েকটি কমিটি আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ আমার থাকবে। এই অপূর্ণতার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত”। 

ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ব্যর্থতা

২০২৫ সালে ডাকসুসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয় প্রসঙ্গে নিজেদের ঘাটতির কথা তুলে ধরেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক। 

তিনি লিখেছেন, “ছাত্রসংসদ নির্বাচনে আমাদের প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়া। একজন সংগঠক হিসেবে এই ফলাফল আমাকে প্রায়ই ভাবিয়েছে। কোথায় আমাদের ঘাটতি ছিল, কোথায় আরও ভালো করা যেত, এসব প্রশ্ন নিজের কাছে করেছি। রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয়। আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রদল এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, আরও গ্রহণযোগ্য এবং আরও সংগঠিত ছাত্রসংগঠন হয়ে উঠবে।

আমার এই দায়িত্ব পালনের পথে যারা পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই”।

ছাত্রদলের দায়িত্ব ছাড়ার তথ্য দিয়ে তিনি লেখেন, “আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়। পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়; আদর্শ থেকে নয়, ভালোবাসা থেকে নয়, সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে নয়।

“আগামী দিনে ছাত্রদলে যারাই নেতৃত্বে আসবেন, আমি বিশ্বাস করি, তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, আরও সংগঠিত এবং আরও গতিশীল হবে। নতুন নেতৃত্বের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা থাকবে। তাদের প্রয়োজন হলে, তাদের ডাকে আমি আগের মতোই পাশে থাকব, ইনশাআল্লাহ।” 

যা লিখলেন রাকিব

একইদিন সকালে এক স্ট্যাটাসে ছাত্রদল সভাপতি রাকিব লেখেন, “আমি বিশেষভাবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ থেকে বলছি, সবগুলো ক্যাম্পাসে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতি বিকাশে চেষ্টা করেছি। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দ্বারা ক্যাম্পাসগুলোতে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও যেন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন না হন, সে জন্য বিশেষ মনোযোগী ছিলাম। আমার নিজ দলের বাহিরেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে কোন বিষয়ে আমার শরণাপন্ন হলে, আমি আমার জায়গা থেকে সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা করেছি। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভ্রাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের প্রতি।

 “রাকিব-নাসির কমিটির মূল সফলতা হল, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সমন্বয় করে কর্মসূচি প্রণয়ন এবং রাজপথে কার্যকরী বীরোচিত ভূমিকা পালন। ৫ আগস্ট, ২০২৪ পরবর্তী বাস্তবতায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শত শত মবকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ধারাবাহিক বুলিংকে উপেক্ষা করে নেতৃত্ব প্রদান করতে হয়েছে।”

একটি নতুন জীবন শুরু করতে চান জানিয়ে রাকিব বলেন, “নিজেকে আরও বেশি পরিশুদ্ধ, মানবিক ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়তে চাই। ভুল ত্রুটির উর্ধ্বে কেউ না, সেহেতু দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে আমারও ভুল ত্রুটি রয়েছে, কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল। পরিশেষে ছাত্রদলের আসন্ন নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবেন, সেই প্রত্যাশা রইল।” 

ছাত্রদলের দুই নেতাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলসহ দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।