Published : 25 Feb 2026, 01:54 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চুপচাপ থাকলেও ভোটের পরদিন থেকে একের পর এক কার্যালয় খোলার ঘটনা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দেড় বছর পরে নির্বাচন দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সক্রিয় হয়ে ওঠার পেছনের কারণ কী? এই প্রশ্ন আসছে।
আওয়ামী লীগের দলীয় নির্দেশে নাকি নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন, এমন কৌতুহলও তৈরি হয়েছে জনপরিসরে।
জুলা অভ্যুত্থানের প্রায় নয় মাস পর গেল বছর ১০ মে বিক্ষোভের মুখে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। দলের নিবন্ধন স্থগিত করায় নির্বাচনের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
তার আগে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে।
নিষেধাজ্ঞা আসার পর আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময় কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করেন, তারা কখনো কখনো ঝটিকা মিছিল করেছেন। কিন্তু কার্যালয় খুলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টাঙ্গানোর ঘটনা আর দেখা যায়নি।
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে গেল ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দিয়ে বিদায় নেয় ইউনূস সরকার।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটারদের পক্ষে টানতে বিএনপি ও জামায়াতের ইসলামী শিবিরের তৎপরতার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি বিজয়ী হয় এবং সরকার গঠন করে। ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে জামায়াত।
নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার ক্ষেত্রে বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা আছে।
তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা কারো নির্দেশে নয়, নিজেরা উদ্যোগী হয়েই খুলেছেন। তারা মনে করছেন, ‘মব’ সহিংসতার অবসান ঘটে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা ফিরবে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান উৎখাত করে টানা দেড় দশক দেশের ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারকে।
ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা, তিনি এখন সেখানেই আছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও তার সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতা দেশ ছাড়ে। আত্মগোপনে চলে যান দেশে থাকা নেতাকর্মীরা।
পঞ্চগড় থেকে কার্যালয় খোলা শুরু
সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে পঞ্চগড় সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগের তালাবদ্ধ একটি কার্যালয় খোলা হয়।
ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খোলা হয়।
চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান।
তিনি বলেন, বিএনপি বিপুল আসনে সরকার গঠনের পথে। এ প্রথম মুহূর্তে পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সংগ্রামী সভাপতি, চাকলাহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু দাউদ প্রধান, তিনি প্রথমেই যে কাজটি করেছেন, আওয়ামী লীগের প্রতি, তথা আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রাণের যে সংগঠন, আমাদের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগকে তিনি আজকে অবমুক্ত করেছেন।
পঞ্চগড় সদর, তেতুঁলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে এ আসনে জয়লাভ করেছেন বিএনপির মুহাম্মদ নওশাদ জমির। তিনি জামায়াত জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় সংগঠন সারজিস আলমকে হারিয়েছেন।
এর দুইদিন পরেই ১৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে নেতাকর্মীরা ভেতরে প্রবেশ করেন। কার্যালয়ের সামনে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। এ সময় স্লোগান দেন নেতাকর্মীরা।
পীরগঞ্জ ঠাকুরগাঁও-৩ সংসদীয় আসনের অধীন, যেখানে জামায়াতকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন বিএনপির মো. জাহিদুর রহমান।
১৬ ফেব্রুয়ারি বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন দলের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা কার্যালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নামে দোয়া ও মোনাজাত করেন।
সে দিন বেতাগী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিফাত সিকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশে একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে, সেই নির্বাচন নিয়ে বহু প্রশ্ন আছে, আমাদের দল নির্বাচনে আসতে দেওয়া হয় নাই।
“যেভাবেই হোক নতুন সরকার আসাতে রাজনীতির পরিবেশ অন্তত অবৈধ সরকারের চেয়ে ভালো হবে, এটা আমাদের আশা। তার কারণেই আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি, কার্যালয়ও খোলা হয়।”
বেতাগী উপজেলা বরগুনা-২ আসনের অধীন, এখনো জামায়াতের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির মো. নুরুল ইসলাম।
প্রায় প্রত্যেকদিনই সারা দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, পৌরসভা বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোনো না কোনো কার্যালয়ের তালা খোলার খবর আসছে।
যদিও কিছু কার্যালয় খোলার পরপর পাল্টা দখল ও হামলারও ঘটনা ঘটেছে।
‘স্বত:স্ফূর্তভাবেই’ নেতাকর্মীরা খুলছেন কার্যালয়
অভ্যুত্থান দমাতে ‘গুম, খুন, পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, গণহত্যা, বেআইনি আটক, অমানবিক নির্যাতন, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাসী কার্য ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইউনূস সরকার।
গেল বছর ১০ মে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত আসে, আর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ১২ মে।
অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের কার্যালয়গুলোতে আক্রান্ত হয়। কোথাও কোথাও বেদখল হয়ে যায়। অনেক কার্যালয় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।
নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে কার্যালয় খোলার কথা বলেছেন পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক তৌশিকুর রহমান রাভা।
শুক্রবার বিকালে হঠাৎ জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তৌফিক ইমাম খান, পাবনা পৌর আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক পলাশ হেসেন ও সাবেক প্রচার সম্পাদক তৌশিকুর রহমানসহ একদল নেতাকর্মী কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তারা সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই পাবনা শহরের আব্দুল হামিদ সড়কে অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়টি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।
যদিও ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পরপরই প্রতিবাদে শহরের প্রধান সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রলীগ।
কারো নির্দেশে বা পরামর্শে কার্যালয় খুলেছেন কি না, এমন প্রশ্নে ছাত্রলীগ নেতা তৌশিকুর রহমান বিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা নিজেদের মতো আলোচনা করেছি, আওয়ামী লীগ নেতা তৌফিক ভাই, পৌর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সবাই মিলে পার্টি অফিসটা খুলতে সম্মত হয়েছি। নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ততাতেই সবাই গিয়ে খুলে ফেললাম।”
কারা আগুন দিয়েছে বা বাধা দিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তৌশিক বলেন, “শুক্রবার পার্টি অফিস খোলার পরদিন কয়েকজন লোক আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য আগুন দিয়ে চলে যায়, সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে আমরা আসার আগেই তারা চলে যায়।
“এর পরে আমরা আওয়ামী লীগ যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সবাই একসাথে শহরের প্রধান সড়ক-হামিদ রোডে বিক্ষোভ মিছিল করি। আগুন দেয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করার পরে ওরা পরবর্তীতে আর ওইখানে যাওয়ার সাহস করে নাই। কারণ পাবনা জেলায় শহরে আওয়ামী লীগের অবস্থাটা ভালো।”
যারা আগুন দিয়েছে, তারা কারা? বিএনপির লোক না জামায়াতের? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এইটা আসলে জানা যায় নাই। যারা এসেছে এরা নাম পরিচয়হীন, অপরিচিত চার-পাঁচজন আগুন দিয়ে তাৎক্ষণিক সরে যায়, মূলত আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য।
“বিএনপির নেতৃত্ব স্থানীয় পর্যায় থেকে বা জামায়াতের পক্ষ থেকে আমাদের কিছু বলে নাই, আমরাও যোগাযোগ করি নাই। বিএনপি জামায়াতের কিছু কর্মীরা ফেইসবুকে বা বিভিন্ন সোশাল মিডিয়াতে বিভিন্নভাবে নেগেটিভ কথাবার্তা লিখতেছে।”
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে কেক কাটেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী।
পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে জানিয়ে ছাত্রলীগের এই নেতা বলেন, “আমার বাসায় পুলিশ আসছে, আমাদের তৌফিক কাকার বাসায় চার পাঁচবার পুলিশ গেছে। খুবই হয়রানি করতেছে, অলরেডি দুজনকে গ্রেপ্তার করছে। ছাত্রলীগের সহ সভাপতি আমিন আর যুবলীগ নেতা রাজু ভাইকে গ্রেপ্তার করছে।”
পাবনা শহরের আসন পাবনা-৫ এ জয়লাভ করেছেন বিএনপির মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। এ আসন থেকে জামায়াত নেতা আব্দুস সুবহান দুইবার নির্বাচিত হয়েছিলেন।
শনিবার রাতে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে কেক কেটে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন নেতাকর্মীরা।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুজ্জামান শাহীনের ছেলে ছাত্রলীগ নেতা সুপ্রীতসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী কার্যালয় খোলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কালকিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী মাহমুদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শনিবার সন্ধায় ফোন আসার সাথে সাথে আমি সুপ্রীতের সাথে যাই। আসলে ওখানে যেটা সবাই যেটা বলছে, এখন তো আর মব নাই, মব সন্ত্রাসীরা নাই, রাজনীতির পরিবেশ ভালো হবে, আর অপেক্ষা করার দরকার নাই, যা হওয়ার হবে।”
কালকিনি এলাকার এ আসনে এবারের নির্বাচনে জয় পেয়েছেন বিএনপির আনিছুর রহমান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও আবদুস সোবহান গোলাপ এ আসনের সাবেক এমপি। গোলাপ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। অভ্যুত্থানের পর নাছিমকে প্রকাশ্যে দেখা যায় না।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে রোববার আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ নিয়ে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই এলাকার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির সেলিমুজ্জামান মোল্যা। এ আসনের সাবেক এমপি আওয়ামী লীগের ফারুক খান গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
আওয়ামী লীগের পতনের পর গোপালগঞ্জে বড় আকারে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত টানা প্রতিবাদ হয়েছে সেখানে। মাদারীপুর, ময়মনসিংহ, বরগুনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালীসহ আরও কিছু জেলায় প্রতিবাদ হয়েছে, তবে সেই বিক্ষোভ গোপালগঞ্জের মত এত প্রবল ছিল না।
কেন্দ্রীয় ও সভাপতির কার্যালয়
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ৫ অগাস্ট বিকাল থেকেই গুলিস্তানে তখনকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন দেওয়া শুরু হয়।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি, যেটি জাদুঘর করা হয়েছিল তাও ভাঙচুর করে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। একইভাবে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সবকটি ভবনে লুটপাট ও ভাঙচুরের পর আগুন দেওয়া হয়। একই পরিণতি হয় তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের।
সংসদ নির্বাচনের দুইদিন পর ১৪ ফেব্রুয়ারি দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সালাম প্রদর্শনের পাশাপাশি স্লোগান দেন কয়েকজন।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় অর্থাৎ ধানমন্ডি ৩/এ সড়কের ৫১ নম্বর বাড়ির ফটকের সামনে গিয়ে জাতীয় পতাকা ও বঙ্গবন্ধু ছবি রেখে স্লোগান দিয়েছেন যুব মহিলা লীগের একদল নেত্রী।
সেই কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া যুব মহিলা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম বি কানিজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়সহ সারা দেশের পার্টি অফিসগুলোর অবস্থা কী করেছে অবৈধ ইউনূসবাহিনী।
“আমাদের জায়গা থেকে মনে করেছি, এখন অন্তত মব সন্ত্রাসীরা নাই। রাজনীতির পরিবেশটা অন্তত সুন্দর হবে। তাই যুব মহিলা লীগের নেত্রীদের নিয়ে আমরা আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের ফটকের সামনে জাতীয় পতাকা ও বঙ্গবন্ধু ছবি রেখে স্লোগান দিয়েছি।”
যা বলছেন বাহাউদ্দিন নাছিম
কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আসার পর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কোন পথে? এমন প্রশ্ন ওঠে। তবে গেল বছরের বিভিন্ন সময় কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করেন দলের নেতাকর্মীরা। ভারতে বসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় বক্তব্য দেন।
সরকার পতনের ছয় মাস পূর্তির দিনে তার বক্তব্য ঘিরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ভাঙচুর আগুন দেওয়া হয় ধানমণ্ডি ৫ নম্বরে শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদনে।
ভাঙচুর করা হয় ঢাকার বাইরে খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, সিলেটে শেখ হাসিনার আত্মীয় এবং আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িসহ বিভিন্ন ভাস্কর্য।
এসব ঘটনার পরও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল নিয়ে নামতে দেখা যায়।
জুলাই অভ্যুত্থান দমাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিচারের রায় ঘিরে গেল বছর ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর বিক্ষোভের কর্মসূচি দেয় আওয়ামী লীগ। দলটি ১৩ নভেম্বর ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি দেয়।
এ কর্মসূচি চলার মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহনে আগুনে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে বিভিন্ন সংগঠনও পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামে। ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আরেক দফা আগুন দেওয়া হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারের রায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি গুলিবিদ্ধ হন। তার মৃত্যুর পর রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর গুঁড়িয়ে দেওয়া বাড়িতে ও চট্টগ্রামে সাবেক মেয়র মহিউদ্দিনের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। আক্রান্ত হয় ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয় ভবন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আদালত অঙ্গনেও মবের শিকার হয়েছেন আসামিরা। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট আদালতে তোলা হলে তাদের ওপর হামলা করে একদল আইনজীবী।
ইউনূস সরকারের দেড় বছরে ‘মব’ তৈরি করে সহিংসতার ঘটনা ছিল ব্যাপক আলোচিত। বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে মব ‘কালচার’ শেষ।
কার্যালয় খোলার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এ বিষয়টি সামনে এনেছেন।
দেশে মব সহিংসতামুক্ত রাজনীতির সুবাতাস বইবে, এমন আশায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়গুলোর তালা খুলে প্রবেশ করছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দখলদার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পরে নেতাকর্মীদের ভিতরে একটা স্বস্তি এসেছে। তারা মনে করেন, দেশে একটি শান্তির সুবতাস হয়তো আসবে। যেহেতু ফেব্রুয়ারি মাস, আন্দোলনের মাস, এ মাসে স্বাধীনতার পক্ষে নেতাকর্মীদের মন মানসিকতা এটা অন্যরকম আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়, চেতনায় উজ্জীবিত থাকে।”
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করেন দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে, নতুন একটি সরকার গঠিত হয়েছে, সেক্ষেত্রে দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরবে।
নাছিম বলেন, “বঙ্গবন্ধুর উপর যে আঘাত এসেছে, মব সন্ত্রাস হয়েছে, এইটা হয়তোবা এখন আর থাকবে না, এই বিশ্বাস থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নেতাকর্মীরা ঘরে (দলীয় কার্যালয়ে) ফিরে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “দখলকৃত অফিসগুলো যেখানে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে, ধ্বংস করেছে সেই জায়গাটায় তারা শ্রদ্ধা দেওয়ার জন্য স্বতঃস্ফুর্তভাবে যাচ্ছে। কেউ ফুল নিয়ে যাচ্ছে, কেউ জাতীয় পতাকা নিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুপ্রেমী, আওয়ামী লীগপ্রেমী সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিশ্বাস দেশে এখন হয়তো এই মব সন্ত্রাস আর হয়তো হবে না, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এখন উন্নতি হবে ধীরে ধীরে।
“তারা তাদের কার্যালয়গুলোতে, গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবন, এই জায়গাগুলোতে নেতাকর্মীরা যাচ্ছে। তৃণমূলের মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে যাচ্ছে, অনেকে ফুল নিয়ে যাচ্ছে, এটা শ্রদ্ধা ভালোবাসার জায়গা, তারা মনে করে যে, এই শ্রদ্ধা জানাতে তো এখন আর কোনো বাধা নাই।”
আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, তাদের দল নির্বাচন করা দল, ‘গণতান্ত্রিক’ দল।
“আমাদের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক অধিকার পাওয়া উচিত এবং আমরাও মনে করি আমাদের রাজনীতি করার যে অধিকার, সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক অধিকার এটা আমরা আশা করি অচিরেই আমরা ফিরে পাবো।”
সরকার পতনের পর পর সারাদেশেই আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বেপরোয়া হামলা শুরু হয়। আগুন লাগাতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে একাধিক এলাকায়।
যা বলছে তৃণমূল বিএনপি
পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় খোলার ঘটনায় কোনো মন্তব্য করতে চাননি জেলা ও সদর উপজেলা বিএনপির নেতারা।
জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টুটুল বিশ্বাস প্রথমে কোনো কিছু বলতে রাজি হননি। পরে তিনি
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের খুঁজছে, এর মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তারও করেছে।”
বরগুনার বেতাগী উপজেলা বিএনপির নেতারাও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ছাত্র দল নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ অফিস খোলার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যেই চলা ফেরা করেছেন। বিএনপি ক্ষমতায় গেছে শুনেই তারা অফিস খোলেন। তাদের বাধা দেওয়ার জন্যও দল থেকে কোনো নির্দেশ আসেনি।
“আওয়ামী লীগ যখন সরকারে ছিল, তখন তো আমাদের অফিস খোলা ছিল, তাহলে এখন তাদের অফিস খোলা থাকায় সমস্যা দেখছি না, তাই কেউ বাধা দিতে যায় না। কয়েকজন অতি উৎসাহী আছে, যারা নতুন রাজনীতিতে এসেছে অথবা কোনো এক সময় আওয়ামী লীগের কারও সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল, সেই ক্ষোভ থেকে কেউ কেউ এর বিরোধিতা করতে চায়, তবে সাংগঠনিকভাবে আমরা কোন সমস্যা দেখছি না। দলীয়ভাবে কোনো নির্দেশনা আসলে আমাদের তো সেটা করতেই হবে।”
‘আইনিভাবে’ দেখবে বিএনপি
জুলাই আন্দোলন দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের আগে দলটির কার্যালয় খোলার বিষয়ে বিএনপি নেতারা বলছেন, বিষয়টি ‘আইনিভাবে’ দেখা হবে।
সোমবার ঢাকার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “এটা আমরা চাইনি। যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে, তাদের (আওয়ামী লীগের) কার্য্ক্রম নিষিদ্ধ, সেইভাবে এটাকে দেখা হবে, সব জায়গায়।”
মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য আব্দুল মঈন খান বলেন, তাদের দল বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, সেই বিশ্বাস নিয়েই তারা সামনের দিকে যাবেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর সাংবাদিকরা এ নিয়ে প্রশ্ন করেন।
জবাবে বিএনপির এই নেতা বলেন, “বিএনপি একদলীয় বাকশাল শাসন—যেটা বাংলাদেশের উপরে জগদ্দল পাথরের মত আওয়ামী লীগ চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই ধারণায় বিএনপি বিশ্বাস করে না; বিএনপির জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস করে ।”
মঈন খান বলেন, “আমরা আপনাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই যে, বিএনপি একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল; আমরা সবাইকে নিয়ে আমরা রাজনীতি করি, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।”
আইনি ব্যবস্থা নেবে পুলিশ
দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার খবরের মধ্যে দলটির তৎপরতা চলতে না দেওয়ার কথা বলেছেন পুলিশের সদ্য সাবেক আইজি বাহারুল আলম।
রোববার বিকালে পুলিশ সদর দপ্তরে এক সভায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আইজি বলেন, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না। কেউ বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”