এনসিপির ’শাপলা’ প্রতীকের পক্ষে শতাধিক আইনজীবীর বিবৃতি
“জাতীয় প্রতীকের উপাদানের মধ্যে দুইটি উপাদান ইতোমধ্যে দুইটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে বরাদ্দকৃত। সুতরাং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণসাপেক্ষে এনসিপি'র নিবন্ধিত হবার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন আইন মোতাবেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।“
তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিকে দলীয় প্রতীক ‘শাপলা’ বরাদ্দ দিতে ‘আইনগত কোনো বাধা নেই’ বলে মনে করেন দেশের শতাধিক আইনজীবী।
বুধবার তারা এক বিবৃতি দিয়ে আইনি ব্যাখ্যাসহ এই দাবি করেছেন।
শাপলা রাষ্ট্রীয় প্রতীকের অংশ হওয়ায় এবং জাতীয় ফুল হওয়ায় তা দলীয় প্রতীক হিসাবে নেওয়া যাবে কী না, বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠার পর আইনজীবীরা ব্যাখ্যা নিয়ে এলেন।
নির্বাচন কমিশন জাতীয় নাগরিক পার্টি - এনসিপিকে 'শাপলা' প্রতীক বরাদ্দ দিতে পারে বলে বিবৃতিতে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেনসহ ১০১ জন আইনজীবী।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনা আক্তার লাভলী এবং লাবাবুল বাসার স্বাক্ষরিত সংবাদ বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের আবেদন জমা দিয়ে প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা’ চেয়েছে এনসিপি, যা উসকে দিয়েছে নতুন প্রশ্ন। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের প্রতীকের তালিকায় শাপলা নেই।
নির্বাচন কমিশনে এনসিপির নিবন্ধন আবেদন জমা দেওয়ার পর সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, তারা তিনটি ‘মার্কার’ জন্য আবেদন করেছেন। শাপলা, কলম ও মোবাইল। তবে তাদের প্রথম পছন্দ শাপলা।
দলটির নেতাকর্মীদের অনেকেই শাপলাকে প্রতীকের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে চলছে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা।
বিবৃতিতে আইনজীবীরা বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪(৩), এর ধারা ৪, এর বিধি ৩ এবং অন্যান্য বিদ্যমান আইন অনুসারে জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি'র শাপলা প্রতীক বরাদ্দ পেতে কোন আইনগত বাধা নেই। ১৯৭২ সালের অর্ডারের ৩য় তফসিল এবং ১৯৭২ সালের বিধিমালার পরিশিষ্ট-ক তে জাতীয় প্রতীকের নকশা অংকিত আছে। নকশা অনুযায়ী জাতীয় প্রতীক হচ্ছে লালচে এবং হলুদ রঙের যুগল বৃত্তের ভেতরে লালচে এবং হলুদ রঙে অংকিত পানির ওপর ভাসমান শাপলা ফুল, দুপাশে দুটি ধানের শীষ, উপরে তিনটি সংযুক্ত পাট পাতা যার ঠিক দুই পাশে দুটি করে চারটি তারকা-এর সন্নিবেশ ও সামষ্টিক রূপ।
“অর্থাৎ জাতীয় প্রতীকের নকশা এবং রঙ ১৯৭২ সালের অর্ডারের ৩য় তফসিল ও বিধিমালার পরিশিষ্ট-ক দ্বারা সুনির্দিষ্ট। তাছাড়া জাতীয় প্রতীকের শাপলাটি পানিতে ভাসমান কিন্তু এনসিপি 'ভাসমান শাপলা' প্রতীক হিসেবে চায়নি।”
এনসিপির প্রতীক শাপলাকে জাতীয় প্রতীকের চারটি স্বতন্ত্র উপাদানের একটি মাত্র উপাদান বর্ণনা করে বিবৃতিতে বলা হয়, “নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল - বিএনপিকে জাতীয় প্রতীকের চারটি উপাদানের একটি উপাদান 'ধানের শীষ' বরাদ্দ দিয়েছে এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল - জেএসডিকে আরেকটি উপাদান 'তারা' প্রতীক হিসেবে বরাদ্দ দিয়েছে। সেহেতু নির্বাচন কমিশন জাতীয় নাগরিক পার্টিকে 'শাপলা' বরাদ্দ দিতে পারে।
“এছাড়াও নির্বাচন কমিশন জাতীয় ফল 'কাঁঠাল'-কে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির প্রতীক হিসেবে বরাদ্দ দিয়েছে এবং তৃণমূল বিএনপি নামের আরেকটি দলকে 'সোনালী আঁশ' প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে। সুতরাং 'শাপলা' জাতীয় ফুল হলেও দলের প্রতীক হিসেবে এনসিপির এটি পেতে আইনগত কোনো বাধা নেই।“
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “ধানের শীষ, শাপলা, পাটপাতা এবং তারকা আলাদা আলাদা করে চারটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। আর এই চারের সমষ্টিই হচ্ছে জাতীয় প্রতীক যা দুই রঙের দুটি বৃত্ত দ্বারা পরিবেষ্টিত। জাতীয় প্রতীকের উপাদানের মধ্যে দুইটি উপাদান ইতোমধ্যে দুইটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে বরাদ্দকৃত। সুতরাং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণসাপেক্ষে এনসিপি'র নিবন্ধিত হবার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন আইন মোতাবেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।“
প্রতীকের তালিকায় সংযোজনপূর্বক শাপলা প্রতীকটি এনসিপি-কে বরাদ্দ দেবে বলে বিবৃতিদাতা আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, পতাকা এবং প্রতীক সম্পর্কিত ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ১৩০ নম্বর আদেশের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক হবে পানির ওপর ভাসমান শাপলা ফুল। যার দুপাশে থাকবে দুটি ধানের শীষ, উপরে তিনটি সংযুক্ত পাট পাতা থাকবে, যার ঠিক দুই পাশে দুটি করে চারটি তারকা থাকবে।
এই প্রতীকের কোনো পরিবর্তন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর ব্যত্যয় ঘটলে এক বছর কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
যেহেতু শাপলা জাতীয় প্রতীক, ফলে কোনো দল এটি প্রতীক হিসবে পেতে পারে কিনা জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফ্ল্যাগ অ্যান্ড এমব্লেম অর্ডার নামে আমাদের একটি আইন আছে। সেখানে বলা আছে, জাতীয় প্রতীক হবে শাপলা। অতএব, যেহেতু জাতীয় প্রতীক আইন করে বলা হয়েছে শাপলা, এটা অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারবে না। এটা শুধু দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করা যাবে।”
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। আমরা আবেদন পেয়েছি। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখব।”
