Published : 02 Aug 2025, 04:23 PM
গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে দীর্ঘায়িত করলে দেশের মানুষ আবার জেগে উঠবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান।
নতুন ‘বন্দোবস্তের’ যে কথা বলা হচ্ছে, তা যেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত না হয়ে যায় সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন তিনি।
শনিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আলোচনা সভায় মঈন খান বলেন, “গণতন্ত্রের উত্তরণের যে প্রচেষ্টা নিয়ে দীর্ঘ পনেরো-ষোলো বছর ধরে বাংলাদেশের সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলো যে আন্দোলন করেছে, সেই প্রত্যাশা কি পূরণ হয়েছে?
“দীর্ঘ এক বছরে হয়নি। কেন হয়নি? আমরা তো অতীতে উদাহরণ দেখেছি। ৯০ দিনের ব্যবধানে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। আমাদের চোখের সামনে সেই উদাহরণ আছে।
“তাহলে কি আমরা সেই প্রশ্ন করতে পারি না? দীর্ঘ এক বছরের ব্যবধানে কেন আমরা উত্তরণ করতে পারিনি? আজকে আমাদের জবাবদিহি করারও প্রয়োজন আছে।”
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য ধরে কাজ করছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যেই বিএনপি দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার করে জাতীয় নির্বাচনের দাবি তুলেছে।
অপরদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতারা নতুন দল গঠনে করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য তুলে ধরে নতুন রাজনৈতিক ‘বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন।
বিএনপি নেতা মঈন খান বলেন, “আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, নতুন বন্দোবস্ত আবার যেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তায় পরিণত না হয়ে যায়। আমরা পরিবর্তন চাই, সব পরিবর্তন কিন্তু পরিবর্তন নয়। ১/১১ এর সময় ঢাকা শহরের প্রত্যেক জায়গায় একটা গোষ্ঠী ব্যানার ফেস্টুন করে ছিল-‘সবকিছু বদলে দাও, পাল্টে দাও’।
“পৃথিবীর সবকিছু বদলে দেওয়া যায় না, পাল্টে দেওয়া যায় না, সেটা আমি তখনও বলেছিলাম।”
পরিবর্তনের কথা বললেও বিভেদ থাকার কথাও মাথায় রাখতে বললন বিএনপির এই নেতা।
তিনি বলেন, “বিভেদ কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে। অন্যথায় আমাদের সেই সকল প্রচেষ্টা ভুলে পরিণত হবে এবং তাই হচ্ছে।”
মঈন খান বলেন, “সংস্কার, সেই প্রসঙ্গেই বলেছি, সংস্কার কিন্তু সংস্কারের জন্য নয়। কসমেটিক পরিবর্তন দিয়ে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব হবে না। সংবিধানের কিছু বাক্যের যদি আমরা পরিবর্তন করি, সংবিধানের পরিবর্তন কেন, আপনারা যদি পুরো সংবিধান পাল্টেও দেন তাহলে কোনো লাভ হবে না। যারা সংবিধান পরিবর্তন করে, এই দেশের আমরা যারা, মানুষের অন্তরের যদি পরিবর্তন না হয়।
“বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ একটা স্বাধীন দেশ চেয়েছিল কেন? এই দেশে গণতন্ত্র থাকবে। পাকিস্তানে থেকে এই দেশে গণতন্ত্র সম্ভব নয়, সেটা বিশ্বাস করেই আমরা একটা আলাদা রাষ্ট্র চেয়েছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অনুরোধ করবো, আপনারা এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উত্তরণের পথকে দীর্ঘায়িত করবেন না, তাহলে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আবার জেগে উঠবে।”
ন্যায় বিচার হলে ‘১৬০০ মানুষ হত্যার বিচার ১৬০০ বছরেও সম্ভব নয়’ মন্তব্য করে তিনি।

তার মতে, সাধারণ অপরাধের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে যে অপরাধ হয়েছে, সেটা কিন্তু সাধারণ অপরাধ নয়। তাই একটি সাধারণ আইন দিয়ে এই ‘অসাধারণ অপরাধের’ বিচার করা সম্ভব নয়। কোনোদিন সম্ভব হবে না।
এর জন্য ১৬০০ হত্যার জন্য একটি মামলাই যথেষ্ট মন্তব্য করে মঈন খান বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকার বাদী হবে। এসব হত্যার যদি ১৬ হাজার অপরাধী হয়ে থাকে তাদের প্রত্যেকে এই মামলার আসামি হবেন।
তার মতে, একটি মামলার বিচার একটি রায়ে করা সম্ভব এবং এই বিচার ‘১৬ ঘণ্টায় করা সম্ভব’।
বিএনপির নেতা বলেন, “যদি কোনো সৎ সাহসী সরকার থাকেন, যারা আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন, ন্যায়ে বিশ্বাস করেন, মানবাধিকারে বিশ্বাস করেন, তাদের এই বিচার করার জন্য ১৬ ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে না।”
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “অতীতে তিন মাসের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন করেছেন, একবছর পরেও কোনো নাগরিক এখনো পর্যন্ত আস্থা রাখতে পারছেন না, কোথায় কোন পরিবেশে অবাধ সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন করতে পারবো কি না।”
বৈষম্য বিলোপ হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বৈষম্য ছড়িয়ে পড়েছে। দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে, না খাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। কর্মহীনতা বেড়েছে। বিনিয়োগের পরিস্থিতি একটা নেতিবাচক জায়গায় এসে পৌঁছেছে।
“এর মধ্যে কেবল একটা ভালো খবর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছে। সেখানে কীসের বিনিময়? বাংলাদেশকে কী কী দিতে হবে, এটা আমরা জানি না।”
কীসের বিনিময়ে শুল্ক চুক্তি হয়েছে সেই প্রশ্ন করে সাইফুল হক বলেন, “আমার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে কি না, সরকারকে এটা দেশবাসীকে জানাতে হবে। এই শুল্ক কমানোর পেছনে কী কী রাজনীতি কাজ করেছে , এই বিষয়টা উন্মোচন করবেন। তথ্য মানুষের কাছে নিয়ে আসবেন।”
বাংলাদেশ একটা ‘বিরাট নিরাপত্তা ঝুঁকির’ মধ্যে আছে দাবি করে তিনি বলেন, “নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে বাংলাদেশের ভিতরে এবং বাহিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি তত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।”
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।