হরতাল চাইলেন কর্মীরা, ফখরুল বললেন ‘আগে রাজপথ দখল’

“হারিকেন ধরানোর সময় শেষ আপনাদের। হারিকেন ধরানোর টাইম পাবেন না, পেছনের রাস্তায় দিয়ে যাওয়ারও সময় পাবেন না”, ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে বলেন বিএনপি মহাসচিব

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 August 2022, 11:37 AM
Updated : 2 August 2022, 11:37 AM

ভোলায় পুলিশের গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আবদুর রহিম নিহতের প্রতিবাদে নেতাকর্মীদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেন, “আপনারা রাস্তা দখল করতে রাজি আছেন? রাস্তায় না নামলে কিছু হবে? রাস্তা দখল করতে হবে। আপনারা সবাই রেডি হয়ে যান, তৈরি হয়ে যান।

“আমরা এই ফ্যাসিস্ট কর্তৃত্ববাদী সরকারকে টেনে হিঁচড়ে নামাব এবং আমরা জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করব- এটা হোক আজকে আমাদের শপথ।”

এ সময় কর্মীরা ‘হরতাল, হরতাল’ স্লোগান দিতে থাকলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “হরতাল দিও। আগে রাস্তা দখল করো।”

মির্জা ফখরুল বলেন, “আর আমাদের কোনো সময় দেওয়া চলবে না। এখন আমাদের দাবি একটাই- একদফা এক দাবি,…।

“আসুন সেই এক দফা দাবি আদায় করার লক্ষ্যে, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে, জনগণের প্রতিনিধিদেরকে পার্লামেন্টে পাঠানোর লক্ষ্যে, আমাদের গণতন্ত্রের প্রতীক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যিনি আমাদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং এখন সুদূর ৮ হাজার মাইল দূর থেকে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।”

আগামী বৃহস্পতিবার থেকে দলের প্রতিটি অঙ্গসংগঠন বিক্ষোভ করবে, সেখান থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান ফখরুল।

‘জনগণই হারিকেন তুলে দেবে’

বিএনপি নেতাদের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দেওয়ার যে মন্তব্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করেছেন, সে প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, “অনেক কথা বলেন। বলেছেন যে, বিএনপির নেতাদের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দেবেন। হারিকেন ধরানোর সময় শেষ আপনাদের। হারিকেন ধরানোর টাইম পাবেন না, পেছনের রাস্তায় দিয়ে যাওয়ারও সময় পাবেন না।

“এরকম বহু ঘটনা আছে। শ্রীলঙ্কায় গোটাবায়া রাজাপাকসে পালাতে গিয়েও সহজে পালাতে পারছিল না,... মালদ্বীপে গিয়ে বসে আছে। পালাতে চাইলেও জনগণ পালাতে দেয় না- সেই কথাগুলো মনে রাখবেন, সেই কথাগুলো স্মরণ রাখবেন।”

গত দেড় দশকে সরকার দেশকে ‘শ্মশানে’ পরিণত করেছে মন্তব্য করে ফখরুল বলেন, “গত ১৫ বছরে এই বাংলাদেশকে একটা পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন এবং ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। কোথায় সাফল্য আপনাদের? এই মেট্রোরেল দেখিয়ে বলেন, পদ্মা সেতু দেখিয়ে বলেন- এখানে নাকি ওদের সব সাফল্য।

“আর সবচেয়ে বেশি মানুষ যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে, আমাদের মানুষ দুই বেলা খেতে পারে না, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ তারা আজকে হাহাকার করছে।”

ভোলায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আবদুর রহিম নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে এ বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে কয়েক হাজার নেতা-কর্মী তাতে অংশ নেন।

ভোলার ঘটনা প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “রহিমের মা কালকে যখন মর্গ থেকে তার লাশ নিতে যায়, সেখানে গিয়ে চিৎকার করে বুক ফাটতে ফাটতে বলছেন, আমার ছেলেকে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। বাংলাদেশে এটা নতুন নয়। আমরা ১৪/১৫ বছরে সেটাই দেখছি।

“গুম হয়ে যাওয়া ইলিয়াস আলীর মেয়ে এখনও দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে- কখন তার বাবার বাসায় ফিরে আসবে, আমাদের ছাত্রদলের ছেলে-মেয়েরা এখনও বলে আমি বাবার সঙ্গে ঈদ করতে চাই। ৩৫ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা, আমাদের নেতাকর্মীরা হাজিরা দিতে দিতে হয়রান হয়ে গেছে। এই হচ্ছে বাংলাদেশের চেহারা।”

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ফখরুল বলেন, “আমাদেরকে দখল করে নিতে হবে রাস্তাঘাট, আমাদেরকে দখল করে নিতে হবে- এই ক্ষমতাসীন যারা আজকে জোর করে রাষ্ট্র দখল করে রেখেছে তাদের তখ্তে-তাউস থেকে নামিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “এই সমাবেশ থেকে আমি আহ্বান জানাতে চাই- আমাদের টার্গেট এই স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, লুটেরা সরকারকে হটাতে হবে; আমাদের টার্গেট আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পূর্ণ মুক্ত করতে হবে; আমাদের টার্গেট আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

“এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে কিছু হবে না। নির্বাচন তো দূরের কথা আগামীতে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে আরও অনেক সংকটের মোকাবিলা করবে। সরকারকে বলব- পদত্যাগ করুন, সংসদ বাতিল করুন, নির্দলীয় সরকার গঠন করে আপনারা কেটে পড়ুন। তাই না হলে শ্রীলঙ্কার মতো জনগণ রাস্তায় নেমে আপনাদের বিদায় করবে।”

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, “ভোলার আবদুর রহিম দখলদার সরকারের গুলিতে মৃত্যবরণ করেছে। রহিম তুমি বিজয়ের চেতনা আগামী দিনে, রহিম তুমি মুক্তির চেতনা আগামী দিনের, রহিম তুমি গণতন্ত্রের চেতনা আগামী দিনের, রহিম তুমি স্বাধীনতার চেতনা আগামী দিনের। তোমার মৃত্যু আমরা বৃথা যেতে দেবো না।

“রহিমের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মালিকানা ফিরে পাওয়ার আরেকটা শপথ আমাদের নিতে হবে। এটা বিএনপির যুদ্ধ নয়, এটা বাংলাদেশের জনগণের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ আমাদের করতে হবে।”

বিএনপির মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব আমিনুল হক ও রফিকুল আলম মজনুর পরিচালনায় বিক্ষোভ সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বিএনপির শামসুজ্জামান দুদু, আবদুস সালাম, আবদুস সালাম আজাদ, কামরুজ্জামান রতন, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, মীর সরফত আলী সপু, সাইফুল আলম নিরব, ইকবাল হোসেন শ্যামল, মহানগর বিএনপির ইশরাক হোসেন, ইউসুফ মৃধা, যুবদলের সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, মোনায়েম মুন্না, স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তাফিজুর রহমান, মহিলা দলের নিলোফার চৌধুরী মনি, হেলেন জেরিন খান, ওলামা দলের শাহ নেসারুল হক, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, শহিদুল ইসলাম বাবুল, তাঁতী দলের আবুল কালাম আজাদ, মৎস্যজীবী দলের আবদুর রহিম, জাসাসের জাকির হোসেন রোকন, শ্রমিক দলের মোস্তাফিজুল করীম মজুমদার, ছাত্রদলের কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবন ও সাইফ মাহমুদ জুয়েল বক্তৃতা করেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক