তৌফিক ভাই, আমাদের ‘নাকউঁচু’ শিক্ষক
বাহ্যিক ‘নাকউঁচু' আর একরোখা স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রজ্ঞা, পেশাদারত্ব ও আপসহীন ব্যক্তিত্বের তৌফিক ইমরোজ খালিদীর স্মরণে আমীন আল রশীদ।
সুদর্শন। পরিপাটি পোশাক। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব। প্রমিত উচ্চারণ। প্রতিটি শব্দ বুঝেশুনে বলা। বাড়তি কথা না বলা। ভীষণ আত্মবিশ্বাসী, সেইসঙ্গে কিছুটা উন্নাসিক বা নাকউঁচু। কাউকে পাত্তা না দেওয়া। এই সবকিছু মিলিয়ে যে অবয়বটা দাঁড়ায়—তার নাম তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
প্রথম দেখাতেই তার প্রেমে পড়ি ২০০৮ সালে; যখন প্রথম আলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবিসি রেডিওর যাত্রা শুরু হয়। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো অফিসের পঞ্চম তলায় আমাদের ক্লাস নিয়েছিলেন তিনি। সেই সুবাদে তিনি আমার সরাসরি শিক্ষকও বটে। যদিও সাংবাদিকতায় ‘স্যার’ খুব একটা চলে না বলে আর দশজনের মতো আমিও তাকে ‘ভাই’ সম্বোধন করতাম। কিন্তু বারবার মনে হতো, তৌফিক ভাইকে আসলে ‘স্যার’ বলা উচিত।
শুক্রবার সন্ধ্যার পরে যখন তার মৃত্যুর অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদটা পাই, তখন মনে পড়ল—খুব সম্প্রতি তিনি আমাকে ডেকেছিলেন তার অফিসে। রাত ১০টার দিকে যাই। দীর্ঘ সময় নানা বিষয়ে আলোচনা। মূলত তিনিই বলছিলেন, আমি শুনছিলাম। এত ধীরে এবং এত আস্তে কথা বলছিলেন যে, তার চেয়ারের বিপরীতে বসেও সব শব্দ বুঝতে পারছিলাম না। ফলে কোনো কোনো বাক্য তাকে দ্বিতীয়বার বলার অনুরোধ করি। তার সঙ্গে কথা বলার একটা অসুবিধা ছিল এই যে, তিনি অনেক বাক্যই বলতেন ইংরেজিতে। ফলে খুব সতর্কভাবে কান খাড়া করে না শুনলে বোঝা যেত না যে, আগের বাংলা বাক্যের সঙ্গে ঠিক কী অর্থ বোঝাতে তিনি এই ইংরেজি বাক্যটা বললেন।
বিডিনিউজের মতামত বিভাগে নিয়মিত লিখি—এই সুবাদেই তিনি আমাকে ডেকেছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণাটা এরকমই ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলার পরেও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না যে, তিনি আসলে ঠিক কী কারণে আমাকে ডেকেছেন। মাঝেমধ্যে আমার কোনো কোনো লেখার বিশেষ কোনো একটি লাইনের উদ্ধৃতি দিচ্ছিলেন। তাতে মনে হলো, তিনি আমার লেখা পড়েন। সেই লাইনগুলো আর কীভাবে লেখা যেত বা কীভাবে লিখলে আরেকটু স্পষ্ট হতো—সেটিও বললেন। তাতে মনে হলো, তিনি কিছু কিছু বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিনও শুক্রবার ছিল। পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে কেডস পরে বসেছিলেন। টেবিলের ওপরে একটা কাঁচের বোতলে মেরুন রঙের একটা পানীয়ের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকালে তিনি বললেন, ‘এটা একটা অখাদ্য। সেজন্য তোমাকে দিচ্ছি না।’ তারপর বললেন, শরীরের কোনো একটা অসুবিধার কারণে এই পানীয়টা বানিয়েছেন; যাতে বিটরুট, আদা, রসুন ইত্যাদি আছে। জিজ্ঞেস করলেন, চা খাব কি না। এইসব আলাপচারিতার পরে যখন উঠব বলে অনুমতি চাইলাম, বললেন, ‘ও হ্যাঁ, তোমার তো অনেক রাত হয়েছে।’
২০০৮ থেকে ২০২৬—মানে দেড় যুগ ধরে একজন মানুষকে দূর থেকে দেখা। তার সঙ্গে এরকম মুখোমুখি বসে গল্প করার সুযোগ খুব বেশি হয়নি। বিডিনিউজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি কয়েকজন অতিথির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এই বলে যে, ‘হি ইজ আওয়ার অনারেবল কনট্রিবিউটর।’ এটা আমার মতো একজন লেখকের জন্য নিশ্চয়ই বড় পাওয়া; অন্তত তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মতো একজন শিক্ষকের কাছ থেকে।
মানুষ মানুষকে মনে রাখে কিংবা মানুষ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে এইসব ছোটখাটো ঘটনার মধ্য দিয়েই। তার সহকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়নি, কিন্তু তার সাংবাদিকতার গভীরতা, বস্তুনিষ্ঠতা, সততা ও সাহসের সঙ্গে আমাদের সকলেরই পরিচয় আছে। তার মতো একজন শিক্ষকের সঙ্গে কাজ করতে পারা যে কারো জন্যই সৌভাগ্যের বলে মনে করি।
সাংবাদিক মহলে তৌফিক ভাইয়ের একটা বড় সমালোচনা হচ্ছে, তিনি ‘নাকউঁচু’ স্বভাবের লোক; কাউকে পাত্তা দেন না। কিন্তু এর বিপরীতে নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে এটাও দেখা যাবে যে, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় যাদেরকে আমরা গুরুস্থানীয় বলে জানি ও মানি, তাদের অনেকের চেয়েই তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পড়ালেখা, জানাবোঝা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা অনেক বেশি ছিল।
তার চেয়ে বড় কথা, সাংবাদিকতার মূল কথা যে বস্তুনিষ্ঠতা—সেখানে তিনি ছিলেন আপসহীন। সবার আগে সংবাদ দেওয়ার তাড়া তার মধ্যেও ছিল। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন—ধীরে, প্রয়োজনে অন্যের পরে, কিন্তু সঠিক সংবাদ দিতে হবে। তার অর্থ এই নয় যে, বিডিনিউজ অন্যদের অনেক পরে খবর দেয়; বরং একটি তথ্যকে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে সংবাদ আকারে পরিবেশন, এবং সংবাদের যত বেশি সম্ভব অ্যাঙ্গেল ও বিস্তারিত বিবরণসহ প্রকাশের যে নীতিতে তিনি অটল ছিলেন, সেটিই অন্য যেকোনো সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিডিনিউজকে আলাদা করে। যে কারণে প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের বার্তাকক্ষে বিডিনিউজের সাইট খোলা থাকে। এই আস্থা অর্জন খুব সহজ নয়। পেশার প্রতি আনুগত্য এবং সৎ না থাকলে এই পর্যায়ে পৌঁছানো যায় না।
এটা ঠিক যে, তৌফিক ভাই অনেক ব্যাপারেই একরোখা ছিলেন। নিজে যেটি বিশ্বাস করতেন, ভালো মনে করতেন, সেখানে অবিচল থাকতেন। সেই আপসহীনতার কারণে অনেক সময় তাকে হয়তো স্রোতের বিপরীতে চলা মানুষ মনে হতো। কিন্তু একরোখা, জেদি এবং ‘নাকউঁচু’ স্বভাবের হওয়ার জন্যও যে যোগ্যতা, মেধা, সততা আর পেশার প্রতি পূর্ণ পেশাদার থাকার মানসিকতা প্রয়োজন—সেগুলোও তৌফিক ভাইয়ের মধ্যে ছিল। ছিল বলেই তিনি ‘অনেক লোকের মাঝে বসে নিজের মুদ্রাদোষে’ একা, আলাদা। আমরা আপনাকে ভুলব না, প্রিয় তৌফিক ভাই—আমাদের তৌফিক স্যার!
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।
