০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

কোড নেম ‘টিআইকে’

তৌফিক ভাই জনসমক্ষে একটাই কথা বলতেন, “আমরা নিরপেক্ষ নই। আমাদের প্রচণ্ড পক্ষপাতিত্ব আছে, একাত্তরের প্রতি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।”

কোড নেম ‘টিআইকে’

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

কাজী সাজিদুল হক কাজী সাজিদুল হক

Published : 03 Oct 2026, 01:08 AM

Updated : 03 Oct 2026, 01:58 AM

সাংবাদিকতার চরম আকালে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন ঋজুতার আরেক নাম। অস্থির সব সময়ে যে প্রতিষ্ঠান কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই সাংবাদিকতা করে গেছে, সেটির প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রায় এক দশক কাজ করেছি। প্রতিষ্ঠানটিকে স্কুল মনে করি, আর সেই স্কুলে আমার হেডমাস্টার ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী—আমাদের তৌফিক ভাই, কোড নেম ‘টিআইকে’।

মামলা দিয়ে যখন একের পর এক সমস্যা তৈরি করা হচ্ছিল, তখনও তৌফিক ভাই সেই একই ঋজুতা দেখিয়েছেন। বারবার শুনেছি, একটাই কথা, “সাংবাদিকতা কোনো অন্যায় নয়। আমরা ঠিক পথে আছি।” চরম আর্থিক দৈন্যদশার ভেতরে সহকর্মীদের মনের জোর যাতে ঠিক থাকে, সেদিকটায় লক্ষ্য রাখতেন।

হঠাৎ করে মৃত্যুসংবাদ শুনে মনে হলো, সাংবাদিকতাকে আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল তার। তবে তিনি যেটা দিয়ে গেছেন, তা কম নয়। তিনি ‘সূত্রমুক্ত’ সাংবাদিকতা দিয়ে গেছেন।

সাংবাদিকরা খবরে প্রায়ই লেখেন, ‘সূত্র জানায়’। পুরো খবরে সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য না দিয়ে খবর প্রকাশ আকছারই হচ্ছে। ‘সংশ্লিষ্ট সূত্র’, ‘দায়িত্বশীল সূত্র’—এসব খুব সাধারণ। তৌফিক ইমরোজ খালিদী দেশের প্রথম ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ‘সূত্র’ বাদ দিলেন। অর্থাৎ, কোন সূত্রে জানা গেছে, সেটা না লিখলে খবর প্রকাশ হবে না—নীতি ঠিক করলেন। সেই নীতিতে ছিলেন দৃঢ়, অবিচল। কারও বক্তব্য না থাকলে খবর ছাপা হতো না। কত খবর যে আমরা আগে দিতে পারিনি! রাগও হতো। ‘সূত্র জানায়’ লিখে বিডিনিউজ হাতেগোনা কিছু সংবাদ প্রকাশ করেছে, ২০ বছরে ৪০টি হবে কি না সন্দেহ! কিন্তু সেটার জন্য কতরকমের ফ্যাক্টচেকের মধ্যে যেতে হয়েছে, তা আমরা যারা কাজ করেছি তারা জানি। দিনশেষে বিডিনিউজই জিতে যেত।

একটি সংবাদমাধ্যমকে পাঠকের কাছে আস্থা নিয়ে দুই দশক দৃঢ়ভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা যে কতটা কঠিন, তা সংবাদকর্মীরা জানেন। ‘ভাইরাল’ জোয়ারে গা না ভাসিয়ে বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিকতা করার যে কঠিন চ্যালেঞ্জ তৌফিক ভাই নিয়েছিলেন, তা অতুলনীয়।

২০১৪ সালের ঘটনা। দেশের বড় বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জমি দখলের নথি আমার হাতে। নিউজ লিখলাম। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নিয়ে খবর লিখে বার্তাকক্ষে জমা দিলাম। তৌফিক ভাই শুনলেন সেই নিউজের কথা, নিজে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন, সব প্রমাণ আছে কি না। নিশ্চিত করলাম তাকে। নিউজ প্রকাশিত হলো। এর দুদিন পর রিপোর্টার্স মিটিং। এ কথা-ও কথায় বললেন, যাদের নিয়ে নিউজ হয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে প্রতিষ্ঠান, তাদের কাছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বিজ্ঞাপন বাবদ বড় অঙ্কের টাকা পায়। আদালত-সংশ্লিষ্ট একটা খবরে তাদের নাম থাকায় বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি, বাকি টাকা দেয়নি। দীর্ঘদিন পর আবার ব্যবসায়িক আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আমার করা নিউজের জন্য হয়তো সেটা আর এগোবে না। শুনে, আমি প্রতিবর্ত ক্রিয়া থেকেই বলে উঠেছিলাম, “আমি জানতাম না।”

শুনে তৌফিক ভাই ধমকে উঠলেন। বললেন, “তুমি রিপোর্টার। তোমার তো সেলসের কথা জানার কথা নয়। আমার প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টার নিউজ পেয়েছে। সেই নিউজে কোনো কমতি নেই। যথাযথ প্রমাণ আছে, সবার বক্তব্য আছে। কিছু টাকার জন্য যদি সেই নিউজ না প্রকাশ করি, তাহলে আমি তোমার কাছে কী জবাব দেব? কী আর হবে, একটু কষ্ট হবে না হয়। পারবে না কষ্ট করতে?” সেদিন মনে মনে কথাটা বলেছিলাম, “আমার সম্পাদক।”

আওয়ামী লীগের আমলে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা হলো। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হলো। সমস্যায় পড়ল বিডিনিউজ। আমরা কর্মীরা ঠিকমতো বেতন-ভাতা পাচ্ছিলাম না। তৌফিক ভাই চাইলেই ওই সময় আপস করতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেটা করেননি। আইনি পথে সব মোকাবিলা করেছেন। সাংবাদিকতার নীতি থেকে একবিন্দু সরেননি। সহকর্মীদের নিয়ে দিনের পর দিন কঠোর সংগ্রাম করেছেন।

বিডিনিউজ নিয়ে নানা সময় নানা কথা হতো, নানা ট্যাগ লাগানো হতো। তৌফিক ভাই জনসমক্ষে একটাই কথা বলতেন, “আমরা নিরপেক্ষ নই। আমাদের প্রচণ্ড পক্ষপাতিত্ব আছে, একাত্তরের প্রতি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি সবসময় একাত্তর নিয়ে সংবেদনশীল। তৌফিক ইমরোজ খালিদী, সাংবাদিকদের তৌফিক ভাইকে অতল শ্রদ্ধা! টিআইকে, আপনি আছেন সাংবাদিকতায়!

কাজী সাজিদুল হক: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কর্মী; বর্তমানে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চরচা।