মন-স্বাস্থ্য সুস্থ রাখে ধ্যান

এম এম খালেকুজ্জামানএম এম খালেকুজ্জামান
Published : 20 May 2021, 06:53 PM
Updated : 20 May 2021, 06:53 PM

ডিপ্রেশনের বাংলা নাকি নিম্নচাপ?

বৃষ্টি এল। সঙ্গে কফি এক-দু' কাপ

কেবল মুঠোয় বন্দি কফির একলা কাপ

ডিপ্রেশনের বাংলা জানি। মনখারাপ।

(শ্রীজাত, ডিপ্রেশান)

শ্রীজাত এর এ কবিতাটি নাগরিক রোমান্টিসিজমের আমেজ নিয়ে মজলিস জমিয়ে তুলবে (তুলেছেও) নিশ্চিত। কিন্তু প্রকৃত ডিপ্রেশনে আক্রান্ত কারও জন্য কতটা 'পোয়েটিক রিলিফ' বয়ে আনবে তা নিশ্চিত না।

গত পঞ্জিকা বর্ষে,  পঞ্জিকা না মেনে আগেই বর্ষা এসেছিল। আর ডিপ্রেশনের চাপ সইতে না পেরে সময়ের আগেই  অশান্ত হয়ে নিজেকে নিয়ে গেলেন সুশান্ত রাজপুত। তার এ আত্মহত্যা করোনাভাইরাসের এক দূরতম পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বললে বেশি বলা হবে না। অনিবার্য  এক বিষাদে আক্রান্ত  মেরু থেকে মরু অঞ্চল আদতে গোটা সভ্যতাই।  আলো ঝলমল সিনে জীবনের কোন না কোন পর্যায়ের ক্ষণিক ধূসরতা যেন চির আঁধার নিয়ে আসে।  তারকাদের বহিরাঙ্গিক জীবনের নাটকীয়তা জনপরিসরের এক সযত্ন  চর্চার বাণিজ্যিক বিষয়। যেহেতু সংবাদও একালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সংবাদ মাধ্যমের ভাগ্য গড়ে দেয়! 

ফল নয়, প্রচেষ্টাই নির্ধারণ করে দেয় জীবনে কে সফল, কে ব্যর্থ। 'ছিছোড়ে' ছবিতে অনিরুদ্ধ পাঠক চরিত্রে অভিনয় করা সুশান্ত রাজপুত বলেছিলেন তার ছেলেকে। আত্মহত্যার অর্থহীনতাকে তুলে ধরা সে মানুষটা নিজেই বেছে নিলেন আত্মহননের পথ। চকচকে রিল লাইফ এবং রিয়েল লাইফ এর মাঝখানের মেরু প্রতিম ব্যবধান রয়েই গেল জীবন আর পর্দার চিত্রনাট্যের মাঝে।

মহামারীর এ অভূতপূর্ব ক্রান্তিকালে  সিঙ্গাপুর, সাউথ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো কটি দশ ছাড়া অন্য দেশগুলো অতি ব্যতিক্রমহীনভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা ঢাকতে পারেনি। অতি মনোযোগের মৌলিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যখন এ হাল তখন মানসিক স্বাস্থ্য  নিয়ে চিন্তা করার সময় কোথায়। মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় ধ্যান বা মেডিটেশনই ভরসা। ব্রিটিশ নাগরিক উইল উইলিয়ামস এর পৌরহিত্যে আন্তর্জাতিকভাবে ২১ মে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মেডিটেশন দিবস হিসেবে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে "বিশ্ব মেডিটেশন দিবস" উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। 

সিকি শতকের পরিক্রমায় দেশে ধ্যান চর্চার প্রসারে এক আমলযোগ্য পরিবর্তন এনেছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। ২১ মে শুক্রবার, ২০২১, সকাল সাড়ে ৯টা। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ধ্যানী একযোগে অংশ নেবেন যৌথ মেডিটেশনে। এ সময়টিতে বিশেষ ধ্যানে লাখো মানুষের সাথে একাত্ম হতে পারেন আগ্রহীরা।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বিশ্বের ৫০ কোটি মানুষ এখন নিয়মিত মেডিটেশন করে। আধুনিক ব্যস্ততা তাড়িত জীবনের ওয়ার্ক স্ট্রেস, হতাশা ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠে সফল ও তৃপ্ত জীবনের জন্য নিয়মিত মেডিটেশনের সমকক্ষ বিকল্প নেই,  এ বাস্তবভিত্তিক ধারণা থেকে উন্নত  বিশ্বে  মেডিটেশন কার্যক্রম এখন মূল ধারার চর্চার বিষয়। হার্ভার্ড, ইয়েল, এমআইটি, অক্সফোর্ড,  স্ট্যানফোর্ডের মত নামজাদা  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও হ্যাপিনেস কারিকুলামকে সামনে রেখে   বিভিন্ন কোর্স চালু আছে ।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় এক  বিশাল জনগোষ্ঠী । আর কোভিড পজিটিভ হয়নি সেই  বিশাল জনগোষ্ঠীর মানসিক সংকটের কারণ হচ্ছে- আক্রান্ত  হওয়ার  ভীতি, চলমান  নাগরিক জীবনে  হঠাৎ স্থবিরতা ও সামাজিকতাবিহীন আপাত বন্দী জীবন, লকডাউনজনিত অর্থনৈতিক মন্দাভাব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।এইসব জেঁকে বসা সমস্যা কাটাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভার্চুয়াল মিডিয়ার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা, স্থবির জীবনে পারিবারিক অশান্তি ও অস্থিরতা ইত্যাদি তৈরি করেছে। আরবান, নন আরবান বিশাল জনগোষ্ঠীর মনোজগতের উপর তৈরি হওয়া এ বিরূপ প্রভাবের প্রতিকার ও মোকাবেলা এখন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবনার বিষয়। 

এ করোনাকালে অনেক পরামর্শ বা প্রটোকলই নানাভাবে বদলেছে ক্রমশ নিজেকে পরিবর্তন করা ভাইরাসটির মতোই, তবে একটি বিষয় অপরিবর্তিত এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও ইমিউন (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) সিস্টেম ভালো থাকলে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা যায় এবং এতে ধ্যান (মেডিটেশন) অর্জিত মনোবল সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

নভেল করোনাভাইরাস অতিমারীর আকার ধারণ করে শারীরিক সমস্যা ও মৃত্যু ঝুঁকির সাথে তৈরি করছে মানসিক অশান্তি। যিনি  আক্রান্ত হলেন তার মানসিক সমস্যার কারণ হচ্ছে  শারীরিক উপসর্গের সাথে মৃত্যুভীতি (যদিও আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যু হার অনেক কম)। ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে পরিবারের সদস্যদের দুর্ব্যবহার অসুস্থ সদস্যদের বিরান কোথাও রেখে অথবা হাসপাতালে নিয়ে স্বজনদের নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর তো বেশ  স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া সুস্থ হয়ে ওঠা ও পুনর্বাসনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং রোগীর প্রতি সামাজিক বিরূপ আচরণ বেশ পীড়াদায়ক। আইসোলেশানে থাকা রোগাক্রান্ত  ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থেকে একাকী জীবনযাপন সুস্থ  ও অসুস্থ সবাইকে মানসিক  কষ্টে রেখেছে। এমন নিদারুণ সহমর্মিতার সংকট আর দেখা না দিক। তবে বিপরীত ব্যতিক্রমকে মনে রাখতে চাই মৃতের সৎকারে কিছু সংগঠনের আন্তরিক সেবা আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাহায্যের কত যে সত্য গল্প আছে। এসব সত্য গল্পে আছে জীবনের সামূহিক প্রকাশ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক