ক্যান্সার গবেষণার নতুন দিগন্তে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনমোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
Published : 21 Oct 2020, 12:21 PM
Updated : 21 Oct 2020, 12:21 PM

১৮৬৯ সালের ৪ নভেম্বর তারিখে লন্ডনে 'নেচার' নামের একটি বিজ্ঞান সাময়িকীর যাত্রা শুরু হয়েছিল। নীতিগত বার্তায় বলা হয়েছিল, "প্রথমত বিজ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে অর্জিত ফলাফল ও আবিষ্কার জনসাধারণের কাছে উপস্থাপন এবং শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনে তার প্রয়োগ এবং দ্বিতীয়ত পৃথিবী জুড়ে প্রকৃতি জগতের বিভিন্ন শাখার জ্ঞান থেকে অর্জিত সকল অগ্রগতির আগাম তথ্য জানানোর মাধ্যমে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ গড়ে তুলতে সাহায্য করাই হবে 'নেচার'-এর লক্ষ্য।"

প্রায় দেড়শত বছর ধরে 'নেচার' তার লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকেছে এবং বিজ্ঞানের অভাবিত অগ্রযাত্রার দিশারী হয়ে আজ শীর্ষ বিজ্ঞান জার্নালের সম্মান অর্জন করেছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে 'নেচারে' প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ক্যান্সারের উপর বর্তমান সময়ের সবচাইতে অগ্রবর্তী জ্ঞান ও ধারণা দিয়েছেন এমন কয়েকজন প্রথিতযশা ক্যান্সার গবেষকের সাথে জায়গা করে নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সজীব চক্রবর্তী। বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এ এক অনন্য অর্জন। তা এজন্যে যে নানাভাবে পিছিয়ে পড়া আমাদের এই দেশেই গবেষণায় নিবিষ্ট থেকে বিজ্ঞানের একেবারে সামনের কাতারের গবেষণায় অভিমত দেয়ার মতো বিজ্ঞানী রয়েছেন – তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া গেল।

'নেচারে' প্রকাশিত নিবন্ধের বাংলায় ভাবানুবাদ পাঠকদের নজরে আনা এবং আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণায় অবদান রাখার মত বিজ্ঞানীরা যে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে রয়েছেন, তা তুলে ধরার লক্ষ্যেই আমাদের এই লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। 'নেচারের' মূল ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ করেছেন আমাদের বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তন্ময় দাশ ও মায়িশা আদিবা

ভূমিকায় জেনোম সম্পর্কে দুটো কথা বলে মূল ভাবানুবাদে চলে যাব।

প্রকৃতি জগতে প্রজাতির পরিচয় ও বিশিষ্টতা নির্ভর করে তার জেনোমের উপর। কিছু আরএনএ ভাইরাস ছাড়া মানুষসহ সকল প্রজাতির জেনোম হচ্ছে ডিএনএ। এই ডিএনএ'র মধ্যেই প্রজাতির সকল জেনেটিক বৈশিষ্ট্য জিন হিসেবে থরে থরে সাজানো থাকে। জিনের ডিএনএ-র গঠন কাঠামোতে কোনো মিউটেশন বা ত্রুটি হলে ক্যান্সারসহ নানা ব্যধিতে আক্রান্ত হয় দেহ। জিনের ডিএনএ-র সংবিন্যাসে সংরক্ষিত জেনেটিক তথ্য প্রথমে আরএনএ এবং তা থেকে প্রোটিন হিসেবে প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধের শিরোনাম 'জেনোমের বাইরে' বলতে আরএনএ এবং প্রোটিনকে বোঝানো হয়েছে। এবারে প্রবন্ধের ভাবানুবাদ।

জিনোমের বাইরে (Beyond the Genome)

'বহু বছর ধরে জেনেটিক গবেষণার ফলে বর্তমানে আমরা যেমন ক্যান্সার সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে পেরেছি, তেমনি বিভিন্ন ডিএনএ-নির্ভর ক্যান্সার চিকিৎসা পদ্ধতিও উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। তবে নিউ ইয়র্ক সিটির কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিস্টেম বায়োলজিস্ট আন্দ্রেয়া ক্যালিফানো-এর মতে, এসব চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহারকারী ৯০-৯৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পর ক্যান্সারের পুনরাবির্ভাব ঘটে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে একই ক্যান্সার কোষকলা বা টিস্যুতে বিভিন্ন ধরনের কোষের মিশ্রণ রয়েছে। শুধু ডিএনএ নির্ভর চিকিৎসা যে আদর্শ চিকিৎসা পদ্ধতি হতে পারে না তা ফুটে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার গবেষক বার্ট ভোগেলস্টেইন এর কথায়ও।

তার মতে, "একটি বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার এবং বাস্তবায়ন করা সহজ কাজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সার কোষে ত্রুটিপূর্ণ জিন থেকে তৈরি প্রোটিন পাওয়া যায় না, তাই এগুলো নিয়ে গবেষণা করা কঠিন। যদি কোষে প্রোটিন না থাকে, তবে এর বিরুদ্ধে কোনো ওষুধ ব্যবহার করাও সম্ভব নয়।"

ইসরাইলের তেলআভিব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়নবিদ টামার গেইগার-এর মতে, "শুধুমাত্র ডিএনএ নির্ভর চিকিৎসা ব্যবহারের ফলে কিছু ক্যান্সার কোষ বেঁচে গিয়ে পুনরায় রোগীর শরীরে ক্যান্সারের সূচনা করতে পারে।" তাই সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞানীগণ বুঝতে পেরেছেন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে ডিএনএ ছাড়াও আরএনএ, প্রোটিন এবং জিনের এপিজেনেটিক পরিবর্তন (জিনের জেনেটিক কোড সংবিন্যাস অক্ষুণ্ণ রেখেও কোন পরিবর্তন) নিয়ে গবেষণা করতে হবে। এরই ফলে ২০০৬ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউট (এনসিআই) এবং ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইন্সটিটিউট 'দ্য ক্যান্সার জিনোম অ্যাটলাস (টিসিজিএ)' নামে একটি ব্যাপক ভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম শুরু করে, যেখানে ৩৩ রকম ক্যান্সারের ২০ হাজারেরও বেশি নমুনার ডিএনএ, আরএনএ, প্রোটিন এবং এপিজেনেটিক পরিবর্তনসহ আরো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করা হয়েছে। এই বিভিন্ন রকম তথ্যের সমন্বিত গবেষণা ক্যান্সার নিরাময়ের কার্যকর পথ উন্মোচন করবে বলে গবেষকগণ বিশ্বাস করেন। যেমন ভোগেলস্টেইনের মতে, "জিনের ডিএনএ'র পরিবর্তনকে সরাসরি প্রতিহত করা কঠিন হলেও যদি তার গতিবিধি সম্পর্কে জানা যায় তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।"

একই সূত্রে গাঁথা

ক্যালিফানো বলেন যে, "আরএনএ হলো ডিএনএ-এর প্রতিচ্ছবি এবং প্রোটিন হল তাদের ফলাফল। বিভিন্ন কারণে ডিএনএ বা আরএনএ'র মধ্যে গঠনগত পরিবর্তন হলে প্রোটিন অস্বাভাবিক চরিত্র দেখাতে পারে ও ক্যান্সার রোগের কারণ হতে পারে।" ক্যালিফানো তার তৈরি একটি গাণিতিক আলগোরিদম-এর সাহায্যে ১০ হাজার ক্যান্সার নমুনা থেকে ৪০৭টি প্রোটিনকে ক্যান্সারের মূল কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রোটিন হিসাবে শনাক্ত করেন। তার মতে, এই প্রোটিনগুলো ক্যান্সার কোষের মূল কার্যক্রম পরিচালনা করে। এগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় মাস্টার রেগুলেটর। ডিএনএ এবং আরএনএ সম্পর্কিত জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে তারা নানা ঔষধও খুঁজে পেয়েছেন যা এসব ক্ষতিকর প্রোটিনগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। যেমন, একটি বিশেষ শ্রেণির স্তন ক্যান্সার-এর রোগীদের জন্য ব্যবহৃত ঔষধ ট্রাসটুজুম্যাবের (হারসেপ্টিন) অকার্যকারিতার কারণ হিসেবে তারা 'স্টেট' নামের একটি প্রোটিনের ভূমিকা খুঁজে পান। এটি এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় কোষের দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটায়। এর সমাধান হিসেবে গবেষকগণ ট্রাসটুজুম্যাবের সাথে রুক্সলিটিনিব নামের এক ধরনের ঔষধ প্রয়োগের কথা বলছেন। বিভিন্ন গাণিতিক অ্যালগরিদম ব্যবহারের করে তারা কোন চিকিৎসা পদ্ধতি রোগীর জন্য কার্যকর হবে, তার পূর্বাভাস দেয়ারও চেষ্টা চালাচ্ছেন। আর এ সবই সম্ভব হচ্ছে ক্যান্সারের নমুনা থেকে প্রাপ্ত সব রকম তথ্যের সমন্বিত পর্যালোচনার মাধ্যমে।

প্রাণরসায়নিক প্রভাবকসমূহ

প্রোটিন হল ডিএনএ এবং আরএন-এর সর্বশেষ ফলাফল। এ প্রসঙ্গে গেইগার বলেন, "কোনো কোষের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পেতে চাইলে আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রোটিনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।" প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রোটিন নিয়ে অনুসন্ধান করা কঠিন হলেও বর্তমানে জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটে কর্মরত মাথিয়াস ম্যান এবং তেলআভিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইগার-এর মতো বিজ্ঞানীগণ প্রোটিন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা দেখিয়েছে প্রোটিন সম্পর্কিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে ক্যান্সারের বিভিন্ন শাখার পার্থক্য বোঝা যায়, যা শুধু ডিএনএ বা আরএনএ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভব হয় না। এসকল তথ্য ক্যান্সারের গতিপ্রকৃতি এবং রোগীর আয়ুকালের সাথে সম্পর্কিত। গেইগার বলেন, "আমরা প্রোটিনের সঙ্গে রোগীর আয়ুকালের সম্পর্ক খুঁজে পাই। এটা আরএনএর মাধ্যমে পাওয়া যায় না। তাই বলা যায়, প্রোটিন আমাদের কোষের গভীরে জানতে সাহায্য করে।"

এ ছাড়াও প্রোটিন গবেষণার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। যার ফলে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা যেমন- ইমিউনোথেরাপি (একটি ক্যান্সার চিকিৎসা পদ্ধতি) কোন রোগীর জন্য কার্যকর হবে এবং কোন রোগীর জন্য হবে না এবং কি করলে রোগী উপকৃত হতে পারেন, এসব সম্পর্কিত নানা প্রশ্নের সমাধান প্রোটিন গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। ওয়াশিংটনের প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত আছেন জীববিজ্ঞানী ক্যারিন রোডল্যান্ড। তিনি বলেন, "খুব কম ক্যান্সারের জন্যই ইমিউনোথেরাপি কাজ করে। তবে যাদের শরীরে কাজ করে, তাদের জন্য এটা নিঃসন্দেহে একটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে, যাদের শরীরে এটা কাজ করে না, তাদের জন্য এ পদ্ধতির উন্নতি করা যেতে পারে।" এ গবেষণায় ইমিউনোথেরাপির প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো প্রোটিন নিয়ে অনুসন্ধানের গুরুত্ব প্রমাণিত হওয়ায় এরই প্রয়োগ হিসেবে বর্তমানে গেইগার ত্বকের ক্যান্সারের কিছু কিছু রোগীদের উপর ইমিউনোথেরাপির কাজ না করার কারণ, এবং কিভাবে তাদের জন্য এর কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা যায় সে সম্পর্কে গবেষণা করছেন।

সবচেয়ে ভাল সমন্বিত প্রয়াস

কোনো ক্যান্সারের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ক্যান্সার কোষে উপস্থিত ডিএনএ, আরএনএ এবং প্রোটিন অনুসন্ধানের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। সম্প্রতি কলোরেক্টাল ক্যান্সার সম্পর্কিত একটি গবেষণায় প্রোটিনের পরিমাণের উপর জিনের সংখ্যার পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গিয়েছে। অন্যদিকে ২০১৮ সালে পরিচালিত স্তন ক্যান্সারের একটি অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে সুস্থ স্তন টিস্যুর তুলনায় টিউমার টিস্যুতে উপস্থিত আরএনএ-এর পরিমাণ প্রোটিনের পরিমাণের সাথে বেশি সম্পর্কিত। সুতরাং, ডিএনএ, আরএনএ এবং প্রোটিনের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ক্যান্সার জগতে নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটাবে বলে ধারণা করা যায়।

বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্ট সজীব চক্রবর্তী বলেন, "আরএনএ এবং প্রোটিনের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্ক ক্যান্সার কোষগুলোর কার্যপদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে।" একটি ক্যান্সার কোষের কার্যপদ্ধতি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য একগুচ্ছ আরএনএ এবং প্রোটিনকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে হয়। চক্রবর্তী বলেন, "এভাবে আমরা ক্যান্সার কোষের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কার্যপদ্ধতিগুলোকে শনাক্ত করতে পারি।" বর্তমানে চক্রবর্তী জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব ফ্রাইবুর্গে কর্মরত তার সহকর্মীদের সহযোগিতায় ক্যান্সার রোগীদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ক্যান্সারের বিস্তার রোধক পদ্ধতি শনাক্তকরণ এবং রোগীর ক্যান্সার চিকিৎসার কার্যকারিতা সম্পর্কে জানতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়াও চক্রবর্তী আরএনএ ও প্রোটিনের পারস্পরিক সম্পর্ক কিভাবে সময়ের সাথে কোনো ঔষধের কার্যকারিতায় পরিবর্তন করে তা সম্পর্কে জানতে আশাবাদী। অনেক ক্ষেত্রে এটি লক্ষ্যণীয় যে কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঔষধ ৫-ফ্লুরোইউরাসিল একটি নির্দিষ্ট সময় পর অকার্যকর হয়ে যায়। চক্রবর্তী বলেন, "ক্যান্সারের প্রাক্কালে যে সকল জিন ৫-ফ্লুরোইউরাসিলের কার্যকারিতার সাথে জড়িত তাদের আরএনএ এবং প্রোটিনের নিবিড় সম্পর্ক বজায় থাকে, কিন্তু পরবর্তীকালে এই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এটি আমাদের একটি কার্যকরী ঔষধের সময়ের সাথে কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মূল কারণ কোনটি তা বুঝতে সহায়তা করে।"

প্রোটিন ও ক্যান্সার নিয়ে গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল প্রোটিন তৈরির পর তার মধ্যে পরিবর্তন অনুসন্ধান করা। তৈরি হওয়ার পরও প্রোটিন নিজেরা বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে ফসফরাইলেশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনুসন্ধান করা হয়েছে যা প্রোটিনের অন-অফ সুইচ হিসেবে কাজ করে। এসকল গবেষণার ফলে ক্যান্সার সম্পর্কে অজানা অনেক বিষয়ের ব্যাখ্যা জানা সম্ভব হচ্ছে। যেমন, সাধারণত ক্যান্সার কোষে ক্যান্সার প্রতিরোধী জিন 'আরবি১' অকার্যকর থাকে; কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কোলোরেক্টাল ক্যানসারে 'আরবি১' প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি। এর কারণ হিসেবে দেখা যায় যে 'আরবি১' জিন থেকে তৈরি হওয়া 'আরবি প্রোটিন' কোষের বৃদ্ধিতে বাধা প্রদান করলেও আরবি প্রোটিনের ফসফোরাইলেশন তার এই বাধা দেওয়ার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। রোডল্যান্ড তাই বলেন, "প্রোটিনের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে শুধু প্রোটিনের পরিমাণ সম্পর্কে জানাই যথেষ্ট নয়, প্রোটিনের পরিবর্তন সম্পর্কেও জানাও জরুরি।"

বর্তমানে প্রোটিন অনুসন্ধানের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত জটিলতার জন্য গবেষকগণ প্রোটিন-নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে ক্যান্সার গবেষণার একেবারে সম্মুখসারির বিজ্ঞানীগণ যেহেতু ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও তার কার্যকর নিরাময়ে প্রোটিনের গুরুত্ব সম্যক উপলব্ধি করছেন, তাই সামনের বছরগুলোতে এ সকল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নিশ্চিতভাবেই অতিক্রম করা যাবে। জীবনের মৌল রহস্য ও তার বিভিন্নতার আধার ডিএনএ, তার প্রতিচ্ছবি আরএনএ ও তার চূড়ান্ত প্রকাশ প্রোটিনের সমন্বিত গবেষণার মাধ্যমে প্রাণঘাতী ক্যান্সার রোগের নিঁখুত এবং সুলভ চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন শুধু নয়, সকল রোগ-ব্যাধি-জরা থেকে মানব দেহকে রক্ষা করার কৌশলও বিজ্ঞানিরা উপহার দেবেন। সে লক্ষ্যেই তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

সজীব চক্রবর্তী আস্থার সাথেই বলেছেন, "আমি আশাবাদী যে ভবিষ্যতে ব্যবহার-বান্ধব এমন সফটওয়্যার থাকবে যা মুহূর্তে বলে দেবে রোগীর নমুনায় আসলে কি ঘটছে। কারণ আমাদের মতো কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্টদের হাতেই তা তৈরি হবে।"'

'নেচারে' প্রকাশিত নিবন্ধের সুত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. সজীব চক্রবর্তীর কথা এসেছে। আনন্দের বিষয় হচ্ছে তিনিই শুধু নন, আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণায় অবদান রাখার মতো আরো বিজ্ঞানীরা এ দেশে কাজ করেই আন্তর্জাতিক পরিসরে নাম করেছেন।

এদেরে মধ্যে রয়েছেন আইসিডিডিআর(বি)'র ইমিউনলজি বিভাগের এমেরিটাস বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী। ৬ অক্টোবর, ২০২০ তারিখে বিল গেটস এই টিকা বিজ্ঞানির উপর তার লেখা নিবন্ধে বলেছেন, "গত ২৫ বছর ধরে ড. ফেরদৌসী কাদরী কলেরার হাত থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে সুলভ ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০১৯ সালে বিশ্বে কলেরা রোগে মৃত্যুর সংখ্যা পূর্বের চেয়ে ৩৬ ভাগ কমে এসেছে। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের ইমিউনোলজিস্ট ড. কাদরীর জীবনব্যাপী গবেষণার কারণে।"

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে বিল গেটস লিখেছিলেন বাংলাদেশের অণুজীব বিজ্ঞানী ড. সমীর সাহা ও ড. সেঁজুতি সাহাকে নিয়ে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সমীর সাহা গড়ে তুলেছিলেন শিশু স্বাস্থ্য গবেষণা ফাউন্ডেশন। বিল গেটস লিখেছিলেন, "১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসার বিরল কৃতিত্ব সরকারের ভ্যাকসিন কর্মসূচি এবং সাহার গড়ে তোলা ফাউন্ডেশনের নিরবিচ্ছিন গবেষণা কাজ।" নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিস রোগের ভ্যাকসিন দরিদ্র মানুষের কাছে সহজলভ্য করা এবং তাদের উপযোগী করে নতুন ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে এই দুই বিজ্ঞানীর গবেষণার কথা বলেছেন গেটস। বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারীর এই সময়ে এই দুই বিজ্ঞানী বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগীদের নমুনা থেকে করোনাভাইরাসের জেনেটিক সিকুয়েন্স প্রথমবারের মতো সম্পন্ন করেন।

বহুল সমাদৃত ব্রিটিশ সাময়িকী 'প্রসপেক্ট'-এর নির্বাচিত বর্তমান ২০২০ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০ জন চিন্তাবিদের মধ্যে ৩য় স্থান অধিকারী বাংলাদেশের স্তপতি মেরিনা তাবাসসুম। প্রকৃতির অংশ হিসেবে মানুষকে দেখা এবং সে অনুযায়ী তার চাহিদা পূরণে আবাসস্থল, প্রার্থনার জায়গা, বহুতল ভবন, মিউজিয়াম ও নানা প্রয়োজনের ভবনের শৈল্পিক স্থাপত্য নকশা মেরিনা তাবাসসুম করেছেন। শুধুমাত্র একজন স্থপতি নয়, তিনি হয়ে উঠেছেন বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রসর চিন্তক।

আমাদের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হাসিনা খান বাংলাদেশে বিজ্ঞান গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৯ সালের স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার লাভ করেন। ড. মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে পাটের জেনোম সিকুয়েন্সিং কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো পদ্মার ইলিশ মাছের জেনোম সিকুয়েন্সিং সম্পন্ন হয়।

প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অপর নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানী অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ। গত প্রায় তিন যুগ ধরে বাংলাদেশে লবনাক্ততা সহনশীল ধান উদ্ভাবনে তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে গবেষণা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

এদের ছাড়াও নবীন বিজ্ঞানীরা রয়েছেন যারা নানা প্রতিকুল অবস্থা মোকাবেলা করেও বাংলাদেশে বিজ্ঞান সাধনায় নিবিষ্ট আছেন। সামনের দিনগুলিতে অত্যাধুনিক বিজ্ঞান গবেষণায় তাদের সাফল্য যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিভাত হয়ে বাংলাদেশকে সম্মানিত করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের শুধু প্রয়োজন বিজ্ঞান বান্ধব একটি সরকার ও সমাজব্যবস্থা। তা কি আমরা পেতে পারি না?

মূল প্রবন্ধের লিংক: https://www.nature.com/articles/d41586-020-02676-9

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক