‘আগষ্ট ১৪’, ঐশি ও আমাদের প্যারেন্টিং 

সৈয়দা মৌ জান্নাত
Published : 15 June 2020, 02:14 PM
Updated : 15 June 2020, 02:14 PM

আমি তখন নবম শ্রেণি, আমি তখন ষোল। নাহ গান গাইছি না। নবম শ্রেণি পড়ুয়া এক কিশোরীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যখন আমিও নবমেই। আমাদের স্কুল আলাদা কিন্তু এক কোচিংয়েই পড়তাম। পড়ালেখায় মন আমার কোনওদিনই ছিল না, তারও না। তাই ঝাঁক ঝাঁক 'মেধাবি'র ভিড়ে তার সাথেই আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। লেখার খাতিরে ধরে নিলাম তার নাম মাধবী। 

একদিন ক্লাসের ফাঁকে গল্প করছিলাম দুইজন। ওকে দেখে খুব নিষ্প্রভ মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এখনই কেঁদে ফেলবে। জিজ্ঞেস করলাম, মাধবী, কী হইছে তোমার! মন খারাপ নাকি। 

সে হড়বড় করে অনেক কথা বলল। তার অনেক ছেলে বন্ধু, মেয়ে বন্ধু নেই বললেই চলে। গ্রাম থেকে শহরে এসেছে, তথাকথিত 'স্মার্ট মেয়েদের' সঙ্গে সে পেড়ে ওঠে না বা পাত্তা পায় না। বন্ধুহীন কী এক বিষণ্ণ কৈশোরে দলিত-মথিত দিন পার করে সে। 

তবে তার দুই একজন ছেলে বন্ধু কীভাবে যেন জুটে গেছে, তারা মাধবীকে বন্ধুর মর্যাদাও দেয়। এতে তার নিজেকে বন্ধুহীন মনে না হলেও ঘোর আপত্তি তোলেন মা। কোনওভাবেই তিনি মানতে পারেন না মেয়ের এত এত ছেলে বন্ধু আছে, কোচিং শেষে ছেলে বন্ধুরাই তাকে বাড়ি অব্দি দিয়ে আসে। এসব নিয়ে নানান অশান্তি লেগেই থাকে। যেদিন আমার সঙ্গে কথা বলছিল তার আগের সন্ধ্যাতেই মা তাকে খুব বাজেভাবে বকেছেন। তাকে যে ভাষায় গালি দিয়েছেন, তার একটু শুদ্ধ বাংলা করলে দাঁড়ায় 'বেশ্যা।' গালিটা মাধবীর বুকে শেলের মতো বিঁধে ছিল, চোখে কান্না আর অন্তরে ক্ষোভ নিয়ে ও বলে, 'মা কেমনে আমারে এই গালি দেয়? মা আমারে আগেও গালি দিছে মহুয়া। আমি এসব সহ্য করতে পারি না। আমার জিদ উইঠা যায়। মনে হয় যেদিক খুশি চইলা যাই।' 

মাধবীর মা চাকরি করতেন, বাবা কী করতেন আমি জানি না, জিজ্ঞেস করিনি কখনো। তবে তার কথায় বুঝেছিলাম, পরিবার থেকে সে বিশেষ কোনও সময় পায় না। তার বন্ধু হওয়ার মতো বাড়িতে কেউই নেই। কোনো মমতাময়ী তাকে বলেন নাই- নতুন পরিবেশে, নতুন জায়গায় তুমি খাপ খাওয়ায়ে ন্যাও, আমি তোমার সঙ্গে আছি। 

তার বাবার কথা বলতে গিয়ে আরো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, জানাল তার স্কুলে দুই একটা মেয়ের সঙ্গে তার কিঞ্চিৎ হায়-হ্যালো আছে। তারা মাঝে মাঝেই 'মিসড কল', 'মিসড কল' খেলে। নিজেদের ফোন নেই, তাই বাবার ফোনেই সে 'মিসড কল', 'মিসড কল' খেলত আরকি। তার এক সহপাঠী যাকে সে বন্ধু বলতে নারাজ তার পরপর কয়েকটা মিসড কলে তার বাবা নাকি বলে উঠেছেন, "মাগিরা পাগল হয়ে গেছে।" এতেও মনটা ভেঙে গেছে ষোড়শীর। "মহুয়া আমার আব্বু কেমনে আমার ক্লাসমেটরে মাগি কয়।" সেদিন আমি আসলে বুঝি নাই এত কিছু, আমার এত খারাপও লাগে নাই। কিন্তু আজ লাগছে, কিশোরী মাধবীর জন্য আমার কান্না পাচ্ছে।

শিহাব শাহীনের 'আগষ্ট ১৪', আমাদের পরিবার ব্যাকরণ

কয়েকদিন ধরে প্যারেন্টিং নিয়ে খুব আলোচনা চলছে শুনলাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। অবশ্য সে আলোচনা আমি দেখি নাই, পড়ি নাই, যোগও দেইনি। কিন্তু এরইমধ্যে আমি দেখে ফেললাম, শিহাব শাহীনের 'আগষ্ট ১৪'। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পেলাম ২০১৩ সালের সেই মিন্টো রোডের ঘটনা। সস্ত্রীক পুলিশ কর্মকর্তার নিজের মেয়ের হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়ার ঘটনার উপর ভিত্তি করে সিরিজটা বানানো হয়েছে বলে মনে হলো। যদিও সিরিজের শুরুতেই বলা হয়েছে, চিত্রনাট্যের সাথে বাস্তবের মিল থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। তবে চিত্রনাট্য একটি সত্য ঘটনা থেকে উৎসাহিত হয়ে লেখা তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।  

আমি শিহাব শাহীনকে চিনি না, জানি না। ইনফ্যাক্ট আমি মুভিখোর, সিরিজখোর টাইপ না। খোঁজও রাখি না। কিন্তু প্রতিদিন একটু কিছু দেখি আর কী। যাহোক, আপাতদৃষ্টিতে সিরিজের মেকিং ভালো লেগেছে। মূল চরিত্রের অভিনয়ে আমি বারবার অবাক হয়ে ভেবেছি, না এ ওপাড়ের পার্নো মিত্র নন, আমাদের তিশা। 

কিন্তু এত ছিমছাম গোছানো এক সিরিজ দেখে আমার মনটা বিষিয়ে উঠল। সিরিজ শেষে চোখটা ভিজে গেল। 'বাজে প্যারেন্টিং' শব্দ দুইটা মাথায় বারবার টোকা দিতে থাকল। আর মন বললো- আহারে কী সুন্দর একটা বাচ্চা কেমন ভয়ঙ্কর ঘৃণিত খুনি হয়ে উঠল!   

আলাপ তোলার আগে বলে রাখি, সিরিজে মূল চরিত্রের নাম তুশি। সংক্ষেপে ঘটনার কথন এভাবে বলা যায়, এক 'বেপরোয়া' 'অবাধ্য' ও 'উচ্ছৃঙ্খল' মেয়ের উচ্ছন্নে যাওয়া ও একটি আপাত বিচ্ছিন্ন পরিবারের পতন। 

'ধূর্ত শয়তান' ও 'অন্ধকারের মেয়ে'

এই সিরিজের তিন নম্বর এপিসোডের নাম 'ধূর্ত শয়তান' এবং ছয় নম্বর এপিসোড 'অন্ধকারের মেয়ে'। এই দুটো বিশেষণ যে তুশিকে দেওয়া তা বুঝতে কারো বাকি থাকার কথা না। অন্যদের কী মনে হয়েছে সেদিকে না গিয়ে নিজের কথা বলি, আমার মনে হয়েছে তুশিকেই বলা হয়েছে। দেখানো হয়েছে এই চরিত্রটি নিঃসকোচে পরিচিত বা আধাপরিচিত বন্ধুর সাথে কিংবা চোখাচুখি হওয়া যুবার সাথে বিছানায় যেতে পারে, ড্রাগ নেয়, অনেক রাতে ঘরে ফেরে; মোট কথা 'উচ্ছন্নে' যেতে যা যা করার সবই করে। যার বন্ধুদের অধিকাংশই বখে যাওয়া তরুণ। যারা জিমি, রুমি বা আরো কিছু নামে চিত্রনাট্যে জায়গা পেয়েছেন। সিরিজের সেই 'ধূর্ত শয়তান' ও 'অন্ধকারের মেয়ে' তুশি অন্যায় করেছে, নিজের জন্মদাতা বাবা-মাকে হত্যা করেছে, সুন্দর গোছানো সংসারটা তছনছ করে ফেলেছে। এর সবই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আচ্ছা, বলেন তো কেন সিরিজের চরিত্র তুশি এমন অমানবিক খুনি হয়ে উঠেছিল? কেনই বা সিরিজের পর্দায় নির্মিত হলো 'ধূর্ত শয়তান' ও 'অন্ধকারের মেয়ে'। ধূর্ত শয়তানের যাবতীয় 'অপকর্ম' নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো- কিন্তু সমাজের সেই বিচ্ছিন্ন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধে গড়ে ওঠা পরিবারের সময়, শাসন বা বেড়ে ওঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠল না কেন? অপরাধী তুশিকে হেন বাছবিচার ছাড়াই চরিত্র বিচারে কাঠগড়ায় তোলা এত সহজ হয়ে গেল কোন উপায়ে?  

সংবাদে খোঁজা সেই ঐশি

সিরিজ দেখা থামিয়ে আমি ওই সময়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত মিন্টো রোডে মেয়ে ঐশির হাতে সস্ত্রীক পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা সংক্রান্ত সমস্ত খবরগুলো পড়লাম। কিছু জায়গা ছাড়া সব কিছুই হুবহু তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে হলো। তবে ঐশি কেন নেশাখোর, অমানবিক খুনি হয়ে উঠল তা জানা হলো না। বাবা মা বাস্তবে উদাসীন ছিলেন কী না জানা বোঝা গেল না। 

তাই সিরিজ দেখেই তার পরিবারে মা বাবার ভূমিকা কিছুটা আন্দাজ করে ফেললাম। যদিও নির্মাতা বলেছেন এগুলোর সঙ্গে বাস্তবের মিল থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। 

সেটাও যদি হয় তাহলে এখানে তুশি বা ঐশি যাই বলি না কেন তার বাবা মার উদাসীনতাও তো সিরিজেই স্পষ্ট! অথচ একটা এপিসোডের নাম 'উদাসীন বাবা মা' রাখা হলো না! কেন মেয়েটি বখে গেল তা নিয়ে সচেতন করা হলো না আমাদের অভিভাবকদের। 

ধরে নিলাম সে 'ধূর্ত শয়তান' ঠিক আছে, কিন্তু কেন 'ধূর্ত শয়তান' হলো তা আমরা ভাবলাম না। নিমেষে ষোল কোটি মানুষ ঐশিকে গালাগালি শুরু করলাম, ধিক্কার দিলাম, ফাঁসি চাইলাম। অথচ সে ছন্দহীন প্যারেন্টিং এর শিকার কী না তা আমরা খতিয়ে দেখলাম না। কেউ দেখে থাকলেও আমার জানা নেই অবশ্য।

ঐশি কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে মেশে এসব নিয়ে যে তার বাবা মা অসচেতন ছিলেন তা না, তারাও সচেতন হয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ, মেয়ে ড্রাগ নেওয়া শুরু করেছে, চলে গেছে অনেক দূরের অন্ধকার এক জীবনে।

সফলতার কেচ্ছা ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান

আমাদের প্রায় অধিকাংশ পরিবারে একটি শিশু জন্ম নিলে, শিশুর বাবা-মা বা অন্যান্য সদস্যরা তার বিকাশ বা বুদ্ধি তৈরি হওয়ার আগেই এক পরিষ্কার কেচ্ছা গেঁথে ফেলেন। যেখানে হয়তো 'হার' বা 'থেমে যাওয়া' বলে কোনো শব্দের স্থান থাকে না। প্রকৃতির স্বভাব থেকেই হয়তো মানুষের কাছে সফলতাই জেয়, অন্য সব শব্দগুলো তুচ্ছ। ফলে শিশুর সেই রঙিন স্কুল পোশাক গায়ে উঠলে তার মনে আনন্দের থেকে বিষাদের পাল্লা ভারি হতে থাকে। ফলে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার 'অপরাধে' সরল মনে শিশুরা জটিল সমাজে টিকে থাকার ভয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আহারে সরল বাচ্চা আমার! এজন্যই প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের পর প্রতিটি সংবাদকর্মীকে আপাত 'সফলতার' সংবাদের পাশাপাশি আত্মহননের সংবাদও লিখতে হয়। 

এ বছরই মানে ২০২০ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত সংবাদে দেখলাম, জয়পুরহাট, হবিগঞ্জ, গাজীপুরে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে চার শিশু। সরলদৃষ্টিতে চার জেলার চারটি শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যান হয়তো সহজই মনে হতে পারে। কিন্তু এর গুঢ় বেদনা আমাদের অনুসন্ধান করা দরকার; যেমন করে '১৪ আগষ্ট ' সিরিজের নির্মাতা শিহাব শাহীন অন্ধকারের মেয়ে তুশিকে পর্দায় তুলে এনছেন। দুটো দিক নিয়েই আলোচনা জরুরি। 

সিরিজ ও সম্প্রতি আত্মহননের ঘটনার বিবরণ দুই মেরুর হলেও শিকড় একই, প্যারেন্টিংয়ের সীমাবদ্ধতা। 

মাধবী ও সংবাদের ঐশি 

আমি মাধবীকে খুব মনমরা ও আত্মবিশ্বাসহীন জীবন কাটাতে দেখেছি। তার উপর ছিল ভালো ফলাফলের চাপ এবং বন্ধুদের সঙ্গে মেশা নিয়ে সীমাহীন কটাক্ষ। আর ঐশির বখে যাওয়া দেখে আমাদের কারো বুঝতে বাকি থাকে না সেও আসলে উদাসীনতারই শিকার। যার ফলে সীমা ছাড়িয়ে সে এমন জায়গায় চলে গেল, যেখান থেকে কেউ কখনো ফিরেই আসে না। ঐশিও ফিরল না, সবটা শেষ করে, তছনছ করে গুঁড়িয়ে দিয়ে তারপর ঠাণ্ডা হলো। 

মনোবিজ্ঞান কী বলে?

শৈশবে অভিভাবকের সঙ্গে শিশুর যে বন্ধন গড়ে ওঠে তার প্রভাব জীবনব্যাপী। অর্থাৎ শৈশবের অভিজ্ঞতার উপর অনেকটা নির্ভর করে পরবর্তীতে নিজের সাথে, অভিভাবকের সাথে ও অন্যদের সাথে একজন ব্যক্তির সম্পর্ক কেমন হবে বা সে মানুষ হিসেবে কেমন হবে?

শিশুর সাথে অভিভাবকের মূলত দুই ধরনের বন্ধন রয়েছে; নিরাপদ ও অনিরাপদ বন্ধন। 

নিরাপদ বন্ধনের ক্ষেত্রে মা বাবা সন্তানের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয় ও ভরসার জায়গা। অভিভাবকের আত্মবিশ্বাস, সংগতিপূর্ণ আচরণ, সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সংবেদনশীলতা ও সন্তানের চাহিদাপূরণের ব্যাপারে তৎপরতা, সন্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে করে তোলে মধুর ও আস্থাপূর্ণ! ফলে সন্তান হয়ে ওঠে সুখী, আত্মবিশ্বাসী, আত্মপ্রত্যয়ী।  সন্তান নিজেকে সুরক্ষিত ভাবে। তাই বলা যায় বন্ধন যদি নিরাপদ হয় তাহলে পরবর্তীতে তা নিজের সঙ্গে এবং অন্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। 

এবার দেখা যাক অনিরাপদ বন্ধন কী? যদিও অনিরাপদ বন্ধনের আরো অনেক দিক রয়েছে। আমি খুব অল্প পরিসরে বলার চেষ্টা করছি। এই ধরনের বন্ধনে অভিভাবক সন্তানকে যথেষ্ঠ পরিমাণে সময় ও আবেগীয়ভাবে সাড়া দেয় না বা এড়িয়ে চলে। ফলে সন্তান আস্থাহীন হয়ে পড়ে, অনিরাপত্তায় ভোগে। এতে সে গুরুত্বহীন মনে করে নিজেকে, একাকিত্বে ভোগে, জীবনের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে এবং একটা সময় একলা চলার সিদ্ধান্ত নেয়। অভিভাবকের সাথে অনিরাপদ বন্ধন শিশুর মনকে ক্ষত বিক্ষত করে তোলে। শারীরিকভাবে বড় হলেও মনের ভেতরে আহত ও ক্ষতবিক্ষত সেই শিশুটি থেকেই যায়। এতে দিনকে দিন শিশুটি হিংস্র, বিষণ্ণ, রাগী হয়ে উঠতে পারে, ঘটিয়ে ফেলতে পারে আত্মহত্যার মতো দুর্ঘটনা। (নাহার, রাউফুন; মনের যত্ন, ফেব্রুয়ারি, ২০২০) 

আজকাল পত্রিকা খুললে প্রায়ই চোখে পড়ে কিশোর অপরাধের খবর। এগুলো আমাদের প্যারেন্টিংয়ের সীমাবদ্ধতার জন্য হয় কিনা তা হয়তো খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। 

শেষে আর কী বলি 

আমাদের সমাজে কিছু কিছু শিশুর উপর যে ধরনের শাসন চলে তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কেউ বাচ্চাকে মাথায় তুলে ফেলেন, কেউ আবার কঠোরভাবে শাসন করেন। আমি নিজের চোখেই দেখেছি এসব, নিজের জীবন দিয়েও কিছু উপলব্ধি করতে পারি। 

শাসনের ক্ষেত্রে হয় এসপার নয় ওসপার, মানসিকতা মোটেও শুভ বার্তা আনবে না। আমার এক আত্মীয়ের কাছে তার বাচ্চাকে নিয়ে হাজার অভিযোগ শুনেছি। ছোটবেলায় দেখতাম বাচ্চা খায় না বলে রাগ হয়ে যেতেন, বড় বেলায় বাচ্চা খায় বলে তিনি রাগ হয়ে যান। আমার কাকাত ভাই, নাম স্মরণ। দিন রাত বই নিয়ে বসে থাকে। শুনলাম পর্যায় সারণী মুখস্ত করে ফেলেছে। এ নিয়ে আবার আমার চাচির সমস্যা। শুধু সমস্যা বললে ভুল হবে, উনার ধারণা উনার ছেলের পাগল হতে বেশি দেরি নেই। স্মরণের ছোট সাদাফ, সে ঠিকঠাক পড়তে বসে না বলেও চাচির সমস্যা। এবার বলেন, ঘটনা আসলে কী দাঁড়ায়!

বাচ্চাকে স্নেহ মমতাও দিতে হবে আবার শাসনও করতে হবে। 'আরে ভাবি আমার বাচ্চা তো মাংস ছাড়া ভাত খায় না বা শাক না খেলে আজ তোকে মেরে ফেলব' টাইপ আচরণ বন্ধ করতে হবে। বাচ্চাকে মাংসের সঙ্গে শাক দিয়ে সুন্দর করে তার বেড়ে ওঠার সময়টাতেই বুঝিয়ে বলুন শাক তার জন্য কেন দরকার, সব সময় মাংস কেন খারাপ। তাকে বুঝিয়ে বলুন লেখাপড়া কেন দরকার, লেখাপড়া না করলে তার ভবিষ্যতে কোন ধরনের সমস্যা হতে পারে। ভালো খারাপের পার্থক্য বোঝানোর কাজটা সঠিক সময়েই করবেন। প্লিজ, এ কাজে দেরি নয়।

সরল স্বীকারোক্তি

সেই ঐশি কিংবা শিহাব শাহীনের সিরিজের তুশিকে আমরা ভাবলেশহীন চিত্তে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি। কিন্তু ঐশি বা তুশি কেন অমানবিক খুনি হয়ে উঠল তার সন্ধানও যে করা উচিত আমি সেটাই বলতে চেয়েছি। আমাদের সমাজে এমন অনেক বাবা মা আছেন যারা সন্তানের পরীক্ষার যেকোনো রকম ফলাফলকেই উদযাপন করতে জানেন, জানেন কীভাবে শুষে নিতে হয় সন্তানের চোখের নোনা জল, জানেন সঠিক প্যারেন্টিংয়ের গুরুত্ব। এমন মা বাবা আছেন যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া সন্তানকে বুকে টেনে নেন, পরের বার নিশ্চয়ই ভালো হবে বলে আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন তাদের প্রতি রইল অগাধ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক