১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রান্ত থেকে পর্দায়: ঔপনিবেশিক ভারতে মুসলিম নারীর নীরব রেনেসাঁ

ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের মুসলিম নারীদের সম্মিলিত অবদানের ইতিহাস আজও অনেকাংশে অস্বীকৃত রয়ে গেছে।

প্রান্ত থেকে পর্দায়: ঔপনিবেশিক ভারতে মুসলিম নারীর নীরব রেনেসাঁ
ঔপনিবেশিক ভারতের চরম কড়াকড়ি পেছনে ফেলে ফাতমা বেগম, জুবাইদা, জাদ্দনবাই, বিব্বো, বি আম্মা, বেগম সুলতান জাহান ও আতিয়া ফয়জির মতো মুসলিম নারীরা চলচ্চিত্র, রাজনীতি, শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ সাঈদ ইফতেখার আহমেদ

Published : 07 Sep 2026, 07:19 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:56 AM

ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম সমাজ সার্বিকভাবে পশ্চাৎপদ ছিল—এমন একটি ধারণা ঔপনিবেশিক আমল থেকেই অনেকের মনে গেঁথে রয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে নিবিড়ভাবে তাকালে চোখে পড়ে একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য। ওই একই সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু মুসলিম নারী নিজেদের সমাজের পশ্চাৎপদতা থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

একদিকে তখন মুসলিম সমাজে পর্দাপ্রথা, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ আর নারীর জনপরিসর থেকে দূরে থাকবার কড়াকড়ি বহাল। অন্যদিকে ঠিক ওই সময়েই একদল মুসলিম নারী—কেউ ক্যামেরার পেছনে, কেউ রাজনৈতিক মঞ্চে, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে, কেউবা লেখালেখিতে—উপমহাদেশের সবচেয়ে রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আধুনিকতাকে নতুন রূপে সংজ্ঞায়িত করছিলেন। এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটা ছিল একটা প্রকৃত রেনেসাঁ—খণ্ডিত, অসম, প্রায়ই অস্বীকৃত, কিন্তু নিঃসন্দেহে বাস্তব।

এ আলোচনা শুরু করা যাক চলচ্চিত্র দিয়ে, কারণ এখানেই এই জাগরণের সবচেয়ে দৃশ্যমান স্বাক্ষর রয়ে গেছে। ১৮৯২ সালে গুজরাটের সুরাটে এক উর্দুভাষি মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া ফাতমা বেগম উর্দু থিয়েটারে অভিনয় দিয়ে শুরু করেন—এমন এক সময়ে যখন থিয়েটারে অভিনয় করাটাও একজন ভদ্রঘরের নারীর জন্য ‘সম্মানজনক’ পেশা বলে গণ্য হতো না। ১৯২২ সালে আরদেশির ইরানির 'বীর অভিমন্যু' ছবিতে চলচ্চিত্রাভিষেক হয়, এমন এক ইন্ডাস্ট্রিতে যেখানে নারী চরিত্রেও পুরুষেরা অভিনয় করতেন।

তবে, আসল বিপ্লব ঘটে আরও চার বছর পর। ১৯২৬ সালে তিনি নিজের প্রযোজনা সংস্থা 'ফাতমা ফিল্মস' প্রতিষ্ঠা করেন এবং নির্মাণ করেন ‘বুলবুল-ই-পরিস্থান’—ভারতের প্রথম নারী-পরিচালিত ছবি, একই সঙ্গে দেশের প্রথম ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র, যেখানে তিনি ট্রিক ফটোগ্রাফির মাধ্যমে আদি যুগের বিশেষ প্রভাব তৈরি করেছিলেন। প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার আর অভিনেত্রী—এই চারটি ভূমিকায় একজন নারীর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা তখনকার ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভূতপূর্ব ছিল, শুধু মুসলিম নারীদের মধ্যে নয়, সামগ্রিকভাবেই। এরপরের তিন বছরে তিনি অন্তত আটটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এর মধ্যে ১৯২৯ সালেই মুক্তি পায় পাঁচটি চলচ্চিত্র—সৃষ্টিশীলতার বিচারে যা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ বছর।

ফাতমা বেগমের কন্যা জুবাইদা মাত্র বারো বছর বয়সে অভিনয়ে প্রবেশ করেন এবং ১৯৩১ সালে আরদেশির ইরানির 'আলম আরা'—ভারতের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের নায়িকা হন। রাজকুমারী আলম আরার চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়া জুবাইদা মায়ের মতোই উদ্যোক্তা-মানসিকতা নিয়ে ১৯৩৪ সালে নিজের প্রযোজনা সংস্থা 'মহালক্ষ্মী মুভিটোন' প্রতিষ্ঠা করেন। আর এই মা-মেয়ে আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম ছিলেন না।

একই দশকে বারানসীতে জন্ম নেওয়া জাদ্দনবাই ১৯৩৫ সালে নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান 'সংগীত মুভিটোন' প্রতিষ্ঠা করে প্রযোজনা, পরিচালনা ও সংগীত পরিচালনা—তিনটি করেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আর ইশরাত সুলতানা, যিনি বিব্বো নামে পরিচিত, ১৯৩৪ সালের ‘আদল-ই-জাহাঙ্গীর’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করে হয়ে ওঠেন প্রথম নারী সংগীত পরিচালকদের একজন। ১৯২০-এর দশকের শেষ থেকে ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত সময়টা তাই আসলে ভারতীয় চলচ্চিত্রে মুসলিম নারীদের একটা সম্মিলিত অগ্রগমনের কাল—সৃষ্টিশীলতার প্রায় প্রতিটি শাখাতেই তারা প্রথম সারিতে ছিলেন, এমন এক সময়ে যখন এই শিল্পমাধ্যম নিজেই সবে আকার নিচ্ছিল।

এই তথ্যগুলো থেকে সহজেই 'মুসলিম সমাজ তখন প্রগতিশীল ছিল'—এমন একটা সরল উপসংহারে পৌঁছানো যায়। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস আরও জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক। ফাতমা বেগম বেড়ে উঠেছিলেন কোঠা-সংস্কৃতির মধ্যে—উত্তর ভারতের তওয়ায়েফ-পরিসর, যেখানে নারীরা সংগীত-নৃত্যে প্রশিক্ষিত হলেও মূলধারার সমাজ তাদের সম্মানের বাইরেই রাখত। জাদ্দনবাইয়ের মা দালিপাবাই ছিলেন এলাহাবাদের প্রখ্যাত তওয়ায়েফ। অর্থাৎ যারা প্রথম এই দরজা খুলেছিলেন, তাদের অধিকাংশই এসেছিলেন ওই সামাজিক প্রান্ত থেকে, যাকে তথাকথিত ‘ভদ্র’ মুসলিম সমাজ নিজেই প্রান্তিক করে রেখেছিল।

এখানেই রয়েছে ইতিহাসের একটা কৌতূহলোদ্দীপক প্যারাডক্স। মূলধারার রক্ষণশীল সমাজ যাদের সম্মানের কক্ষপথের বাইরে ঠেলে দিয়েছিল, ওই প্রান্তিক অবস্থানে তাদের হারাবার কিছু ছিল না, যা তাদের নতুন এক ক্ষেত্রে পা রাখবার সাহস জুগিয়েছিল। ‘ভদ্রঘরের’ নারীরা যেখানে সামাজিক সম্মান রক্ষার দায়ে জনপরিসর থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেখানে তওয়ায়েফ ও থিয়েটার-পরিবারের নারীরা—যাদের ‘হারানোর সম্মান’ আগে থেকেই সীমিত ছিল—নতুন শিল্পমাধ্যমের অনিশ্চয়তাকে সুযোগে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন। এই অর্থে এটা কোনো সরল 'মুসলিম সমাজ প্রগতিশীল ছিল' বয়ান নয়; বরং সমাজের ভেতরের স্তরবিন্যাস, বর্জন আর সুযোগের এক জটিল দ্বন্দ্বের প্রতিফলন, যেখানে প্রান্তিকতাই বিপ্লবের বীজ বুনেছিল।

চলচ্চিত্রের বাইরেও, ঠিক একই সময়ে, মুসলিম নারীরা রাজনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও একই ধরনের বাধা ভাঙছিলেন। খিলাফত আন্দোলনের (১৯১৯-২৪) সময় আবাদি বানু বেগম, যিনি বি আম্মা নামে পরিচিত, সারাজীবন কঠোর পর্দাপ্রথা মেনে চলা সত্ত্বেও যখন তার দুই ছেলে মুহাম্মদ আলী ও শওকত আলীকে ব্রিটিশ সরকার কারারুদ্ধ করে, তখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক জনসভায় গিয়ে বোরকা পরিহিত অবস্থাতেই ভাষণ দেন। ঔপনিবেশিক ভারতে এটাই কোনো মুসলিম নারীর প্রথম নথিভুক্ত প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভাষণ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি পর্দা ত্যাগ করেননি; বরং পর্দার ভেতর থেকেই রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, যা প্রমাণ করে আধুনিকতা আর ধর্মীয় রক্ষণশীলতা সব সময় পরস্পরবিরোধী নয়, বরং তাদের সহাবস্থানই অনেক সময় নতুন অগ্রযাত্রার পথ তৈরি করে। মহাত্মা গান্ধী নিজে তার সঙ্গে দেখা করে নারীদের স্বাধীনতা আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার অনুরোধ জানান, আর বি আম্মা হয়ে ওঠেন মুসলিম নারীদের আন্দোলনে যুক্ত করার প্রধান মুখ।

এই একই দশকে ভূপালের শাসক বেগম সুলতান জাহান আরও এক ধরনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২০ সালে, স্যার সৈয়দ আহমদ খানের প্রতিষ্ঠিত মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ যখন পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়ে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়, তখন বেগম সুলতান জাহান হন এর প্রথম তথা প্রতিষ্ঠাকালীন চ্যান্সেলর এবং এই পদে ছিলেন মৃত্যু পর্যন্ত। আজ পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র নারী চ্যান্সেলর—বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বে (ভাইস-চ্যান্সেলর পদে) প্রথম কোনো নারী আসেন আরও প্রায় এক শতাব্দী পরে, ২০২৪ সালে, নাইমা খাতুনের মাধ্যমে। শুধু আলীগড় নয়, ভারতের কোনো সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়েই (নারী-বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতীত) পরবর্তী কোনো নারী ভাইস-চ্যান্সেলর পদে আসতে সময় লেগেছিল প্রায় তিন দশক—১৯৪৯ সালে গিয়ে হংসা মেহতা বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন, ভারতের কোনো সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে আসা প্রথম নারী তিনিই।

এর আগে ১৯১৪ সালে বেগম সুলতান জাহান অল ইন্ডিয়া মুসলিম লেডিজ কনফারেন্সের সভাপতি হন—যা মুসলিম নারীদের অন্যতম প্রথম সর্বভারতীয় সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম। বেগম সুলতান জাহান শুধু শিক্ষাই নয়, ভূপাল রাজ্যের কর ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পুলিশ প্রশাসনেও ব্যাপক সংস্কার আনেন। ফলে ভূপাল হয়ে ওঠে একজন নারী শাসকের হাতে রাষ্ট্রীয় আধুনিকীকরণের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

আতিয়া ফয়জি ছিলেন বোম্বাইয়ের প্রখ্যাত তৈয়বজি পরিবারের এক বুদ্ধিজীবী নারী, যে পরিবার সুলাইমানি বোহরা মুসলিম সম্প্রদাযের অংশ। তিনি লন্ডনে একটি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কলেজে অধ্যয়নরত ছিলেন এবং ওই অভিজ্ঞতা নিয়ে ভ্রমণ-দিনলিপি লিখেছিলেন, যা পরে ‘জামানা-ই-তাহসিল’ নামে প্রকাশিত হয়। তিনি লাহোরের 'তাহজিব-উন-নিসওয়া' আর আলীগড়ের 'খাতুন' পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন এবং প্রকাশ্যে পর্দাহীন অবস্থায় আসা প্রথম কয়েকজন অভিজাত মুসলিম নারীর একজন হিসেবে পরিচিত। কবি মুহাম্মদ ইকবাল ও পণ্ডিত শিবলী নোমানির সঙ্গে তার দীর্ঘ বৌদ্ধিক পত্রালাপ ছিল ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় অধ্যায়, যা পরবর্তীতে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়। শিক্ষা, সাহিত্য আর আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক পরিসরে তার উপস্থিতি প্রমাণ করে, মুসলিম নারীর অগ্রগমন কোনো একটামাত্র ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না।

এত অগ্রগমনের মধ্যেও, একটা কৌতূহলোদ্দীপক বৈপরীত্য লক্ষ করার মতো। আলীগড় আন্দোলনের প্রাণপুরুষ স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষার প্রবর্তক হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু নারীশিক্ষার প্রশ্নে তিনি নিজে ছিলেন যথেষ্ট রক্ষণশীল ও দ্বিধাগ্রস্ত। অথচ তারই প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের চ্যান্সেলর হয়ে উঠলেন এমন একজন নারী, যিনি নারীশিক্ষার পক্ষে সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আর নিজের রাজ্যে স্বাস্থ্য ও প্রশাসনের মতো ক্ষেত্রেও ব্যাপক আধুনিকীকরণ ঘটিয়েছিলেন। এই বৈপরীত্য নিছক কাকতালীয় নয়; এটা দেখায়, আধুনিকীকরণের প্রশ্নে পুরুষ সংস্কারকদের প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই নারীর প্রকৃত সম্ভাবনার চেয়ে পিছিয়ে ছিল। পুরুষ সংস্কারকেরা যেখানে তাত্ত্বিক বিতর্কে ব্যস্ত ছিলেন, নারীরা সেখানে নিজেদের বাস্তব দৃষ্টান্ত দিয়েই কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে বোঝার জন্য দুটো তাত্ত্বিক কাঠামো সহায়ক হতে পারে। প্রথমত, ‘ঔপনিবেশিক আধুনিকতা’ ধারণাটি ব্যাখ্যা করে কেন ঔপনিবেশিক সমাজে আধুনিকতা কখনোই একরৈখিক বা সমান হারে আসে না; এটা আসে খণ্ডিতভাবে, প্রায়ই ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে সংঘাত ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে। ধারণাটি বিশেষভাবে পরিচিতি পায় ইতিহাসবিদ তানি বার্লোর হাত ধরে, তার সম্পাদিত ‘ফরমেশনস অব কলোনিয়াল মডার্নিটি ইন ইস্ট এশিয়া’ (১৯৯৭) গ্রন্থে। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট একটা যুক্তি দিয়েছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়, তার ‘দ্য ন্যাশন অ্যান্ড ইটস ফ্র্যাগমেন্টস’ (১৯৯৩) গ্রন্থে। তার মতে, ঔপনিবেশিক ভারতের জাতীয়তাবাদীরা সংস্কৃতিকে দুটো ক্ষেত্রে ভাগ করেছিলেন: ‘বস্তুগত’ ক্ষেত্র (অর্থনীতি, রাষ্ট্র, প্রযুক্তি), যেখানে পশ্চিমা আধুনিকতা মেনে নেওয়া হয়েছিল, আর ‘আধ্যাত্মিক’ ক্ষেত্র (ধর্ম, পরিবার, নারী), যাকে পশ্চিমা প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রেখে জাতীয় পরিচয়ের আধার হিসেবে গণ্য করা হতো। ফাতমা বেগম, বি আম্মা, বেগম সুলতান জাহানের মতো নারীরা যখন চলচ্চিত্র, রাজনীতি বা রাষ্ট্রপ্রশাসনের মতো ‘বস্তুগত’ ও প্রকাশ্য ক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন, তখন তারা প্রকারান্তরে এই ঔপনিবেশিক-জাতীয়তাবাদী বিভাজনকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিলেন, যেখানে নারীর স্থান নির্দিষ্ট ছিল কেবল অন্দরমহলের ‘আধ্যাত্মিক’ পরিসরে।

দ্বিতীয়ত, ‘রেসপেক্টেবিলিটি পলিটিক্স’ ধারণাটি ব্যাখ্যা করে কেন সমাজে ‘সম্মান’ আর ‘অসম্মান’-এর মানদণ্ডই নির্ধারণ করে দেয় কে জনপরিসরে প্রবেশের অনুমতি পাবে আর কে পাবে না। এই ধারণাটির প্রবর্তক ইতিহাসবিদ এভলিন ব্রুকস হিগিনবথাম, যিনি ১৯৯৩ সালে তার ‘রাইচাস ডিসকনটেন্ট’ (Righteous Discontent) গ্রন্থে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যাপ্টিস্ট নারী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বটি প্রথম উপস্থাপন করেন, যদিও পরবর্তীতে তা বিভিন্ন প্রান্তিক সমাজের ইতিহাস বিশ্লেষণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ঠিক এই রেসপেক্টেবিলিটির মানদণ্ডকেই ফাতমা বেগম, জাদ্দনবাই, বি আম্মার মতো নারীরা নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন—কেউ পর্দা রক্ষা করে, কেউ পর্দার বাইরে গিয়ে।

এই ইতিহাস আজকের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রায়ই মুসলিম নারীর ‘ক্ষমতায়ন’কে একবিংশ শতকের পশ্চিমা ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন এটা বাইরে থেকে আমদানি করা কোনো বিষয়। কিন্তু ফাতমা বেগম, জুবাইদা, জাদ্দনবাই, বি আম্মা, বেগম সুলতান জাহান আর আতিয়া ফয়জির ইতিহাস বলে দেয়, একশ বছর আগেও মুসলিম নারীরা নিজেদের সমাজের ভেতর থেকেই আধুনিকতা ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্ন তুলেছিলেন—কোনো ঔপনিবেশিক অনুকরণ বা পশ্চিমা ধারা অনুসরণ করে নয়, বরং নিজেদের সমাজের অভ্যন্তরীণ যুক্তি ও সাহস থেকেই। আর অনেক ক্ষেত্রেই তারা তাদের পুরুষ সমসাময়িকদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। অথচ নিজ সমাজেরই একটি অংশ, যারা তখনও প্রবলভাবে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় আচ্ছন্ন ছিল এবং আজও রয়েছে, তারাই এই ধারাবাহিক অগ্রযাত্রাকে ‘ঔপনিবেশিক’ বা ‘পশ্চিমা প্রভাবিত’ এমন নেতিবাচক তকমা দিয়ে অতীতে রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আর বর্তমানেও একই কৌশলে তা করে চলেছে।

ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের মুসলিম নারীদের সম্মিলিত অবদানের ইতিহাস আজও অনেকাংশে অস্বীকৃত বা বিস্মৃত রয়ে গেছে। ফাতমা বেগম যখন ১৯৮৩ সালে মারা যান, তখনো ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার অবদান নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি হয়নি। এই বিস্মৃতিটাই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তোলে—আমরা কি আমাদের নিজেদের ইতিহাসের এই নীরব বিপ্লবীদের যথেষ্ট মনে রেখেছি, নাকি তাদের কীর্তি শুধু পাদটীকা হয়েই রয়ে গেছে ওই ইতিহাসের বইয়ে, যা মূলত পুরুষদের গল্প বলার জন্য লেখা হয়েছিল।

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ, আমেরিকান পাবলিক উনিভার্সিটি সিস্টেম -মেইল: sia112002@yahoo.com