১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মবতন্ত্রের চাপ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পরীক্ষা

নিরাপত্তা দিতে না পেরে আয়োজন বাতিল করা আসলে পরোক্ষভাবে মবতন্ত্রকেই ভেটো ক্ষমতা উপহার দেওয়া।

মবতন্ত্রের চাপ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পরীক্ষা
বাধা আসতেই পারে, কিন্তু সংস্কৃতিচর্চার বহুমাত্রিক চেতনা স্তব্ধ করার ক্ষমতা মবের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।

প্রদীপ্ত মোবারক প্রদীপ্ত মোবারক

Published : 28 Aug 2026, 01:57 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:01 PM

রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র শুধু নির্বাচন, সংসদ ও সরকারের ওপর নির্ভর করে না। গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা দিয়ে নির্ণীত হয় না। রাষ্ট্রের আসল ও কঠিন পরীক্ষা হয় ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি, শিল্পী, লেখক ও গোষ্ঠির অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে। সমাজের কোনো অংশ কারও বক্তব্য, শিল্পচর্চা ও জীবনদর্শন পছন্দ না-ও করতে পারে। সেগুলোকে বিতর্কিত ও আপত্তিকর মনে করাও অস্বাভাবিক নয়। এমন পরিস্থিতিতেও যদি রাষ্ট্র সেই মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারে, তবেই তা প্রকৃত গণতন্ত্র।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দকে অনুমোদন দেওয়ায় নয়; বরং আইনের পরিসীমার মধ্যে সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী ও অজনপ্রিয় মতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সামর্থ্যে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক পরিসরের কয়েকটি ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।

সব ঘটনাকে একই সূত্রে ব্যাখ্যা করা অবশ্যই অনুচিত। কোথাও ধর্মীয় আপত্তি, কোথাও সরাসরি সহিংসতা, কোথাও নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা, আবার কোথাও প্রশাসন ও আয়োজকদের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য ছিল। তথাপি একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে, কোনো আইনসিদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ চাপ বা সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিলে রাষ্ট্র কাকে নিয়ন্ত্রণ করবে—হুমকিদাতাকে, নাকি আয়োজনটিকেই? ২০২৪ সালের নভেম্বরে নারায়ণগঞ্জের মধ্য নরসিংপুরে মুক্তিধাম আশ্রম ও লালন একাডেমির বার্ষিক লালন মেলা ধর্মীয় একটি গোষ্ঠির হুমকির প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক অনুমতি না পাওয়ায় অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। আয়োজকদের অভিযোগ ছিল, নিরাপত্তা প্রদানের পরিবর্তে আয়োজনের ওপরই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে নারীদের খেলাধুলাকে কেন্দ্র করেও অনুরূপ চাপের নজির দেখা যায়। জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে নারী ফুটবল ম্যাচের আগে মাঠের বেড়া ভাঙচুরের পর ম্যাচটি স্থগিত হলেও পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের উদ্যোগে তা অনুষ্ঠিত হয়। ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখায়, রাষ্ট্র চাইলে সংঘবদ্ধ চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে। বিপরীতে, রংপুরের তারাগঞ্জে ধর্মীয় আপত্তিকে কেন্দ্র করে আরেকটি নারী ফুটবল ম্যাচ উত্তেজনার মুখে বাতিল হয় এবং ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ অমর একুশে বইমেলায় তসলিমা নাসরিনের বই প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে সব্যসাচী প্রকাশনীর স্টলের সামনে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পুলিশ প্রকাশককে নিরাপদে সরিয়ে নেয় এবং স্টলটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এখানে মূল প্রশ্ন কোনো লেখকের জনপ্রিয়তার বা গ্রহণযোগ্যতার নয়; প্রশ্ন হলো, কোনো বই আইনত নিষিদ্ধ না হলে তার প্রকাশ ও প্রদর্শনের ভবিষ্যৎ কি আইনি প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে, নাকি জনতার চাপ? ২০২৬ সালের মে মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী ঘিরেও অনুরূপ সংকট দেখা দেয়। স্থানীয় কওমি শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠনের আপত্তি ও প্রদর্শনী প্রতিহত করার ঘোষণার পর বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় প্রদর্শনী স্থগিত করা হয়। একই সময়ে নেত্রকোনার মদনে পূর্বনির্ধারিত বাউল গানের আয়োজনও চাপের মুখে বাতিল হওয়ার সংবাদ আসে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন হলেও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পরিসর নিয়ে উদ্বেগকে নিছক কল্পনা বলে উপেক্ষা করা কঠিন।

অন্যপক্ষে, সব সহিংসতার উৎস আদর্শিক বা ধর্মীয় নয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ফরিদপুর জেলা স্কুলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জেমসের কনসার্টের আগে বহিরাগতদের প্রবেশচেষ্টা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের পর অনুষ্ঠান বাতিল হয়। এই ঘটনাকে ধর্মীয় বিরোধিতার সঙ্গে একীভূত করা যথাযথ নয়। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি একই থেকে যায়—সহিংসতার মাধ্যমে কোনো অনুষ্ঠান পণ্ড করা যদি বারবার সফল হয় এবং অপরাধীর দৃশ্যমান জবাবদিহি না হয়, তবে ভবিষ্যৎ আয়োজকেরা কী বার্তা গ্রহণ করবেন?

এখানে ‘মব’ শব্দটির যথার্থ অর্থও নির্ধারণ করা জরুরি। প্রতিবাদকারী জনতা মাত্রই মব নয়; শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার। মব তৈরি হয় তখন, যখন সংঘবদ্ধ জনচাপ আইনি প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করে ভয়ভীতি, আক্রমণ, ভাঙচুর, বলপ্রয়োগ বা তাৎক্ষণিক শাস্তির মাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়। অতএব প্রতিবাদের অধিকার সংরক্ষণ এবং মবতন্ত্র প্রতিরোধ, দুটিই রাষ্ট্রের সমান্তরাল দায়িত্ব।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে হামলা এই সংকটকে আরও ভয়াবহ মাত্রা দেয়। ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের চেষ্টা এবং বাদ্যযন্ত্র ও প্রযুক্তিপণ্য ধ্বংসের অভিযোগ সাংস্কৃতিক পরিসরের শারীরিক নিরাপত্তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সময়ে উদীচীর কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আগাম হুমকির অভিযোগও সামনে আসে। তবে অভিযোগ, প্রমাণিত তথ্য ও তদন্তের ফল—এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখাই দায়িত্বশীল জনপরিসরের পূর্বশর্ত।

গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো চলচ্চিত্র, বই, গান, নাটক কিংবা শিল্পকর্মের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকতেই পারে। নাগরিক সমালোচনা করতে পারেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে পারেন, বর্জনের আহ্বান জানাতে পারেন, এমনকি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালতের দ্বারস্থও হতে পারেন। কিন্তু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অন্য নাগরিকের আইনসিদ্ধ অধিকার বিলুপ্ত করার অধিকার কারও নেই। এখানেই আইনের শাসন ও মবতন্ত্রের মৌলিক বিভাজনরেখা।

রাষ্ট্র সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে যদি প্রথমেই অনুষ্ঠান বন্ধ করার পথ বেছে নেয়, তবে স্বল্পমেয়াদে হয়তো সহিংসতা এড়ানো সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জন্ম নেয় বিপজ্জনক প্ররোচনা, হুমকি কার্যকর প্রমাণিত হয়। তখন যে গোষ্ঠি হুমকি দিয়েছে, তারা বুঝে নেয় যে যথেষ্ট লোকসমাগম, অনলাইন উত্তেজনা বা সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা সৃষ্টি করতে পারলেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বদলানো যায়। এভাবেই সংঘবদ্ধ গোষ্ঠি অর্জন করে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক ‘ভেটো ক্ষমতা’।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশে ভূমিকা রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। অবশ্যই এই স্বাধীনতা সীমাহীন নয়; জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কিংবা অপরাধে প্ররোচনার ক্ষেত্রে আইন সীমা নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু সেই সীমা নির্ধারণের কর্তৃত্ব আইনের, রাস্তার শক্তির নয়।

প্রশাসনের বাস্তব নিরাপত্তা-সংকটও উপেক্ষণীয় নয়। শত শত মানুষের সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হলে জীবন ও সম্পদ রক্ষা অগ্রাধিকার পেতেই পারে; সাময়িক স্থগিতাদেশ কখনো অনিবার্য হতে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন সাময়িক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা স্থায়ী নীতিতে পরিণত হয়। যদি হুমকিদাতাকে শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করা সহজতর হয়, তবে প্রশাসনিক সুবিধাবাদ ধীরে ধীরে সাংবিধানিক অধিকারের বিকল্পে পরিণত হয়। এর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি দৃশ্যমান সেন্সরশিপ নয়, অদৃশ্য আত্মনিষেধ। যখন চলচ্চিত্র নির্মাতা সম্ভাব্য হামলার ভয়ে প্রদর্শনী করেন না, শিল্পী গান বাদ দেন, নাট্যকার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন আগেভাগেই আয়োজন বাতিল করে—তখন রাষ্ট্রের কোনো আনুষ্ঠানিক সেন্সর ছাড়াই ভয় নিজেই সেন্সরের ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি কখনো একরৈখিক ছিল না। বাউল, সুফি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, মুর্শিদি, যাত্রা, লোকনাট্য, আধুনিক গান, ব্যান্ডসংগীত, চলচ্চিত্র ও চারুকলার বহুধাবিভক্ত ঐতিহ্য মিলিয়েই আমাদের সাংস্কৃতিক সত্তা। বহুত্ববাদী সমাজে সবাই সবকিছু পছন্দ করবে, এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। গণতন্ত্রের দাবি পছন্দ নয়; গণতন্ত্রের দাবি সহাবস্থান।

তাই রাষ্ট্রের নীতি হতে হবে সুস্পষ্ট। বৈধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে হুমকি এলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হুমকিদাতাকে আইনের আওতায় আনা। অনলাইন সহিংসতার আহ্বান দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। নিরাপত্তার কারণে অনুষ্ঠান স্থগিত হলে কারণ, গৃহীত পদক্ষেপ এবং পুনরায় আয়োজনের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। মব সহিংসতার মামলায় দৃশ্যমান তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মবের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শিক পরিচয় নির্বিশেষে একই আইন প্রয়োগ করতে হবে।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সম্পত্তি নয়। আজ যদি মব একটি চলচ্চিত্র বন্ধ করতে পারে, কাল বই, পরশু গান; এরপর পোশাক, শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশীলন, ব্যবসা কিংবা রাজনৈতিক মতপ্রকাশও একই কৌশলের শিকার হতে পারে। আইনের শাসন নির্বাচিতভাবে রক্ষা করা যায় না।

রাষ্ট্রের সাফল্য কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করে সংঘর্ষ এড়ানোর মধ্যে নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে আইনসিদ্ধ একটি অনুষ্ঠান হুমকির মধ্যেও নিরাপদে অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি তাই কেবল সংস্কৃতির নয়, রাষ্ট্রের চরিত্রের। সীমারেখা নির্ধারণ করবে আইন, নাকি সবচেয়ে সংগঠিত, উচ্চকণ্ঠ ও ভয় প্রদর্শনে সক্ষম গোষ্ঠি?

ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট: মবতন্ত্র প্রায়ই শুরু হয় একটি অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে, কিন্তু শেষ হয় মানুষের নিজের কথা বলার সাহস হারানোর মধ্য দিয়ে। তাই সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি আইনের শাসন, নাগরিক মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

প্রদীপ্ত মোবারক কবি, কলামনিস্ট ও জনসংযোগ পেশাজীবী। ই-মেইল: prodeeptomobarook@gmail.com