Published : 03 Apr 2026, 11:39 PM
কূটনীতির সবচেয়ে প্রচলিত শব্দগুলো এখন অচল হতে বসেছে। ‘বন্ধুত্ব’, ‘আস্থা’, ‘সহযোগিতা’—এসব এখন অবসরকালীন প্রস্তুতিতে আছে। নতুন শব্দ এসেছে—‘ড্রোন নজরদারি’, ‘থার্মাল ইমেজিং’, ‘কাঁটাতার’ ও ‘ইলেকট্রিফিকেশন’। আর এই অভিধানের একেবারে সাম্প্রতিক সংযোজন—‘সাপ ও কুমির’।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। বাংলাদেশ সীমান্তের নদীপথ ও জলাভূমি পাহারায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বিষাক্ত সাপ ও কুমিরের মতো প্রাণী ছাড়ার কথা ভাবছে বলে খবর দিয়েছে দেশটির ‘দ্য ফেডারেল’ নামে এক সংবাদমাধ্যম। সংবাদটি নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হলো প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এক জীবন্ত রেখা—যেখানে প্রতিদিন ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি আর মানবিকতার লড়াই চলে। এতদিন এই সীমান্তে কাঁটাতার ছিল, গুলি ছিল, মাঝে মাঝে আলোচনার টেবিলও ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আলোচনার টেবিল সরিয়ে সেখানে রাখা হবে কুমিরের দাঁত আর সাপের ফণা।
পৃথিবীর ইতিহাসে কূটনীতি আর সীমান্ত রক্ষা নিয়ে কতই না বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে। কেউ বানিয়েছে চীনের মহাপ্রাচীর, কেউ বার্লিন দেয়াল, আবার কেউ মেক্সিকো সীমান্তে বিশাল প্রাচীর তোলার স্বপ্ন দেখে ক্ষমতা হারিয়েছেন। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ যা ভাবছে, তা এক কথায় ‘বিপ্লবী’, অভিনব ও অভূতপূর্ব! ড্রোন, জিপিএস আর থার্মাল ইমেজার দিয়ে যখন কাজ হচ্ছে না, তখন তারা শরণাপন্ন হয়েছেন প্রকৃতির আদিম যোদ্ধা সাপ আর কুমিরের।
এ যেন একুশ শতকের ‘পঞ্চতন্ত্র’! এতদিন আমরা জানতাম ‘জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ’, কিন্তু এখন বিএসএফের কৃপায় সীমান্তে নতুন প্রবাদ হতে যাচ্ছে—‘জলে কুমির, ডাঙ্গায় বিএসএফ, আর ঝোপেঝাড়ে বিষধর সাপ!’
ভাবুন তো একবার দৃশ্যটা! সীমান্তের নদী বা জলাভূমি দিয়ে কেউ একজন গরু পার করার কথা ভাবছে বা অবৈধভাবে ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অমনি জলের নিচ থেকে উদয় হলো এক বিশাল হাঁ করা কুমির। তার গলায় হয়তো একটা ছোট্ট আইডি কার্ড ঝুলছে—‘বিএসএফ স্পেশাল ফোর্সেস’। কুমিরটি কামড় দেওয়ার আগে হয়তো একবার জিজ্ঞেস করবে, ‘আধার কার্ড আছে?’ কিংবা জলাভূমির ঝোপের ভেতর লুকিয়ে থাকা গোখরো সাপটি ফণা তুলে বলবে, ‘ভিসা ছাড়া প্রবেশ নিষেধ!’
বিএসএফের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই যে ‘বিষাক্ত সরীসৃপ’ মোতায়েনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা আসলে তাদের সৃজনশীলতারই বহিঃপ্রকাশ। বন্দুকের গুলিতে মানুষ মরলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো চিল্লাপাল্লা করে, জাতিসংঘ রিপোর্ট লেখে। কিন্তু কেউ কুমিরের পেটে গেলে বা সাপের কামড়ে মরলে তো আর বিএসএফকে দোষ দেওয়া যাবে না। তখন বলা যাবে, ‘আরে ভাই, এ তো প্রকৃতির নিয়ম! কুমির ক্ষুধার্ত ছিল, তাই খেয়েছে। আমরা কী করব?’ এটিই বোধহয় ‘ইকোলজিক্যাল ডিপ্লোম্যাসি’ বা বাস্তুসংস্থানিক কূটনীতি।
বিএসএফ এতদিন ড্রোন উড়িয়েছে, বিদ্যুতায়িত বেড়া দিয়েছে এবং থার্মাল ইমেজার দিয়ে মানুষের শরীরের উত্তাপ মেপেছে। কিন্তু মানুষের বুদ্ধি বড় বালাই। মানুষ বেড়া কাটে, ড্রোনের চোখ ফাঁকি দেয়। কিন্তু কুমির? কুমির কি আর ঘুষ খায়? কিংবা সাপ কি আর লাইনম্যানের সঙ্গে যোগসাজশ করে অনুপ্রবেশ করতে দেয়? সাপের ডিকশনারিতে ‘বিবেচনা’ বা ‘মানবিকতা’ বলে কোনো শব্দ নেই। তারা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দংশন করতে জানে।
তবে বিএসএফের এই সরীসৃপ বাহিনী নিয়ে কিছু কারিগরি প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। কুমিররা কি ডেস্টিনেশন চেনে? দেখা গেল, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় ছাড়া কুমিরটি সাঁতরে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে কোনো এক গ্রামের পুকুরে গিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। কিংবা সাপটি দিক ভুল করে ভারতেরই কোনো সীমান্ত চৌকির রান্নাঘরে ঢুকে বিএসএফ জওয়ানদের রাতের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। তখন কি বিএসএফ সেই সাপকে ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করবে? নাকি কুমিরের বিরুদ্ধে ‘সীমান্ত লঙ্ঘনের’ মামলা দেবে?
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে বিএসএফকে নিশ্চয়ই নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। এখন আর শুধু দৌড়ঝাঁপ জানলেই হবে না, জওয়ানদের ‘সাপুড়ে’ বিদ্যায় পারদর্শী হতে হবে। ট্রেনিং সেন্টারে হয়তো শেখানো হবে কীভাবে কেউটে সাপকে স্যালুট দেওয়া শেখাতে হয় কিংবা কুমিরকে কীভাবে সিগন্যাল মেনে চলতে বাধ্য করা যায়।
পয়সা বাঁচানোর এ এক দারুণ উপায়। ড্রোন নষ্ট হলে সারাই করতে পার্টস আনতে হয়। কিন্তু সাপ-কুমিরের তো আর পার্টস লাগে না। তারা সীমান্ত পারাপারকারী চোরাচালানিদের খেয়েই নিজেদের ‘রেশন’ জোগাড় করে নেবে। অর্থাৎ, শূন্য বিনিয়োগে শতভাগ নিরাপত্তা!
যে সভ্যতা মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বানিয়েছে, সেই সভ্যতাই আবার সীমান্ত পাহারায় সাপ-কুমিরের কথা ভাবছে—এতে একটা গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উঠে আসে: আমরা কি তবে প্রকৃতির কাছে ফিরছি? সভ্যতার এই অগ্রযাত্রা দেখে চার্লস ডারউইনও হয়তো একটু থমকে যেতেন—এতদিন তিনি মানুষকে বানর থেকে বিবর্তিত হতে দেখেছিলেন, এখন দেখতেন মানুষ আবার সরীসৃপের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র চালাতে চাইছে!
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই সাপ আর কুমির কার বিরুদ্ধে? অনুপ্রবেশকারীর বিরুদ্ধে, নাকি সেই নদীর ধারে বসবাস করা নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে? সীমান্ত মানে শুধু নিরাপত্তা নয়, সেখানে মানুষ থাকে—তাদের জীবন, জীবিকা, সম্পর্ক ও ইতিহাস—সবকিছু জড়িয়ে আছে। কুমির কি এসব বোঝে? সাপ কি জানে কে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আর কে নিজের বাড়ির পথে হাঁটছে?
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে এতদিন অনেক আলোচনা হয়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ঘাটতি—কত কী! কিন্তু এখন আলোচনার টেবিলে নতুন ইস্যু যোগ হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়তো নোট পাঠাবে, ‘আপনারা আপনাদের কুমিরদের আমাদের ইলিশ খেতে বারণ করুন’ কিংবা ভারত বলবে, ‘আপনাদের দিকের সাপগুলো আমাদের সীমানায় ঢুকে অনুপ্রবেশ করছে, এদের থামান।’
সত্যি বলতে, এই সরীসৃপ পরিকল্পনা যেন মধ্যযুগীয় দুর্গের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাজা-বাদশাহরা তাদের দুর্গের চারপাশে পরিখা খুঁড়ে তাতে কুমির ছেড়ে রাখতেন। বিএসএফও সম্ভবত ভারতকে একটি অভেদ্য দুর্গ মনে করছে। তবে সমস্যা হলো, সাপ বা কুমির তো আর মানচিত্র বোঝে না। তাদের কাছে সীমান্ত মানে কেবলই জল আর ডাঙা। তারা যদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘উষ্ণতা’ না বুঝে কামড় দিয়ে বসে, তবে সেই ক্ষত সারানোর জন্য কোন অ্যান্টি-ভেনম লাগবে, তা দিল্লির নর্থ ব্লক বা ঢাকার সেগুনবাগিচা জানে কি না সন্দেহ।
আরও প্রশ্ন আছে। সাপ আর কুমির কি ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে ঘুরবে? নাকি বিএসএফের ইউনিফর্ম পরবে? যদি কুমির বাংলাদেশি নদীতে ঢুকে পড়ে, তাহলে কি তাকে অনুপ্রবেশকারী গণ্য করে গুলি করবে বিজিবি?
কল্পনা করা যাক, বিএসএফ সত্যিই সাপ ছেড়েছে। এখন সীমান্তে গ্রামবাসী যখন মাছ ধরতে যাবে, তখন তাদের হাতে মাছ ধরার জালের বদলে থাকবে সাপুড়ের বাঁশি। আর কুমির ঠেকাতে হয়তো তারা সঙ্গে করে বিশাল এক-একটা মহিষ নিয়ে ঘুরবে। সীমান্তের জিরো পয়েন্টে সাপে-নেউলে লড়াই দেখার জন্য ট্যুরিস্টদের ভিড় বাড়বে। বিএসএফ তখন এন্ট্রি ফি নিয়ে নতুন আয়ের পথ খুঁজে পাবে।
আবার এমনও হতে পারে, চোরাচালানিরা আরও চালাক হয়ে উঠবে। তারা হয়তো কুমিররোধী স্যুট পরে নামবে কিংবা সাপদের বশ করার জন্য সীমান্তের ওপার থেকে বিন বাজাবে। ড্রোনের চেয়ে সাপ মোকাবিলা করা তাদের জন্য হয়তো বেশি রোমাঞ্চকর হবে।
সীমান্ত রক্ষা করা যেকোনো দেশের সার্বভৌমত্বের দাবি। কিন্তু সেই সুরক্ষা যখন ‘সাপ-কুমির’ তত্ত্বে গিয়ে ঠেকে, তখন বুঝতে হবে সাধারণ বুদ্ধির দৌড় ফুরিয়ে এসেছে। চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত পাহারা দিতে কত লাখ সাপ আর কত হাজার কুমির লাগবে, সেই অংক কষতে গিয়ে বিএসএফের ক্যালকুলেটর হয়তো ইতিমধ্যেই হ্যাং হয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখা যাবে, এই সরীসৃপ বাহিনী মোতায়েনের আগেই খোদ বিএসএফ জওয়ানরাই প্রতিবাদ শুরু করেছেন—কারণ বন্দুক চালানো সহজ, কিন্তু পাহারার সময় একটা কিং কোবরার সঙ্গে একই ডিউটি পোস্টে থাকাটা মোটেও সুখকর নয়। আপাতত আমরা অপেক্ষা করতে পারি সেই দিনের জন্য, যখন সীমান্তের সাইনবোর্ড লেখা থাকবে: ‘সাবধান! সামনে বিএসএফ এবং তাদের পোষা বিষাক্ত সাপ ও ক্ষুধার্ত কুমির রয়েছে। অনুপ্রবেশকারীর মৃত্যুতে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়, দায় কুমিরের!’
কূটনীতি আর সীমান্ত পাহারার এই ‘চিড়িয়াখানা সংস্করণ’ সফল হলে ভবিষ্যতে হয়তো আমরা দেখব আকাশ পাহারায় বাজপাখি আর মাটির নিচে সুড়ঙ্গ ঠেকাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইঁদুর নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তখন হয়তো আমেরিকা মেক্সিকো সীমান্তে গরিলা আর অ্যানাকোন্ডা ছাড়বে, চীন-ভারত সীমান্তে ছাড়বে হিমালয়ান ইয়েতি আর তুষার চিতা। জয় হোক সরীসৃপ কূটনীতির!