হুতি ঠেকানো কি বাংলাদেশের কাজের তালিকায় পড়ে?
বাংলাদেশ কি নিজের অজান্তেই পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে পা রাখছে? সংঘাতপূর্ণ ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তার সমীকরণে ঢাকার এমন অবস্থানের যৌক্তিকতা কী?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর বুধবারের বৈঠক নিয়ে প্রকাশিত খবর রীতিমতো হোঁচট খাওয়ার মতো। প্রতিমন্ত্রী যা বলেছেন, সেটি কি সত্যি বাংলাদেশ করতে চায়?
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের খবরে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে পর প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ঠেকাতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১৪ দেশের সমন্বয়ে গঠিত সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের জন্য নয়।
বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে হুমায়ূন কবির বলেন, “কিছু নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে আমরা মতবিনিময় করেছি। হুতিদের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে গঠিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় আমরা যোগ দিয়েছি।”
তিনি বলেন, “আমি আগেও যেমনটা বলেছি, ইরানের ওপর আক্রমণ চালানোর কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরা সেখানে কাজ করছি না। এটা হুতিদের বিরুদ্ধে। এটা হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যে চ্যালেঞ্জ আছে, সেটাতে আমরা সহায়তা করতে চাচ্ছি।”
তার বক্তব্য সঠিকভাবে লেখা হয়ে থাকলে এ বিষয়টি নিয়ে ভাবার অবকাশ আছে।
সবচেয়ে কৌতুকের বিষয় হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী হুতি ঠেকানোর কথা বলেছেন তাকেই, যার দেশ হুতি বিদ্রোহীদের মূল সাহায্যকারী। এবং হুতি বিদ্রোহীরা হচ্ছে ইরানের অন্যতম সামরিক প্রক্সি, যা দিয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলসহ অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোকে সামরিক ও কৌশলগতভাবে চাপে রাখে ইরান। সুতরাং, ইরানের রাষ্ট্রদূতের কাছে হুতি ঠেকানোর কথা বলা কতটুকু বিচক্ষণতার পরিচয়, সেটিও ভেবে দেখার বিষয়।
হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ে আলোচনার আগে জানা দরকার, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক জোট কী এবং কেন সেটি গঠিত হলো। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলকারী সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ। ভারত মহাসাগরের এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ তেল ও ২০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনের তেল-গ্যাস সংকীর্ণ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এমন স্থানে, সেখানে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করলে ওই সব দেশ থেকে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য মালামাল সরবরাহকারী জাহাজ চলাচল বন্ধ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে ইরান সেই কাজটি করছে। তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে তাদের নিয়মে চালাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের কথাও বলছে। ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে তেল-গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সে কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই প্রণালি খুলতে এত মরিয়া, কিন্তু কাজ হচ্ছে না।
সৌদি আরব বিশ্ববাজারে শীর্ষ তেল সরবরাহকারী দেশ। দেশটির পূর্ব দিকে হরমুজ প্রণালি ও পশ্চিম পাশে লোহিত সাগর। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় তারা এখন পশ্চিম দিকের বন্দর দিয়ে তেল-গ্যাস সরবরাহ করছে। কিন্তু এখানেও সমস্যা। লোহিত সাগরের দক্ষিণে যে দিক দিয়ে জাহাজ সৌদি বন্দরে পৌঁছাবে, সেখানে একটি সরু জলপথ রয়েছে, যার নাম বাব-আল-মান্দেব। এটি ইয়েমেনের নিচে ও গালফ অব এডেনের কিছুটা ওপরে অবস্থিত। হুতি বিদ্রোহীরা বাব-আল-মান্দেবের ওপরের দিকের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং, সৌদি আরবের পশ্চিম দিকের বন্দর থেকে লোহিত সাগরের সরু পথ দিয়ে সুয়েজ খাল হয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে তারা সহজেই আক্রমণ করতে পারবে।
এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই মূলত সৌদি আরবের নেতৃত্বে এই সামুদ্রিক জোট গঠন, যেখানে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে। তবে সেখানে কোনো প্রকার যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো পাঠানো হয়নি। এই সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান নৌবাহিনী প্রধান ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার।
বাংলাদেশ মূলত জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ অনুসারে সমুদ্রপথে বেসামরিক জাহাজের চলাচলের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। এর আগে কখনো বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্র অথবা গোষ্ঠির বিরুদ্ধে কাজ করার কথা বলেনি। এই প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বললেন, সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিদের বিরুদ্ধে কাজ করবে বাংলাদেশ।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত নৌপথ সুয়েজ খালে প্রবেশের মুখে এবং ভারত মহাসাগরে অবস্থান হওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইয়েমেনের গুরুত্ব বিশাল। সে কারণেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, ইসরায়েল ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তার করতে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখে। দেশটির একেক অঞ্চলের শক্তিকে একেক দেশ অর্থ ও অস্ত্র প্রদানসহ রাজনৈতিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন আসে, হুতি বিদ্রোহী কারা, এদের শক্তি কোথায়, এদের অবস্থান কোথায় এবং এই বিদ্রোহী গোষ্ঠি কী সমস্যা সৃষ্টি করছে।
হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের জায়দি শিয়া গোষ্ঠির একটি আন্দোলন, যারা দেশটির কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডে এবং দেশের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের দুই ভাগ অঞ্চলে বসবাস করে। ১৯৯০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত এই গোষ্ঠি ২০১৪ সালে সৌদি-সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা গ্রহণ করে। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতি মনসুর হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেয় ইরান। এরা ইরানের অন্যতম প্রক্সি বাহিনী।
প্রশ্ন আসতে পারে, ইরান কেন তাদের সমর্থন দেয়। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামপন্থীরা পশ্চিমাদের সমর্থিত রেজা শাহ পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে মার্কিন অবরোধ মোকাবিলা করছে ইরান। দেশটি জানে, আমেরিকা, ইসরায়েল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সুযোগ পেলেই তাদের ধ্বংস করে দেবে। নিজেদের রক্ষা করতে শিয়া ইরানের সরকার পুরো পশ্চিম এশিয়ায় বিভিন্ন সামরিক প্রক্সি বাহিনী গঠন করে ঘিরে রেখেছে।
ইরাকে তাদের কমপক্ষে পাঁচ লাখ প্রশিক্ষিত মিলিশিয়া সেনা রয়েছে, যাদের মাসিক বেতন দেয় ইরান। এদের দিয়ে ইরাক, কুয়েত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখে ইরান। ফিলিস্তিনে হামাস বাহিনী এবং লেবাননে হিজবুল্লাহকে সমর্থন দেয় ইরান। এই সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তারা ইসরায়েলকে চাপে রাখে এবং ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সব প্রকার সহায়তা দেয় তেহরান। এই প্রক্সি গ্রুপগুলো ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল।
আলোচনার টেবিলে এই সব প্রক্সির প্রতি সমর্থন না দিতে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে তারা হুতি বিদ্রোহীদের কোনোভাবেই ধ্বংস করতে পারছে না।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে হুতিদের বিরুদ্ধে কাজ করার কথা বলাটা বাংলাদেশের জন্য কতটুকু বিপজ্জনক, সেটি বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সামরিকভাবে প্রচণ্ড চাপে রেখেছে হুতি বাহিনী। দেশ দুটি হুতিদের সঙ্গে পেরে উঠছে না। সৌদি আরবসহ ৪৩টি দেশের সামরিক প্রতিনিধি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা এই জোটে অংশ নিলেও বাংলাদেশসহ মাত্র ১৪টি দেশ যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। অন্য দেশগুলো বুঝেছে, এর বিপত্তিগুলো কী হতে পারে।
হুতি বিদ্রোহী এবং ইরান বাংলাদেশের কোনো বাণিজ্যিক অথবা সামরিক জাহাজে আক্রমণ করেনি অথবা স্বার্থহানি করেনি। এই অবস্থায় সৌদি আরবের নেতৃত্বে এই জোটে যোগ দিয়ে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কাজ করার অর্থ হলো তাদের খেপিয়ে দেওয়া। সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গেও সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে বাংলাদেশকে। সরকারের উচিত হবে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদের বিধান অনুযায়ী বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা। তবে কোনোভাবেই হুতি বিদ্রোহী অথবা ইরানকে লক্ষ্য করে কিছু করা আমাদের উচিত হবে না। অথবা সামরিক কোনো জোটে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া সঠিক কাজ হবে না।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের জন্য ইরানের অর্থ আদায়ের ব্যাপারে তাদের যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু সেটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে জানাতে হবে। কারণ হরমুজ প্রণালিতে সমস্যার কারণে বাংলাদেশের মতো অনেক জ্বালানি আমদানি-নির্ভর দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে। উপরন্তু, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের জন্য অর্থ আদায় করা হলে সেটি দিনশেষে সাধারণ মানুষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ ব্যাপারে ইরানকে স্পষ্ট জানিয়ে দিতে হবে।
কামরান রেজা চৌধুরী পেশায় সাংবাদিক–সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন তিন দশক ধরে। ই-মেইল: kamran.reza@gmail.com
