Published : 29 Nov 2025, 09:45 PM
সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের দাবি ও অধিকার প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি কম থাকায় জাতির সামনে বঞ্চনার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। যে কোনো আন্দোলন বিশেষ করে পেশাভিত্তিক কোনো আন্দোলনের সফলতা নির্ভর করে তার যৌক্তিকতার ওপর। যুক্তিগ্রাহ্য আন্দোলন হলে সেটা সহজেই সাধারণ মানুষের সমর্থন পায়। এমনিতেই মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে নানা মহলে অনেক বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে আছে। এসব বিভ্রান্তি দূর করার জন্যই এই লেখা।
আমরা বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি-বাসমাশিসের পক্ষ থেকে ৪টি দাবি ও অধিকার নিয়ে সরকারকে তিন কর্মদিবস সময় দিয়ে ১ ডিসেম্বর থেকে আন্দোলনে যাচ্ছি যদি সরকার আমাদের নায্য দাবি ও পাওনাগুলোকে মেনে না নেয়। সারা বাংলাদেশের সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আমাদের ৪টি দাবি হলো:
১. এন্ট্রিপদ ৯ম গ্রেড ধরে বিসিএস(মাধ্যমিক) পদসোপানসহ স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন
২. ২০০১-২০১২ ব্যাচ পর্যন্ত সকল শিক্ষকবৃন্দের টাইমস্কেল-সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ প্রদান
৩. সকল শূন্য পদে সিনিয়র শিক্ষক, সহকারী প্রধানশিক্ষক, প্রধানশিক্ষক, জেলা শিক্ষা অফিসার, সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতি ও পদায়ন
৪. বিএড-এমএড পেশাগত ডিগ্রি অর্জনের জন্য অবিলম্বে ২-৩টি অগ্রিম বর্ধিত বেতনের মঞ্জুরি আদেশ প্রদান
এই দাবিগুলোর মাঝে আমাদের নায্য পাওনাও রয়েছে।
৯ম গ্রেড ও স্বতন্ত্র অধিদপ্তর কেন?
২০০৩ সালের 'ড. মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশন' ও '২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি'তে স্পষ্টভাবেই স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কথা উল্লেখ আছে। বর্তমানে শিক্ষার ৩ স্তম্ভ কারিগরী শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নামে আলাদা ৩টি অধিদপ্তর রয়েছে। অথচ শিক্ষার দুটি বড় স্তম্ভ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক মিলে রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর-মাউশি। সেই অধিদপ্তরে মাধ্যমিকের কর্মকর্তা মাত্র ৩জন!
এসব বিবেচনা করে মাধ্যমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে বর্তমান সরকার স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা জানি সেই কর্মপত্রের প্রস্তাবে প্রধান উপদেষ্টা লিখিত সম্মতি প্রদান করেছেন। এরপরও প্রজ্ঞাপন হচ্ছে না। এতে মাধ্যমিক শিক্ষকদের মাঝে সন্দেহ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যই আমরা কর্মসূচি দিয়েছি।
একই সাথে সরকারি মাধ্যমিককে বিসিএস (মাধ্যমিক) ৯ম গ্রেড ধরে পদসোপান না করলে এর সুফল মাধ্যমিক শিক্ষকগণ পাবেন না। কারণ পরিচালক পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষকদের যেতে হলে অবশ্যই পদসোপান লাগবে। বিদ্যমান নীতিমালা অনুসারে যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিসিএস (মাধ্যমিক) নতুন কোনো বিষয় নয়। নতুন নীতিমালারও প্রয়োজন নেই।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের দুটি উইং আছে। একটি কলেজ উইং অপরটি স্কুল উইং। স্কুল উইংয়ে মাধ্যমিকদের জন্য ১০০৮টি পদ বিদ্যমান কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। তাই বিসিএস মাধ্যমিক শিক্ষা ক্যাডার করাটা অযৌক্তিক কিছু নয়।
এখন বিসিএস নন-ক্যাডার শিক্ষক সরকারি মাধ্যমিকে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ হচ্ছে। এই বিষয়টা ভেবে দেখার জন্য আমরা সরকারকে অনুরোধ জানাই। ইতোমধ্যেই এন্ট্রিপদ ৯ম গ্রেড ধরে আমরা মন্ত্রণালয়ে পদসোপান জমা দিয়েছি।
এছাড়াও আমাদের সাথে যারা ১০ম গ্রেডে ছিলেন যেমন, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার, পিটিআই ইনস্ট্রাক্টর, সাব রেজিস্ট্রার তাদের এন্ট্রিপদও ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররাও আন্দোলন করছেন। প্রাইমারির প্রধানশিক্ষক পদটিকে সরকার ১০ম গ্রেডে উন্নীত করেছেন। তাই আমাদের ৯ম গ্রেড চাওয়া শতভাগ যৌক্তিক। আমরা আমাদের নায্য দাবির পক্ষেই আন্দোলনে যাচ্ছি।
২০০১–২০১২ ব্যাচের বকেয়া টাইমস্কেল গ্রেড
আমরা সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা ২০০১-২০০৬ ব্যাচ পর্যন্ত গত সরকারের আমলে আমাদের বকেয়া টাইমস্কেল-সিলেকশন গ্রেডের আবেদন করি। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে ডিপিসি মিটিংয়ে আমাদের প্রাপ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়৷ এরপর আমরা এ নিয়ে মামলা করি যার আপিল বিভাগের রায় আমাদের পক্ষে প্রদান করে। মামলায় ২০১১ ব্যাচের শিক্ষকরাও আছেন। তাই ২০০১-২০১২ ব্যাচ পর্যন্ত টাইমস্কেল-সিলেকশন গ্রেড দিতে আইনগত কোনো বাধা আর নেই। এই রায়ের পর মাউশি আমাদের ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে শুধু আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্কুল ছুটির পর বহুদিন মন্ত্রণালয়ে গিয়েছি কিন্তু এরপরও মঞ্জুরি আদেশে বিলম্ব হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন সচিব মহোদয় ইতোমধ্যেই ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন বলে ঘোষণা করেছেন। এ অবস্থায় শিক্ষকদের মনে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে যে , এরপর আর সহজে পাওয়া যাবে কী-না। কারণ তখন সবাই নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবেন। তাই আমরা চাই সরকার আমাদের প্রতি সদয় হয়ে অবিলম্বে আমাদের বকেয়া নায্য পাওনার মঞ্জুরি আদেশ প্রদান করবেন। কারণ এটা আমাদের নায্য বকেয়া পাওনা।
শূন্য পদে পদোন্নতি ও পদায়ন
আমাদের সরকারি মাধ্যমিকে ৮০০ এর উপরে বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী প্রধাশিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নেই। সিনিয়র শিক্ষকদের চলতি দায়িত্ব দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান চালানো হচ্ছে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে ভালভাবে পরিচালনার জন্য তাদের দ্রুত বিধি সংশোধন করে পদায়ন দরকার। ইতোমধ্যেই এই পদগুলো শূন্য থাকার কারণে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের বিধিবহির্ভূত কর্মকান্ড পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারা এসব পদগুলো দখলে নিতে চাচ্ছেন। এই পরিকল্পনায় আমাদের দুইজন সহকারী প্রধান শিক্ষক(ভারপ্রাপ্ত) শিক্ষকসমাজের বিরাট অংশকে অন্ধকারে রেখে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যও উঠে পড়ে লেগেছেন। আমরা এসবেরও বিরোধিতা করছি। অবশ্যই বিদ্যমান বিধিমোতাবেক এসব পদে ২০ শতাংশ সরাসরি এবং ৮০ শতাংশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের মধ্য থেকে পদায়ন করার যে বিধান এর বাইরে গেলে আমরা তা মেনে নেব না। আমাদের দাবির ভেতর এই বিষয়ও রয়েছে।
২০১০ সালের ভূতাপেক্ষা পদোন্নতির ফাইল অনেকদিন ধরে মন্ত্রণালয়ে। তারা ১৫ বছর ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত। ১০ম গ্রেডের সর্বশেষ ধাপে তারা অবস্থান করছেন। এখনই পদোন্নতি না হলে তাদের বেতন নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এসবের কোনো কূল-কিনারা হচ্ছে না। ২০১১ ও ২০১২ ব্যাচের পদোন্নতিও হচ্ছে না ১৪ বছর ধরে। এসব বঞ্চনার কারণে তারা সংক্ষুব্ধ। তাদের নায্য অধিকার হলো ৮বছরে পদোন্নতি। গ্রেডেশন লিস্ট থাকা ও মামলার বিষয়টি সুরাহা হওয়ায় সরকার ইচ্ছে করলেই পদোন্নতি দিতে পারেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এজন্যই আমরা বলেছি অবিলম্বে সকল শূন্য পদে পদোন্নতি ও পদায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
পেশাগত ডিগ্রির জন্য অগ্রিম বর্ধিত বেতন
২০১৫ সালের পর যেসব শিক্ষকরা যোগদান করেছেন তাদের পেশাগত ডিগ্রি অর্জনের জন্য ২-৩টি অগ্রিম বর্ধিত বেতন মঞ্জুর করা হচ্ছে না। ২০১৫ সালের পে-স্কেলে তা রহিত করা হয়েছে। আমাদের দাবি তা পুনর্বহালের। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে এখনও তা দেওয়া হচ্ছে (যেমন ডাক্তার, পলিটেকনিকের শিক্ষক ইত্যাদি)।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে এ ধরনের বৈষম্য সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। পেশাগত ডিগ্রি অর্জনের জন্য এক ডিপার্টমেন্ট পাবে অন্যরা পাবে না, তা হতে পারে না। তাই আমরা এটিও পুনর্বহালের দাবি তুলেছি এবং অবলম্বে এ সংক্রান্ত মঞ্জুরি আদেশ প্রদান করার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
এই হলো সংক্ষেপে আমাদের ৪দফা দাবির যৌক্তিকতা।
আমরা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেক ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছি। প্রায় সকল ডিপার্টমেন্ট যেখানে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন করেছে তখন আমরা বিরত ছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম সরকার আমাদের দাবিগুলোও মেনে নেবেন।
এর জন্য আমরা ইতোপূর্বে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টাকে স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। সারাদেশে মানববন্ধন করে দাবিগুলো জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের দাবির প্রতি কোনো কর্ণপাত করা হয়নি। আমাদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে। দীর্ঘ বঞ্চনার পর আর সইতে না পেরে আমরা সারাদেশের সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকবৃন্দ একত্র হয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে এই ৪টি দাবি নিয়ে চূড়ান্ত কর্মসূচি দেই।
৩০ নভেম্বরের ভেতর এসব দাবি না মানা হলে আমরা ১ ডিসেম্বর থেকে লাগাতার কর্মবিরতিতে যাবো। এছাড়া সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের আর কোনো উপায় নেই। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
ইতোমধ্যে বেসরকারি মাধ্যমিকদের শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, প্রাইমারি প্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে, সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের দাবির প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রস্তাব গিয়েছে। তাই আমরাও বিশ্বাস করি এই বৈষম্যহীন সরকার আমাদের দাবিগুলোকে মেনে নিয়ে আমাদের দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটাবেন এবং সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের হৃদয়ে সারাজীবনের জন্য স্থান করে নেবেন।
অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ, বিভ্রান্ত হবেন না। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হোক আমরা তা চাই না। সাময়িক ক্ষতি হলে আমরাই আবার সেই ঘাটতি পূরণ করব। আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন। পাশাপাশি আমাদের বিষয়গুলো অনুধাবন করে আমাদের যৌক্তিক আন্দোলনকে সমর্থন দিন। পাশে থাকুন। যেকোনো বিষয় নিয়ে আমাদের শিক্ষকদের সাথে কথা বলুন। জানুন আমাদের বঞ্চনার ইতিহাস। আমরা দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদদের আমাদের ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে দাঁড়াতে উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।