Published : 20 Aug 2026, 04:08 PM
ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল কেবল চিকিৎসা সেবার একটি পুরোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত না, এর দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের শ্রম ও জীবন। হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা, বর্জ্য অপসারণ, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং প্রতিদিনের স্বাস্থ্যসম্মত কার্যক্রম সচল রাখার পেছনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাজ করেছেন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। সেই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর বহু পরিবার প্রায় ১৬৮ বছর ধরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের মিনিয়াডস কোয়ার্টারে বসবাস করছেন।
নতুন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য তাদের আবাসন খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ বিকল্প আবাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা এখনো সামনে আসেনি। ফলে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আড়ালে আবাসন, জীবিকা, মর্যাদা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার গুরুতর প্রসঙ্গ সামনে এসেছে।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত নোটিশ অনুসারে, আগামী ৩০ অগাস্টের মধ্যে মিনিয়াডস কোয়ার্টারসহ সংশ্লিষ্ট ভবন খালি করতে হবে। পরদিন, ৩১ অগাস্ট বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও বলা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০ সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ভবন অপসারণের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাসা খালি না করলে পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির দায় বসবাসকারীদের ওপর বর্তাবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা ছাড়া কলোনি খালি করার নির্দেশের প্রতিবাদে ও নিরাপদ বাসস্থানের দাবিতে রাজপথে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের মানববন্ধন।
প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাসপাতালের সম্প্রসারণ, নতুন ভবন নির্মাণ এবং পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণের প্রয়োজন থাকতে পারে। জনস্বার্থে হাসপাতালের আধুনিকায়নও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের পরিকল্পনা যখন বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ির ওপর এসে পড়ে, তখন বিষয়টিকে শুধু নির্মাণ প্রকল্পের হিসাব দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। কতগুলো ভবন ভাঙা হবে, কোথায় নতুন স্থাপনা উঠবে, কত দিনের মধ্যে জায়গা বুঝিয়ে দিতে হবে, এসবের পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী মানুষ কোথায় যাবেন, তাদের সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে চলবে, কর্মস্থলের সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে বজায় থাকবে, প্রবীণ ও শিশুদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, এসবও পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।
মিনিয়াডস কোয়ার্টারের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে বসবাসের বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রায় ১৬৮ বছর কোনো পরিবারের কাছে সাময়িক বসবাসের সময়কাল হতে পারে না। এত দীর্ঘ সময়ে কয়েক প্রজন্ম জন্মেছে, বড় হয়েছে, কাজ করেছে, সংসার গড়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে। একটি জনপদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল জমি ও ভবনের মধ্যে সীমিত থাকে না। সেখানে গড়ে ওঠে সামাজিক সম্পর্ক, স্মৃতি, সংস্কৃতি, পারস্পরিক সহায়তার কাঠামো এবং কর্মজীবনের নিজস্ব পরিসর। সেই জায়গা থেকে হঠাৎ সরে যাওয়ার নির্দেশ তাই কয়েকটি ঘর ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে মানবিক বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই পরিবারগুলোর জীবিকার সঙ্গে হাসপাতালের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
হরিজন সম্প্রদায়ের বহু মানুষ ঐতিহাসিকভাবে পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত। শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সচল রাখতে তাদের শ্রম প্রতিদিন প্রয়োজন হয়, অথচ তাদের জীবনমান, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা বহু সময় রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার প্রান্তেই থেকে যায়। যে মানুষ হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখেন, সেই মানুষকেই যদি পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা ছাড়াই হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে উন্নয়নের মানবিক চরিত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
চার প্রজন্মের বসবাস আর হাজারো স্মৃতির ঠিকানা; উচ্ছেদের নোটিশে যেকোনো মুহূর্তে গুঁড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় হরিজনদের এই ঠিকানা।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে বাসস্থানের কথা রয়েছে। ১৯ অনুচ্ছেদ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে। ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার অধিকার নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবাসন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাদের সামাজিক অবস্থান, জীবিকা এবং পুনর্বাসনের বাস্তবতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতেও পর্যাপ্ত আবাসন মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১১ অনুচ্ছেদ পর্যাপ্ত জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে আবাসনের অধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। উচ্ছেদের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া, আগাম আলোচনা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অংশগ্রহণ এবং কার্যকর বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা মানবাধিকার সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে কোনো মানুষ যেন গৃহহীন হয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়। এখানে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণাটিও বিশেষ উদ্বেগজনক। আবাসন নিয়ে বিরোধ চলমান থাকা অবস্থায় জরুরি নাগরিক সেবা বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারগুলো কার্যত বসবাসের অযোগ্য পরিবেশে পড়ে যেতে পারে। শিশু, নারী, প্রবীণ, অসুস্থ ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধী সদস্যদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সেবা বিচ্ছিন্ন করা হলে প্রশাসনিক চাপের মাধ্যমে মানুষকে স্থানত্যাগে বাধ্য করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে মানবিক প্রভাব যাচাই করা জরুরি।
সরকার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সামনে কার্যকর সমাধানের পথ রয়েছে। প্রথমে মিনিয়াডস কোয়ার্টারে বর্তমানে কত পরিবার বসবাস করছে, কতজন হাসপাতালের কর্মচারী, তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা কত, শিশু ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত, প্রবীণ ও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা কত, এসবের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এরপর বাসিন্দাদের প্রতিনিধি, হরিজন সংগঠন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পুনর্বাসন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা দরকার।
পুনর্বাসন বলতে শহরের দূরবর্তী কোনো স্থানে কয়েকটি ঘর বরাদ্দ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কর্মস্থলের দূরত্ব, যাতায়াত ব্যয়, শিশুদের বিদ্যালয়, চিকিৎসাসেবা, পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, সামাজিক পরিবেশ এবং নিরাপত্তা বিবেচনায় রাখতে হবে। কর্মরত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য হাসপাতালের কাছাকাছি আবাসনের ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জায়গা না থাকলে সরকারি অন্য জমি চিহ্নিত করে বহুতল আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। স্থায়ী আবাসন প্রস্তুত হতে সময় লাগলে অন্তর্বর্তী সময়ে নিরাপদ অস্থায়ী বাসস্থান এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা। তাদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের বক্তব্যের জায়গা থাকবে না, এমন প্রশাসনিক সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। উন্নয়ন মানুষের জন্য। ফলে উন্নয়নের কারণে যাঁদের জীবন সবচেয়ে বেশি বদলে যাবে, তাদের কথা শোনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত।
হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক আচরণের ইতিহাসেও বৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে তাদের শ্রম প্রয়োজনীয় হলেও সামাজিক মর্যাদা, আবাসন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তাঁরা বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। পেশাগত পরিচয় অনেক সময় তাদের সামাজিক অবস্থানকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই বৃত্তে আটকে রেখেছে। মিনিয়াডস কোয়ার্টারের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি হাসপাতালের জমি ব্যবস্থাপনার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। প্রান্তিক মানুষের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজ কী ধরনের আচরণ করবে, তার সঙ্গেও বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত।
মিটফোর্ড হাসপাতালের আধুনিকায়ন হোক, নতুন অবকাঠামো নির্মিত হোক, চিকিৎসাসেবার পরিসর বাড়ুক। একই সঙ্গে ১৬৮ বছর ধরে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত জনগোষ্ঠীর মাথার ওপর নিরাপদ ছাদও নিশ্চিত হোক। উন্নয়নের সুফল অর্জন করতে গিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীকে গৃহহীনতার দিকে ঠেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই ৩০ অগাস্টের সময়সীমা কার্যকর করার আগে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে লিখিত ও বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন পরিকল্পনা ঘোষণা করা প্রয়োজন। বিকল্প আবাসন প্রস্তুত হওয়ার আগ পর্যন্ত পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ সচল রাখাও জরুরি। ১৬৮ বছরের বসতি কয়েক সপ্তাহের নোটিশে মুছে ফেলা সহজ প্রশাসনিক পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবন এত সরল হিসাব মেনে চলে না। মিটফোর্ডের হরিজন পরিবারগুলোর ঘর রক্ষার প্রসঙ্গ শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক নাগরিক মর্যাদার প্রসঙ্গ। হাসপাতালের নতুন ভবনের পাশাপাশি রাষ্ট্র যদি তাদের জন্য নিরাপদ আবাসনের নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে, তাহলেই উন্নয়ন ও মানবিক দায়িত্ব একই পথে এগোতে পারবে।
শাহেদ কায়েস কবি ও মানবাধিকার কর্মী। ই-মেইল: shahedkayes@gmail.com