১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

এই সরকার কি সত্যিই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করতে পারবে?

অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আর মব-সন্ত্রাসের শঙ্কা—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ফেব্রুয়ারিতে আদৌ অবাধ-সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন সম্ভব কিনা?

এই সরকার কি সত্যিই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করতে পারবে?
অস্থির সময়, ভঙ্গুর আস্থা ও ফেব্রুয়ারির নির্বাচন—বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সামনে বড় পরীক্ষা।

আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Sep 2025, 11:04 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:14 PM

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনপরিসরে কয়েকটি ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে।

১. আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে নির্বাচন হবে না।

২. ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নির্বাচন বানচাল বা অনিশ্চিত করার চেষ্টা করবে, যাতে দেশে-বিদেশে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করা যায় এবং এর মধ্য দিয়ে দেশ আরও বেশি নৈরাজ্যের দিতে ধাবিত হয়।

৩. ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। বিশেষ করে নির্বাচন হলে যাদের বর্তমান ক্ষমতাকাঠামো থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা আছে এবং অভ্যুত্থানের পরে যারা নিজেদের দলীয় ও সাংগঠনিক আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নকে উত্তম সময় বলে মনে করছে, তারা নির্বাচন বানচালের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

৪. যদি এটা ধরেই নেওয়া হয় যে, একটি অবাধ-সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে বিএনপি সরকার গঠন করবে এবং নির্বাচন না দিয়ে উপায় নেই, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য স্টেকহোল্ডার এমনকি বিদেশি শক্তিগুলোর মধ্যস্থতায় বিএনপির সঙ্গে অন্য বড় দলগুলো, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আসন ভাগাভাগির অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা হবে।

৫. ওপরের কোনো কিছুই যদি সত্য না হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকার যদি যে কোনো মূল্যে ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যেতে বদ্ধপরিকর হয়, সেক্ষেত্রে এটি কেমন নির্বাচন হবে তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। কেননা গত এক বছর ধরে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের যে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে এবং সংস্কারের নামে এক বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পরেও রাষ্ট্রের মৌলিক জায়গায় কতটুকু সংস্কার করতে পারল, তা নিয়ে যেহেতু যথেষ্ট প্রশ্ন আছে, ফলে এরকম সক্ষমতা আর দক্ষতা নিয়ে তারা একদিনে ৩০০ আসনে শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করে ফেলতে পারবে—সেটি বিশ্বাস করা কঠিন। যে কারণে অনেকেই মনে করেন, এটিও হয়তো দেশের ইতিহাসে আরেকটি খারাপ নির্বাচনের নজির তৈরি করবে; সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন হবে; দুয়েকটি বড় দল নির্বাচন বয়কট করবে—সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে ওই নির্বাচনটিও গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। উপরন্তু ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারকে শুরু থেকেই নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তারা হয়তো বেশিদিন দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।

একটি বিরাট অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে সরকারটি গঠিত হলো, তার নেতৃত্বে আছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী এমন একজন মানুষ যিনি সারা বিশ্বেই সম্মানিত। ফলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তিনি সকল পক্ষের মধ্যে একটা ঐক্য স্থাপন করে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু এই প্রত্যাশাটি দ্রুতই ফিকে হয়ে আসতে থাকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো কোনো স্টেকহোল্ডারের আচরণ, বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলকরণ তথা ট্যাগ দিয়ে মব সৃষ্টি করে দেশে একটা নৈরাজ্য ও ভীতির পরিবেশে তৈরির কারণে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অনেকেই দেশের সম্মানিত মানুষ। কর্মজীবনে তাদের কেউ কেউ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। কিন্তু গত এক বছরে প্রশাসনসহ কোনো জায়গায় তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে পেরেছেন বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনিয়ম দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমেছে—তাদের পক্ষে সেই দাবি করা কঠিন। বরং কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে বলে শোনা যায়।

এই সরকার গত এক বছরে মব সন্ত্রাসই পুরোপুরি থামাতে পারেনি। এমনকি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বারবার হুঁশিয়ারি দেওয়া সত্ত্বেও মবকারীরা তা পাত্তা দিচ্ছে বলে মনে হয় না। সুতরাং, এই মবগোষ্ঠী আগামী নির্বাচনে বড় ধরনের হুমকি তৈরি করবে বলে অনেকেরই শঙ্কা। এমনকি আগামী নির্বাচনে মব যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, তা নিয়ে শঙ্কিত মার্কিন দূতাবাসও। গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্র্যাসি এন জ্যাকবসন নির্বাচনের সময় ‘মব’-এর প্রভাব এবং কমিশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চান। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, “জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের নির্বাচন একযোগে অনুষ্ঠিত হবে। এতে করে যারা মব সৃষ্টি করেন, তাদের শক্তি ভাগ হয়ে যাবে এবং নির্বাচনের সময় তারা সুবিধা করতে পারবেন না।”

বাস্তবতা হলো, সারা দেশে একদিনে ৩০০ আসনে নির্বাচন হবে এবং প্রতিটি জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে রাষ্ট্রের সকল বাহিনীর শতভাগ সদস্যকেও যদি নির্বাচনি কাজে নিয়োগ করা হয়, তারপরও প্রতিটি জায়গায় নজরদারি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ক্যান্টনমেন্ট ফাঁকা করে সব সেনা সদস্যকে নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োগও বাস্তবসম্মত নয়।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা  জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, আগামী নির্বাচনে পুলিশ ও আনসারের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ৮০ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে। কিন্তু প্রায় ২০ কোটি মানুষ আর ১২ কোটি ভোটারের দেশে; বিশেষ করে রাজধানী থেকে দূরবর্তী এলাকা, উপকূল, চরাঞ্চল তথা যেসব জায়গা দ্রুত পৌঁছানো কঠিন—সেসব জায়গায় যদি কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি করে ভোট বানচালের চেষ্টা করা হয়, সরকার সেটি কীভাবে সামাল দেবে? আবার কখন কোথায় মব তৈরি করা হবে, সেটি ধারণা করাও সম্ভব নয়। সুতরাং কোনো একটি আসনের দুয়েকটি এলাকায়ও যদি মব তৈরি হয়, তার প্রভাব পুরো আসনেই পড়বে।

গত ৩১ অগাস্ট আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন বানচালের জন্য চেষ্টা করছে। এটা প্রতিহত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দল, জনগণ সবার। এর দুদিন পরে ২ সেপ্টেম্বর কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক শেষে তার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হচ্ছে—এমন ইঙ্গিত দেন।

প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে যাতে নির্বাচন না হয়। এগুলোর কিছু কিছু লক্ষণ এখন দেখা যাচ্ছে। সামনে আরো আসবে। এজন্য আমাদের আরো সতর্ক হতে হবে। আমাদের চেষ্টা হবে নির্বাচন করার এবং নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচিত সরকারের হাতে আমরা ক্ষমতা হস্তান্তর করব।”

আবার এই মুহূর্তে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর সবাই নির্বাচন ইস্যুতে অভিন্ন সুরে কথা বলছে না। বরং কেউ কেউ নতুন সংবিধান লেখার জন্য আগে গণপরিষদ নির্বাচন চায়, কেউ চায় পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন। কোনো কোনো দল মনে করে নির্বাচনের পরিবেশ নেই। একটি দলের একজন শীর্ষ নেতা সম্প্রতি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। এই যখন পরিস্থিতি, তখন শুধু সরকার ও নির্বাচন কমিশন চাইলেই ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হয়ে যাবে—বিষয়টা এত সহজ নয়। কেননা নির্বাচন কেমন হবে, সেটি শুধু সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। নির্বাচনের প্রধান স্টেকহোল্ডার রাজনৈতিক দলগুলো। তারা যদি অবাধ-সুষ্ঠু ও ভালো নির্বাচনের জন্য সরকার ও ইসিকে সহযোগিতা না করে, তাহলে শুধু আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

তাহলে কী হতে পারে? রাজনীতির মাঠে এরকম আলোচনাও আছে যে, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে না। বরং নির্বাচনের আগে আরও এক বা একাধিক সরকার গঠিত হতে পারে। সবশেষ বুধবারও ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ নিয়ে আলোচনায় এই ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন।

তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে কোনো দৃঢ়তা নেই। লোভের কারণে ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পথে। আগামী নির্বাচনের আগেই গোটা দুয়েক সরকার আসতে পারে। যেভাবে বাহুবলী ওয়ান, টু, থ্রি সিক্যুয়েল আছে, তেমনি হয়তো দেখা যাবে ইউনূস গভর্নমেন্ট ওয়ান, টু।”

আলোচনায় আছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টিও। সংবিধানের যে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে এই বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, এটি ফিরিয়ে আনা-সম্পর্কিত মামলার রিভিউ শুনানি হওয়ার কথা আগামী ২১ অক্টোবর। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ফিরে এলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবর্তে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। যদি ওই সরকারটি নভেম্বরেও গঠিত হয় এবং তাদের মেয়াদ যদি হয় তিন মাস, তাহলেও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে তাদের অধীনে নির্বাচন করা সম্ভব।

পরিশেষে, একটি নির্বাচন কেমন হবে তার পুরোটা নির্ভর করে ওই সরকার কী চায় এবং সরকার কতটা শক্তিশালী তার ওপর। ইনটেনশন বা নিয়ত ভালো থাকলেও দুর্বল সরকারের পক্ষে সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়। কেননা সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই নির্বাচন ভণ্ডুল করার চেষ্টা করতে পারে। সেই অপশক্তি প্রতিহত করার মতো সক্ষমতা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আছে কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সংশয় প্রকাশ করছে।

মনে রাখা দরকার, সরকার শক্তিশালী না হলে নির্বাচন কমিশনও শক্তিশালী হয় না। দুর্বল সরকার অথচ কমিশন শক্তিশালী—এটা অবাস্তব। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশন যদিও স্বাধীন, কিন্তু তারপরও সে একা নিজের মতো সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তার সকল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন। সিইসি ও কমিশনাররা খুব দক্ষ, আন্তরিক দেশপ্রেমিক, দলনিরপেক্ষ—কিন্তু মাঠপর্যায়ে যারা নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবেন, যেমন রিটার্নিং কর্মকর্তারা অসৎ ও দলবাজ; প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা অদক্ষ ও ভীত; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গা ছাড়া ভাব; সমরিক বাহিনীও তৎপর নয়—এমন যদি পরিস্থিতি হয় তাহলে সরকারে থাকা ১০ জন ভালো উপদেষ্টা আর নির্বাচন কমিশনে বসে থাকা পাঁচ জন ভালো মানুষের পক্ষে শেষমেষ ভালো নির্বাচন করা অসম্ভব। কেননা পুরো কাজটি টিমওয়ার্ক। গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে এই টিমওয়ার্কের ঘাটতিই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।