নিউ ইয়র্কের অবিশ্বাস্য ম্যাজিক: আমেরিকার স্বর্গ রাষ্ট্রে শ্রমিক থেকে বিলিয়নিয়ার

মোস্তফা সারওয়ারমোস্তফা সারওয়ার
Published : 19 April 2022, 02:25 PM
Updated : 19 April 2022, 02:25 PM

স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেড নির্মাণ শ্রমিক থেকে হয়েছিলেন বিলিয়নিয়ার। শুধু তাই নয়, তিনি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণাঢ্য প্রেসিডেন্টের পিতা। ফ্রেড এর জীবন কাহিনী এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যান। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, আইনের ফাঁক-ফোকরের সূক্ষ্ম ব্যবহার, দক্ষ শো-ম্যানশিপ, উপরি প্রদানে সিদ্ধহস্ত, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, আসবপানবিমুখ অথবা মদ্যাদি-পান-পরিহারকারী, এমনি বিচিত্র মানবিক গুণ ও কুটিলতায় পরিপূর্ণ জীবনে ফ্রেড হলেন অদ্ভুত খিচুড়ি অথবা নিউ অর্লিয়েন্স এর নামজাদা গামবো সুপ।     

১৯১৮ সালের ২৯ মে ফ্রেড তার পিতা ফ্রিডের সাথে নিউ ইয়র্ক কুইন্সের জামাইকা অ্যাভিনিউতে হাঁটছিলেন। হঠাৎ ফ্রেড অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরদিন ৩০ মে তিনি মাত্র উনপঞ্চাশ বছর বয়সে অতিমারী স্প্যানিশ ফ্লু (Spanish Flue) রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ফ্রেড তখন মাত্র বারো বছর বয়সের এক বালক। বিধবা জননী এলিজাবেথ অপ্রাপ্ত বয়স্ক বড় মেয়ে এলিজাবেথ জুনিয়র এবং ছোট দুই ছেলে ফ্রেড এবং জনকে নিয়ে সংসারের হাল ধরেন। স্বামী রেখে গেছেন কুইন্সের উডহ্যাভেনে একটি মধ্যবিত্ত বাসভবন, কিছু জমি, ভাড়া দেওয়া বসত বাড়ি, এবং অন্যান্য সম্পদ মিলে সর্ব-সাকুল্যে প্রায় পাঁচ লাখ ডলার (বর্তমান বাজার মূল্যে) এর সম্পদ।

এলিজাবেথ ট্রাম্প সদ্য প্রয়াত স্বামীর আবাসন ব্যবসা খুবই যোগ্যতার সাথে চালিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মিতব্যয়ী এবং সাবধানী। বড় ছেলে ফ্রেডকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলেন।   

বাবা জীবিত থাকার সময়ে ফ্রেড লেখাপড়ার সাথে সাথে খণ্ডকালীন কাজে যোগ দিয়েছিলেন। মাত্র দশ বছর বয়সে তার প্রথম খণ্ডকালীন চাকরি ছিল এক কসাইয়ের ডেলিভারি বয় হিসেবে। নিউ ইয়র্কে অবস্থিত কুইন্সের রিচমন্ড হিল হাই স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন ফ্রেড কাজ করেছেন গলফ খেলোয়াড়দের সাজসরঞ্জাম বহনকারী (ক্যাডী) হিসেবে, এবং  করেছেন রাস্তার কার্ভে (curve) চুনকামারীর কাজ। ১৯২৩ সালে হাই স্কুল পাশ করার পর ফ্রেডের চাকরি ছিল ঘোড়ার সহকারীর কাজ। এটা ছিল দারুণ কষ্টসাধ্য। নির্মাণ ঠিকাদারদের মালামাল বিশেষ করে কাঠ তিনি বহন করতেন ঘোড়ার মতো। এইসব কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি প্রাট ইনস্টিটিউট (Pratt Institute) এ প্লাম্বিং এবং রাজমিস্ত্রি কাজের শিক্ষা গ্রহণ করেন। ফ্রেড তরুণ বয়সে থেকেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় সিদ্ধহস্ত। পত্র-যোগে শিক্ষাদানের কোর্স (correspondence course) এ ভর্তি হয়ে, সেই যুগে তিনি বিদ্যুৎ-মিস্ত্রির কাজ শিখেছিলেন। প্রাট ইন্সটিটিউটে ছাত্র থাকাকালীন তিনি এক কাঠমিস্ত্রির শিক্ষানবিশি করেছিলেন। সোজা কথায় বলা যায়, ভবিষ্যতে আবাসন নির্মাণ ব্যবসায়ে যোগ দেওয়ার আগে এই ব্যবসার সকল খুঁটিনাটি বিষয়গুলো রপ্ত করেছিলেন নিষ্ঠার সাথে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কোন কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফ্রেড কোনও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন নি। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক মন্দায় এলিজাবেথ এর মালিকানাধীন জমির মূল্য কমে যায়। অন্যান্য উপার্জনও হ্রাস পায়। এমনি পরিস্থিতিতে একজন ঠিকাদারকে দিয়ে স্বামীর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির উপর আবাসন নির্মাণ করে নিজেই ক্রেতাদের ঋণ দিয়ে বিক্রি করতেন। ঋণের মাসিক আদায়কৃত অর্থ এবং সূচিকর্মের যৎসামান্য উপার্জন দিয়ে সংসারের খরচ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯২৪ সালে এলিজাবেথ তার ছেলে ফ্রেডকে ৮০০ ডলার ধার দিয়েছিলেন একটি গ্যারাজ তৈরির জন্য। নির্মাতা হিসেবে ফ্রেড তার প্রথম প্রকল্পের কাজটি প্রতিবেশীর জন্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছিলেন।

১৯২৫ সালে ফ্রেডের বয়স ছিল বিশ বছর। ওই বছর তার মা 'ই ট্রাম্প অ্যান্ড সান' নামে একটি আবাসন কোম্পানি গঠন করেন। মাত্র একুশ বছর বয়সে ফ্রেড বিশটি বাড়ি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। একটি বাড়ি নির্মাণ সমাপ্তির আগেই বিক্রি করে, সেই ডলারে আরেকটি বাড়ির তৈরির কাজ শুরু করে দিতেন। 'ধার-নির্মাণ-ধার' ফ্রেডের ওই ব্যবসায়ী মডেলটি এখনও তার ছেলে ডনাল্ড ট্রাম্প ও পৌত্র-পৌত্রীরা নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করছেন।

১৯৩৩ সালে ফ্রেড কুইন্সের উডহ্যাভেনে ট্রাম্প মার্কেট নামে এক আধুনিক সুপার মার্কেট নির্মাণ করে মালিক হিসেবে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। সেলফ সার্ভিস (self-service) মডেলে এটাও ছিল এক উদ্ভাবনী প্রবর্তন। প্রচুর লাভ নিয়ে মাত্র ছয় মাস পর ঊর্ধ্ব মূল্যে বিক্রি করে দেন। যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা বিক্রয়ের (Retail) ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রির মূল্য নির্ধারিত হয় নেট অপারেটিং আয়ের উপর। ঊর্ধ্ব মূল্য পাওয়ার কারণ ছিল প্রচুর আয় এবং সে তুলনায় কম ব্যয়।

কঠোর পরিশ্রমী ফ্রেড ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও ধূর্ত চালাকির জাদুকর। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের সময়ে  মহামন্দায় যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলো দারিদ্র, বেকারত্ব, এবং দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে বিপর্যস্ত; ঠিক তখনই ফ্রেড চমৎকার সুযোগ দেখতে পেলেন।  যে কোনও দুর্যোগের গহ্বরে লুকায়িত থাকে অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা ও সুযোগ। ১৯৩৪ সালে ব্রুকলিনে অবস্থিত লিরিনক্রাউস কর্পোরেশন নামে এক বন্ধকী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার সাবসিডিয়ারি বন্ধকী-সেবা দানকারী কোম্পানিকে আলাদা করে নিলামে বিক্রি করে দেয়। ফ্রেড তৎকালীন নিউ ইয়র্কে অসম্ভব শক্তিধর ডেমোক্রেটিক পার্টি বসদের ম্যানেজ করে অতি অল্প মূল্যে এটা কিনে নিয়েছিলেন। 

ব্রুকলিন কোর্টে তিনি ক্রয়ের নিমিত্ত যে বিড (bid) জমা দিয়েছিলেন, তাতে তার মর্টগেজ সেবা দানের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। কোর্টে ফ্রেড হাজির হয়েছিলেন যখন তুষার ঝড়ে ছয় ইঞ্চি বরফ জমে ছিল জমিনে। তিনি কৌঁসুলি ছাড়া নিজেই কোর্টে উপস্থিত ছিলেন। অন্য দরদাতা অথবা বিডাররা তুষার ঝড়ের জন্য কোর্টে আসেননি। শুধু তাদের কৌঁসুলিরা এসেছিলেন। এ থেকেই প্রমাণ মেলে যে, ফ্রেড এর কাছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোন ব্যাপারই নয়। যে কোনও বাঁধা প্রতিহত করে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে তিনি ছিলেন বদ্ধ পরিকর।

ফ্রেড পরে ওই কোম্পানিটি উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে দেন। কিন্তু তার চেয়েও চমকপ্রদ বিষয় হলো তিনি ওই কোম্পানি ক্রয়ের পর ওখানে রক্ষিত ঋণ গ্রহণকারীদের গোপন তথ্য জেনে নিলেন। বিশেষ করে মনোযোগী হলেন মন্দায় আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত এবং দেউলিয়া হওয়ার পথে ধাবিত আবাসিক রিয়েল এস্টেট সম্পর্কে। ওগুলোকে তিনি খুব কম দামে কিনে নিলেন। দেউলিয়া হয়ে সবকিছু হারাবার চেয়ে কম মূল্যে বিক্রি করে দেওয়াই ছিল বিপর্যস্ত মালিকের জন্য বাঞ্ছনীয়। নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভাল। ১৯৩২ সালে ৮ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন এফডিআর নামে পরিচিত ফ্রেডরিক ডিলানো রুজভেল্ট। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি কতগুলো সুদূরপ্রসারী আইন প্রণয়ন করেন। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র মহামন্দার তীব্র ছোবল থেকে রক্ষা পায়। 'নিউ ডিল' নামে তিনি শুরু করেছিলেন এক মহানির্মাণ কর্মযজ্ঞ। যাতে মন্দায় কর্মহীন বেকারদের কর্মসংস্থান ঘটে। ধীরে ধীরে অর্থনীতিতে আবার প্রাণ সঞ্চার হয়। ফ্রেড যে বাড়িগুলো নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করেছিলেন, সেগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেন।

আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত এবং নতুন অর্জিত পুঁজি নিয়ে ফ্রেড এবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন আবাসন নির্মাণের কর্মযজ্ঞে। কিন্তু বিশাল প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন অনেক অর্থ। কোথায় মিলবে সে অর্থ? প্রেসিডেন্ট ফ্রেডরিক ডিলানো রুজভেল্ট খুলে দিলেন সুযোগের রুদ্ধদ্বার। তিনি ১৯৩৪ সালে ফেডারেল হাউজিং অথরিটির আওতায় শুরু করলেন ঋণ ভর্তুকি (Loan Subsidy)। এবার আর ফ্রেড কে আটকাবে কে? ডেমোক্রেটিক পার্টির বসদের ম্যানেজ করে তিনি প্রায় সকলের আগে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তহবিল পেয়েছিলেন। ফ্রেড পরিকল্পিতভাবে ব্রুকলিনে অবস্থিত মেডিসন ডেমোক্রেটিক ক্লাবের টমি গ্রেইস (Tommy Grace) নামে এক ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক ফেরেববাজের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন [Ref:American Oligarchs by Andrea Bernstein, Pa 60-61]। টমি গ্রেইসের সহায়তায় ১৯৩০ সালে এফএইচএ (FHA) এর কাছ থেকে ফ্রেড পেলেন মরগেজ বীমা হিসেবে সাড়ে সাত লাখ ডলার। ব্রুকলিনের ইস্ট ফ্লাইবুশে সাড়ে ৪০০ বাড়ি নির্মাণ করা ছিল প্রকল্পের দায়িত্ব। ১৯৩৮ সালে তিনি পেলেন আরও দশ লাখ ডলার। 'ব্রুকলিন ঈগল' নামে এক পত্রিকা লিখেছিল, ফ্রেড ট্রাম্প হলো আবাসন নির্মাণ শিল্পের হেনরি ফোর্ড। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর উপকূলের জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলোর সন্নিকটে নৌবাহিনীর কর্মচারীদের জন্য ফ্রেড নির্মাণ করেছেন ব্যারাক এবং অ্যাপার্টমেন্ট। যুদ্ধের শেষে ৯০ লাখ ডলার এফএইচএ (FHA) তহবিল পেয়ে ১৯৪৭ সাল হতে ১৯৪৯ সালে পর্যন্ত ব্রুকলিনের বেনসনহার্স্টে ৩০ একর বিস্তীর্ণ জায়গায় তিনি নির্মাণ করেছেন বত্রিশটি ছয় তলা দালান। ১৯৫০ সালে এক কোটি ষাট লাখ ডলার এফএইচএ (FHA) তহবিল পেয়েছেন কনি আইল্যান্ডে চল্লিশ একরের উপর বিচ হ্যাভেন অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের জন্য। ১৯৬৩-৬৪ কনি আইল্যান্ডে সাত কোটি ডলার খরচ এ নির্মাণ করেছিলেন ট্রাম্প ভিলেজ। সর্বমোট সাতাশ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করেছিলেন ফ্রেড ট্রাম্প। নির্মাণ শিল্পে সত্যিকার তিনি হলেন হেনরি ফোর্ড। দশ বছরে বয়সে কসাইর ডেলিভারি বয় হতে শুরু করে ফ্রেড ট্রাম্প আমেরিকার স্বর্গরাষ্ট্রে হয়েছিলেন বিলিয়নিয়ার।

ফ্রেডের সফলতার মূলে ছিলেন একজন নারী। তারই একমাত্র সহধর্মিণী যুক্তরাষ্ট্রে অভিসংশিত স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী মেরি এন ম্যাকলিয়ড। স্বর্ণকেশী এই নারী যুক্তরাষ্ট্রের অভিশংসন দলিলে ভবিষ্যৎ পেশা হিসেবে লিখেছিলেন 'ঝি' অর্থাৎ বুয়া অথবা চাকরানি। গৃহ-কর্মী হিসেবে মেরি এন চাকরি পেয়েছিলেন ধনকুবের অ্যান্ড্রু কার্নেগির বাসভবনে। লাস্যময়ী মেরি এন অচিরেই কার্নেগীর সংসারে এক আপনজনের স্থানে নিজেকে উত্তরণ করেছিলেন। সত্যি বলতে আদমশুমারির ফরমে তার পরিচয় ছিল কার্নেগি সংসারের সদস্য হিসেবে। মহামন্দার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের এবং ক্ষমতাধর লোকদের সাথে মাখামাখির সুযোগ পেয়েছিলেন কার্নেগির প্রাসাদে।

১৯৩৫ সালে কুইন্সের এক নাচের আসর এ ফ্রেড ও মেরি অ্যান এর প্রথম দেখা হয়েছিল। প্রথম দর্শনেই প্রেম। মনে হয় কিউপিড প্রেমের তীর নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। লাস্যময়ী স্বর্ণকেশী মেরি অ্যান এবং লম্বা সুঠাম দেহী স্যুটেড-বুটেড উঠতি ধনকুবের ফ্রেড প্রথম দর্শনেই কিউপিডের তীর বিদ্ধ হয়েছিলেন। ওইদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ফ্রেড তাঁর মা কে বলেছিলেন যে, তিনি ভবিষ্যৎ সহধর্মিণীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন।

১৯৩৬ সালের ১১ জানুয়ারি ফ্রেড ট্রাম্প এবং মেরি অ্যান বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। তাদের ছিল সুখের সংসার। একে একে সংসারের এলো ম্যারিয়ান (মেয়ে), ফ্রেড জুনিয়ার (ছেলে), এলিজাবেথ (মেয়ে),  ডনাল্ড (ছেলে),  এবং রবার্ট (ছেলে)। ভবিষ্যতের যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড হয়ে উঠেছিলেন পিতার সবচেয়ে প্রিয়।

ফ্রেড ছিলেন পোশাক-পরিচ্ছদে কেতাদুরস্ত। প্রায়ই স্যুট টাই পরিধান করতেন। কখনও মদ অথবা কড়া পানীয় পান করতেন না। ছেলেমেয়েদের রাখতেন কড়া শাসনে। বাসায় গালাগালি করা ছিল অগ্রহণযোগ্য। মেয়েদের লিপস্টিক পরা ছিল নিষিদ্ধ।  হালকা জলখাবার অথবা স্নাকিং করা যেত না। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে স্ত্রীর কাছ থেকে ছেলেমেয়েদের দিনের কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি নিতেন। নিজের কোন কলেজ ডিগ্রি ছিল না। কিন্তু পাঁচ ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার জন্য চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেননি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক উঁচু ধাপে আরোহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রির, বিশেষ করে আইভি লীগ এর অন্তর্ভূক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভ করার উপকারিতা অনুধাবন করেছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী ফ্রেড। কিন্তু এক্ষেত্রে সফলতা ছিল সীমিত। তার বড় মেয়ে ম্যারিয়ান আইভি লীগের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এমএ লাভ করেছিলেন। পরে হফস্ট্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ক জেডি ডিগ্রি লাভ করেন। এক সময়ে ম্যারিয়ান ফেডারেল বিচারকের আসন অলংকৃত করেছিলেন। ফ্রেডের প্রিয় ছেলে ডনাল্ড ট্রাম্প স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছিলেন আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার বিখ্যাত ওয়ারটন স্কুল থেকে। ডনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ওয়ারটনে ভর্তি হতে পারেননি। ট্রান্সফার ছাত্র হিসেবে এসেছিলেন তৃতীয় বর্ষে। ফ্রেড ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে বড় ধরনের অনুদান দিয়েছিলেন। নৈতিক সততার ব্যাপারে ফ্রেন্ডের মাথা ব্যথা ছিল না। যেখানেই ডলার সাইন অথবা অর্জন, সেখানে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে হলেও ফ্রেন্ডের সেটা পেতেই হবে। ফ্রেডের পিতা ফ্রিডরিকের নৈতিকতাও ছিল নিম্নমানের। তৃতীয় প্রজন্মের ডনাল্ড ট্রাম্পও একই পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন। তার প্রেসিডেন্সির এক পর্যায়ে ওয়াশিংটন পোস্ট তাঁর মিথ্যা বলার হিসাব দিয়েছিল দুই হাজারের বেশি। 

ফ্রেড ট্রাম্প তার সাফল্যের জন্য অনেক অনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। সন্তানদের নামে ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে খুব কম মূল্য দেখিয়ে জমি সন্তানদের হস্তান্তর করতেন। জমির কম মূল্যের জন্য দান কর (gift-tax) ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নিতেন। ওই একই জমির দালানকোঠাগুলো থাকতো ফ্রেডের নিজের নামে। জমি ব্যবহারের জন্য উচ্চমূল্যে ভাড়া দিতেন সন্তানদের কাছে, এবং ওই উচ্চমূল্যকে খরচ দেখিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে কর ফাঁকি দিতেন। সন্তানদের নামে ভুয়া (fake) কোম্পানি গঠন করে সেই কোম্পানি থেকে কিনে নিতেন উচ্চমূল্যে তার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। কর প্রদানের সময় ওই বাড়তি খরচ দেখিয়ে তার নেট আয় কমিয়ে আনতেন অতি নিচে। ওটা ছিল তার তৃতীয় পর্যায়ের কর ফাঁকি। সর্বোপরি এই পদ্ধতির মাধ্যমে ফ্রেড তার সম্পত্তি কর ফাঁকি দিয়ে তার সন্তানদের সম্পত্তি হস্তান্তর করতেন। নিজের আয়কর এবং সন্তানদের উত্তরাধিকার কর দুটোতেই ফাঁকি দিতেন ফ্রেড  ট্রাম্প। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি (Thomas Picketty) তার লেখা 'ক্যাপিটাল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি' (Capital in the Twenty-First Century) বইটিতে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পুঁজি পাচারে ধনিক শ্রেণির বিবিধ উদ্ভাবনী পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। পাঠক, গত দশ বছরে বিলিয়নিয়ার ডনাল্ড ট্রাম্পের বার্ষিক আয়কর ছিল ছিল মাত্র সাড়ে ৭০০ ডলার। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের সময়ে ও প্রেসিডেন্ট থাকার সময় কেউ তার ট্যাক্স রিটার্নের দলিল বের করতে পারেনি। ডনাল্ড তার দক্ষ কৌঁসুলি বাহিনীর সাহায্যে ওই দলিলগুলো গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভেবে দেখুন, যুক্তরাষ্ট্রে একজন সামান্য আয়ের অফিস কেরানি গড়ে সাত থেকে আট হাজার ডলার আয় কর দেন। অথচ বিলিয়নিয়ার ডনাল্ড ট্রাম্পের আয়কর মাত্র সাড়ে ৭০০ ডলার। প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল কংগ্রেসের যৌথ সেশনে তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫টি সবচেয়ে বড় কর্পোরেশন গত বছর কোন কর দেননি। যুক্তরাষ্ট্রে ধনকুবেরদের আরও ধনী বানাতে চলছে বিস্ময়কর ভানুমতীর খেল। দেখার মতো! রিপাবলিকান পার্টি ধনীদের ট্যাক্স সুবিধা দিয়ে থাকে। ডনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ধনীদের ট্যাক্স কমিয়ে আনা ছিল নেহাত দৃষ্টিকটূ। অথচ এই ডনাল্ড ট্রাম্পকে বেআইনিভাবে জোরপূর্বক ক্ষমতায় রাখার জন্য করের বোঝা বহনকারী নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত লোকরা ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি খোন্তা, কুড়াল, ও লোহার রড নিয়ে ক্যাপিটল হিল আক্রমণ করেছিলেন। অবাক বিশ্ব! অনেক সময় ভাবি, খরগোশের গর্ত দিয়ে হয়তো পড়ে গিয়েছি তাসের দেশে। সবকিছু ওলটপালট।

ফ্রেড ট্রাম্পের অনৈতিক কাজের শুমার করা কঠিন। সরকারের আর্থিক সহায়তায় প্রকল্প নির্মাণের খরচ বেশি দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে সত্যিকারের খরচের চেয়ে অধিক অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বেশ কয়েক বার। সংখ্যালঘু কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে অধিক বাড়ী ভাড়া দাবি করে সরকারি অনুদানে তাদের জন্য নির্মিত আবাসন থেকে বঞ্চিত করেছেন। অনেকবার তিনি আইনের খপ্পরে পড়েছিলেন।

১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সিনেটের ব্যাংকিং কমিটি ফ্রেড ট্রাম্পের অভাবনীয় লাভ এর জন্য তার তদন্ত করেছিল। সরকারি আর্থিক সহায়তা ব্যবহার করে তিনি ওই অত্যধিক লাভ অর্জন করেছিলেন যা ছিল সরকার নির্ধারিত ঠিকাদারদের লাভের অনেক বেশি। ১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্ক স্টেট ইনভেস্টিগেশন কমিশন দ্বারা এমনি আরেকটি তদন্তের শিকার হয়েছিলেন ফ্রেড ট্রাম্প। ফ্রেডের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি আবাসন বৈষম্যের মামলায় তাকে বিবাদী করেছিল ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। দক্ষ কৌঁসুলিদের সহায়তায় তিনি সবগুলো মামলা ও তদন্ত থেকে পার পেয়ে যান। ফ্রেড ট্রাম্পের ব্যাপারই আলাদা। তার জন্ম হয়েছিল নিউ ইয়র্কের ব্রংক্স এ ১৯০৫ সালের ১১ অক্টোবর এক জার্মান ইমিগ্র্যান্ট নাপিত ফ্রিডরিকের ঔরসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন যুক্তরাষ্ট্রে জার্মান বিরোধী মনোভাব তুঙ্গে, তখন ধূর্ত ফ্রেড ট্রাম্প রাতারাতি তার জাতিত্ব পরিবর্তন করেই ক্ষান্ত হননি; তার জন্ম শহর ও পরিবর্তন করেছিলেন। তার ভুয়া জন্মস্থান হয়ে গেল নিউ ইয়র্কের পরিবর্তে নিউ জার্সি। তার পিতার আদি নিবাস জার্মানি থেকে জিয়ন কাঠির ছোঁয়ায় মুহূর্তে চলে গেল সুইডেনে। ফ্রেড ট্রাম্প বাসায় জার্মান ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জার্মান ভাষা পুরোপুরি ত্যাগ করেন। 

শো-ম্যানশিপের দক্ষ কারিগর ছিলেন ফ্রেড ট্রাম্প। একবার কনি আইল্যান্ডে তার নির্মিত অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স বাজারজাতকরণের জন্য তিনি এক দল অর্ধ-উলঙ্গ বিকিনি পরিহিত লাস্যময়ী নারীদের ভাড়া করেছিলেন। এ প্রবণতা দেখা গেছে তার ছেলে ডনাল্ড ট্রাম্পের জীবনে বিভিন্ন সময়ে।

ডনাল্ড ট্রাম্প তার পিতার মতই ছিলেন বর্ণবিদ্বেষী। মনে হচ্ছে ট্রাম্পদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতাটা এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত। নিউ ইয়র্কের কুইন্সে ১৯২৭ সালের ৩০ মে এর মেমোরিয়াল ডে তে উদযাপনরত সহিংস বর্ণবিদ্বেষী ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান এর প্যারেড থেকে বাইশ বছরের যুবক ফ্রেড ট্রাম্পকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি ছাড়া পেয়ে যান। তার বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি। টেফলনের মতো পিচ্ছিল ফ্রেড ট্রাম্পকে আইনের মাধ্যমে কাবু করা ছিল অসম্ভব। আইনের ফাঁকফোকরে সবসময়ই তিনি রেহাই পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, ফ্রেড অনেকটা ক্যামেলিয়ন টিকটিকির মতো। যেখানে যায় সেখানের রঙ ধরে। তার অভিযোজন ক্ষমতা ছিল সাধারণ মানুষের অনেক ঊর্ধ্বে। ইহুদি-বিদ্বেষী ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান এর প্যারেডে যোগদান করে গ্রেপ্তার হওয়া ফ্রেড ট্রাম্প যখন টের পেলেন তার ব্যবসায়ে ইহুদিদের ক্ষমতা সুদূর বিস্তৃত, তখন তিনি রাতারাতি ইহুদিদের দোস্ত বনে গেলেন। অনেক ইহুদি  চ্যারিটিতে  দান করেছেন মুক্ত হস্তে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে গড়ে তুলেছিলেন অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব এবং সখ্যতা।

আমেরিকার স্বর্গরাষ্ট্রে ভোজবাজির দক্ষ কারিগর, কঠোর পরিশ্রমী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ফ্রেড ট্রাম্প অধ্যবসায়, পরিশ্রম, এবং আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে কসাই এর ডেলিভারি বয় হতে হয়েছিলেন বিলিয়নিয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পিতা। রূপকথার সিন্ডারেলার গল্পের চেয়ে চমকপ্রদ সত্য কাহিনীর নায়ক হলেন ফ্রেড ট্রাম্প।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক