আইনের বাস্তবায়ন: মহাপরিকল্পনা ও মহাপ্রকল্প জরুরী

বিধান চন্দ্র পালবিধান চন্দ্র পাল
Published : 3 May 2021, 08:12 PM
Updated : 3 May 2021, 08:12 PM

প্রশ্ন দুটো আজ কয়েকদিন হলো মাথায় ঘুরপাক ঘাচ্ছে- দেশে আদৌ কি এমন একটা আইনও রয়েছে যার সফল ও শতভাগ বাস্তবায়ন আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? আইন কি শুধুই পেশার সাথে সংশ্লিষ্টদের চিন্তা-ভাবনার বিষয়? 

আমাদের দেশে আইনের সংখ্যা প্রায় বারো শ (আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুসারে দেশে প্রচলিত আইনের সংখ্যা এক হাজার ১৪৮টি। সূত্র: দৈনিক সমকাল ৩০ জুন, ২০১৯)। কিন্তু দেশে সুষ্ঠু ও সফলভাবে শতভাগ বাস্তবায়িত এমন একটা আইনের নাম কি কেউ বলতে পারবেন?

বলাবাহুল্য, এ ১২০০ আইনের প্রতিটিরই আলাদা আলাদা গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। এতোগুলো আইনের মাঝে কতগুলো আইন আমরা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? এ বিষয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে দেখা যেতে পারে। তবে এমন উদাহরণসৃষ্টিকারী কোন একটি আইনের নাম আমার মতো কেউই বলতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

আমি সারাদেশের অসংখ্য তরুণকে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নটি ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু এমন একটি আইনের কথাও তাদের মুখে শুনতে পাইনি, যা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কিংবা হচ্ছে। যা অত্যন্ত লজ্জার এবং দুঃখজনক একটি অধ্যায় বললে আশা করি অত্যুক্তি হবে না। আর এ কারণেই বোধ হয় বৈশ্বিক বেশ কিছু সাম্প্রতিক আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের অবনতি বিশেষভাবে প্রকাশ হয়েছে।

বাংলাদেশে হরহামেশা বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মুখে এখন আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা লক্ষ্য করা যায়। সম্প্রতি করোনাভাইরাস বা কোভিড–১৯ সংক্রমণের মধ্যে বাড়ির বাইরে চলাচলরত অবস্থায় ব্যক্তিকে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নের দিকে তাকালেও চিত্রটা আরও সুস্পষ্ট হয়।

এসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন হলেও এ নিয়ে আলাদাভাবে গবেষণার প্রয়োজন আছে বলেই আমার কাছে মনে হয়। তবে, আইনের প্রতি এই অশ্রদ্ধা তো একদিনে তৈরি হয়নি। ধীরে ধীরে আইনের প্রতি মানুষের মনে অশ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে এবং সেটা ক্রমেই বাড়ছে। আর এ বৃদ্ধি যদি এখনই শক্ত হাতে রোধ না করা যায়, তাহলে আইনের যে মহতী উদ্দেশ্য তা কখনোই পূরণ হবে না অর্থাৎ অপরাধ, অবিশ্বাস আরও বেড়ে যাবে এবং জনগণকে অপরাধ থেকে দূরে রাখাটা কঠিন হয়ে যাবে। 

প্রসঙ্গত একথা বলতে হয় যে, আইন বা নিয়ম-কানুন আসলে আমাদেরকে বলে দেয় কোন কাজটি অপরাধ আর কোনটি নয়। যদি কেউ অপরাধ করেন তাহলে আইনের বিচারে তার শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, যাতে সেই অপরাধটি আর না হয় এবং যিনি অপরাধ করেছেন তিনিও ভুল শুধরে নিতে পারেন কিংবা কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি পান।

 অর্থাৎ আইন তৈরির প্রধান উদ্দেশ্যই হলো, মানুষকে অপরাধ বিষয়ে সচেতন করা এবং জনগণকে অপরাধ কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে সহায়কের ভূমিকা পালন করা। আইনপ্রণেতারা আইন তৈরি করছেন ঠিকই; কিন্তু আইন তৈরির উদ্দেশ্যকে সফল করে তোলার জন্য এবং সব আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য আসলে প্রকৃতঅর্থে কতটুকু কাজ হচ্ছে? এ প্রশ্নটি আমি আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারক মহলকে গুরুত্ব দিয়ে এবং বিশেষভাবে ভেবে দেখতে অনুরোধ করবো। 

করোনাকালে গণমাধ্যমের দেওয়া খবর অনুসারে সবচেয়ে বেশি আইনের বরখেলাপ হচ্ছে যেসব ক্ষেত্রে তার মধ্যে পরিবেশ অন্যতম। পরিবেশের দিক থেকে কেবল যদি নদীক্ষেত্রের আইনভঙ্গের  কথাই বলি তাহলে উদাহরণ হিসেবে টানা যায়- ভৈরব নদকে খাল বানানোর কার্যক্রম এবং সেখানে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অনিয়মকে উৎসাহিত করার কথা; ধামরাইয়ের বংশী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কাহিনী এবং সেক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য; ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে ভুল জায়গায় পিলার বসানো; কোহেলিয়া নদী ভরাট করে পাকা সড়ক তৈরি; বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীতে শিল্পকারখানার বর্জ্য থেকে শুরু করে পয়ঃপ্রণালির ময়লা-আবর্জনা ফেলা, মৌলভীবাজারে দুই মাস ধরে কণ্ঠিনালা নদীকে খুন করে ফেলা এবং সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতা ইত্যাদি। আরও অসংখ্য উদাহরণ দেওয়াও সম্ভব।

আমরা জানি, নদ-নদী সংশ্লিষ্ট অবৈধ দখল, দুষণ, নাব্যতা হরণসহ নদ-নদীর পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলো ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়া পানি আইন, দণ্ডবিধি ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেও দখল ও দূষণকারীদের শাস্তির সুযোগ রয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি, এসব ঘটনাতে আমরা বাস্তবে এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ হতে দেখিনি। 

একইভাবে গণমাধ্যমগুলো বলছে, করোনাকালে বেড়ে গিয়েছে নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং পারিবারিক নির্যাতন। শিশুদের জন্যও ন্যায়বিচার লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রেও অসংখ্য আইন আছে কিন্তু সেগুলোর সুষ্ঠু প্রয়োগ হতে আমরা দেখছি না। 

আইন বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের যেমন অনেক দায়িত্ব আছে, তেমনি আছে নাগরিকেরও। যেমন: সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক ব্যবহারকারীকে জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু এসবের সঠিক চাহিদা নিরূপন করে যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যায় এগুলো তৈরি করা না হয়, তাহলে আইন থেকেও কোন লাভ হবে না।

একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে নাগরিকেরও। সব আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকাটা একজন সচেতন নাগরিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া প্রয়োজন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, যে সংবিধানকে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং যে আইনের মাধ্যমে সব ক্ষমতার মালিক জনগণকে করা হয়েছে, সেই আইনটি অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান সম্পর্কে নাগরিকদের সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়ার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থাই আমরা রাখিনি। 

অথচ দেশের নাগরিক হওয়ার বয়স পূর্ণ হলে প্রত্যেকের হাতে একটি করে সংবিধান তুলে দিয়ে তাদেরকে সুনাগরিক করার প্রয়াস আমরা শুরু করতে পারতাম। যার মধ্য দিয়ে সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেতেন। প্রসঙ্গত, সংবিধান জানা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার আর এ অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে। তাই এ লক্ষ্যে আলাদা একটি কার্যক্রম শুরু হওয়া উচিত বলেই আমার কাছে মনে হয়।

 সর্বোচ্চ এই আইনটিকে আরও সহজবোধ্যভাবে তাই সবার কাছে নিয়ে যাওয়াটা জরুরী হবে। আইন সম্পর্কে ভয় দূর করে, এর মধ্য দিয়ে দৈনন্দিন সাধারণ আইনগুলো জানার আগ্রহ ও উৎসাহ তৈরি করার একটি পথ রচনা করাটাও সম্ভব হবে। ফলে এ বিষয়গুলো পরিকল্পনার সময় গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

প্রসঙ্গত, যে কোন সমাজের বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে কিশোর ও তরুণ কিংবা যুব-জনগোষ্ঠী। এ বয়সে তারা আসলে যে জ্ঞান অর্জন করে তার একটা ছাপ সারাজীবনই থেকে যায়। আর তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় তাদের আচার-আচরণে। আর তাই কোন সমাজে আইনের শাসন, আইন মেনে চলার ইতিবাচক চর্চা তখনই গড়ে উঠবে, যদি সেই সমাজে কিশোর ও যুব-জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দিয়ে এসব বিষয় শেখানো হয় এবং সেসবের ইতিবাচক চর্চায় উৎসাহিত করে তোলা হয়। 

তাদেরকে শেখানোর ও উৎসাহিত করার অন্যতম উপায় নিঃসন্দেহে পাঠ্যসূচিতে বিষয়গুলি সহজভাবে ও পর্যায়ক্রমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। সমাজকে আরও সুশৃঙ্খল করে তোলার জন্য, যদি এ ধরনের একটি প্রচেষ্টা গুরুত্ব দিয়ে শুরু করা যায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এর সুফল আমরা পেতে পারি। 

আমার ধারণা, কোভিড-১৯ এর এ সময়েও পরিবেশ সম্পর্কিত অন্তত যে কোন একটি আইনকেও বেছে নিয়ে যদি আমরা তার সফল বাস্তবায়ন করে দেখাতে পারি, তাহলে জনমানুষের মনে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা দূর করতে তা বিশেষভাবে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে। এভাবে পর্যায়ক্রমিকভাবে এবং দ্রুততম সময়ে একেকটি আইনকে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা ও সে প্রেক্ষিতে মহাপ্রকল্প শুরু করাটা এ মুহূর্তে খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ হবে। যার মধ্য দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ভালোভাবে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে বলেই আমি বিশ্বাস করি। 

স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুদকের ভূমিকা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও যুক্তিপূর্ণ পরামর্শ আছে, সেকথাও সত্যি। ফলে সার্বিক দিক ভেবে চিন্তে এই মহাপরিকল্পনাটি সবার আগে তৈরি করাটা জরুরী হবে। 

আইন নিয়ে এ ধরনের মহাপরিকল্পনা করে যদি সত্যি সত্যিই আমরা কাজে নামতে পারি তাহলে তা কোভিড-১৯ পরিস্থিতিকেও সুন্দরভাবে মোকাবেলা করতে সহায়তা করবে। আর এর মধ্য দিয়ে আইনের শাসনের ক্ষেত্রে কেবল শৃঙ্খলা আর নিরাপত্তাই নয়, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতার প্রয়োগ, নাগরিক ন্যায়বিচার এবং ফৌজদারি বিচারসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল মাপকাঠিতেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। একইসাথে বিশ্বের বুকে সাহস এবং সততার সাথে বলিষ্ঠ উদাহরণ সৃষ্টি করবে বলেও আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক