ব্যতিক্রমকে মেনে নেয়ার শক্তি ও জ্ঞানের অভাবে ভুগছে পৃথিবী

সাদিকুল ইসলাম
Published : 28 Jan 2021, 07:51 AM
Updated : 28 Jan 2021, 07:51 AM

বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড বা মহাবিশ্বের অন্তর্গত সকল রহস্যজগতের মধ্যে অতিকায় ক্ষুদ্র এক গ্রহের পৃষ্ঠ জুড়ে মানব জাতির পদচারণা। এ মহাবিশ্বের যা কিছু তাত্ত্বিকভাবে বিজ্ঞানের আলোকে অভিজ্ঞাত হয়েছে তার বিচিত্র বৈশিষ্ট্য বা রহস্যের উন্মোচনে গবেষকদের দিন-রাত একাকার হয়ে যায়; সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে তা রূপকথার গল্পের মতোই শোভা পায়। পৃথিবী নামক যে গ্রহে আমাদের বিচরণ, তার এপাশ-ওপাশের কথা ভাবতে গেলেই কেমন নির্বাক হয়ে যেতে হয়। কোথাও একটা আস্ত মহাদেশই শুভ্র বরফে আচ্ছাদিত, কোথাওবা এমন পর্বত- যা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মেঘের দেশ অতিক্রম করে মহাশূন্যের কাছাকাছি চলে যাওয়া যায়, কোথাওবা শত শত মাইল জুড়ে ঘন জঙ্গল, আবার কোথাওবা দিগন্ত রেখায় মিলিয়ে যাওয়া দূরত্বে দরিয়া কিংবা মরুর রাজত্ব-সে দরিয়া কিংবা মরুর বুক জুড়ে আরেক অজানা রহস্যজগত।

কী নেই ছোট্ট এই পৃথিবীতে! প্রায় আট শত কোটি মানব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এ জগতের আনাচ-কানাচ। তবুও যেন রহস্যের শেষ নেই। বিচিত্র এ জগতের অধিবাসীদের সব কিছুতেই আবার ভিন্নতা লক্ষণীয়। কেউবা সাদা, কেউবা কালো, কেউ অনেক বেশি লম্বা, কেউ কেউ অনেক খাটো বা খর্বাকৃতির। দেশ, মহাদেশ, অঞ্চলভেদে একেক বৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে ধরনীর বুকে রাজত্ব করা এই মনুষ্য সমাজ। অনেক দেশের মানুষকে দেখেছেন, যারা আস্ত সাপ কেটে গরম পানিতে সিদ্ধ করে দিব্যি খেয়ে ফেলছে, আবার বাঙালি হয়ে আপনি-আমি মাছ-ভাত ছাড়া এক বেলাও তৃপ্তি করে খেতে পারি না। আনন্দ ভাগাভাগি করতে নানা রঙ্গের-ঢঙ্গের আয়োজনে কত কত ভিন্নতা একেক সংস্কৃতি ও সমাজ জুড়ে, তার হিসেব করা ভার। মহাবিশ্বে পৃথিবীর বৈচিত্র্যপূর্ণ অবস্থানের কারণেই হয়তো নিজের রূপের এত রঙ, এত কারুকাজ, এত এত অবাক করা ভিন্নতা। আর সেই ভিন্নতার সমান্তরালেই হয়তো এ পৃথিবীতে বিচরণকারী মানুষের জীবন-যাপনে এত বিচিত্রতা। ধর্মীয় বয়ানের আলোকে, এই মানুষ হচ্ছে সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ভাল-মন্দের তফাৎ করতে পারে, মন্দকে ত্যাগ করে ভালকে সাথে নিয়ে বিশ্ব দরবারে নিজেকে বিকশিত করার পথ উন্মোচন করে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করে পৃথিবীতে শান্তি আনয়নে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালায়। আর তাই পৃথিবীর সকল কিছুর উপরে এই মানব সমাজের স্থান। কিন্তু শান্তি কি আদৌ স্থাপিত হয়েছে? সৃষ্টির আদিকাল থেকেই স্বীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য গোত্রে-গোত্রে বা বা বর্ণে–বর্ণে যে হানাহানি, তা আধুনিক যুগের কাঁটাতারের বেড়ায় বিভক্ত ভিন্ন ভিন্ন দেশের মধ্যে হানাহানিতে এসেও শেষ হয়নি। বিনিময়ে লাশ হয়েছে কোটি কোটি প্রাণ। আদিকালের পেশিশক্তির রাজত্ব হাসিলের কৌশল আধুনিক সমাজে নানা ঢঙ্গের সামরিক কৌশলে রূপ নিয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস শুধু বদলায়নি-তা হল মানুষ হত্যা। আর এই সমস্ত কিছুর দায়- আর কিছুর নয়, শুধু পৃথিবীর বৈচিত্র্যতার, মানুষের ভিন্নতার, ভিন্ন আচার-অভ্যাসের। আর এখানে মারা পড়ে তারাই, যাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল বা যারা সংখ্যালঘু। পৃথিবীতে দুর্বলের ওপরে সবলের অত্যাচার এবং বঞ্চনার মাত্রা দিন দিন শিক্ষার আলোয় কমে যাওয়ার আশা করা হলেও তা যেন কমছেই না।

এই মনুষ্য সমাজে একটা শ্রেণি বরাবরই আরেকটা শ্রেণিকে শোষণ করে নিজের আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, স্বীয় পছন্দ-রুচি, অভ্যাস কিংবা বিশ্বাসকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। যে মানব সৃষ্টিলগ্ন থেকেই সেরা, সে মানবের আবার শোষকশ্রেণির কাছ থেকে স্বীকৃতি নিয়ে বাঁচতে হয়। আবার সংখ্যালঘিষ্ঠ ও সংখ্যাগরিষ্ঠই হোক, পৃথিবীতে কোনো মানুষই চাপিয়ে দেয়া কোনো কিছু গ্রহণ করেনি। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় সংঘাত, সবুজ-শ্যামল নির্মল পৃথিবীর আকাশ ছেয়ে যায় কালো ধোঁয়ায়।

অজানা কিংবা অলৌকিক কারণেই ব্যতিক্রমী কোন সৃষ্টির প্রতি আকর্ষণ মনুষ্য সমাজের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সে আকর্ষণ দুঃখজনকভাবে বেশিভারভাগ সময়েই ইতিবাচক হয় না। মানবকুল সৃষ্টির সেরা হলেও তার স্বীয় জ্ঞানের আলোয় ব্যতিক্রমকে সে ইতিবাচকভাবে আলিঙ্গন করতে পারেনি। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ''In nature, a flock will attack any bird that is more colorful than the others because being different is seen as a threat.'' মানে, ব্যতিক্রম কিছু দেখলে পক্ষীকূলেও আতঙ্ক তৈরি হয়। মানব সমাজের ব্যতিক্রমকে ইতিবাচকভাবে নিতে না পারাটা এই পক্ষীকূলের শিক্ষা কিনা, আমার জানা নেই। তবে বাস্তবতা তারই প্রমাণ দিচ্ছে। অবশ্য এই ব্যতিক্রমকে পুঁজি করে শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল হয় কি না! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, ঠিক কোন একক বা বৈশিষ্ট্যের আলোকে মনুষ্য সমাজের একটা শ্রেণি আরেকটা শ্রেণির থেকে নিজেদের সেরা ভাবে, কিংবা কোন এককের মাপকাঠিতে একজন মানুষকে স্বাভাবিক মানুষ, এবং অন্য আরেকজনকে অস্বাভাবিক মানুষ হিসেবে ট্যাগ দেয়া হয়, তা আজও অজানা। তার মানে হল, মানুষ সৃষ্টির বিচিত্রতা অবাক হয়ে উপভোগ করলেও স্বভাবজাত কারণে তা মেনে নিতে পারেনি। আর এ কারণেই আজ পা-হীন মানুষকে ল্যাংড়া, অন্ধ মানুষকে কানা কিংবা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কাউকে মেন্টাল, প্রতিবন্ধী এমনসব নেতিবাচক ট্যাগ দিয়ে সমাজে পিছিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। সৃষ্টির ভিন্নতার যে শক্তি, সে শক্তির বিষয়ে জ্ঞানের অভাবই কি তাহলে এর পেছনের কারণ?

আমি শিক্ষা বিজ্ঞানের ছাত্র, এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আমার কাছে নেই। আমার মনের বিচিত্র অনুভূতিগুলো শুধু প্রশ্নেরই জন্ম দিতে জানে। উত্তর না হয় বুদ্ধিজীবী কিংবা শাসকগোষ্ঠীর কেউ দেবেন। তবে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, যারা হিউম্যান ডাইভারসিটি বোঝে না, তারাই বরং প্রতিবন্ধী।

বিক্ষিপ্ত এ আলোচনা ঠিক কোন বিষয়ে আলোকপাত করছে, তার সদুত্তরের অভাব লেখক হিসেবে আমাকেও খানিক বিচলিত করছে। তাই এবার কিছুটা সোজাসাপটা আলোচনা করার চেষ্টা করছি।

ব্যতিক্রমকে মেনে নেয়ার ইতিবাচক শক্তি বা জ্ঞানের অভাবে ভুগছে এ পৃথিবী, তার আরেকটা জ্বলন্ত প্রমাণ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়ে বোঝার বয়স অব্দি আমাদের বিরচণের ক্ষেত্রে দুই ধরনের মানুষের সাথেই পরিচিত হতে হয়, বিশ্বাস জন্ম নেয় পুরুষ এবং নারী ব্যতীত পৃথিবীতে আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, যার সাথে আদম-হাওয়া কিংবা অ্যাডাম-ইভ নামক ধর্মীয় তথ্যের চরিত্র জুড়ে দিয়ে সে বিশ্বাসকে পোক্ত করা হয়। নারী-পুরুষ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকলেও সেটা আমাদের চোখে ব্যতিক্রম বা অদ্ভুত চরিত্র হিসেবেই ধরা পড়ে। আমরা এই ব্যতিক্রমকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে অক্ষম। অথচ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সৃষ্টিও পৃথিবীর অন্য দশজন মানুষের মতই স্বাভাবিক। যাদের আমরা সাধারণভাবে হিজড়া বলে ডাকি। এই শ্রেণির মানুষের বিষয়ে শ্রদ্ধেয় ডা. সেজান মাহমুদের লেখার একটি অংশ হুবহু তুলে ধরছি,

সাধারণ অর্থে হিজড়ার অভিধানিক অর্থ বলতে আমরা বুঝি একই দেহে নারী ও পুরুষের চিহ্নযুক্ত মানুষ । যারা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম। শারীরিক ভাবে পুরুষ কিন্তু মানসিক ভাবে নারী বৈশিষ্ঠের অধিকারী। হিজড়া হওয়ার কারণ নিয়ে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে, এমনকি ধর্মেও আছে নানান কুপ্রচার। কেউ এটাকে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ বলে, কেউ বলে পিতামাতার দোষ কিংবা প্রকৃতির খেয়াল। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী মাতৃগর্ভে একটি শিশুর পূর্ণতা পেতে গড়ে ২৮০ দিন সময়ের প্রয়োজন। XX প্যাটার্ন ক্রোমোজম (জিনেটিক উপাদান) বর্ধিত হয়ে জন্ম দেয় নারী শিশুর। আর XY প্যাটার্ন জন্ম দেয় পুরুষ শিশুর। সাধারণভাবে বললাম। ভ্রূণের পূর্ণতা প্রাপ্তির একটি স্তরে ক্রোমোজম প্যাটার্নের প্রভাবে পুরুষ শিশুর মধ্যে অন্ডকোষ এবং মেয়ে শিশুর মধ্যে ডিম্বকোষ জন্ম নেয়। অন্ডকোষ থেকে নিঃসৃত হয় পুরুষ হরমোন এন্ড্রোজেন এবং ডিম্বকোষ থেকে নিঃসৃত হয় ইস্ট্রোজেন। পরবর্তী স্তরগুলোতে পুরুষ শিশুর যৌনাঙ্গ এন্ড্রোজেন এবং স্ত্রী শিশুর যৌনাঙ্গ এস্ট্রোজনের প্রভাবে তৈরি হয়। ভ্রূণের বিকাশকালে এই প্রক্রিয়ায় নানারকমের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। প্রথমত ভ্রূণের নিষিক্তকরণ এবং বিভাজনের ফলে কিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সূচনা হতে পারে। যেমন এক্স-ওয়াই ওয়াই (XYY) অথবা এক্স এক্স ওয়াই (XXY)। এক্স ওয়াই ওয়াই প্যাটার্নের শিশু দেখতে নারী শিশুর মতো। কিন্তু একটি এক্সের অভাবে এই প্যাটার্নের স্ত্রী শিশুর সব অঙ্গ পূর্ণতা পায় না। একে স্ত্রী হিজড়াও বলে। আবার এক্স এক্স ওয়াই প্যাটার্নে যদিও শিশু দেখতে পুরুষের মতো কিন্তু একটি বাড়তি মেয়েলি ক্রোমোজম এক্সের জন্য তার পৌরুষ প্রকাশে বিঘ্নিত হয়। মূলত এটি একটি শারীরিক গঠনজনিত সমস্যা যা জন্মগত রোগ বা ডিসওর্ডার বলা যায়। হিজড়াদের শারীরিক গঠন মূলত তিন প্রকার। নারীদের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও নারী যৌনাঙ্গ থাকে না। পুরুষের সকল বৈশিষ্ট্য থাকলেও পুরুষ যৌনাঙ্গ থাকে না। আবার উভয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে।

যদিও তথাকথিত সভ্য মানুষরা এঁদেরকে বলে "হিজড়া"। হিজড়া শব্দটি এসেছে আরবী হিজরত বা হিজরী শব্দ থেকে। যার আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন বা মাইগ্রেট। ইংরেজিতে হিজড়াদের Hermaphrodite, Transgender বা Eunuch বলা হয়। ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থাকে বোঝায় যা মেয়ে বা ছেলে কোন শ্রেণীতে পড়ে না। হিন্দিতে ভাষায় এঁদের বলা হয় ( কিন্নার)"। সংস্কৃত ভাষায় নপুংসক শব্দটি পাওয়া যায়। বাংলায় হিজড়া শব্দটির সঙ্গে নানান স্টিগমা জড়িত। তথাকথিত সভ্য মানুষেরা এটা গালির মতো ব্যবহার করে, সামাজিক দিক থেকে যেন অচ্ছুত একটি গোষ্ঠী। অথচ দোষ যদি দিতে হয় দিতে হবে প্রকৃতি বা সৃষ্টিকারক কে। এঁদের দোষ হবে কেন? এরা তো বরং ভিক্টিম!

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা সেই আদিকাল থেকেই তাদের ব্যতিক্রমী শারীরিক বা মানসিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। যদিও তাদের সকল বৈশিষ্ট্যই সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতি প্রদত্ত। অবাক করার মত বিষয় হল, সৃষ্টিসূত্রে এরা মানুষ হয়ে জন্ম নিলেও বিভিন্ন দেশ এদের আবার আলাদাভাবে স্বীকৃতি প্রদান করছে। তার মানে, এ পৃথিবী তাদের আলাদাভাবে স্বীকৃতি দিয়ে মানব সমাজকেই খাটো করল কি না! যা হোক, ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল আমলে বিশেষ এই জনগোষ্ঠীকে সম্মানজনক স্থানে রাখা হলেও ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশ শাসনকালে তাদের নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করে। ফলশ্রুতিতে তারা ধীরে ধীরে আবার প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়। তাই বর্তমান সময়ে এই বিশেষ গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি প্রদান মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার আদায়ের পথকে সুগম করেছে বলেই ধরা যাক। কিন্তু স্বীকৃতি প্রদানেই সব শেষ। এ মানুষগুলোর আর 'মানুষ' হয়ে ওঠা হয়নি। সভ্য সমাজ তাদের স্বভাবজাত কারণে ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষধর ছোবলে প্রতিনয়ত বিদ্ধ করছে। তবে তাদের নিজেদের মানুষ ভাবার বিষয়ে ছোট্ট একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। করোনাভাইরাস মহামারীর সময়ে ১০ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে কাজ করেছে আমাদের সাথে। জরুরি ত্রাণ বিতরণ, অসুস্থ রোগীকে ঔষধ পৌছানো, বাজার করে দেয়া, করোনা রোগীর প্রয়োজনীয় জিনিস হাসপাতালে পৌছে দেয়া, জীবানুনাশক স্প্রে করা থেকে শুরু করে সব ধরনের সেবার সাথে সংযুক্ত ছিল ব্যতিক্রমী এই মানুষগুলো। এ সেবা কার্যক্রম শেষে তাদের অনুভূতি জানতে চাইলে তারা জানান, করোনা মহামারী তাদের মানুষ ভাবতে শিখিয়েছে। কেননা, এই প্রথম তারা সাধারণ কোনো মানুষের মুখে তাদের জন্য নিষ্পাপ হাসি দেখতে পেয়েছেন। আমরা অন্যান্য সদস্যরা তাদের সাথে এক বাসায় থেকে, একসাথে খেয়ে মানুষের সেবায় কাজ করেছি। কই, আমাদের কাছে তো মানুষ ভিন্ন তাদের অন্য কিছু মনে হয়নি?

বৃহন্নলা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার ওপর ব্যক্তিগত একটি গবেষণায় সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পেলাম, তারা প্রায় ৯০ শতাংশ বৃহন্নলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং এর স্বীকার। মাইগ্যা, হাফ-লেডিস, হিজড়া ইত্যাদি ট্যাগ দিয়ে তাদের শিক্ষা জীবনের পথকে রুদ্ধ করে দেয়া হয়। পাশাপাশি পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গিগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান-ইত্যাদি নানা কারণে তাদের এক প্রকার চাপের মুখে ঘরছাড়া হতে হয়। বেঁচে থাকার তাগিদে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুক্ত হতে হয় সকল নেতিবাচক চর্চার সাথে, যা সত্যিকার অর্থেই সভ্য মানুষের কাছে মানুষের জীবন নয়, পশুর জীবন। কিন্তু তাদের এই অবস্থার পিছনে দায় আসলে কার? উত্তর একটাই-সৃষ্টির বৈচিত্র্যতা ও তার শক্তির ওপর জ্ঞান ও সেসবের চর্চার অভাব। আবার জ্ঞান থাকলেই বা কি? মানুষ তো শোষণ করতে, হাসি-তামাশা করতে, কিংবা বিনোদনের সস্তা খোরাক জোগাতেই চারিত্রিকভাবে অভ্যস্ত। আর সেই সহজলভ্য উপকরণ হিসেবে তাদের নিকট আবির্ভূত হয়েছে তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষেরা। কে জানে, এটা ব্রিটিশদের শিখিয়ে যাওয়া সেই মজমার অনুসরণ কি না।

স্বাধীনতার ৫০ বছর কিংবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের মতো এমন তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে এসে আমার মস্তিষ্কে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, মহান মুক্তিযুদ্ধে এত বীরসেনা অংশ নিল, শহীদ হল, মা বোনেরা নির্যাতিত হল, একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও কি তখন কোনো প্রকার গেরিলা আক্রমণের সহযাত্রী হয়নি? তৃতীয় লিঙ্গের কেউই কি মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখায়নি? নাকি যুদ্ধে অংশ নিলেও অজানা কারণেই তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি, নাকি হলেও সেটা পুরুষ বা নারী তালিকায় হয়েছে? যদি যুদ্ধে গিয়েই থাকে, যদি দেশের জন্য রক্ত দিয়েই থাকে, তবে সে মানুষগুলো কেন আজ রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করবে? কেন তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে? কেন মা-বাবার আদর-ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানুষের অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করবে?

কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যিনি পিতার আদর্শে বলীয়ান হয়ে মানবিক বাংলাদেশ গড়তে দৃঢ় প্রত্যয়ী। তার নেতৃত্বে অধিকারবঞ্চিত এই মানুষগুলোর জীবনে আশার আলো ফিরেছে। ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে অনেকেই। অনেক সংগঠন কাজ করছে এ মানুষগুলোর জীবনমান উন্নয়নে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এই শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে যতদিন না পারা যাবে যে স্বীয় মনুষ্য সমাজের একটা গোষ্ঠীকে খাটো করা মানে পুরো মানব জাতিকে খাটো করা, একটা অংশকে পিছিয়ে রাখা মানে পুরো মানব জাতিকে পিছিয়ে রাখা, ততদিন এ মানুষগুলোর জীবনে সত্যিকারের আলো ফিরবে না।

যতদিন অব্দি মানব সমাজে সৃষ্টির বৈচিত্র্যতার শিক্ষার ইতিবাচক বিস্তার না ঘটবে, ভিন্নতার সৌন্দর্য ও শক্তি উপলব্ধি করতে না পারবে, ততদিন অব্দি মানবিক বিশ্ব গড়া কিংবা একীভূত বিশ্ব গড়া নেহাত স্বপ্নই রয়ে যাবে। আসুন, আমরা মানবিক হই, সৃষ্টির ভিন্নতাকে মেনে নিই, মানুষকে মানুষ হিসেবেই মনে করি, সম্মান করি, সহযোগিতা করি। তাহলেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, এগিয়ে যাবে বিশ্ব।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক