১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ঘুরে দাঁড়ানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে

ঘুরে দাঁড়ানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতাকারী খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের দাবিতে একটি কর্মসূচি।

অজয় দাশগুপ্ত অজয় দাশগুপ্ত

Published : 23 Nov 2020, 03:40 AM

Updated : 01 Jul 2022, 05:34 PM

কোনও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। করোনাভাইরাসে মানুষের কষ্ট, দুঃখ, মৃত্যু সবকিছুর পর বাঙালির উদ্বেগ এখন সত্যিতে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশ কেমন আছে, মানুষের কষ্ট কতটা, তারা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারছে কি পারছে না, এসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। শুরুতে বলব আওয়ামী লীগের নেতাদের বিষয়ে। গদি শাসন আর সরকারে থাকতে থাকতে তারা হয়তো ধরে নিয়েছেন এটা গ্যারান্টেড। আমরা কিন্তু সময়ের বিস্মিত দর্শক। তারুণ্য থেকে পুরো যৌবন কেটেছিল এরশাদ, বিএনপি আর জামাতের শাসন আমলে। বহু ঘটনা, বহু কাহিনী আর অঘটন মিলে আমাদের সময় ছিল টানটান। ভালো কিছু আশা করাও ছিল পাপ। সেই সময়কার আওয়ামী লীগ ও তার নেতারা ছিলেন সাহসী। তারা ছিলেন সামনের সারির যোদ্ধা। একেকটা মিছিল ছিল মানুষ আর মানুষে সয়লাব। বঙ্গবন্ধু তখন নিষিদ্ধ, কোথাও নাই তিনি। রেডিও, টিভি, প্রচারযন্ত্রে নাই আমাদের চার নেতাদের কেউ। সে সময়কালে মানুষ বুক দিয়ে ঠেকিয়েছে যাবতীয় আগ্রাসন। তখন রাজনীতি করা ছিল সম্মানের বিষয়। এখনকার মতো খাই খাই মনোভাব দেখিনি।

হঠাৎ করে বছরের পর বছরের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা আর শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে আসন পোক্ত হবার পর দলের সিংহভাগ নেতারা ভুলে গিয়েছেন তাদের অতীত। কোনো কিছুতেই রুখে দাঁড়ানো বা ঠেকানোর কোনো দায় নাই তাদের। এমন না যে তাদের কেউ লাঠি নিয়ে মাঠে নামতে বলছে। মানুষ চায় তারা তাদের দায়িত্ব পালন করুক। কী সে দায়িত্ব? মানুষের জীবন, সম্পদ আর মৌলিক চাওয়ার নিরাপত্তা। সে কি আজ আসলে আছে? আমি এমন কোনো কথা বলব না বা লিখব না যা আমার কিংবা এই লেখা ছাপার ফলে মিডিয়ার বিপদ টেনে আনে। কিন্তু এটা কে না জানে আজ যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙ্গতে চেয়েছে অচিরেই তারা মাঠে নামলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।

কী হবে আর কী হবে না তার বিচারক সময়। সময় বলবে কোনটা হবে কোনটা হবে না। কিন্তু এটা বলা অন্যায় হবে না যে এই বিপদ আর হুমকি মূলত আওয়ামী লীগই টেনে এনেছে। এদেশের মানুষ সবসময় ধার্মিক ছিলেন আজও আছেন। ধর্ম এদেশের সম্পদ। প্রায়ই তা পথ দেখিয়েছে অন্ধকারে। আজ হঠাৎ তবে কেন এমন পরিস্হিতি? সুশাসন কাকে বলে? মানুষের মন কি সবসময় নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে? না তা সম্ভব? দেশের মানুষ এটা যেমন মানেন শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নাই তেমনি তারা এটাও বলেন শাসন মাঝে মাঝেই হারিয়ে যায় হয়ে ওঠে দুঃশাসন। এই যে প্রধানমন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাদের অগোচরে বেড়ে ওঠা দানব তারাই আজ হুংকার দিচ্ছে। সবদেশে সব সমাজে কিছু মানুষ থাকে যারা নিয়ম শৃঙ্খলা মানে না। তারা অকারণে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ দিতে পছন্দ করে। ব্যক্তিজীবনের হতাশা, মগজ ধোলাইসহ নানা কারণে তাদের অসংলগ্ন আচরণের দায় গিয়ে পড়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের কাঁধে। এতে দুটো বিষয় হুমকির মুখে পড়ে। প্রথমত এর কারণে সমাজ হয়ে পড়ে দ্বিধাবিভক্ত। তারপর যেটা হয় আতংক আর টেনশনে মানুষ থাকে ভয়ে।

যেটা বলছিলাম নিষ্ক্রিয় রাজনীতি আর একতরফা রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ভুলে গেছে অনেক জরুরি বিষয়। সমাজ যে আজ কী বিপদে সেটা সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সবার আগে চাই নিরাপদ দেশ। কীভাবে সম্ভব প্রকাশ্যে এমন করে বলা? এই সেদিনও যা ভাবা যায়নি আজ তা সত্য। কোনো রাষ্ট্র যদি সামনে যেতে থাকে তার চাই সুষম বণ্টন, দরকার সামাজিক সাম্য, লাগবে সহমর্মিতা ও সহাবস্থান। এই জায়গাগুলো আজ বিপদের মুখে। কে কাকে দোষারোপ করবে আর কে কাকে আসামী ঠাউরাবে তাতে জনগণের কোনো লাভ নাই। তারা চায় স্বাভাবিক জীবন। সরকারি দল যদি তা বুঝতে না পারে বা না চায় এরচেয়ে বড় কষ্ট আর কিছু হতেই পারে না। তাদের জবাবদিহিতা সময়ের চাহিদা।

নেতৃত্বের অভাব কথাটা কি মিথ্যা? আওয়ামী লীগ যে বঙ্গবন্ধু ও তার যোগ্য নেতাদের দল এটা যে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল, মনসুর আলী বা কামরুজ্জামানের দল তা বোঝার কি কোনো উপায় আছে আজ? এটা মানি বিশ্বজুড়ে রাজনীতি আজ পরিবর্তিত। কিন্তু যেসব দেশ যেসব সমাজ এখনো চলমান বা নানাভাবে উদার ও সহনশীল তাদের আছে যোগ্য নেতৃত্ব। আমরা কী দেখছি? সবকিছু একা শেখ হাসিনার কাঁধে চাপিয়ে আনন্দে আছেন দলের বেশিরভাগ নেতা। তাদের এক একজন মাঝে মাঝে টিভি ক্যামেরার সামনে আসেন কথা বলেন তারপর হাওয়া। দলের সেক্রেটারি ছাড়া আর খুব কম শীর্ষ নেতার ভেতরই আন্তরিকতা দেখি। তাহলে সমাজের এই অসঙ্গতি এই অন্যায় রুখবেন কীভাবে তারা?

বাংলাদেশের সমাজ এখন যে জায়গায় তাতে দেশের মঙ্গলকামী উদারনৈতিক মানুষজন ভয়ার্ত। এই ভয় অমূলক না। আজ যখন এই লেখা লিখছি দৈনিক জনকণ্ঠ যারা কিনা সরকারি দলের সমর্থক নামে পরিচিত তারা শিরোনাম করেছে, দেশে জঙ্গিবাদ বেড়েছে। আসলে শুধু বাড়েনি তারা আজ এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে যেখানে হাজার হাজার মানুষ সামাজিক মাধ্যমে লিখছেন, তারা কি এইদেশে থেকে গিয়ে বা বিদেশের সুযোগ হারিয়ে ভুল করেছেন? এই আফসোস এখনো শুধুই হতাশা কয় বছর পর এর রূপ কী হবে তা আফগানিস্তান-পাকিস্তানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। হলি আর্টিজানের ঘটনা নিশ্চয়ই ভুলিনি আমরা। সে ঘটনা বলে দিয়েছে কাদের মগজ ধোলাই হয়ে গেছে, সমাজের কোন্ শ্রেণি আজ পচে-গলে একাকার। এ জায়গাটা ভয়ের এই কারণে যে মধ্যবিত্তের ঘরে পচন ধরা মানে সমাজ নষ্ট হবার শেষ প্রান্তে চলে গেছে দেশ।

আজ সাকিবের মতো তারকা খেলোয়াড় আক্রান্ত। কাল হবেন আর এক জন। শীর্ষ থেকে নিচে কোথাও ছাড় পাবে না কেউ। এটাই তাদের নিয়ম। তারা তাদের উদ্দেশ্য আর নিশানা ভুল করে না। কিন্তু আমাদের সমস্যা আমরা না পারি একত্রিত থাকতে না পথ চিনে উপায় বের করতে। যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ আর একাত্তরের চেতনার ধারক নামে পরিচিত যার শক্তি এদেশের প্রগতি তাদের ভেতর লুকিয়ে থাকা একাংশই শাহবাগের পায়ে কুড়াল মেরেছিল।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের মুক্ততার দিশারী। তার দেশে তার সমাজে তার রক্তের মাটিতে দাঁড়িয়ে এরা তার ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দেয়। এরপরও আমরা কি মনে করব দেশ উন্নয়ন বা সমাজ শান্তিতে থাকতে পারবে?

ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা এখন জরুরি। বুঝতে দেরি হলে ঘুরে দাঁড়ানোরও সময় পাওয়া যাবে না।