চোখ খুলে দেওয়া দুই মসজিদের গল্প

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনমোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
Published : 25 Sept 2020, 02:15 PM
Updated : 25 Sept 2020, 02:15 PM

দুইটি মসজিদের খবর আমরা পড়েছি সাম্প্রতিক সময়ে। একটি মসজিদের খবর গভীর বেদনা ও শোকে মুহ্যমান করেছে বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা এদেশের মানুষকে। ক্ষতি করেছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে। অপর একটি মসজিদ এবং তার সাথে জড়িত একজন মানুষের গল্প বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে সম্মান ও শ্রদ্ধা।

গত ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম তল্লা এলাকায় বায়তুস সালাত জামে মসজিদে লিক হওয়া গ্যাসের বিস্ফোরণে নামাজ পড়া অবস্থায় অর্ধশতাধিক মুসল্লি দগ্ধ হওয়ার খবরটি জানা যায়। এ পর্যন্ত মসজিদের ইমামসহ ৩০ জন মুসল্লি মৃত্যুবরণ করেছেন।

অপর মসজিদটির নাম 'বায়তুর রউফ' জামে মসজিদ। ঢাকার দক্ষিণখানে অবস্থিত এই মসজিদের শৈল্পিক নকশার  জন্য ২০১৮ সালে স্থপতি হিসেবে 'জামিল প্রাইজ' লাভ করেন মেরিনা তাবাসসুম। এর আগে একই নকশার জন্য ২০১৬ সালে তিনি সম্মানজনক আগা খান পুরস্কার পান। সুলতানি আমলের স্থাপত্যের আদলে নকশাকৃত এ মসজিদটি ২০১২ সালে ঢাকায় নির্মিত হয়। এই মসজিদ ও তার স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমকে নিয়ে আরো কিছু বলবার আগে 'জামিল প্রাইজ' নিয়ে কিছু কথা বলতে হবে।

ইসলামি ঐতিহ্যে অনুপ্রাণিত সমসাময়িক কালের শিল্প ও নকশার জন্য একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের নাম 'জামিল প্রাইজ'। একবিংশ শতাব্দীর ইসলামি সংস্কৃতি নিয়ে চলমান ভাবনার অংশ হিসেবে বর্তমান সময়ের ইসলামি ঐতিহ্য ও অনুশীলন নিয়ে অনুসন্ধান করা 'জামিল প্রাইজ'- এর অন্যতম লক্ষ্য। সৌদি আরবের বাসিন্দা একজন দানবীর আবদুল লতিফ জামিল আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা জনহিতকর কাজে সহায়তার জন্য ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'জামিল কমিউনিটি' নামের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান।

পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে 'আর্ট জামিল'। ২০০৯ সালে লন্ডনে ভিক্টোরিয়া ও এলবার্ট মিউজিয়াম ও 'আর্ট জামিল' যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করে 'জামিল প্রাইজ'। প্রতি দুই বছর অন্তর পুরস্কারটি দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ২৭ জুন তারিখে ভিক্টোরিয়া ও এলবার্ট মিউজিয়াম হলে অনুষ্ঠিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ৫ম জামিল প্রাইজ যৌথভাবে লাভ করেন ইরাকে জন্মগ্রহণকারী শিল্পী মেহেদি মৌতাশার ও বাংলাদেশের স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম। ভিডিওতে অনুষ্ঠানটি দেখেছি এই লেখা শুরু করার আগে। আট জন চূড়ান্ত প্রতিযোগী যারা প্রত্যেকে শিল্পকলার নিজ নিজ ভুবনে প্রথিতযশা তাদের সৃষ্টি কর্মের সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখেছি। তাদের মধ্য থেকে বেঁছে নেওয়া হয় মেরিনা তাবাসসুম ও মেহেদি মৌতাশারকে। এই প্রথম স্থাপত্যকর্মের জন্য 'জামিল প্রাইজ' দেওয়া হলো।

এখন 'বায়তুর রউফ' জামে মসজিদ নিয়ে বলবো। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে মসজিদটি দেখতে যাওয়া এখনো হয়নি। তবে মসজিদ প্রাঙ্গণে মেরিনা তাবাসসুমের সাক্ষাৎকার এবং মসজিদের ইমাম এবং স্থানীয় মুসল্লিদের বক্তব্য বড় ভাল লেগেছে। ইচ্ছা আছে সরেজমিনে গিয়ে তা দেখে আসার। ২০১৬ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মেরিনা তাবাসসুম তার বক্তৃতার অংশ হিসেবে বায়তুর রউফ জামে মসজিদের উপর তৈরি ভিডিওটি দেখিয়ে ছিলেন। প্রচলিত গম্বুজ বা মিনার কোনটাই নেই এই মসজিদে। এর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রশস্ত খোলা জায়গা। আকাশ, বাতাস– প্রকৃতির সাথে চমৎকার সাযুজ্যে নকশা করেছেন মেরিনা তাবাসসুম। ফাঁক রেখে রেখে লাল ইটের গাঁথুনিতে গড়া বহিরাবরণ দেয়ালের দু্ইপাশ সমন্বিতভাবে বহন করছে বিশাল ছাদের ওজন ও সম্ভব করছে আলো-বাতাসের অবাধ প্রবেশ। সব মিলিয়ে ফল হয়েছে বিস্ময়কর! একতলা ছাদ ও দেয়াল থেকে প্রচুর আলো এসে পড়েছে মসজিদের অভ্যন্তরে। আলোর বন্যা প্লাবিত করছে মসজিদের অঙ্গন। একদিক থেকে অন্যদিকে বাতাস বয়ে যাচ্ছে এই মসজিদে। তাই গরমে স্বস্তির জন্য কোন শীতাতপ যন্ত্রের প্রয়োজন পড়েনি।

স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের ভাবনার সাথে পরিচিত হয়েছি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতা এবং বন্যা ও প্লাবনের বাংলাদেশের কথা মনে রেখে বাসগৃহের নকশা করার বিষয়াদি থেকে। শিক্ষা জীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, তিনি খুবই দেশজ। বললেন,  তিনি 'মেইড ইন বাংলাদেশ'! তবে হলিক্রস স্কুল ও কলেজ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের কথা বলতে গিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করলেন কিভাবে দেশজ আবহের সাথে  যুক্ত হয়ে গিয়েছিল পশ্চিমের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ছোঁয়া। মনন গঠনে কিভাবে পূব ও পশ্চিমের মিলন ঘটে গিয়েছিল। প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ নয়, তাকে গভীরভাবে অধ্যয়ন ও অনুসরণ করে একনিষ্ঠভাবে আপন কাজে তার প্রতিফলন ঘটানো– এমন এক দর্শনের পূজারি মনে হলো তাকে। প্রকৃতির অংশ হিসেবে মানুষকে দেখা এবং সে অনুযায়ী তার চাহিদা পূরণে আবাসস্থল, প্রার্থনার জায়গা, বহুতল ভবন, মিউজিয়াম ও নানা প্রয়োজনের ভবনের শৈল্পিক স্থাপত্য নকশা মেরিনা তাবাসসুম করেছেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তার নকশায় তৈরি হয়েছে আকাশে উঠে যাওয়া আলোর স্বাধীনতা স্তম্ভ।  এভাবেই তৈরি হয়েছে তার আপন ভাবনার ভুবনটি। কেবল একজন স্থপতি নয়, তিনি হয়ে উঠেছেন বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রসর চিন্তক। করোনা মহামারী-উত্তর সমতার পৃথিবী গড়ার জন্য এমন প্রবুদ্ধ মানুষের বড়ই প্রয়োজন অসংগতি ও অসাম্যে ক্ষত-বিক্ষত বর্তমান ধরিত্রীতে।

আমাদের নজরে তেমন আসেনি সে সংবাদটি।  ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ তারিখে স্থানীয় একটি দৈনিকে জানানো হয় সংবাদটি। বহুল সমাদৃত ব্রিটিশ সাময়িকী  'প্রসপেক্ট' ১৪ জুলাই, ২০২০ তারিখে বিশ্বের শীর্ষ ৫০ জন চিন্তাবিদের নাম প্রকাশ করে, যাদের মধ্যে মেরিনা তাবাসসুম ছিলেন ১০ম । পরে নির্বাচিত ৫০ জনের মধ্য থেকে শীর্ষ  ১০ জন নির্বাচনের জন্য ২০ হাজার গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ভোট গ্রহণ করা হয়। সেখানে ৩য় স্থান লাভ করেন মেরিনা তাবাসসুম। উল্লেখ করা দরকার যে শীর্ষ দশের সাত জনই নারী। প্রসপেক্টের রিপোর্টে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের এক বাস্তব সমস্যার দিকে মনোনিবেশ করেছেন মেরিনা তাবাসসুম। বন্যার সময় পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও নদী ভাঙনে উদ্বাস্তু মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে এমন ঘরবাড়ির নকশা তিনি করেছেন, যা সহজে সরিয়ে নেয়া যাবে নিরাপদ যায়গায়। নদী সিকস্তি মানুষের ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত আইন জারি হয়েছিল ১৯ শতকে। যে জমি পানির নিচে, সে জমির মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে বংশ পরম্পরায়। তাই নদী সিকস্তি মানুষ স্বপ্ন দেখে নতুন জেগে ওঠা ভূমির, যেখানে আবার নতুন বসতি করবে সে। তাদের কথা ভেবে সহজে খুলে অন্য জায়গায় নিয়ে আবার ঘর তোলার কথা ভেবেছেন মেরিনা তাবাসসুম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বদ্বীপ অঞ্চলের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য যে বিপর্যয় ও দুর্ভোগ ডেকে আনবে, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার চিন্তাও আমাকে এমন বাড়িঘর তৈরিতে উদ্ভুদ্ধ করেছে।"

এবারে ফিরবো যে মসজিদের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেই আগুনে দগ্ধ নারায়ণগঞ্জের বায়তুস সালাত মসজিদের কথায়। এ ব্যাপারে  বিবিসি  বাংলা গুরুত্বপূর্ণ কিছু রিপোর্ট করেছে।  ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিবিসির কাদির কল্লোল তার রিপোর্টে ইসলামি চিন্তাবিদদের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে বলেন, "ইসলামি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, একেবারে নিষ্কণ্টক জমি না হলে এবং পুরোপরি স্বচ্ছতা ছাড়া কোন মসজিদ নির্মাণ করা যায় না।" মসজিদের ইমামদের একটি সংগঠন জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব এবং লেখক মো. ওসমান গণি জানাচ্ছেন, "ইসলাম ধর্মে মসজিদ নির্মাণে পুরোপুরি স্বচ্ছ থাকার কথা বলা হয়েছে।" বিবিসির রিপোর্টের গুরুত্বপূর্ণ আরো কিছু তথ্য নিচে দেখা যেতে পারে। 

"সারাদেশে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা তিন লাখের বেশি মসজিদ রয়েছে। ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের অধীনে রয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদসহ দেশে মাত্র চারটি মসজিদ। সরকারের ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ বলেছেন, মসজিদের জায়গার বৈধতা এবং নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় মনিটর করার জন্য কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোন কাঠামো নেই। অনেকদিন ধরে ঝুলে থাকা একটি নীতিমালার খসড়া এখন চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন। …বর্তমান ঘটনার পরে ধর্ম মন্ত্রণালয় মনিটরিংয়ের নীতিমালাকে আরও হালনাগাদ করে দ্রুত চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। […] জায়গার ব্যাপারে, যেমন খাসজমিতে মসজিদ করতে হলে অবশ্যই সরকারের কাছ থেকে সেই জমির বন্দোবস্ত নিতে হবে। আর বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের ব্যাপারে সেসব বিভাগের অনুমতি নিতে হবে। এই নিয়মগুলো অন্যদের সবার মতো মসজিদকেও মানতে হয়।"

"ইসলামী চিন্তাবিদদেরও অনেকে বলেছেন, অনেক সময় স্বার্থন্বেষী মহল সরকারি জায়গা, এমনকী নদী খাল দখলের ক্ষেত্রে মসজিদের ব্যানার ব্যবহার করে থাকে এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকে না। কিন্তু আবেগ এবং ধর্মীয় বিষয় হওয়ায় কর্তৃপক্ষও নীরব থাকে বলে তারা মনে করেন।"

সারা দেশে এভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বহু মসজিদ। দৃষ্টান্ত হিসেবে কয়েকটি উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। তুরাগ নদীর পুর্ব তীর ধরে বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে একটি সড়ক যুক্ত হয়েছে মিরপুরের মাজার রোডে। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশ ঘেঁষে অনেকগুলো মসজিদ। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড উদ্যোগ নিয়েছিল তুরাগ নদীকে অবৈধ দখলদার থেকে মুক্ত করতে। নদীর নতুন সীমানা পিলারও স্থাপন করেছিল। সীমানার ভেতরে পড়েছে এমন দখলদারদের সময়সীমা বেঁধে নোটিশও জারি করেছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট, যাতে তারা তাদের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেয়। একজন স্থানীয় এমপি হাইকোর্টে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন। একেবারে রাস্তার উপরে যে মসজিদগুলো বানানো হয়েছে, তাদের সরাবার ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড, অন্য কোন সরকারী প্রতিষ্ঠান অথবা বিচার বিভাগ– কারো কোন উদ্যোগ নেই।

'ধর্মীয় বিষয়' হওয়ায় হয়তো কর্তৃপক্ষ এখানে নীরব। আরো বহু উদাহরণ আছে। সোবহানবাগ মসজিদ দখল করে নিয়েছে ঢাকার ব্যস্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুইটি লেইন ও ফুটপাত।  পশ্চিম আগারগাঁও থেকে মিরপুরের দিকে যে ৬০ ফুট রাস্তা নামে পরিচিত সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে অবৈধ দখলদারদের বহু কষ্টে উচ্ছেদ করে, সেই রাস্তার আইল্যান্ডের একপাশের ফুটপাত ও রাস্তার অর্ধেকের বেশী জায়গা দখল করে নির্মিত মসজিদের দেয়ালে লোহার এঙ্গেল লাগিয়ে লেখা হয়েছে 'তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন'! এই মসজিদ সরানো যায়নি বা সরাবার উদ্যোগও নেয়া হয়নি।  এসব ক্ষেত্রেও সেই 'ধর্মীয় বিষয়' নিয়ে দ্বিধা ও শংকা।

দুইটা মসজিদের চিত্র ও সেই প্রসঙ্গে আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করে  মসজিদ প্রতিষ্ঠা এবং তার প্রতি সরকার, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের উদাসীনতা ও অপ্রয়োজনীয় অসহায়ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি। একজন জনবান্ধব এবং সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ শাসক আলোচিত দু'টো মসজিদের পরষ্পরবিরোধী অবস্থানকে বিবেচনায় নিয়ে কি করতে পারেন সে প্রসঙ্গে এবারে দৃষ্টিপাত করবো।

শুধু বাংলাদেশ নয়, খুবই উন্নত পশ্চিম বিশ্বের দেশগুলোতে চলতে থাকা বহুযুগের অসঙ্গতি, অন্যায় ও অবিচারের দিকে রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজ শুধুমাত্র তখনই দৃষ্টি দিয়েছে, যখন নিপীড়িত মানুষের নিষ্ঠুর জীবননাশের ঘটনা ঘটেছে। 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার'– এই বোধের যথার্থতা অনুধাবন করতে আমেরিকা ও পশ্চিম বিশ্বের দেশগুলোকে চারশো বছর ধরে সাদাদের হাতে কালো মানুষদের মৃত্যুর দৃশ্য দেখে যেতে হয়েছে। ভাবছিলাম এর কি অন্যথা হতে পারে না? বিশেষ করে বাংলাদেশে, যার জন্মই হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনদানের মধ্য দিয়ে।  তখনি প্রকৃত শাসকের কথাটি মনে এল।

বায়তুস সালাত মসজিদে ৩০জন অসহায় মুসল্লির অগ্নিদগ্ধ হয়ে করুণ মৃত্যুবরণ একজন দূরদৃষ্টি ও মানবিকবোধসম্পন্ন শাসকের সামনে যে কর্তব্য হাজির করতো- যা বিবিসির রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল তা হতে পারে নিম্নরূপ:

দ্রুত সারা দেশে সেইসব মসজিদের তালিকা তৈরি করা, যা বাংলাদেশের ইসলামি চিন্তাবিদদের বিবেচনায় 'স্বার্থন্বেষী মহল কর্তৃক সরকারি জায়গা, এমনকী নদী খাল দখলের উদ্দেশ্যে  মসজিদের ব্যানার ব্যবহার করে হয়েছে এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়নি'।

বিবিসির প্রশ্নের উত্তরে যেখানে 'জাতীয় ইমাম সমিতি' ও 'ইসলামিক ফাউন্ডেশন'-এর নেতারা ইসলামি ব্যাখ্যার উল্লেখ করে মসজিদ নির্মাণের সঠিক নিয়ম উল্লেখ করেছেন, সেখানে কেন একজন শাসক যে কাজ যুগ যুগ ধরে স্থগিত থেকে যাচ্ছে 'ধর্মীয় বিষয়'–এর ধোঁয়া তুলে, তা নিরসনে তৎপর হতে পারবেন না।  

এ প্রসঙ্গে সংসদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। আইনের তোয়াক্কা না করে গড়ে তোলা মসজিদের দিকে তিনি সুদৃষ্টি দিয়েছেন। আমরা আশা করবো পরিকল্পিতভাবে এসব মসজিদ উপযুক্ত যায়গায় সরিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশনাও তিনি সকলের সাথে আলোচনা করে দেবেন। তা না হলে  প্রধানমন্ত্রীর 'সুদৃষ্টি' সমস্যা সমাধানে কোন ভূমিকা রাখবে না। তুরাগ নদী পার্শ্বস্থ রাস্তা দখল করে গড়ে তোলা মসজিদ বা সোবাহানবাগ ও মিরপুরগামী রাস্তা দখলকারী মসজিদ স্বস্থানে থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্ভোগ ঘটাতেই থাকবে।

একজন অগ্রসর চিন্তার শাসক অবশ্যই বায়তুর রউফ জামে মসজিদ ও তার স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের উদাহরণকে সামনে রেখে যে ৫৬০টি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা সরকার জানিয়েছে, তার পরিবেশ-বান্ধব স্থান নির্ধারণ,  স্বাভাবিক আলো-বাতাসের কথা বিবেচনায় রেখে স্থাপত্য নকশা (এসি'র প্রয়োজন যেখানে হবে না) ইত্যাদি কাজে মানবিক ও অগ্রসর চিন্তার মানুষদের কাজে লাগাবেন।

সে আশায় এ দেশের মানুষ অপেক্ষা করছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক