আর্ন্তজাতিক জাদুঘর দিবস: মহামারীর পরে কেমন হবে জাদুঘর ব্যবস্থাপনা?
জাদুঘরে সাধারণত মানব নির্মিত, ব্যবহৃত ও প্রভাবিত বস্তুগত নিদর্শনাদি সংরক্ষিত থাকে এবং সেগুলো সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রদর্শিত হয়। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চাহিদার প্রভাবে পূর্ববর্তী যুগের সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার ধারণাই পরে আধুনিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে।
১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক জাদুঘর কাউন্সিল (ICOM) এর ১০ম সাধারণ অধিবেশনে জাদুঘরের সংজ্ঞা হিসেবে বলা হয়েছে- A museum is a non profit making, permanent institution in the service of society and of its divelopment and open to the public, which acquires,conserves,researches communicates and exhibits for purpose of study, education and enjoyment, material evidence of man and his environment (Amborse and Paine 1993:8)|
আন্তর্জাতিক জাদুঘর কাউন্সিলের ১৯৭৪ সালে গৃহীত সংজ্ঞায় শুধু মানুষ এবং তার পরিবৈশিক প্রেক্ষিতের বস্তুগত উপাদানের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণা, যোগাযোগ এবং প্রদর্শনের বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে সংজ্ঞাটি যুগের চাহিদা ও বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে ২২ তম সাধারণ অধিবেশনে মানবতার সাথে সম্পৃক্ত বস্তগত ও অবস্তুগত উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করে পুনরায় নিম্নরূপভাবে সংজ্ঞা গৃহীত হয়- A museum is a non-profit, permanent institution in the service of society and its development, open to the public, which acquires, conserves, researches, communicates and exhibits the tangible and intangible heritage of humanity and its environment for the purposes of education, study and enjoyment (URL-1) .
সংজ্ঞা ও ধারণার আলোকে বলা যায় জাদুঘর হল সমাজ, জাতি ও দেশের দর্পণ। একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতিকে দেশী-বিদেশী দর্শকের কাছে তুলে ধরতে জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। অতীতে জাদুঘরকে একটি একক, স্বতন্ত্র এবং বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হত। কিন্তু বর্তমান কালের ধারণা অনুযায়ী জাদুঘরকে সমাজ সম্মিলন কেন্দ্র ও শিক্ষালয় হিসেবে ধরা হয়।
বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী এই উপলব্ধি লক্ষ্য করা যায় যে, জাদুঘরসমূহ জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপকভিত্তিক অবদান রাখতে পারে এবং জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত নিদর্শন কেন্দ্রিক প্রামাণ্য শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাদুঘরই আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত । জাদুঘরে গেলে মানুষ তার শেকড়ের টান অনুভব করে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষিতে জাদুঘর একটি আধুনিক অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রূপে উৎকর্ষ লাভ করেছে (Amborse and Paine 1993); যেখানে একটি জাতি, গোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত নিদর্শনাদি সংগৃহীত, সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতিহাসের শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে বিকশিত হওয়ার ব্যবস্থা থাকে। ফলে জাদুঘরকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গণবিশ্ববিদ্যালয় রূপেও গণ্য করা যায়।
একুশ শতকের জাদুঘর হচ্ছে স্মৃতি, নান্দনিক, উত্তরাধিকারের দলিল, বুদ্ধিদীপ্ত নব্য চেতনার বাহক, সংস্কৃতি ও সমাজের জ্ঞান ভাণ্ডার। যেহেতু জাদুঘরে বস্তুগতভাবে যে সংস্কৃতি উপস্থাপিত তা অনেক বেশি মনন, প্রাসঙ্গিকতা, ব্যবহার, বিশ্বাস, যুক্তি, নন্দনতত্ত্ব এবং বিশ্বমানবের অর্জিত জ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যায়িত হওয়া উচিত এবং তখনই জাদুঘরের শিক্ষা সমাজের বহুমুখী সাংস্কৃতিক উন্নয়নে, জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধিতে, জনগোষ্ঠীর কল্যাণে, টেকসই সমাজ গঠনে বর্তমান যুগের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে (হুদা,২০০২:৩২)। জাদুঘরে শুধু গ্যালারি পরিদর্শনই নয়, প্রদর্শনীতে রয়েছে জনশিক্ষা বা শিক্ষামূলক কার্যক্রম। এছাড়াও নানাবিধ শিক্ষমূলক কার্যক্রম জাদুঘরে পরিচালিত হয়ে থাকে। এ সকল কার্যক্রমের মাধ্যমে সর্বস্তরের দর্শক ও দেশি-বিদেশি গবেষকদের জাদুঘরে নিদর্শন কেন্দ্রিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে জাদুঘরের নিদর্শনের সাথে ওতপ্রোতভাবে দর্শক ও গবেষকদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্বের জাদুঘরসমূহে দর্শকদের ওপর বহুমাত্রিক গবেষণা, প্রদর্শন উন্নয়নের ওপর কাজ করা শিক্ষামূলক কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে (হুদা,২০০২:৩২)। ফলে জাদুঘরে শিক্ষাবিদদের কর্মক্ষেত্রও বেড়ে গেছে। একুশ শতকে জাদুঘরের শিক্ষা কেবল সাধারণ শিক্ষা কর্মসূচি নয় বরং দুটো নতুন বিষয়ে সংযোজন ঘটেছে। তা হলো কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ এবং ইন্টারপ্রিটেশন বা ব্যাখ্যা প্রদান (হুদা,২০০২:৩২)। এক্ষেত্রে নিদর্শন প্রর্দশনীর ক্ষেত্রে নান্দনিকতা, বৈচিত্র্যময়তা ও শিক্ষার পাশাপাশি দর্শক, গবেষক বা শিক্ষার্থীর ব্যাখ্যার আদান- প্রদানের এবং তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান করে অর্ন্তভূক্তিমূলক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হয়। নিদর্শনের ব্যাখ্যা দেওয়া বাস্তবে একটি জটিল ও দুরূহ বিষয়।
সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া ও তা নানা ধরনের দর্শক, জনগোষ্ঠীকে তাদের জ্ঞান ও মননের পরিসীমার মধ্যে ব্যাখ্যা ও তথ্যের পরিপূর্ণ সংযোগ ঘটানোর মধ্যে একুশ শতকের জাদুঘর শিক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়নের চাবিকাটি নিহিত (হুদা,২০০২:৩২)। ফলে জাদুঘর নিদর্শন সম্বলিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রদর্শন কেন্দ্র হিসেবে অনেক বেশি সৌহার্দ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাদুঘর ব্যক্তি, গোষ্ঠি ও জাতিগত সামগ্রিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্মৃতি ও ইতিহাসের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে । জাদুঘর অর্থবহ সাংস্কৃতিক বিনিময়, সাংস্কৃতিক সম্মৃদ্ধি, গবেষণা, পারস্পরিক সম্প্রীতি, যোগাযোগ এবং শান্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর কাউন্সিল
বিশ্বব্যাপী জাদুঘর এবং জাদুঘর পেশায় নিয়োজিতদের মধ্যে সর্বোত্তম মানদণ্ড নির্ধারণ, কূটনৈতিক ফোরামে নেতৃত্ব প্রদান, থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করা ও আন্তর্জাতিক মিশন পরিচালনাসহ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে ১৯৪৬-৪৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়াম (আইসিওএম) গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটি বিশ্ব জাদুঘর সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং বিশ্বব্যাপী জাদুঘর পেশায় নিয়োজিত পেশাদারদের প্রয়োজন অনুসারে বিকশিত হয়েছে (URL-2) ।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস
আইসিওএম ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতি বছর সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে ১৮ই মে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালন করছে। সমাজ ও গোষ্ঠীর উন্নয়নে জাদুঘরের ভূমিকা ও গুরুত্বের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জনসচেনতা বৃদ্ধির লক্ষেই প্রতিবছর আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয় ।
সমতার জন্য জাদুঘর-বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি
২০২০ সালের আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে আইসিও প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে "সমতার জন্য জাদুঘর: বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্ত"। প্রতিপাদ্যটি নির্ধারনের ক্ষেত্রে আইসিওএম উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করেছে যে, জাদুঘর সম্প্রদায় ও জাদুঘর কর্মী উভয়ের বৈচিত্র্যময় ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দিবসটি উদযাপন করা। জাদুঘরের প্রদর্শনী ও বর্ণিত গল্পে কোনো ধরনের পক্ষপাত রয়েছে কিনা তা শনাক্তকরণ এবং সমস্যাগুলি কাটিয়ে ওঠার সেরা উদ্যোগ ও উপকরণ উদ্ধাবন করাই হবে এ প্রতিপাদ্যের সার্থকতা। সামাজিক পরিবর্তনের জন্য ক্রমবর্ধমান জনসাধারণের প্রত্যাশা এবং জাদুঘরের প্রদর্শনী, সম্মেলন, পারফরম্যান্স, শিক্ষা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক উন্নতির সম্ভাবনার আলোচনাকে উৎসাহিত করে (URL-3)। এবারের প্রতিপাদ্যে -সমতা, বৈচিত্র্য ও অর্ন্তভূ্ক্তি তিনটি গুরত্বপূর্ণ প্রত্যয় যুক্ত রয়েছে। এ পরিসরে সংক্ষিপ্তভাবে শব্দ তিনটির সংজ্ঞার আলোকে প্রতিপাদ্যটিকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন রয়েছে।
সমতা
ন্যাশনাল মিউজিয়াম ওয়েলস সমতাকে নিম্নোক্তভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে- 'সমতা হলো বাধা অতিক্রম ও বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং পণ্য সরবরাহ, সেবার উভয় ক্ষেত্রে সুযোগ ও প্রবেশাধিকারের নিশ্চয়তা। এ অধিকারটি আইন দ্বারা সমর্থিত ও সুরক্ষিত হওয়াই হলো গুরুত্বপূর্ণ (URL-4) ।'
বৈচিত্র্য
বৈচিত্র্যকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে-
বৈচিত্র্য হলো মানব-পার্থক্যের পরিসীমা, যার মধ্যে গোষ্ঠি, জাতি, লিঙ্গ, লিঙ্গ পরিচয়, যৌন দৃষ্টিভঙ্গি, বয়স, সামাজিক শ্রেণি, শারীরিক ক্ষমতা বা বৈশিষ্ট্য, ধর্মীয় বা নৈতিক মূল্যবোধ ব্যবস্থা, জাতীয় উৎস এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈচিত্র্যকে পৃথকভাবে উদযাপন এবং প্রত্যেককে মূল্যবান হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে। প্রতি ব্যক্তি দৃশ্যমান এবং অ-দৃশ্যমান পার্থক্যসহ এবং এটি সম্মানের দ্বারা স্বতন্ত্র । প্রত্যেকে তাদের অবদানের জন্য মূল্যবান বোধ করতে পারে (URL-4)। মানুষের আচরণের সংস্কৃতি, মেধা, সাহিত্য, কর্ম কুশলতা, ভাষা—সবকিছুই অনন্য। এই অনন্যতাকে মেনে নেওয়া, প্রতিটি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় নান্দনিক বিষয়গুলোকে আহরণ ও আত্তীকরণের ইচ্ছাই পারে একটি সমাজকে বৈচিত্র্যময় করে তুলতে। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সমাজবদ্ধ মানুষের বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান। ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিকাশের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ। প্রয়োজন বৃহত্তর সমাজের মানস জগৎকে উদার, মানবিক এবং নান্দনিকতাকে গ্রহণ করার উপযোগী করে গড়ে তোলা (URL-6)। সংস্কৃতি, ধর্ম, বর্ণ এবং ভাষার বিভিন্নতা সত্বেও বিশ্বে বসবাসের ক্ষেত্রে সকলে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। পারষ্পারিক বোঝাপড়া, সহিষ্ণুতা এবং বন্ধুত্বকে এগিয়ে নিতে জাদুঘর সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে।
অন্তর্ভুক্তি
অন্তর্ভুক্তি হলো সম্পৃক্ত হওয়া এবং ক্ষমতায়ন, যেখানে সমস্ত মানুষের সহজাত মূল্য এবং মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে একটি জাদুঘর তার প্রচার ও অন্তর্গত একটি ধারণার স্বকীয়তা বজায় রাখে; এবং জাদুঘর কর্মীর মেধা, বিশ্বাস, প্রেক্ষিত এবং জীবনযাপনের পদ্ধতির মর্যাদাকে সন্মান প্রর্দশন এবং অনুশীলন করে (URL-4)। এসডিজি ৪ এর মূল লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা ও জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রসার। এসব বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে অঙ্গীকার ও প্রাধিকারের বিষয়গুলি আলোচনার মাধ্যমে জাদুঘরকে প্রসঙ্গিক করণের সুযোগ রয়েছে।
কোভিড-১৯ পরবর্তী অবস্থা ও কাঠামোতে জাদুঘর দিবসে আইসিওএম এর ভাবনা
কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব এবং লকডাউন পরবর্তী অবস্থা ও কাঠামোকে বিবেচনায় নিয়ে জাদুঘর দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ক্রিয়াকলাপগুলিতে ফোকাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলমান বৈশ্বিক মহামারীকালে জনসাধারণ এবং জাদুঘর কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সাথে সাথে জাদুঘরের প্রদর্শনী, উদ্ধাবনী কার্যক্রম এবং জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্য ও মূল্যবোধগুলি প্রচার করতে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। মহামারীকাল কেটে গেলেও স্থায়ী কার্যক্রমের আওতায় জাদুঘরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যময় প্রর্দশন, প্রচার-প্রসারে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করা অত্যন্ত হয়ে উঠেছে। বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নান্দনিক ও বৈচিত্র্যময় প্রদর্শনীর মাধ্যমে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বৈশ্বিক গ্রামে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিস্তৃতির সুযোগ রয়েছে। এ ব্যবস্থায় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমতা প্রতিষ্ঠার অবারিত সুযোগ তৈরি হবে ।
জাদুঘরগুলি কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবে লকডাউন কালীন অবস্থা ও কাঠামোতে এবং লকডাউন পরবর্তী নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থায়ী কাঠামোতে কীভাবে তাদের ডিজিটাল ক্রিয়াকলাপ করতে পারে এসকল বিষয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। সরকারী, বেসরকারী ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জাদুঘরগুলি ওয়েবের সম্ভাব্যতা কাজে লাগিয়ে কিভাবে বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারে-এসকল বিষয়ে নীতি নির্ধারনী মহলে ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বের সাথে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। জাদুঘর কর্মীদেরকে নতুনমাত্রায় গবেষণা ও চিন্তার মাধ্যমে কনটেন্ট ও কলা কৌশল নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং অনলাইন সমীক্ষার মাধ্যমে জেনে নেওয়ারও প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে ভার্চুয়াল জাদুঘরে দর্শকের চাহিদা।
আইসিওএম ইতিমধ্যে সম্ভাব্য ক্রিয়াকলাপগুলির একটি তালিকা তৈরি করেছে। সংস্থাটি চিহ্নিত যেসব কাজের মাধ্যমে জাদুঘরগুলি তাদের জনসাধারণের কাছে দূরবর্তীভাবে পৌঁছানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে সেগুলো হলো (URL-5):
কণ্ঠস্বর
জাদুঘর পরিচালক এবং কিউরেটররা তাদের সংগ্রহগুলি নিজেরাই স্বকণ্ঠে বর্ণনা করতে পারেন। "কিউরেটরকে জিজ্ঞাসা করুন" বা এ ধরনের ইভেন্ট ও উদ্যোগ চালু করে কিউরেটররা নিজের কণ্ঠে বর্ণনা ও প্রশ্নোত্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। সম্প্রতি মিশরের তুরিন জাদুঘরে এধরনের ডিজিটাল কর্মসূচি নিয়েছে বলে জানা যায়। এ ব্যবস্থায় ক্রমান্বয়ে সকল জাদুঘর কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, দর্শক ও জনগোষ্ঠীকে অর্ন্তভূক্ত করা যায় এবং জাদুঘরের সংগ্রহ ছাড়াও চলমান বৈশ্বিক মহামারীর এ সংকটকালীন অভিজ্ঞতার কথা আদান-প্রদান করা যায়। সংকটকালীন অভিজ্ঞতার কথা আদান-প্রদানের মাধ্যমে দুরে থেকেও কাছে থাকার অনুভূতি তৈরির মাধ্যমে মানসিক চাপমুক্ত থাকার প্রচেষ্টা নেওয়া যায়।
শ্রোতা
ডিজিটাল কার্যক্রমগুলি ধাপে ধাপে সংগঠিত করার জন্য আইসিওএম কর্তৃক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এজন্য টার্গেট গ্রুপ নির্দিষ্ট করে জনতাত্ত্বিক চার্ট (যেমন শিশু, প্রবীণ নাগরিক, গবেষক, ইত্যাদি) ও সিডিউল/ ক্যালেন্ডার তৈরি করা যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, সান ফ্রান্সিসকো এক্সপ্লোরেরিয়াম জাদুঘর শিশুদেরকে করোনাভাইরাসের পিছনের বিজ্ঞানটি বোঝার জন্য এবং কীভাবে সংক্রমণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায় তা জানার জন্য অনলাইনে তথ্য সরবরাহ করছে (@San Francisco's Exploratorium website)। বয়স্ক ব্যক্তি বা সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলি সম্পর্কে চিন্তা করা প্রয়োজন। জাদুঘর সংলগ্ন এসকল জনগোষ্ঠির সামগ্রিক সুস্থতা কথা বিবেচনায় নিয়ে ভয় এবং আত্ম-বিচ্ছিন্নতার প্রভাবগুলি থেকে দুরে রাখার জন্য কর্মকৌশল ও কনটেন্ট নির্ধারণ করার খুবই জরুরী।
মাধ্যম
টার্গেটগ্রুপ ও ক্যালেন্ডার নির্ধারণের পর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ডিজিটাল মাধ্যম ও ভাষা ব্যবহারের প্রসঙ্গগুলো নির্বাচন করতে হবে। ডিজিটাল সম্ভাবনাগুলি অফুরন্ত তবে মনে রাখতে হবে যে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্সেসযোগ্যতার প্রতিশব্দ নয়। দূরত্ববর্তী অঞ্চল যেখানে সীমিত ইন্টারনেট অ্যাক্সেস রয়েছে সেসকল দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচার, টেলিভিশন সম্প্রচারের সুযোগ গ্রহণও বিবেচনা নেওয়া যেতে পারে। ফ্রান্স এবং বেলজিয়াম জুড়ে লকডাউনে প্রবীণদের কাছে চিঠি লিখতে the One Letter, One Smile নামে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাদুঘর সংলগ্ন কমিউনটিতে এধরণের উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে পোস্টকার্ড চালু করে চিঠি লিখতে উৎসাহিত করতে পারে। চিঠি লিখতে আগ্রহীগণ জাদুঘর থেকে পোস্টকার্ড সংগ্রহ করে প্রিয়জনদের কাছে চিঠি লিখতে পারে।
সূচি (কনটেন্ট)
জাদুঘরের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও শ্রোতার সাথে প্রাসঙ্গিকতা এবং মাধ্যমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ গল্প বলতে, আনন্দ করতে ও তথ্যের আদান প্রদান করতে সূচি (কনটেন্ট) নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শ্রোতাদের অর্ন্তভূক্তি জন্যে ও কনটেন্টগুলি বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে শুধুই নিদর্শন কেন্দ্রিক গল্পের কনটেন্ট হবে নাকি বৈচিত্র্যপূর্ণ কিংবদন্তি বা জনশ্রুতি বা মিথলজিকে সম্পৃক্ত করা হবে, নাকি সমসাময়িক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সচেতনতা ও সাহসের গল্পগুলি করা হবে এবিষয়ে জাদুঘর কমিউনিটির আর্ত-সামাজিক অবস্থার আলোকে কিউরেটরের নির্ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। কীভাবে গল্পটিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায় সে সম্পর্কে তিনটি উদাহরণ সংযুক্ত করেছে আইসিওএম ওয়েবসাইটে। এ পরিসরে উদাহরণ তিনটি আলোচনা করা গেল না। তবে নিন্মোক্ত উদাহরণ তিনটি আইসিওএম ওয়েবসাইটে দেখা যেতে পারে (URL-5) :
1. This great twitter thread comparing Ancient Egyptian amulets and hand sanitizers ; 2. The Carnegie Museum of Natural History Titktok account and their snail jokes, quite successful!; 3. The British Museum's LGBTQ histories trail or the work of the V&A's LGBTQ working group.
বাংলাদেশের জাদুঘর ব্যবস্থাপনা নিয়ে পর্যালোচনা ও প্রস্তাব
কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবে লকডাউনকালীন অবস্থা ও কাঠামোতে এবং লকডাউন পরবর্তী নিয়মিত কর্মকাণ্ডে জাদুঘর ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্তি, বৈচিত্র্য ও সমতাকে প্রাধান্য দিয়ে ক্ষেত্র পর্যালোচনা ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করা সময়ের দাবি। প্রজন্মান্তরে ও সর্বস্তরের জনসাধারণের মধ্যে একুশ শতকের যুগোপযোগী নিদর্শন কেন্দ্রিক শিক্ষা প্রদানের জন্য জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি আউটরিচ বা বহির্বিভাগীয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বে সাথে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে।
ভার্চুয়াল জাদুঘর প্রদর্শনী
আধুনিক তথ্য কমিউনিকেশনের যুগে জাদুঘর শিক্ষা কার্যক্রমে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জাদুঘর প্রর্দশনীর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। ভার্চুয়াল জাদুঘর প্রর্দশনীর মাধ্যমে জাদুঘরের গ্যালারি ও গ্যালারিতে প্রদর্শিত গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের তথ্য ও আলোকচিত্রের সমন্বয়ে বিশ্বগ্রামে প্রবেশ করা যায়। বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নান্দনিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বৈশ্বিকগ্রামে অর্ন্তভূক্তিমূলক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এ ব্যবস্থাটিতে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমতা প্রতিষ্ঠার অবারিত সুযোগ সৃষ্টির অবকাশ রয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা
জাদুঘরের স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা অর্ন্তভূক্ত করা প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবে গ্রাম কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ও শিক্ষার্থী শহরে এসে জাদুঘর পরিদর্শন করতে পারে না। এক্ষেত্রে জাদুঘরের নির্বাচিত কিছু নিদর্শন, গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের রেপ্লিকা বা রিপ্রডাকশন ও আলোকচিত্রের সমন্বয়ে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর স্থাপন করে প্রান্তিক পর্যায়ে মানুষের কাছে নিদর্শন-প্রদর্শনের মাধ্যমে নিদর্শন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। এভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে অর্ন্তভূক্তির মাধ্যমে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে পরস্পারিক মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে সঠিক ও প্রামাণ্য শিক্ষা প্রদান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে এটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মতোই কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে সর্বসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
জাদুঘরের স্কুল কর্মসূচি
কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবে লকডাউন কালীন অবস্থায় স্কুল কর্মসূচিটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চালু করার সুযোগ রয়েছে। এই মহামারিকালে অসহনীয় গৃহবন্ধী অবস্থায় টেরিস্টোরিয়াল টেলিভিশন চ্যানেল সংসদ টেলিভিশনে এ ধরণের স্কুল কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। তাহলে বৈচিত্রপূর্ণ নিদর্শনগুলি ঘরে বসে শিশুরা দেখতে পারবে এবং গৃহবন্ধীত্বের অসহনীয় সময়ে গুণগত বিনোদনের সুযোগ পাবে। এক্ষেত্রে কুইজ ও পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকলে কর্মসূচিটি উভয়মূখী যোগাযোগের মাধ্যমে অর্ন্তভূক্তিমূলক হয়ে উঠতে পারে।
জাদুঘরের স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে স্কুল কর্মসূচি অর্ন্তভূক্তির কাঠামো দাঁড় করাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন শিশু- কিশোর সংগঠনের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় তাকে স্কুল কর্মসূচি বলা হয়। এই প্রোগ্রামের আওতায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গ্যালরিতে নিয়ে নিদর্শন সম্পর্কিত বিস্তর শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা থাকে। স্কুল কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিদর্শন সম্পর্কীয় শিক্ষা প্রদান প্রসঙ্গে ১৯৭৩ সালে Lawson and Silver বলেন, স্কুল কর্মসূচির প্রধান বৈশিষ্ট হলো নির্দশন পাঠ। সকল শ্রেণির শিশুর মধ্যে নিদর্শন সংক্রান্ত জ্ঞান জন্মানো নিদর্শন শিক্ষার উদ্দেশ্য। নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণে তাদের অস্তিত্ববোধ সম্পর্কে জ্ঞান জন্মাতে সহায়ক হবে, যা তাদের প্রকাশভঙ্গি ও বিচারবুদ্ধি জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উপযুক্ত কর্মপরিকল্পনা এবং দক্ষতায় জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে।
জাদুঘর শিক্ষার প্রধান গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো স্কুল শিক্ষা ( আলী; ২০০৫: ০৫-০৭ ) । সাধারণত স্কুল কর্মসূচি দুই ভাবে পরিচালিত হতে পারে:
ক. জাদুঘরের পরিবহনে আসা শিক্ষার্থী এবং
খ. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহনে আসা শিক্ষার্থী।
সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সমন্বয় এই স্কুল প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীগণ জাদুঘরে আসার পর জাদুঘরের একজন শিক্ষা কর্মকর্তা সূচনা বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে প্রদর্শক প্রভাষক সকল গ্যালারিতে নিয়ে নিদর্শন সম্পর্কে শিক্ষার্থীর চাহিদা অনুযায়ী তথ্য প্রদান করে। গ্যালারি পরিদর্শন শেষে জাদুঘরের মিলনায়তনে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকে। জাদুঘরের শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক ডাকযোগে অথবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি স্কুলের সাথে এই প্রোগ্রামের বিষয়ে যোগাযোগ স্থাপন এবং তদানুযায়ী সিডিউল তৈরি করে স্কুল প্রোগ্রামের আয়োজন করা যেতে পারে । বাংলাদেশের জাদুঘরসমূহে এধরনের স্কুল কর্মসূচি চালু থাকলেও অধিকাংশ জাদুঘরের স্থায়ী কাঠামো নাই। জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও গবেষণার সীমাবদ্ধতার কারণে এ কর্মসূচিটি গতিশীল নয়। ফলে জাদুঘর ব্যবস্থাপনার সাংগঠনিক কাঠামোতে স্কুল কর্মসূচি অর্ন্তভূক্ত করা যেতে পারে।
কথ্য ইতিহাস ও স্মৃতিচারণ লিখন
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ,ইতিহাস, কিংবদন্তি, জনশ্রুতি, মিথলজি ও অগ্রজ প্রজন্মের স্মৃতিচারণ নতুন প্রজন্মের মধ্যে উপস্থাপনের জন্য অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে কথ্য ইতিহাস ও স্মৃতি চারণ ধারণ করা যেতে পারে। এ সম্পর্কিত যে কোনো ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্মৃতিচারণমূলক লিখনের আয়োজনও করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রবীণ প্রজন্মের নিকট থেকে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল কথ্য ইতিহাস বা স্মৃতিচারণ সংগ্রহ করে তা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করবে। কর্তৃপক্ষ প্রাপ্ত স্মৃতিচারণগুলো আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যথাযথ সংরক্ষণ এবং নিজস্ব প্রকাশনায় প্রকাশের ব্যবস্থা করতে পারে। এধরণের উদ্যোগের ফলে অগ্রজ প্রজন্ম তাঁদের গৌরবগাথা নতুন প্রজন্মের মধ্যে উপস্থাপন করে গর্ব অনুভব করবে। অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম সরাসরি নিজের বর্ণাঢ্য ঐতিহ্য সম্পর্কে জেনে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারবে। সামাজিক ও পারিবারিক এ সম্মিলনের আয়োজনের মাধ্যমে জাদুঘরও কালের স্বাক্ষী হয়ে পরম্পরা সুরক্ষা করতে পারে। প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক এ এফ সালাহ্উদ্দিন আহমদ আশির দশকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে কথ্য ইতিহাস নামে একটি প্রকল্প চালু করেছিলেন। দেশ ও কালের পটভূমিতে মানুষ রাষ্ট্রসাধনা,মননশীলতার অনুশীলন, বিচিত্র উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল কর্মের মধ্য দিয়ে নিরন্তর যে ইতিহাস সৃষ্টি করে চলে তা সংরক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। সমকালীন ইতিহাসের উপাদানসমূহ যথোপযুক্তভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় বহু ঐতিহাসিক ঘটনার স্বরূপ এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ের সঠিক ব্যাখ্যা উত্তরকালের মানুষের কাছে পৌছাতে পারে না। সমকালীন ইতিহাসের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা উপলব্দি করে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থানুকুল্যে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে 'কথ্য ইতিহাস প্রকল্প' চালু হয় (আহমদ;১৯৯১:৫) । অধিকন্তু সমাজ ও গোষ্ঠির মধ্যে জাদুঘরকে জনপ্রিয় করে তুলতে, গোষ্ঠিগত অর্ন্তভূক্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এবং সাংস্কৃতিক পরম্পরা বহন করে চলতে এ ধরণের কার্যক্রম খুবই ফলপ্রসু হতে পারে। বাংলাদেশের জাদুঘরগুলিতে তাদের ভিশন–মিশনের সাথে সম্পৃক্ত করে এধরণের প্রকল্প চালু করা যেতে পারে।
সৃজনশীল চিঠি লেখা প্রতিযোগিতা
পোস্ট কার্ড চালু করে অথবা সোশ্যাল মিডিয়াতে সৃজনশীল চিঠি লিখন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে । জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং/ অথবা সংশ্লিষ্ট জাদুঘরের সাথে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে নির্বাচন করে জাদুঘরের দর্শকের নিকট সৃজনশীল চিঠি লিখে প্রেরণের জন্য আহবান করা যেতে পারে। সেরা চিঠি লেখকদেরকে পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে এবং নির্বাচিত কিছু চিঠি জাদুঘরের কোন প্রকাশনায় প্রকাশ করতে পারে। এধরণের সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে জাদুঘরমূখী করা গেলে সামাজিক বিভিন্ন অবক্ষয় থেকে শিশু- কিশোরদেরকে দুরে রাখার চেষ্টা করা যায়।
বস্তুনিষ্ঠ প্রদর্শনী পরিকল্পনায় সমতা আনয়নের নামে অপরাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রদর্শনী পরিকল্পনায় রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সকল প্রেক্ষাপটে বস্তুনিষ্ঠতা কাম্য। কতিপয় জাদুঘর কর্মীদের অতিউৎসাহী রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক বলয়ের অপরাজনীতির কারণে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর বিশেষ প্রেক্ষপটে প্রদর্শনী পরিকল্পনায় বস্তুনিষ্টতা প্রদর্শন করতে পারেনি। ফলে মূল্যবোধ ও মর্যাদার সংকটে পড়ে যায় জাদুঘর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৩-০৪ সালের দিকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কতিপয় কর্মীদের অতিউৎসাহী রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক বলয়ের অপরাজনীতির কারণে প্রদর্শনী পরিকল্পনায় সমতা আনয়নের নামে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে জাতির পিতা ও মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারকে সমমর্যাদায় এনে প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এভাবে কথিত সমতার নামে প্রদর্শনীতে অসমতা, হীনমন্যতা ও অস্থিরতাকে উস্কে দেয়।
আবার চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসটিকে জিয়া জাদুঘরে রূপান্তরের মাধ্যমে ক্ষমতা অপচর্চার মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ প্রদর্শনী পরিকল্পনা, আইন ও আর্ন্তজাতিক ভেনিস সনদকে অবজ্ঞা করা হয়। ১৯১৩ সালে নির্মিত চট্টগ্রামের সার্কিট হাউস নির্মাণে পর থেকে ভবনটির ব্যবহারের ক্ষেত্রে রয়েছে কালানুক্রমিক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষপট। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের কর্মীরা মাস্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে এ ভবন থেকেই অস্ত্র লুট করার (Ahmed; 1986:134.) ঘটনাটি চট্টগ্রাম তথা সমগ্র বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রানী এলিজাবেথ, মালয়েশিয়ার রাজা, মহাচীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন লাইসহ অনেক বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তিত্ব চট্টগ্রামে আগমন করেন এবং এই সার্কিট হাউসে অবস্থান করেছেন (হোসেন ও অন্যান্য সম্পাদিত,পৃষ্ঠা-৪০৭) । ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় দখলদার পাকিস্থানি বাহিনী দালানটিতে কুখ্যাত নিপীড়ণ ও হত্যাকেন্দ্র স্থাপন করে। এ সার্কিট হাউজে পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযুদ্ধকালে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চর্টার সেল স্থাপন করে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষদের ধরে এনে গণহত্যা চালাতো (দৈনিক ইত্তেফাক, সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৯) । ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিজয় পতাকা চট্রগ্রামের প্রথম উত্তোলিত হয়েছিল এই সার্কিট হাউজে (ইসলাম; ১৯৮৯: ৩০৫-৩০৯) । সার্কিট হাউজের বর্ণিত কালানুক্রমিক প্রেক্ষিত ও ইতিহাস এবং সমগ্র চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও ইতিহাস থেকে আড়াল করা হয়। এক্ষেত্রে নতুন আঙ্গিকে সজ্জিতকরণ, উন্নয়ন ও জাদুঘরের রূপান্তরের নামে ভবনের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অন্যান্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ভবনের ব্যবহারিক বিষয়াবলি এবং স্থাপত্যিক তাৎপর্যকে উপেক্ষা করে ভবনের কক্ষগুলোকে যথেচ্ছা জিয়া বন্দনায় প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয় এবং বিকৃত ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়। অথচ জিয়া উক্ত ভবনে একরাত্রি অবস্থান করেন এবং একটি মাত্র কক্ষ ব্যবহার করেছিলেন। এভবনে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের রাতের স্মৃতি সম্বলিত কক্ষটি শুধু ব্যবহারভিত্তিক স্মৃতি গ্যালারি হিসেবে রূপান্তর না ঘটিয়ে ভবনের বিভিন্ন কক্ষে তার পুরো জীবন প্রদর্শন করা হয়েছে। প্রদর্শনী পরিকল্পনায় সমতা আনায়নের নামে এধরনের অপরাজনৈতিক প্রভাবমূক্ত রাখা জাদুঘরের জন্য চ্যালেঞ্জ। এসকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বস্তুনিষ্ঠ প্রদর্শনী পরিকল্পনার নীতি ও কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী
আধুনিক শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি বহুল ব্যবহৃত উপকরণ। বিভিন্ন জাদুঘরের নির্বাচিত ঘটনা ও প্রেক্ষাপটের উপর ডকুমেন্টারি ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রামাণ্য শিক্ষার পাশাপাশি জনগোষ্ঠীকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শিক্ষা ও বিনোদন দেওয়া সম্ভব।
অগ্রজ জাদুঘরকর্মীদের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময়
অনলাইনে সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য মাধ্যমে অবসরে যাওয়া অগ্রজ জাদুঘরকর্মীদের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা যেতে পারে। এ ধরণের অর্ন্তভূক্তিমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অগ্রজ প্রজন্ম অবসারকালিন গুণগত সময় পার করার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে অগ্রজ প্রজন্মের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের জাদুঘর কর্মীগণ দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
নিদর্শন কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা
নিদর্শন কেন্দ্রিক শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিত্রাঙ্কন, রচনা ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা অয়োজন করা যেতে পারে। এ ধরনের প্রতিযোগিতা তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত চলতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের গ্যালারি পরিদর্শন শেষে নির্বাচিত নিদর্শকে বিষয় নির্ধারণের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে জাদুঘরমুখী করে নিদর্শন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করে। অনলাইনেও এধরণের প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে । সেক্ষেত্রে নিদর্শনের তথ্য চিত্র অনলাইনে প্রদর্শন ও বিষয় নির্ধারণ করে প্রতিযোগিতার আহবান করা যায়।
অনলাইন প্রকাশনা
জাদুঘরের শিক্ষা কার্যক্রমকে অর্থবহ করে তুলতে অন্যতম ভূমিকা পালন করে প্রকাশনা। প্রকাশনার মাধ্যমে জাদুঘরের কর্মকান্ড দেশবাসীকে জানানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের সাময়িকী, জার্নাল ও গবেষণাগ্রস্থ প্রকাশ করা যেতে পারে। বিশেষ প্রদর্শনী, স্বল্পকালীন প্রদর্শনীর ওপর ক্যাটালগ বা গাইড, নিয়মিত কর্মকান্ড প্রচারের জন্য নিউজ বুলেটিন বা বার্তা এবং গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য গবেষণা পত্রিকা এবং বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। প্রকাশনার ব্যবস্থা জাদুঘরের শিক্ষা কার্যক্রমকে অর্ন্তভূক্তিমূলক ও গতিশীল করে। করোনা মহামারি কালীন দু:সময়ে নিয়মিত মূদ্রিত প্রকাশনা বের করার ক্ষেত্রে সৃষ্ট সংকটের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে অনলাইন জার্নাল, বার্তা ও ক্যাটালগ প্রকাশের ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরী।
অনলাইন লাইব্রেরি চালু
কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবে লকডাউন কালীন অবস্থার অভিজ্ঞার আলোকে অনলাইন লাইব্রেরি চালুকরণ সময়ের দাবি । অনেক জাদুঘরে অনেক দূর্লভ বই রয়েছে । সে সব বই গবেষক ও সেবা গ্রহীতাদের ঘরে বসে পড়ার সুবিধার্থে এবং অর্ন্তভূক্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় অনলাইন লাইব্রেরি সেবা চালুকরা যেতে পারে।
অনলাইন প্লাটফর্মে সেমিনার, আলোচনা সভা ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা
কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবে লকডাউন কালীন অবস্থার অভিজ্ঞার প্রেক্ষিতে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধাদি গ্রহণ করে সেমিনার, আলোচনা সভা ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন চালানো প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিায়ার বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে অনলাইনে জাদুঘর কর্মীদের আভ্যন্তরীন সেমিনার, সভা ও কর্মশালার আয়োজন চালু করে সাংস্কৃতিক সম্পদের বৈচিত্র্যময় উপস্থাপন ও সুরক্ষায় পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন করা সম্ভব।
অনলাইনে বিশেষজ্ঞ বক্তৃতার আয়োজন
মাঝে মধ্যেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বক্তৃতা বা স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা যেতে পারে। এই বক্তৃতায় সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে গবেষকদের আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। এমনকি ঐতিহ্য সংরক্ষণবিদ, জাদুঘরবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকসহ সংশ্লিষ্ট গবেষকগণের সমন্বয়ে অনলাইনে আর্ন্তজাতিক সম্মেলন বো সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে।
গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ
জাদুঘরকে মূলত গণবিশ্ববিদ্যালয় বা গণশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সঙ্গত কারণেই জাদুঘরকেও গণবিশ্ববিদ্যালয় রূপে আত্মপ্রকাশ করা এবং গবেষণার ক্ষেত্রগুলিকে সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বাংলাদেশে জাদুঘরগুলির গ্যালারিতে প্রদর্শিত নিদর্শনের আলোকচিত্র ও তথ্য ব্যবহরের জন্য অনুমতি গ্রহণে একজন গবেষককে যে জটিল পথ অতিক্রম করতে হয়, সেকল সেবাগুলিকে সহজ করে গবেষণার ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। জাদুঘরের নিদর্শনসমূহের ডিজিটাল ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে অনলাইনে ক্যাটালগ প্রকাশের ব্যবস্থা করা যায়। তবেই গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতে পারে। স্থানিক পরিসরের স্বল্পতার কারণে একটি জাদুঘরের সংগৃহিত সকল নিদর্শনই গ্যালারিতে প্রদর্শন করা সম্ভব হয়না। অধিকাংশ নিদর্শন স্টোরে সংরক্ষিত থাকে। এসকল নিদর্শনের ক্যাটালগ প্রকাশের ব্যবস্থা গবেষক মহলে চাহিদা রয়েছে। কিন্তু জনবলের স্বল্পতা, অগ্রাধিকার তালিকায় কম গুরুত্ব ও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে এ কাজটি জাদুঘরগুলিতে বাস্তবায়নের ধীরগতি রয়েছে। জাদুঘররগুলির গবেষণায় সমতার জন্য অর্ন্তভূক্তি ও বৈচিত্র্য আনায়ন করতে হলে ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন ও ক্যাটালগ প্রকাশের বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করার এখনই সময়।
পুরস্কার প্রবর্তন
জাদুঘর পেশায় নিয়োজিত নবীন ও প্রবীণ প্রজন্মের পেশাদারিত্ব, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা-গবেষণা ও মানবাধিকার বিষয়ে সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য এবং দৃষ্টান্তমূলক কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ও অন্যদের উৎসাহ প্রদানের নিমিত্তে পুরস্কার প্রবর্তন করা উচিত।
জাতীয় ঐতিহ্য কমিশন গঠন
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষা এবং জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক পর্যটন খাতকে সমন্বয়ের লক্ষ্যে 'জাতীয় ঐতিহ্য কমিশন' গঠন করা প্রয়োজন। মিশরের মতো প্রত্নসম্পদ সুরক্ষা ও তদসংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য একটি সর্বোচ্চ পরিষদ বা জাতীয় ঐতিহ্য কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এ সংস্থা হবে স্বশাসিত ও সরকারী নিয়ন্ত্রণমুক্ত। এসংস্থার প্রথম কাজ হবে একটি সাংস্কৃতিক নীতিমালা-২০০৬ এবং প্রত্নসম্পদ ও জাদুঘর আইনের দুর্বলতা দূর করে একটি নতুন ও যুগোপযোগী আইন প্রনয়ন করে জাতীয় সংসদে পাশ করানোর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ। দেশব্যাপী একটি পরিপূর্ণ (Comprehensive) প্রত্নসম্পদ জরিপ কাজ পরিচালনার (Archacological Survey) ব্যবস্থা করা এবং এর ভিত্তিতে সারা দেশের প্রত্নসম্পদের সংগ্রহ সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও পর্যটনের জন্য উপযোগীতাসহ যাবতীয় বিষয়ে নীতি ও কর্মপন্থা গ্রহণ। এ সংস্থার তৃতীয় ও চতুর্থ কাজ হবে অবিলম্বে উন্নতমানের সংরক্ষণ রসায়নাগার ও গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। এছাড়া দেশের প্রত্নসম্পদের বিস্তারিত বিবরণ ও ছবি সম্বলিত বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও জাদুঘরসমূহের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত জাতীয় ঐতিহ্য কমিশনের সুপারিশক্রমে প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে বিবেচনায় নেওয়া এবং দেশের জাদুঘরসমূহ ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এ সংস্থার কাছে তাদের কাজের জবাবদিহিতার সুযোগ রাখা প্রয়োজন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও প্রত্যেক জাদুঘরকে প্রতি বছর তাদের কাজের প্রতিবেদন (Annual Report) প্রকাশ করতে হবে (খান, ২০০৮)। প্রস্তাবিত কমিশনের নিয়ন্ত্রণে বেসরকারী ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জাদুঘরসমূহের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুকরণ ও জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার লক্ষ্যে বেসরকারী জাদুঘর পরিচালনা নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এছাড়া প্রস্তাবিত কমিশন থেকে জেলায় জেলায় বিষয় ভিত্তিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠা এবং জাদুঘর পেশায় নিয়োজিতদের পেশদারিত্বের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিন্ন নীতিমালা ও সরকারী চাকরিতে সাংস্কৃতিক ক্যাডার সার্ভিস চালুর সুপারিশ করতে পারেন।
ঐতিহ্য তহবিল গঠন
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারী অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি ব্যক্তি, বেসরকারী ও দাতা সংস্থাগুলোর নিকট থেকে দান বা চাঁদা বা স্পন্সর গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদের সুরক্ষা এবং জাদুঘর ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ঐতিহ্য তহবিল গঠন করা যেতে পারে। শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে এধরণের ঐতিহ্য তহবিল গঠনের দৃষ্টান্ত লক্ষ করা গেছে। প্রস্তাবিত এ তহবিল থেকে বেসরকারী ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জাদুঘরসমূহ পরিচালনায় প্রণোদনা প্রদান করা যেতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় কাঠামো গঠন
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জাদুঘরসহ সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পর্যটন বোর্ড ও পর্যটন কর্পোরেশনের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকরী সমন্বয় কাঠামো গঠন করা দরকার।
জনবল বৃদ্ধি
বাংলদেশে পুরাকীর্তি ও জাদুঘর পরিচালনা, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হলো সীমিত জনবল। ফলে জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে জন্য প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরী।
গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ
সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও প্রদর্শনী সম্পর্কিত কাজে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে দক্ষ পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। সংরক্ষণের প্রকৌশলগত কাজে সরকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া ব্যক্তি বা বেসরকারী পর্যায়ে দক্ষ জনবল ও প্রতিষ্ঠান পেশাদারিত্বভাবে গড়ে উঠছে না। সরকারী প্রতিষ্ঠানের জনবলের কর্মজীবন শেষে তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ বা কাঠামোও গড়ে উঠছে না। অন্যদিকে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে জনবলকে সংরক্ষণ কাজে দক্ষ করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় উদ্যোগও লক্ষ করা যায় না। বেসরকারী পর্যায়ে ২/১ টি কাজের উদাহরণ পাওয়া গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে এ কাজগুলোর কোন স্থায়ী কাঠামো গড়ে উঠেনি। এজন্য একটি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। জাতীয় সংস্কৃতি নীতি-২০০৬ তে প্রশিক্ষণ ইনিষ্টিটিউট গড়ে তোলার ঘোষণা রয়েছে। এ নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। ভারত, জাপান, ফ্রান্স, কোরিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এধরণের গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনিস্টিটিউট রয়েছে। এধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে জাপান বা কোরিয়ার কৌশলগত সহায়তার মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
মহামারীকালে জাদুঘর সংলগ্ন পতিত জমি উৎপাদনে ব্যবহার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা
করোনাভাইরাসের কারনে চলমান বিশ্বব্যাপী মহামারী ও তৎপরবর্তী সম্ভাব্য খাদ্য সংকট যাতে দেখা না দেয় এবং তার মোকাবিলার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশিত ৩১ দফার ১৫ নম্বর দফায় 'খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কোন জমি যেন পতিত না থাকে।'; জমি পতিত না রেখে তিনি অধিক ফসল উৎপাদনের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্ব মানবতা ও জাতীয় জীবনের এ ক্রান্তিকালে "যার যা আছে" এ নীতি অবলম্বনে জাদুঘরের আনাচে-কানাচে সংলগ্ন পতিত জমি সদব্যবহার করা ও শাক-সব্জি চাষ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এটি আপদকালীন অন্তর্ভুক্তিকালীস ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করে চালু করা গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাজে জাদুঘরের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। স্বীয় কাজের ম্যান্ডেট বলবত রেখে অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে ক্রান্তিকালে অবদান রাখা যেতে পারে। জাতির পিতার গৃহীত সমবায় নীতির ভিত্তিতে উৎপাদিত শাক-সবজি একভাগ চাষাবাদের ব্যয়, একভাগ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং একভাগ স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এই করোনাকালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন কুমিল্লার ময়নামতি জাদুঘর, খুলনা বিভাগীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, সাগরদাড়ি মাইকেল মধুসূদন দত্তবাড়ি স্মৃতি জাদুঘরসহ বেশ কয়েকটি আনাচে কানাচে সংলগ্ন পতিত জমিতে এ ধরনের পরীক্ষামূলক শাক-সবজি চাষাবাদের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। উৎপাদিত শাখ-সবজির কিছু পরিমাণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে খাদ্য সহায়তা হিসেবে বিতরণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় স্থানীয় সংলগ্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে জাদুঘর সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটেছে।
জাদুঘর হলো সমাজ, জাতি ও দেশের দর্পণ। একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতিকে দেশি-বিদেশিদের কাছে তুলে ধরতে জাদুঘরের প্রয়োজন। ছবি যেমন কথা বলে, তেমনি জাদুঘরের জড় নিদর্শনগুলো শিক্ষা প্রদান করে। সুতরাং জাদুঘরকে জনসম্মুখে উপস্থাপন করতে নিদর্শন শিক্ষার বিকল্প নেই (আলী,২০০৫:০৫-০৭)।
জাদুঘরের বিনোদন ও শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই বৈচিত্র্যময় এবং অর্ন্তভূক্তিমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সাম্যাবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য কর্মসূচির মাধ্যমে জাদুঘরকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন। তবেই অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সমতার পথে অগ্রসর হওয়ার পথ সুগম হবে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রূখে স্বজাতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রকাশ জাদুঘররে বৈত্র্যিময় প্রদর্শনীতে ও বৈশ্বিক যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমেই সম্ভব। বৈষম্য, বিস্মৃতি আর বিকৃতির বিরুদ্ধে বৈচিত্র্যময় প্রদর্শনী ও অর্ন্তভূক্তিমূলক জাদুঘর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এভাবেই প্রজান্মান্তরে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের কথা বলবে জাদুঘর। এবারের আর্ন্তজাতিক জাদুঘর দিবসে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা ।
তথ্যসূত্র
Ahmed,Nazimuddin; Buildings of The British, University Press Limited, Dhaka, 1986.
Amborse T & C.Paine 1993, Museum Basics, Routledge, NY
আহমদ, অধ্যাপক এ এফ সালাহ্উদ্দিন ; কথ্য ইতিহাসের রূপরেখা, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর,ঢাকা-১৯৯১।
আলী, মোঃ ছাবের; জাদুঘরের শিক্ষা কার্যক্রম, নিউজ লেটার, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ২০০৫ ।
ইসলাম, রফিকুল; লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মুক্তধারা প্রকাশনী, তৃতীয় প্রকাশ- এপ্রিল ১৯৮৯।
খান, শামসুজ্জামান, ২০০৮, যে কারণে প্রত্নসম্পদ বিদেশ পাঠানোয় বিরোধিতা,( https://arts.bdnews24.com/?p=763)|
হুদা, মোঃ খতিবুল; একুশ শতকের জাদুঘর ও শিক্ষা, প্রত্নতত্ত্ব, ভলিউম-৮, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০২ ।
হোসেন এ বি এম ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা-স্থাপত্য; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।
দৈনিক ইত্তেফাক, সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৯।
URL-1:https://icom.museum/en/activities/standards-guidelines/museum-definition/
URL-2: https://icom.museum/en/about-us/missions-and-objectives/।
URL-3: https://icom.museum/en/
URL-5: https://icom.museum/en/news/less-than-one-month-to-imd-2020-lets-talk-digital-inclusion/
URL-6: https://www.prothomalo.com/northamerica/article/1610647/ ভট্টচার্য, শেখর; বৈচিত্র্যের মধ্যে সৌন্দর্যের খোঁজে, ২৩ আগস্ট ২০১৯, প্রথম আলো ,
