০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও করোনাভাইরাসের করুণা

অজয় দাশগুপ্ত অজয় দাশগুপ্ত

Published : 25 Mar 2020, 06:35 PM

Updated : 01 Jul 2022, 05:37 PM

করোনাভাইরাস সংক্রান্ত খবরকে পিছে ফেলে, পায়ে মাড়িয়ে, ডাউন করে  দিয়ে দেশে এখন শীর্ষ খবর- দুর্নীতির দায়ে ২৫ মাস সাজা ভোগের পর শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য মুক্তি পেলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

এর আগে কী হয়েছিল? মুক্তির আগেরদিন মঙ্গলবারই কিন্তু আমরা জেনে গিয়েছিলাম খালেদা জিয়া মুক্ত হতে যাচ্ছেন। তখন যে আশংকা সেটাই দেখলাম সত্য। তাঁকে বহন করে নিয়ে যাওয়া গাড়ির আশেপাশে মানুষ আর মানুষ। মুখে মাস্ক পরলেই কী করোনাভাইরাস এড়ানো সম্ভব? দুনিয়ার সব দেশে নিয়ম মেনে ছক কেটে দেওয়া হয়েছে কে কত দূরত্বে ধাকবে। তার প্রতি বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এই ভিড় যে হবে এটা সবাই জানতো। সরকার, প্রশাসনও জানতো। তবু তা বন্ধ করা হয় নি। আমাদের আইনমন্ত্রী কী বললেন?

মঙ্গলবার বিকেলে গুলশানের বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে এবং বয়স ও মানবিক বিবেচনায় খালেদা জিয়াকে ৪০১ ধারায় শর্তসাপেক্ষে ৬ মাসের জন্য মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তার সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়া ঢাকার নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে পারবেন।

খবরটি পড়ে মনে হতে পারে খালেদা জিয়ার মুক্তিতে করোনাভাইরাসের করুণা আছে। সারাবিশ্ব যখন ভাইরাসাক্রান্ত, যখন দুনিয়ার কোন দেশে শান্তি নাই- তখন হঠাৎ এই সিদ্বান্ত বেশ ভাবনার বৈকি। খালেদা জিয়া যদি করোনা মহামারীর কারণেই মুক্তি পান তাহলে দুইটি কথা থাকে জনাব আইনমন্ত্রী। দুনিয়া তো বলছে এই মহামারীর আসল প্রতিকার ও  একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে একা থাকা। একজন মানুষ হাসপাতালে একা থেকে এই রোগ থেকে পরিত্রাণ পাবেন এটাই কি স্বাভাবিক না? সে জায়গায় বেগম জিয়া কেন মুক্তি পেলেন তবে?

চলুন দেখি তার মুক্তির পর কী কী ঘটছে? ফিরোজা নামের সে বাসায় ইতোমধ্যে ঘুরে এসেছেন তাঁর আত্মীয়রা। মির্জা ফখরুলও গিয়েছিলেন। একটা মজার ব্যাপার দেখলাম- সারা বাংলাদেশ যখন লক ডাউনের পথে যখন সামাজিক মিডিয়ায় মানুষ সবাইকে সতর্ক করছে বাড়ি থাকতে আদেশ বা অনুরোধ জানাচ্ছে তখন টিভি চ্যানেল  দেখাচ্ছে খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে দাঁড়ানো লোকজনের চেহারা। বেশ রসিয়ে রসিয়ে তাদের নাম ঠিকানাও বলা হচ্ছে । যেমন কোন ওয়ার্ডের নেতা ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা কি করোনা থাবার বাইরে? না তারা নিরাপদ আইনের আওতায় পড়েন না? খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন কি হবেন না, সেটা আইনের ব্যাপার। আমরা এ নিয়ে কিছু বলার অধিকার রাখি না। কিন্তু অবাক হচ্ছি এক দেশে দু আইন বা দু ধরনের বিচার কিংবা ব্যবস্থা দেখে। রাস্তায় যে সামরিক বাহিনী নামানো হলো তাদের কাজ কি শুধু সাধারণ মানুষকে ধরে পেটানো? না তাদের অধিকার আছে আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের ধরার?

খালেদা জিয়ার আগমনে সাড়া পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তিনি দীর্ঘ সময় জেলে ছিলেন এ কারণে তাঁর দলের নেতা কর্মীদের ভিড় হবে এটাও জানা কথা। এও মানতে হবে তাঁর জনপ্রিয়তা কম কিছু না। আওয়ামী লীগ মুখে যাই বলুক না কেন বিএনপি ও খালেদা জিয়া এখনো জনপ্রিয়। তার দলকে খুব সহজে কাবু করা যাবে বলেও মনে হয় না। তবে সময়টা তো বিবেচনায় রাখতে হবে। ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, আমেরিকার মতো দেশ হিমশিম খাচ্ছে। ইতালি, স্পেন বলতে গেলে মৃত্যুপুরি। পাশের দেশ ভারতে দেখুন- তারা পুরো লক ডাউনে চলে গিয়েছে। বলা হচ্ছে এই একুশ দিনের লক ডাউন না মানলে ২১ বছর পিছিয়ে যাবে ভারত। তারা আমাদের চেয়ে স্মার্ট আর অগ্রসর। একদিনের বাণিজ্য বন্ধ মানে সারা দুনিয়ার লোকসান। সেই ভারত যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে এমন করতে পারে আমরা কোন ছাড়। পাশের রাজ্য পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, মমতা ব্যানার্জী ইতোমধ্যে তাঁর আন্তরিকতায় 'ইমেজ' তুঙ্গে নিয়ে এসেছেন। সত্যি বলতে কি  ডাক্তারদের সাথে তাঁর সভা দেখে কথা শুনে আমি মুগ্ধ। এ না হলে নেতা? আমাদের দেশে এখনো তেমন কিছু চোখে পড়ে নি।

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে কী থাকবে জানি না। তবে যদি সর্ম্পূণ 'লক ডাউন' না থাকে আমাদের দেশের ভবিষ্যত কী হতে পারে কেউ জানে না। এমনিতেই জনবহুল দেশ। তার ওপর বেশিরভাগ মানুষ হয় লেখাপড়া জানেন না আর জানলেও অন্ধ। এই মানুষগুলো এখনো কিছুই বুঝতে পারছে বলে মনে হয় না। প্রতিদিন তারা বাসে-ট্রেনে-ফেরিতে গাদাগাদি করে যেভাবে বাড়ি যাচ্ছেন, বেড়াতে যাচ্ছেন- তার বদলে তাদের বাসায় থাকতে দিলেই ভালো হতো। কারণ এই করোনাভাইরাস কিন্তু গাণিতিক হারে বাড়ে না। এর বাড়ার হার জ্যামিতিক। সেটা যদি একবার শুরু হয় জনবহুল বাংলাদেশে কি হতে পারে কারো ধারণা আছে? যে দেশে এখনো অসংখ্য মানুষ রাস্তায় থাকেন, যে দেশে মানুষ একবেলা আহার করে যে সমাজে দিন এনে দিন খাওয়া মজুর রিকশাওয়ালা, গৃহকর্মীর কাজ না হলে- ভাত জোটে না সে সমাজে আইসোলেশন কতটা কার্যকর? আর কিভাবে তা বলবৎ করা সম্ভব? তারপরও এটাই একমাত্র ওষুধ। নয়তো বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে কিছু একটা ঘটে গেলেও অবাক হবার কিছু নাই।

এমন বিভীষিকাময় বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার মুক্তি আমার মত অনেকের কাছে ই দুবোর্ধ্য । কেন হঠাৎ তা করা হলো, তা বুঝতে একটু সময় লাগবে বৈকি। তবে একটা কথা জানি শেখ হাসিনা কাচা কাজ করেন না। তিনি জেনে বুঝেই সায় দিয়েছেন। আমরা সবাই মানি, আইন ও বিচার চলে তার নিজস্ব গতিতে। কিন্তু এটা আমাদের কথা না। সরকারের মন্ত্রী নেতা সরকারী দলের সচিব সবাই বলেছেন- প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এই মুক্তি। তার মানে কোথাও একটা ব্যাপার আছে। করোনাভাইরাসের মানবিক কারণ হোক, আর অন্য যে কোন কারণেই হোক, শর্ত মেনে চলা খালেদা জিয়া এখন জেলের বাইরে। তিনি বিদেশ যাবেন না, এটা তো এখন চাইলেও যেতে পারবেন না। যেসব দেশে যাবার কথা, সে সব দেশের চাইতে বাংলাদেশ এখনো অনেক ভালো আছে। তাছাড়া সেসব দেশে যাতায়াতও বন্ধ। আর এই নিষেধাজ্ঞা আগামী ছয় মাসে উঠবে না। আমাদের সিডনিতেও সব বিষয়গুলো সব প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়ার সময় আগামী ছয় মাস মাথায় রাখা হয়েছে। সে দিক থেকে ছয় মাসে খালেদা জিয়ার বাইরে যাওয়া অসম্ভব।

দেশে থাকা খালেদা জিয়া করোনাভাইরাসের সময়ে লোক জমায়েত বা সভা কিছুই করতে পারবেন না। তাছাড়া নিন্দুকেরা বলে লোক দেখানো হলেও শীর্ষ দুই চারজন নেতা খালেদার সাথে আদৌ দেখা করতে যাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মোট কথায় জনপ্রিয়তা যাই থাক, দল আগের জায়গায় নাই। নাই তাদের সাংগঠনিক শক্তি। ম্যাডাম নিজেও এখন অসুস্থ। মনোবলও নিশ্চয়ই আগের মতো নাই। এই ভঙ্গুর খালেদা জিয়াই কি তবে আওয়ামী লীগের ভয়হীন মানবতার উৎস? স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে খালেদা জিয়া কি স্বাধীনতা পেলেন, না অন্যকিছু তা অচিরেই বুঝতে পারবে জাতি।