আলিফ লাইলা-১৩: আবরারের গণখুন এবং র‌্যাংকিং-এর মৃগতৃষ্ণিকা

শিশির ভট্টাচার্য্যশিশির ভট্টাচার্য্য
Published : 24 Oct 2019, 10:00 AM
Updated : 24 Oct 2019, 10:00 AM

[পূর্বকথা: হিন্দুস্তানের বদমেজাজি বাদশাহ শাহরিয়ার তথাকথিত চরিত্রহীনা এক বেগমের পরকীয়ায় যারপরনাই নারাজ হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন যে প্রতি রাতে তিনি এক যুবতীকে নিকাহ-এ-মুতা করবেন এবং ভোর হলেই এক রাতের সেই বেগমকে কতল করবেন। কয়েক বৎসরে শত শত যুবতী বেঘোরে ইন্তেকাল ফরমালে ক্ষুরধার বুদ্ধিমতী উজিরকন্যা শেহেরজাদি করুণাপরবশ হয়ে ছোটবোন দিনারজাদির সঙ্গে সল্লা করে বাদশা শাহরিয়ারকে নিকাহের প্রস্তাব দেন। জীবনের শেষ রাত্রিতে শেহেরজাদির আবদার রাখতে বাসরঘরে ডেকে আনা হয় শ্যালিকা দিনারজাদিকে। রাত গভীর হলে দিনারজাদি পূর্বপরিকল্পনামাফিক শেহেরজাদিকে বাংলাদেশের বিবিধ সমস্যা নিয়ে একেকটি সওয়াল করতে শুরু করেন এবং শেহেরজাদিও কালবিলম্ব না করে সওয়ালের জওয়াব বাৎলাতে শুরু করেন। প্রথম কয়েক রাত্রিতে সওয়াল-জওয়াবের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং। কিন্তু গত ছয় রাত্রি ধরে 'রবীন্দ্রনাথ বনাম বাঙালি মুসলমান' কিংবা 'শাড়ি'-র প্রসঙ্গ এসে র‌্যাংকিং-এর কথা চাপা পড়ে গিয়েছিল। আজ ত্রয়োদশ রাত্রির সওয়াল-জওয়াবে বিশেষত সহপাঠীদের হাতে বুয়েটছাত্র আবরার গণখুন হবার পরিপ্রেক্ষিতে আবার উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ।]

'দিদি, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটা কি কোনো সমাধান হলো?' এটা মোটেও ভালো সমাধান নয়, প্রিয় দিনারজাদি। তবে ভয় নেই, এটা আই-ওয়াশ মাত্র। রাজনীতি নিষিদ্ধ করা অসম্ভব। যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন রাজনীতিও থাকবে, কীভাবে, কোন আকারে থাকবে সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। রাজনীতিহীন সমাজ কিংবা জীবন হয় না। রাজনীতি ফেনসিডিলের মতো, প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ হলে গোপনে কণ্ঠস্থ হবে। রাজনীতি হচ্ছে আমার দিক থেকে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। অন্যের দিক থেকে আমাকে অধিকারবঞ্চিত করার চেষ্টা। এই টানাপোড়েনের প্রক্রিয়া বন্ধ করার চেষ্টা করলে নিজের পায়ে কুড়াল মারা হয়।

রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও মানুষ গুন্ডামিতে সিদ্ধ হতে থাকবে। ছাত্র রাজনীতি নয়, মূলত 'স্বার্থরাজনীতি' বন্ধ করতে হবে। স্বার্থলীগ, স্বার্থদল, স্বার্থশিবির, স্বার্থমৈত্রী, স্বার্থ ইউনিয়ন গংকে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। হায়! রাজনীতি আর প্রশাসন সমর্থিত গুন্ডামিকে একাকার করে দিয়ে বুয়েটে রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হলো। সবাই শক্তের ভক্ত নরমের যম। রোগ নয়, ঔষধটাকেই নির্মূল করা হলো এবং দাবিটা আসলো সাধারণ ছাত্রদের পক্ষ থেকেই। প্রশাসন যেমন তাল দেয়, ছাগলও তেমন ফাল দেয়।

বাংলাদেশের প্রথম সমস্যা কি জানো দিনারজাদি? এই পোড়া দেশে কোনো নায়ক নেই। এ জাতির প্রথম এবং শেষ নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। দেখো, আবরার যখন মৃত্যুপথযাত্রী, তাকে বাঁচানোর জন্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। কেউ ফোন করে পুলিশ কিংবা প্রশাসনকে খবরটা পর্যন্ত দেয়নি, অথচ সবার হাতে হাতে মুঠোফোন! বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমস্যা: ভুল লোককে ভিলেন মনে করা। আবরারের গণখুনের জন্য দায়ী কে? ভিসি? প্রভোস্ট, প্রক্টর? এরা প্রত্যেকে ক্ষমতার কবলে অসহায়, অথর্ব। এদের কেউ পাত্তা দেয়? ছাগল নাচে খুঁটির জোরে। যে খুঁটির জোরে নেচে ছাগলেরা এই অথর্বগুলোকে পাত্তাই দেয় না সেই খুঁটিই বিচারকের ভূমিকায়। দারুণ এক গোলক ধাঁধা। যে মূল অপরাধী, সেই প্রধান বিচারক। সুতরাং কিছুতেই কিছু হয় না। একই অপরাধ বার বার সংঘটিত হয়।

একাধিক অভ্যুত্থান, দুই দুই জন রাষ্ট্রপতি খুন হওয়া সত্তেও প্রতিরক্ষা বাহিনী বহাল তবিয়তে ছিল। অথচ একটিমাত্র বিদ্রোহে বাতিল হয়েছিল সীমান্ত রক্ষা বাহিনী। একেই বলে, এক যাত্রায় পৃথক ফল। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা যাবে না, বুঝলাম। ছাত্রলীগ কি নিষিদ্ধ হতে পারে? এক কাজের বুয়া একবার মোঘল আমলের এক হুকা সাফ করতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছিল বলে বাড়ির আপা রাগারাগি শুরু করলে বুয়া উত্তর দিয়েছিল: 'আগে কইবেনতো আফা, ফুরান জিনিস!' যারা এখনও ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছেন না, তারা নিশ্চয়ই এই সংগঠনটির পুরাতাত্ত্বিক মূল্যের কথাই ভাবছেন।

আবরার গণখুন হবার খবর শুনে একটা পদ্য রচনা করেছি, দিনারজাদি: 'না কবিতা না আকাশবাণী'।

বিরোধী দলের নেত্রীকে খুন করতে চেয়েছিলাম গ্র্যানেড ছুঁড়ে। আর

বিরোধীদল বলে কিছু থাকুক– এমন ইচ্ছাই নয় আমার।

ক্ষমতায় আসতে এবং চিরদিন থাকতে চাই যেভাবেই হোক। সেই শিক্ষককেই

নিয়োগ দিই, যে কিনা বিনাবিচারে ভোট দেবে আমাকেই।

ও বয়! সমালোচনা সহ্য হয় না। নালিশ করি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে।

নাম মুখে নিতেও ভয়, খেপচুরিয়াস আমি খেপে যাই পাছে!

আমি চাই, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-উপাচার্য-ভট্টাচার্য্য… সবাই লেজুরবৃত্তি করুক।

রব্বানী-সম্রাট! পোষা কুকুরের লেজটি কাটবো, আর একটু নড়ুক।

বলিনি কিছুই, যখন সহপাঠীদের হাতুড়িপেটা করেছিল সোনার ছেলেরা।

আবরার মরলেই টনক নড়ে! দামি স্কুলের ভালো ছাত্র তারা!

লেজও কুকুর নাড়াতে পারে। প্রভূ না চাইলেও বাঁকা হয় কুত্তার লেজ।

কুকুর না চাইলেও নড়ে চড়ে ওঠা লেজের 'প্রিভিলেজ'।

খুনীদের ভিতরে দুই একজন সংখ্যালঘু থাকুক না, সহজ হবে সমীকরণ।

না কবিতা, না আকাশবাণী– নেহায়েতই আমার রোগের বিবরণ।

'স্বৈরাচার' একটি সংক্রামক রোগ। পরমত-অসহিষ্ণুতা উপসর্গ এই রোগের।

আমাদের ইচ্ছাই কি যথেষ্ট নয়? ধূমপান কিংবা স্বৈরাচার ত্যাগের

জন্যে? 'আস্বৈনিক'! এসো 'আমরা স্বৈরাচার নিবারণ করি!' সমাজ

পরিবার, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং নিজের মনের। এখনি, আজ!

বাংলাদেশের পরিবার, সমাজ, কর্মস্থল, রাষ্ট্র– প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অসহিষ্ণুতার চর্চা হয় নিত্যদিন। আমাদের পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, নিয়োগকর্তা, শিক্ষক, রাষ্ট্রনায়ক কিংবা নায়িকা প্রত্যেকটি ব্যক্তি আগাপাশতলা স্বৈরাচারী। আমরা ধর্ম চাপিয়ে দিই, পোশাক চাপিয়ে দিই, নিজেদের মত চাপিয়ে দিই দুর্বলতরদের উপর। ভিন্নমতের গলা টিপে ধরি যথাসম্ভব। যখন বাড়াবাড়ি হয়, মারা যায় কমবেশি গুরুত্বপূর্ণ কেউ, তখনি আমাদের টনক নড়ে। দিশেহারা হয়ে কেউ কেউ তখন দাবি করে, মাথাব্যথা সারাতে মাথাটাই কেটে ফেলা হোক। কেউ বা আবার ঘটনার ঝোপ বুঝে কোপ মেরে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে।

শোভন-রব্বানীবধ, ক্যাসিনোকাণ্ড কিংবা আবরার হত্যা বাঙালি সমাজের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সার্বিক দুর্বৃত্তায়নের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বেচারা আবরারের দুর্ভাগ্য সে বেঁচে নেই, গোবেচারা অন্যদের সৌভাগ্য কোনো কারণে তারা বেঁচে গেছে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র একটি হেরে যাওয়া সেনাবাহিনীর মতো, যেখানে কেউই পরাজয়ের দায় নেয় না– সৈন্যরা দোষ দেয় অফিসারদের, অফিসারেরা দোষ দেয় দুর্ভাগ্যের। কেউ দায় নেয় না বাংলাদেশে। কোন সভ্য দেশে র‌্যাগের নামে বছরের পর বছর নবীন ছাত্রদের উপর নির্মম অত্যাচার হয়? কোনো সভ্য দেশে (অবশেষে রাণীর মুকুটে সর্বশেষ পালক গোঁজার মতো) আবরার হত্যার মতো ঘটনা ঘটলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একযোগে পদত্যাগ করতো। বাঙালির কথা হচ্ছে:  'দায়-লজ্জা-ভয়, তিন থাকতে নয়!' শাসন, বিচার, আইনপ্রণয়ন– রাষ্ট্রের এই তিনটি স্তম্ভ কাজ করে না বাংলাদেশে, কারণ স্তম্ভিত হয়ে থাকাই যে কোনো স্তম্ভের বৈশিষ্ট্য। আবরারের মৃত্যুতে একটা ছড়াও লিখেছি:

বিচার যদি না হয় রগকাটা, হাতুড়ি পেটার

খুন হবো যে কেউ, অমিত অথবা আবরার।

তারইতো গেলই, বুকের ধন ছিল যার!

কারও বা একটা লাশেরই শুধু ছিল দরকার।

'থাক এসব কষ্টের ছড়া আর কবিতা দিদি।' দিনারজাদি অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ পাল্টাতে চায়। 'বেশ কয়েক রাত আগে তুমি বলেছিলে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না। লেখাপড়াটা কি হচ্ছে?'

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে নকল করতে গিয়ে বছর কয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার সিস্টেম চালু হয়েছে। এক বছরকে দুই সেমিস্টারে ভাগ করা হয়েছে আমেরিকানদের অনুকরণ করে। পরীক্ষা নিতে নিতে শিক্ষকদের আর পরীক্ষা দিতে দিতে ছাত্রদের জীবন জেরবার। আগে যখন বছরে একবার পরীক্ষা হতো, তখন ছাত্ররা লেখাপড়া করার সময় পেতো, লেখাপড়ার বাইরে একস্ট্রা কারিকুলার কার্যক্রমের সুযোগ থাকতো: একটা বই পড়া, একটা নাটকে অভিনয় করা… এসবওতো শিক্ষার অঙ্গ। সেমিস্টার আসাতে পরীক্ষার জ্বালায় সব শিকেয় উঠেছে। একাধিক সেমিস্টার থাকলে একাধিকবার খাতা দেখা এবং অন্যান্য বিল নেয়া যায় বটে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটা সেমিস্টারে চার বার ফি নেওয়া যায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। সেমিস্টার সংস্কৃতি চালু করার পেছনে মালিকপক্ষ ও শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির ব্যাপারটাও যে আছে, সে কথাটা ভুলে গেলে চলবে কেন? শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকের পকেটে টাকাটা আসছে। ছাত্রদের মাথায় জ্ঞানটা ঢুকছে কী? লেখাপড়া যদি না হয়, তবে গবেষণাই বা হবে কেমন করে? বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি, অক্সফোর্ডে এখনও সেমিস্টার নেই, বছরান্তে পরীক্ষা হয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কেন নিজের ঐতিহ্য ছেড়ে আমেরিকানদের লেজুরবৃত্তি করছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার সত্যিকার কোনো মান না থাকা র‌্যাংকিং থেকে বাদ পড়ার চতুর্দশতম কারণ।

কী রকম নোংরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একটি টয়লেট! কর্তৃপক্ষ কিংবা ডাকসু কি এদিকে নজর দিতে পারে না? বিশ্ববিদ্যালয়ের একদিক থেকে অন্যদিকে যেতে এখনও আদ্দিকালের রিকশাই ভরসা। চীনের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে দেখবে, ক্যাম্পাসে ব্যাটারি-চালিত টমটম চলছে। ৭/৮ জন শিক্ষার্থী বসতে পারে এই টমটমে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে? বাইরের গাড়ি, ভারি যানবাহন অনবরত ঢুকছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। পথিকের হৃৎকম্প সৃষ্টি করে পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে তীব্রবেগে মোটর সাইকেল চালিয়ে ছাত্রনেতারা। সুতীব্র শব্দে মাইক বাজিয়ে মিটিং-মিছিল-র‌্যাগ ডে করার অনুমতি দেন মাননীয় প্রক্টর। এই শব্দদূষণে ক্লাস কীভাবে হয় ভেবে অবাক হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিজিটে আসা ওমান দূতাবাসের এক কর্মকর্তা। এই সব মহান সুযোগ-সুবিধার অজুহাত দেখিয়ে সেরা একশতে স্থান পেতে চাইলে ঢাবি কেবলই খাবি খাবে। বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সার্বিক অপরিচ্ছন্নতা ও দূষণ র‌্যাংকিং-এর বাইরে ছিঁটকে পড়ার পঞ্চদশতম কারণ।

নান্দনিকতা ও পরিচ্ছন্নতা ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতার প্রাথমিক শর্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কি নান্দনিক, পরিচ্ছন্ন? টয়লেটগুলো কী নোংরা! সাফাই নেই, সংস্কার নেই, যদিও মুখে সাফাই দেওয়া অব্যাহত আছে কর্তাদের। কয়েক মাস আগে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বাণিজ্য অনুষদের পাশে অঁদ্রে মালরো উদ্যান দেখতে গিয়ে এর দুরবস্থা ও অপরিচ্ছন্নতা দেখে ব্যথিত হয়েছিলেন। অন্য একটি উদাহরণ দিই। উপাচার্যের বাসভবনের নিকটে, অতি নিকটে অবস্থিত শহীদস্মৃতি সড়কদ্বীপের উল্টোদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের লাগোয়া এক বৃক্ষতলে বহুবর্ষ যাবৎ বহিরাগতদের উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছে এক গণমুত্রালয়। ঘ্রাণ ও বাকশক্তি নেই বলে আশেপাশের গাছের অশরীরীরা কেউ কিছু বলে না। শিক্ষকগণের নাসিকা নামক ইন্দ্রিয়টি অটুট আছে তাঁরা নাকে হাত দিয়ে লাফিয়ে পার হন সেই মুত্রধারা। এই 'ধারাপাত' বন্ধ করার কেউ নেই, যদিও উপাচার্য ভবনের দোতলা থেকেই দুর্গন্ধ নাকে আসার কথা, মুত্রায়মান পথচারীরা দৃশ্যমানও হবার কথা। এমন দৃশ্য র‌্যাংকিং পাবার অনুকূল নয়, বলা বাহুল্য। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এ আসে, সেগুলো অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন।

বহু মাস ধরে পথচারী ও রাস্তা ব্যবহারকারীদের কষ্ট দিয়ে নির্মিত নীলক্ষেত তোরণটি কি আদৌ নয়নাভিরাম? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিকল্পনা করে কি কোনো ভবন নির্মিত হয়, কিংবা উদ্যান তৈরি করা হয়, বৃক্ষরোপণ করা হয়? যারা সেই পরিকল্পনা করে থাকেন তাদের মস্তিষ্ক উর্বর বলা যাবে না, কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলো সুন্দর নয়। পুরনোগুলো যাও চলে, নতুনগুলো একটির চেয়ে একটি কুৎসিৎ। এর মধ্যে কুৎসিততম হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন। শরীরে লাগানো অসংখ্য এসি মেশিন আর এর পানি বের হবার পাইপ দেখে ভবনটিকে অক্সিজেন পাইপ লাগানো আইসিইউর মুমূর্ষু কোনো রোগী বলে মনে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরতম ভবন কার্জন হল, যেটি বহুদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি বাঙালির তৈরি নয়। দুঃখের বিষয়, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি কুৎসিৎ গ্রিনহাউজ নির্মাণ করে বিরল সৌন্দর্যসম্পন্ন এই ভবনটির নান্দনিকতা এবং দৃশ্যপট বিনষ্ট করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবাদ করার কেউ নেই। পরিকল্পনার অভাব র‌্যাংকিং থেকে দূরে থাকার ষোড়শতম কারণ।

সামাজিক গণমাধ্যমের শক্তি আমরা গত ঈদে দেখেছি। দেখেছি, কীভাবে ফেসবুকে প্রতিবাদের চাপে ঈদের তারিখ পর্যন্ত বদলাতে বাধ্য হয় সরকার। গণমাধ্যমের চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ র‌্যাংকিংকে আমলে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সম্প্রতি সব শিক্ষককে এই মর্মে পত্র দেয়া হয়েছে যে প্রত্যেকে গবেষণা ও ডিগ্রি সম্পর্কিত নিজ নিজ তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করতে হবে এবং যারা করবেন না তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেউ হয়তো 'ভোলেভালা' কর্তৃপক্ষকে (ভুল) বুঝিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকে আসছে না শ্রেফ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যা-দিগগজ শিক্ষকেরা ওয়েবসাইটে তাদের তথ্য দিচ্ছেন না বলেই।

প্রথমত, র‌্যাংকভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ওয়েবসাইট এবং সামাজিক গণমাধ্যম পরিচালনার জন্যে বেশ বড়সড় একটি অফিস একাধিক ওয়েব-মাস্টার এবং একটি কর্মীবাহিনী থাকে যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অর্জনের উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং নির্ভর করে না। কোন সেনাপতি কবে, কোথায়, কী পদক পেয়েছেন, তার উপর কী সেনাবাহিনীর র‌্যাংকিং নির্ভর করে? তৃতীয়ত, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ শুনে অনেকে বলছেন, ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের ডাটা আপডেট দিচ্ছে না সেও এক ভালো, দিলে থলের বিড়াল বেড়িয়ে যাবে। তার চেয়ে মানুষ একটা ধোঁয়াশায় আছে, থাক। প্রমাণ চান? ঢাবির ওয়েব-সাইটে পূজ্যপাদ কর্তাদের একেকজনের লিংকে যান! কবে, কখন, কে, কোন প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক পদে ছিলেন তার ধারাবাহিক বিবরণ আছে বেশির ভাগ শিক্ষকের সিভিতে, গবেষণা কিংবা প্রবন্ধের বেলায় ঢুঁঢুঁ। বাপু হে, এইটুকুই যখন তোমার অর্জন, তবে বেহুদা কেন এত তর্জন-গর্জন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স একশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। গত একশ বছরে যত উপাচার্য নিযুক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজনও কি এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নিয়েছেন? একশ বছর পূর্তি উপলক্ষেও কি ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনের কথা ভাবছে আমাদের সরকার, কিংবা উপাচার্য। সরকারকেই ভাবতে হবে, কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাগজে-কলমে স্বায়ত্বশাসিত হলেও, প্রকৃতপক্ষে সরকারই এই বিশ্ববিদ্যালয় চালায়। কোনো সরকারও কি কখনও দয়াপরবশ হয়ে ভেবেছে যে দেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টিকে অন্তত কিছুদিন নোংরা রাজনীতি থেকে রেহাই দিই, পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে তুলনীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি।

কেন চেষ্টা করবে? কোন মূঢ়, কোন কালে, কী ভেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে 'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড' বলেছিল সেই গর্বে পূর্ববঙ্গের বাঙালির এখনও মাটিতে পা পড়ে না। 'লেজ নাই কুত্তার বাইঘ্যা নাম।' – চট্টগ্রামী প্রবাদ। 'নামে কিছু যায় আসে না, গোলাপের নাম অন্য কিছু হলেও ফুলটি গন্ধ ছড়াতোই।' বলেছিলেন শেক্সপিয়ার। কিন্তু কোনো প্রকার সুগন্ধ যদি না থাকে, তবে শুধু নামসর্বস্ব গোলাপ হয়ে লাভ কী? কোনো বিবেচনাতেই সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি তালিকায় প্রথমদিকে থাকা অক্সফোর্ড-এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সরকারের প্রকাশ্য ও গোপন (অদক্ষ, আনাড়ি, অপরিণামদর্শী) হস্তক্ষেপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এ স্থান না পাবার সপ্তদশতম কারণ।

মধ্যযুগের প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ আবাসিক ছিল। এই আবাসিক সংস্কৃতির অনুকরণ হয়েছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অক্সফোর্ডের অনুকরণ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অক্সফোর্ডের ছাত্রাবাসে প্রত্যেক ছাত্রের জন্যে একটি কক্ষ বরাদ্দ থাকে। সেই কক্ষে কমপক্ষে একটি টেবিল, একটি বুকশেলফ ও একটি বিছানা থাকে। মধ্যম মানের সব বিশ্ববিদ্যালয়েও এটুকু সুবিধা এখনও আছে, থাকাটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেই এই সুবিধা ভোগ করেছি প্যারিসে, একাধিকবার। নিম্নমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বহু বছর ধরে এই সামান্য সুবিধাটুকুও শিক্ষার্থীদের দিতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি 'অতি আবাসিক' বিশ্ববিদ্যালয়, কারণ এখানে কাগজে-কলমে অর্থাৎ অফিসিয়ালি প্রতিটি টেবিল, প্রতিটি বিছানা একাধিক জনের জন্যে বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে। আর বাস্তবে এক বিছানায় কত জন থাকে, সে প্রশ্ন আর নাই বা তুললাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রাবাস একেকটি 'চিৎকাৎ বোর্ডিং'– বিছানায় স্থান এতই স্বল্প যে হয় চিৎ হয়ে, নয়তো কাত হয়ে তোমাকে শুতে হবে। অন্যথায় মেঝেতে শোয়া অন্য কোনো শিক্ষার্থীর গায়ের উপর গড়িয়ে পড়বে। আবাসিক সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা র‌্যাংকিং-এ না থাকার অষ্টাদশতম কারণ।

প্রিয় দিনারজাদি, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নতুন জামাইয়ের মতো। প্রতিদিন সকালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের (চট্টগ্রামের ভাষায়) 'লুইত' (<লৌকিকতা?) করে নিয়ে আসতে হয় এবং বিকালে আবার বাড়ি পৌঁছে দিতে হয়। তুমি বলবে, এতে সমস্যা কী? প্রথমত, পৃথিবীর কোথাও শিক্ষার্থীদের এমন জামাই আদর করতে দেখিনি। দ্বিতীয়ত, নিজেদের আলাদা বাহনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। নিজেদের ব্রাহ্মণ এবং সাধারণ জনগণকে ব্রাত্য ভাবতে শুরু করে। জনগণ কী ভাবছে, কী বলছে, কেমন কষ্ট করে যাতায়াত করছে– এই সব খবর জানা যায় জনগণের সঙ্গে এক গাড়িতে চড়লে।

বাংলাদেশের মন্ত্রী এবং আমলারাও যে জনবিচ্ছিন্ন তার অন্যতম কারণ তাদের জনপরিবহণ ব্যবহার না করা। প্রত্যেক আমলাকে গাড়ি দিয়ে এই জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ানোর মহাপরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গরীবের ঘোড়ারোগের মতো এখনও শিক্ষকদেরও গাড়িরোগ হয়েছে। সেই দেশকে উন্নত বলা যাবে না যে দেশে গরীবের নিজের গাড়ি আছে। বরং সেই দেশকেই উন্নত বলতে হবে, যেখানে ধনীরা, আমলা-মন্ত্রীরা গণপরিবহণ ব্যবহার করে। আলাদা পরিবহণে চড়িয়ে শিক্ষার্থীদের অল্প বয়সেই ভাবতে শেখানো হয়: 'আমি কী হনুরে!' আমলারা, মন্ত্রীরা যে ট্র্যাফিক আইন মানে না, তার প্রমাণতো আমরা একাধিকবার পেয়েছি। যে বাসে করে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে কিংবা বাড়ি ফেরে, সেগুলো ট্র্যাফিক আইন না মানলেও চলে, একে ওকে ধাক্কা দিলেও ক্ষতি নেই, কারণ জামাইবাবু কিংবা দুলামিয়ার গাড়ি বলে কথা!

ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যাবার পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছাত্রাবাসে থাকে চাকুরি পাওয়া পর্যন্ত। অনেকে, বিশেষত নেতারা, শুনেছি ছাত্রাবাসের রুম ভাড়া দেয়। নীলক্ষেতের ব্যবসায়ী, কাটাবনের প্রেসের কর্মী অনেকেই নাকি থাকে ঢাবি ছাত্রাবাসে। অনেকের ছাত্রত্ব শেষই হয় না। নেতাদের অনেকে নাকি বার বার ইচ্ছে করে ফেল করে অনেক দিন নেতা থাকার আশায়। নেতা মানেই কোটি কোটি টাকা ইনকাম, কীভাবে কেউ জানে না (যার একটা মানে হচ্ছে, সবাই জানে, কেউ বলে না!) বেশিরভাগ ছাত্রাবাসে নাকি ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ, তিনগুণ শিক্ষার্থী বসবাস করে। কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। ছাত্রাবাসগুলো মুম্বাইয়ের বস্তির মতো, যেখানে নাকি পুলিশ ঢুকতেও দূর্গানাম জপ করে মনে মনে। বুয়েট ছাত্রাবাসের এক হাউজ টিউটর সম্প্রতি বলেছেন, তিনি হলে ঢোকেন না, কারণ ছাত্রেরা তাকে দেখলেই নানা রকম কমেন্ট করে, ইয়ার্কি মারে। আর ঢুকলেই বা কি? যে ছাগল ক্ষমতার খুঁটির জোরে নাচে, তাকে তুমি নতুন কোন দড়ি দিয়ে বাঁধবে?

বুয়েটছাত্র আবরার খুন হবার পরপরই গণরুমের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তোমার কি জিগ্যেস করতে ইচ্ছে করছে না দিনারজাদি: 'এতদিন কোথায় ছিলেন?' দুর্ঘটনা ঘটলেই বাংলাদেশের রাস্তায় স্পিডব্রেকার বসানো হয়, তার আগে নয়। অথচ বাংলাদেশ নাকি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। OFF দি পিপল, BUY দি পিপল, FAR দি পিপল! জনগণের (না, সরকারের নয়!) টাকায়, সরকারী ছাত্রাবাসে, সরকারী ছত্রছায়ায় (সম্ভবত) সরকারী মটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাঘা-পাতি-হবু ছাত্রনেতারা সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। র‌্যাগ ডে বা নাইট করে অসহায় নবীন শিক্ষার্থীদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার করে। শিক্ষককে চোখ রাঙিয়ে কথা বলে শিক্ষার্থী-নেতারা, প্রয়োজনে গালাগালি, চড়-থাপ্পর দেয়। ভিন্নমতাবলম্বী সহপাঠীকে শীতের রাতে বারান্দায় ফেলে রেখে কিংবা (আবরারের মতো) ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে খুন করে অনেকে মিলে। অথচ সরকার কিংবা খুঁটি বদল হলে রাতের অন্ধকারে এই এরাই পালাবার পথ পায় না। ছাগল কখনও বাঘ হয়? সরকার এবং প্রশাসনের যোগসাজসে যে অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালগুলোতে তাতে প্রতিদিন যে একজন করে আবরার খুন হচ্ছে না– এটা আমাদের চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য। আশরাফুল মখলুকাতের সম্মান আর জীবনের নিশ্চয়তা নেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তার জন্যে র‌্যাংকিং নেহায়েতই এক কালান্তক মৃগতৃষ্ণিকা।

ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় না। ষাট বা আশির দশকে টিভি-নাটক বা সিনেমার নায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতেন। ইদানীংকালের নাটক-সিনেমার বেশিরভাগ নাটকের নায়ক-নায়িকা এখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মধ্যবিত্তের সন্তান ও/এ লেভেল পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় টিকতে না পেরে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং সেখান থেকে পাশ করে বিদেশ চলে যায়। প্রতিটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অংশত একেকটি ইপিজেড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন গ্রামের মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের প্রাধান্য। শহরের মধ্যবিত্তের সঙ্গে গ্রামের মধ্যবিত্তের ভাব আদান-প্রদানের একটা জায়গা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। এই আদান-প্রদান আর হয় না এবং এই যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা উভয় শ্রেণির বিকাশের জন্যে এবং পরিণামে জাতির বিকাশের জন্যে ক্ষতিকর। শ্রেণিনির্বিশেষে সবার জন্যে উন্মুক্ত না হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং থেকে বাদ পড়ার উনবিংশতিতম কারণ।

[বাদশা এবং দিনারজাদি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। ইতিমধ্যে পূবের আকাশে সুবেহ-সাদিকের চিহ্ন ফুটে উঠলো এবং ভোরের আযানও শোনা গেল। শেহেরজাদি পূর্বরাত্রির মতোই কথা থামিয়ে দিলেন। ফজরের নামাজ পড়ে নকশি-লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন দুই বোন। বাদশা শাহরিয়ারও ফজরের নামাজ পড়তে বেরিয়ে গেলেন। খান ত্রিশেক কারণের মধ্যে মাত্র ১৯টি জানা হয়েছে। বাকি সব কারণ জানার আগ্রহ ছিল বলে বাদশাহ শেহেরজাদির মৃত্যুদণ্ড চতুর্দশ দিন সকাল পর্যন্ত স্থগিত করলেন।]

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক