প্রসঙ্গ নিকাহনামা: দূর হোক অসঙ্গতি

এনামুল হক ভূঁইয়া
Published : 2 Oct 2016, 10:43 AM
Updated : 2 Oct 2016, 10:43 AM

"বিবাহসভায় চারিদিকে হট্টগোল; তাহারই মাঝখানে কন্যার কোমল হাতখানি আমার হাতের উপর পড়িল। এমন আশ্চর্য আর কী আছে। আমার মন বার বার করিয়া বলিতে লাগিল, 'আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম।' কাহাকে পাইলাম। এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী, ইহার রহস্যের কি অন্ত আছে।"

না। ইহার রহস্যের অন্ত নেই। কথায় আছে, নারীর মন বিধাতা বোঝেন না। প্রেমিক বা স্বামী কোন ছার। মদ, নারী ও আবহাওয়া বিশ্বাস করা যায় না। আসলে কি তাই? এসব কি সমাজের প্রচলিত আপ্তবাক্য নয়? রবীন্দ্রনাথ বিবাহসভায় কনের কোমল হাতখানার অপেক্ষায় ছিলেন। এখনকার বরেরা অনেক পটু। কেবল হাতখানায় তাদের মনে শিহরণ জাগায় না। বিবাহ তাদের কাছে কাগজে সই করা ছাড়া বই কিছু নয়।

কিন্তু বঙ্গদেশের সে কাগজখানাও যে নারীর রহস্যের খোঁজে ব্যস্ত সেসব বিষয়ে আমাদের নারীবাদীরা কি আশ্বস্ত? তা না হলে 'নিকাহনামা' নামক কাগজখানাতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নারীর রহস্য উম্মোচনের যে চেষ্টা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ নেই কেন? তাহলে কি ধরে নেব, রাষ্ট্র বা সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে নারীবাদীরা যথেষ্ট সন্তুষ্ট। এখন শুধু নারীদের ঘর থেকে রাস্তায় বের করাই যথেষ্ট!

হ্যাঁ, অনেকে হয়তো বলবেন নিকাহনামা একটি প্রতীকী কাগজমাত্র। বিবাহ তার চেয়ে অনেক বড় কিছু। সেখানে কী লেখা হল, তাতে কী আসে যায়? আসে যায়। যদি প্রশ্নটি এমন হয়, তবে কেমন লাগে? "কন্যা কুমারী, বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্ত নারী কি না?"

বরের ক্ষেত্রে তেমন প্রশ্ন নেই কেন? তবে কি নারীর কুমারীত্ব কাঙ্ক্ষিত, বরের কৌমার্য অনাকাঙ্ক্ষিত? বৈধব্য নারীর ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্য, আর বিপত্নীক বর সৌভাগ‌্যবান? আমাদের সমাজে নারী তালাক পায়। নর তালাক দেয়। তাই নিকাহনামায় প্রশ্ন করা হয়, কন্যা তালকপ্রাপ্ত কি না? বরের বেলায় তা উহ্য থাকে।

আসুন, প্রশ্ন করি– "স্বামীর তালাক প্রদানের অধিকার কোনো প্রকারে খর্ব হইয়াছে কি না?' এ ব্যাপারে রাষ্ট্র চিন্তিত হলেও স্ত্রীর বিষয়ে রাষ্ট্রের বিকার নেই। কারণ, তালাক প্রদানের অধিকার নরের, নারীর বেলায় তা ঔদ্ধত্য বা বেহায়াপনা। লজ্জা যে নারীর ভূষণ।

আবার প্রশ্ন করি। এবার বরকে। যদি মুসলিম হন, "বরের কোনো স্ত্রী বর্তমানে আছে কি না এবং থাকিলে অন্য বিবাহে আবদ্ধ হইবার জন্য বর ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ মোতাবেক সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি লইয়াছে কি না?" এ প্রশ্ন কনেকে করবেন? নাউজুবিল্লাহ! এ প্রশ্নটি সর্বদা 'পুংলিঙ্গ'। এর 'স্ত্রীলিঙ্গ' করার সাহস সমাজ বা রাষ্ট্রের নেই।

কোনো রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন-কানুন ওই রাষ্ট্র তথা সমাজের চরিত্র বোঝার জন্য যথেষ্ট। যেখানে রাষ্ট্র নূন্যতম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে না বা নারীর অধিকারের প্রতি সচেতন নয়, সেখানে 'স্টে-টুগেদার' বা 'লিভ-টুগেদার' উদ্ভট চিন্তা। ব্র্যাড পিট ও ‌অ‌্যাঞ্জেলিনা জোলি জুটি দীর্ঘ ১০ বছর লিভ-টুগেদার করে বিয়ে করার মাত্র দুবছরের মাথায় ডিভোর্স নিতে যাচ্ছেন। সুতরাং স্টে-টুগেদার বা লিভ-টুগেদার কোনোটি সমাধান নয়।

অভিনেতা ফখরুল হাসান বৈরাগী প্রায় ১৪ বছর লিভ-টুগেদার করছেন। অতঃপর মনোমালিন্য হওয়ার পর মিডিয়ায় ভদ্রমহিলাকে নিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছেন তা রীতিমতো জঘণন্য। স্টে-টুগেদার বা লিভ-টুগেদারের করার জন্য একজন নারীর প্রতি যতটা শ্রদ্ধাবোধ থাকা দরকার তার কতটা আমাদের আছে? বাস্তবতা হল– বিয়ে হবে, ডিভোর্স হবে। প্রশ্ন হল, তারপর কী হবে?

অতঃপর একজন নারীকে আমরা 'ডিভোর্সি' বলি। এর 'পুংলিঙ্গ' কী? নেই। তাহলে সমস্যা সমাজের পোলারাইজেশনে; সমস্যা শিক্ষায়, দৃষ্টিভঙ্গিতে, মননে, মগজে। সমস্যা সমাজের পরতে পরতে। কেবল সমাজ বা রাষ্ট্র নয়, নারীরা অপমানিত ও অপদস্থ হচ্ছে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে, এমনকি ভাষায়। 'ষোড়শী' ও 'উর্বশী'র যেমন পুংলিঙ্গ নেই, তেমনি নেই 'শাঁখচুন্নি'র। 'বীরপুরুষ' ও 'কাপুরুষ' হতে পারে, 'বীরমহিলা' বা 'কামহিলা' হয় না। এসব যুগে যুগে সমাজে স্থান করে নিয়েছে। আমাদের সমাজদর্শনে নারী ধর্ষিত!

আমাদের সাহিত্যে এত বেশি রস যে রসিয়ে রসিয়ে নারীকে 'কোমল', 'পেলব', 'কমনীয়', 'নমনীয়', 'মোহনীয়', 'সহনীয়', 'সর্বংসহা' ইত‌্যাদি বিশেষণে ভূষিত করেছি। আর পুরুষ মানে তেজোদ্দীপ্ত, শৌর্য-বীর্য ইত্যকার বিশেষণ, হোক না তিনি যতই মিনমিনে। তাতে আমাদের মনোজগৎ এমনভাবে বিকশিত হয়, এমন বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠি যে নারীর প্রতি বৈষম্য আমাদের মধ‌্যে সহজাত বৈশিষ্ট‌্যের মতো প্রতিভাত হয়।

নারীঅধিকার আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৮ সালের ১৩ জুলাই। তাহলে এতদিন কি নারীরা অধিকারবঞ্চিত ছিল? সহজ উত্তর, 'না'। সৃষ্টির আদিতে নারী-পুরুষের অধিকারে বৈষম্য ছিল না। এখনও আমাজনের গহীন জঙ্গলের বাসিন্দাদের মধ‌্যে অধিকারের বেলায় নর-নারীর ভেদাভেদ নেই। ভেদাভেদ নেই আমাদের আদিবাসী বা উপজাতিদের মধ‌্যে। ক্ষেত্রবিশেষে নারীরা বেশি অধিকার ভোগ করে। তবে কি বলা যায় সভ্যতার উম্মেষের সঙ্গে সঙ্গে নর-নারীতে ভেদাভেদ তৈরি হয়েছে?

হয়তো-বা বর্তমান সভ্যতার ঊষালগ্নে কোনো প্রাকৃতিক কারণে নারীরা পিছিয়ে পড়েছে। সে প্রাকৃতিক কারণের একটি কিন্তু সন্তানধারণ ও লালনপালন, যা এখনও ক্ষেত্রবিশেষে নারীকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সিডও সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। অথচ আমাদের দেশে নারীর প্রতি বৈষম্য দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বিস্তৃত! জন্মের পর ছেলেদের ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া হয়। মেয়েদের বেলায় এর ব্যত্যয় রয়েছে। বৈষম্যের মধ‌্যে বেড়ে উঠে বিয়ের পর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর উপদেশ নিতান্ত হাস্যকর নয় কি?

পারিবারিক, সামজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের মধ‌্যে বেড়ে ওঠা কোনো বুড়ো ভামকে যতই পরিবর্তনের চেষ্টা করা হোক না কেন, তার মস্তিষ্কের ময়লা বা হৃদয়ের কয়লা কমিয়ে আনা গেলেও ‍পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। ধর্মকে ছোট করে বা মোল্লা-পুরুতকে গালি দিয়ে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা যায়, বৈষম্য দূর করা যায় না। বেগম রোকেয়া সমাজকে ভেঙেছেন, তসলিমা নাসরিন নিজে ভেঙেছেন।

দীর্ঘদিনের প্রচলিত সমাজব্যবস্থা হঠাৎ পরিবর্তনের জন্য যে শক্তি দরকার তা আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত নেই। তবে আশা করা যায়, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো প্রতিনিয়ত আঘাতের ফলে একটু একটু করে ভেঙে যাবে বৈষম্যের সমাজব্যবস্থা।

পৃথিবীর যে কোনো সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে মধ্যবিত্তরা। উচ্চবিত্তরা সমাজকে ডমিনেট করে, নিম্নবিত্তরা সরাসরি সমাজের বলি হয়। মধ্যবিত্তের সঙ্গে উচ্চ ও নিম্নবিত্তের ট্রানজিশন হলেও নিম্নবিত্তের সঙ্গে উচ্চবিত্তের ট্রানজিশন হয় না– সেটা বিত্তে হোক, আর চিন্তায় হোক। কিন্তু মধ্যবিত্তের দুপাশের সীমারেখা পরিবর্তনশীল। একই বিত্তের দুটি মানুষের মূল্যবোধ এক নয়। তবে সাদৃশ্য থাকে। সেই সাদৃশ্য কেবল মূল্যবোধের বেলায় পরস্পরকে কাছাকাছি আনতে পারে। তাছাড়া প্রত‌্যেকে 'ইউনিক'; চিন্তায়, চেতনায়, মূল্যবোধে মানুষের ভেদাভেদ চিরায়ত। এটি কেবল নর-নারীর বিষয় নয়। এটা মেনে নিয়েই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে।

প্রথম আঘাত আসতে হবে রাষ্ট্রের তরফ থেকে। রাষ্ট্র কিন্তু ধীরলয়ে হলেও এগিয়ে আসছে। সন্তানের পরিচয়ে মায়ের নামের ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীতে নারীর অংশগ্রহণ, খেলাধুলায় নারীর অংশগ্রহণ ইত্যাদি। আবার চ্যালেঞ্জিং, এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নারীরা অসীম সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসছে।

রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনকানুন, রীতি-রেওয়াজে যে সব বৈষম্য আছে তা অতিসত্ত্বর সংশোধন করা উচিত। আশা করি, সরকার নিকাহনামার অসঙ্গতি দূর করার লক্ষ‌্যে যথাযথ উদ্যোগ নেবে।

তথাপি বিবাহসভার হট্টগোলের মাঝেও বরের যেন মনে থাকে, "সে আমার সম্পত্তি নয়। সে আমার সম্পদ।"

দুজনে দুজনার সম্পদ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক