১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

সম্পর্ক, বিয়ে, অতঃপর নিপীড়ন

সম্পর্ক, বিয়ে, অতঃপর নিপীড়ন
REFILE - UPDATING SECOND SENTENCE A couple rests on a seaside promenade during a rain shower in the southern Indian city of Kochi May 29, 2011. India's annual monsoon rains have hit the southern state of Kerala two days earlier than expected, weather officials said on Sunday, boosting prospects for a harvest that could spur Asia's third-largest economy. REUTERS/Sivaram V. (INDIA - Tags: ENVIRONMENT IMAGES OF THE DAY)

সীনা আক্তার

Published : 25 Sep 2016, 10:57 AM

Updated : 01 Jul 2022, 05:44 PM

এক যুগল, প্রেমিক-প্রেমিকা ভালোবাসার ভেলায় এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। তাদের এই সুখকর উচ্ছ্বলতা আশেপাশের অনেকেরই মনোযোগ আকর্ষণ করে। দিন যায়। হঠাৎ প্রেমিক তরুণটিকে একা চলাফেরা করতে দেখা যায়, সঙ্গে প্রেমিকাটি নেই। ঘটনাটি জানার জন্য পরিচিত একজন ইতস্তত করেও পরে জিজ্ঞেস করে।

পরিচিত: কিছু মনে করবেন না, আপনাকে অনেকদিন একা দেখছি। ঐ আপুকে দেখছি না…

তরুণ: হুম, তার বিয়ে হয়েছে।

পরিচিত: আহা! কিন্তু কোথায়, কার সাথে বিয়ে হল?

তরুণ: আমার সাথে!

এটা একটা কৌতুক হলেও বাস্তবে এমন ঘটনা অহরহ দেখা যায়। বিয়ের পর অনেক মেয়েই অদৃশ্য হয়ে যায়, অথবা তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। এভাবে অনেক নারী নিজস্ব সত্তা, নাম-পরিচয় হারিয়ে অমুকের বউ বা তমুকের মা হিসেবে বাকি জীবন কাটায়। চার দেয়ালের আড়ালে কত প্রতিভা চাপা পড়ে যায়। বঞ্চনা ও তিক্ত অভিজ্ঞতায় কত নারী নীল হয়ে ওঠেন যার সামান্যই জানা যায়। সম্পর্ক, বিয়ে সবার জীবনেই মনোরম, আনন্দময় হবার কথা। ভাগ্যবানদের জীবনে সেই স্বর্গীয় স্বপ্নটি বাস্তবে রূপ নেয়। কিন্তু অনেক নারীর জীবনেই তা অধরা রয়ে যায়। ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে প্রায় সকল নারীর জীবনেই কম-বেশি এমনটা ঘটে। জানাশোনা প্রেমের বিয়ে বা পারিবারিকভাবে আয়োজন করা বিয়ে, সব ক্ষেত্রেই এটা ঘটে।

রুমানা মঞ্জুরের কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যিনি প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন হাসান সাঈদ নামের এক ব্যক্তিকে। রুমানার পেশাজীবন, অগ্রযাত্রা এবং সামাজিক মর্যাদা মেনে নিতে পারেননি সাঈদ। পরিণতিতে, রুমানার উপর নিপীড়ন-নির্যাতন চলতে থাকে; শেষে তিনি সহিংসতা শিকার হন এবং কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু চিরতরে মূল্যবান দুটো চোখই হারান।

চূড়ান্ত নির্মমতার কারণে ঘটনাটি মিডিয়াতে উন্মোচিত হয় এবং সর্বসাধারণ জানতে পারে। জানা যায়, সাঈদের হীনমন্যতা, ঈর্ষাকাতরতা এবং কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার কারণে রুমানা অনেক দিন থেকেই নিপীড়নের শিকার ছিলেন। কিন্তু তথাকথিত সামাজিক-পারিবারিক সম্মান, সন্তানের ভবিষ্যত এসবের বেড়াজালে দিনের পর দিন তিনি শারীরিক, মানসিক অত্যাচার সহ্য করেছেন।

রুমানার মতো অনেক মেয়েই লোকলজ্জার ভয়ে নীরবে নির্যাতন সহ্য করেন। কারণ বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে মেয়েদের বিশ্বাস, মানসিকতা সেভাবেই তৈরি করা হয়। যেমন, "আমি তোমার বধু, তুমি আমার স্বামী; খোদার পরে তোমায় আমি বড় বলে জানি!"

Image
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে মেয়েদের বিশ্বাস, মানসিকতা সেভাবেই তৈরি করা হয়, "আমি তোমার বধু, তুমি আমার স্বামী; খোদার পরে তোমায় আমি বড় বলে জানি!"

পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০১১ অনুযায়ী বাংলাদেশে শতকরা ৮৭ ভাগ বিবাহিত নারী তাদের স্বামীর হাতে নিগৃহীত হন। ভাষায় এবং কূটচালে কত নারী নিপীড়নের শিকার হয় তার কোনো তথ্য নেই। কারণ আমাদের দেশে মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন তেমন আমলে নেওয়া হয় না অথবা লঘু করে দেখা হয়। অথচ গবেষণায় দেখা যায়, শারীরিক নির্যাতনের তুলনায় মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের ক্ষত অনেক গভীর এবং এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী।

আমাদের দেশে প্রায় অধিকাংশ মেয়ে স্বামী এবং অথবা তার স্বজনদের দ্বারা অপমান, অবমাননা, কটূক্তি, কর্তৃত্ব-নিয়ন্ত্রণের শিকার হন। এর ফলে, অনেক নারী মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশায় সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা থেকে আক্রান্ত হন বিষণ্নতায়। কেউ কেউ বেছে নেন আত্মহনন বা সন্তান-হননের মতো ভয়ংকর পথ। আমাদের চারপাশেই এমন ঘটনা ঘটছে।

বলাবাহুল্য, পরিবারে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে সমাজ-ধর্ম, তথাকথিত পারিবারিক সম্মানের নামে মেয়েদের উপর কর্তৃত্ব ও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু সচেতন, বুদ্ধিদীপ্ত ও আত্মমর্যাদাশীল মেয়েরা তা মানবেন কেন? আত্মবিশ্বাসী মেয়েরা পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ চ্যালেঞ্জ করেন। ফলে তাদের প্রতি নিষ্ঠুর আক্রমণ যেন অবধারিত। শিক্ষিত, আর্থিক-সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী অনেক মেয়ে স্বামীর পরিবার ও স্বজনদের কাছে তুচ্ছ বলে বিবেচিত হন, উপেক্ষিত হন নানাভাবে।

আর যদি হয় সেটি ভালোবাসার বিয়ে? পরস্পরের পছন্দে বিয়েতেও মেয়েটিকেই দায়ী মনে করে হেয় করা হয়। বিয়ে দিয়ে তাকে যেন দয়া করা হয়েছে, শ্বশুরকুলের কথায়-ইঙ্গিতে থাকে তেমন আচরণ। আর মেয়েটি যদি ছেলের সমবয়সী হয়, এর জন্যও মেয়েটিই দোষী। মেয়েটি যদি ব্রোকেন ফ্যামিলির হন তবে সেটা তো তারই ত্রুটি। বিয়েতে যৌতুক দেওয়া হয়নি এবং নিজের উপার্জনের হিসাব-নিকাশ মেয়েটি শ্বশুরকূলকে দেন না এমনটা হলে তো কথাই নেই, সেটা আরও অমার্জনীয় অপরাধ! মেয়েটি বরের চেয়ে বেশি মাইনের চাকরি করেন, পেশাজীবনে উন্নতি করেন, এসবও মেয়েটির দোষ।

এসবের কারণে সংকীর্ণ মানসিকতার স্বামী এবং অথবা তার স্বজনরা নানা ছুঁতোয় সেই মেয়ের জীবন দোযখ বানিয়ে তোলে। অনেক পুরুষ নিজে করে না, কিন্তু বউয়ের উপর স্বজনদের অন্যায় আচরণে কিছু মনেও করে না বা প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয় না। কারণ এ ধরনের পুরুষের মনোজগত নিপীড়নমূলক নীতি ও মূল্যবোধে ঠাসা।

প্রত্যেক পরিবারেরই নিজস্ব মূল্যবোধ, আদর্শ, সংস্কৃতি আছে এবং সে আলোকেই সেই পরিবারের ছেলেমেয়েদের মানস গঠিত হয়। ভালোবাসাময় এবং শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক তৈরি এবং বজায় রাখার ক্ষেত্রে যা গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্ক, বিয়ে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের বিয়ের পূর্বে সঙ্গীর পারিবারিক মূল্যবোধ জানার তেমন সুযোগ নেই।

বিয়ের আগে ছেলেরা অন্তত মেয়ের বাড়ি যাবার সুযোগ পায়, কিন্তু মেয়েদের সে সুযোগ নেই। মেয়েরা বিয়ের আগে শ্বশুরবাড়ির অন্দরমহল দেখার সুযোগ পায় না। সেই পরিবারের মানুষজনের মানসিকতা ও মূল্যবোধ জানা-বোঝার সুযোগ পায় না। প্রায় সব মেয়েই এক অজানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে, চোখের পানি ফেলতে ফেলতে শ্বশুরবাড়িতে যাত্রা করে। হঠাৎ একটা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া যে কারও জন্যই কঠিন।

তবে বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার কারণে ছেলেদের তেমন কোনো অসুবিধা হয় না, তাদের পক্ষে 'জামাই আদর' বলে একটা কথাই আমাদের সংস্কৃতিতে চালু আছে। কিন্তু প্রায় সকল বিবাহিত মেয়ের বেলায় এর উল্টোটা ঘটে। সেজন্য, বিয়ে-পূর্ব প্রত্যাশা এবং বিয়ে-পরবর্তী বাস্তবতার ব্যবধান ঘুচাতে পরস্পরের মূল্যবোধ, পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে ভালো বোঝাপড়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

Image
হঠাৎ একটা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া যে কারও জন্যই কঠিন

তাই সঙ্গী নির্বাচনে দম্পতি-বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক পিটার পিয়ার্সন (Peter Pearson) দুজনের একই মূল্যবোধের (common values) উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর মতে, পরস্পরের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়গুলো মধ্যস্থতা করা যায়। মূল্যবোধের ক্ষেত্রে তা হয় না। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কোনো যুগলের এক জনের পছন্দ সপ্তাহান্তে পাহাড়-জঙ্গলে ভ্রমণ। অন্যজনের পছন্দ রাতভর পার্টি করা। এগুলোতে আপোষ করা সম্ভব। যেমন, এক সপ্তাহান্তে পাহাড়-জঙ্গলে ঘোরাঘুরি এবং পরের সপ্তাহান্তে পার্টি করা।

তবে মূল্যবোধের পার্থক্যে– যেমন একজন যদি নিজের অগ্রগতি ও পদমর্যাদায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়, আর অন্যজন সামাজিক মর্যাদা গ্রাহ্য না করে– তবে সেই সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকে।

প্রেমিক পুরুষ এবং পারিবারিক পুরুষের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য। সে কারণে সম্ভাব্য বরের নীতি-মূল্যবোধ অনুধাবনে পারিবারিক পরিমণ্ডলে একসঙ্গে অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। রেস্টুরেন্টে খেয়ে, সিনেমা দেখে, পার্কে সময় কাটিয়ে কারও মূল্যবোধ সঠিকভাবে উপলদ্ধি করা অসম্ভব।

এজন্যই উদার সমাজ ব্যবস্থায় সম্পর্ক পরামর্শকরা বিয়ের আগে তিন থেকে ছয় মাস প্রেমিক-প্রেমিকাকে একত্র বসবাসের (live together) পরামর্শ দেন। কিন্তু আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে বিয়ে-পূর্ব একত্র বসবাসের অনুমোদন দেয় না। তাই আমি আগের লেখায় সম্ভাব্য সঙ্গীর নীতি-মূল্যবোধ যাচাইয়ের একটা বিকল্প পদ্ধতি প্রস্তাব করেছি। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিশেষ করে মেয়েটি অতিথি হিসেবে হবু বর এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের বাড়িতে অবস্থান করবে, যাকে বলা যায় সহাবস্থান (stay together)। পারিবারিক পরিবেশে দুজনের সহাবস্থান মানে একসঙ্গে 'ঘুমানো' বা যৌন-সম্পর্ক স্থাপন নয়।

বিস্তারিত:

সম্পর্ক, বিয়ে; অতঃপর…

সঠিক বর বা কনে নির্বাচনের সেকেলে, অকার্যকর পদ্ধতি আমাদের দেশে অনেক অসুখী দাম্পত্য এবং নারীনিপীড়নের অন্যতম কারণ। আমাদের বিয়ে-ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সময়ের চাহিদায় বর বা কনে নির্বাচনে পরিবর্তন এসেছে। একসময় মেয়েরা বিয়ের আগে বরকে দেখার সুযোগ পায়নি, এমনকি বিয়েতে মেয়েদের সন্মতিও নেওয়া হত না। কিন্তু এখনকার তরুণ-তরুণীরা এসব চিন্তাও করতে পারে না।

এখনকার অভিভাবকদের মানসিকতাও অনেক উদার এবং সকল মা-বাবাই তাদের ছেলেমেয়েদের সুখী বিবাহিত জীবন আশা করেন। বিয়ে-পূর্ব সহাবস্থান পদ্ধতি (stay together) বাস্তবায়নে দুপক্ষের অভিভাবকের সহযোগিতা অত্যাবশ্যক।

আশা করি বিয়ে-পূর্ব একত্র বসবাসের বিকল্প হিসেবে সহাবস্থান পদ্ধতি সঠিক সঙ্গী নির্বাচনে সহায়ক হবে এবং নারীনিপীড়ন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।