মরণ ব্যাধি যৌতুক
যৌতুক একটি অনৈতিক, অমানবিক ও অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও আমাদের শিক্ষিত ও সচেতন সমাজের কাছে তা প্রচন্ডভাবে জনপ্রিয়। অবশ্য নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের আমরা দায়ি করে থাকি। কিন্তু দেখা গেছে ধনী ও স্বচ্ছল পরিবারেও যৌতুকের দাবি আছে, সমাদরও আছে। বর ও বরের পরিবার সবসময় প্রত্যাশায় থাকে কনের বাড়ি থেকে কিছু না কিছু তো আসবে। অর্থ-গহনা-গাড়ি-ফার্নিচার-ফ্রিজ-টেলিভিশন-মোটর সাইকেল ইত্যাদি মূল্যবান সামগ্রী দিয়ে মেয়েটিকে আসতে হবে। আবার কোথাও ছেলের নামে জমি, বাড়ি, ব্যবসা দেয়ার রীতিও চালু আছে। আজকাল দেখা যাচ্ছে ছেলের চাকরী যোগার করে দিতে অথবা বিদেশে পাঠানোর টাকা দিতে হবে।
ছেলে বা ছেলের পরিবারের খায়েশ মেটাতে অনেক মেয়ের বাপ সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তবু সান্তনা নিয়েছেন মেয়ে সুখে থাক। মেয়ে সুখে হয়তো কোথাও কোথাও আছেন, কিন্তু সবাই নয়। কেননা স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির চাহিদার শেষ থাকে না। তারা মাঝে মাঝে বলে বসে, 'তোমার বাপের বাড়ি থেকে কিছু টাকা আনো'। কিছু মানেই হলো লক্ষ টাকা। যে মেয়ে দেখে বাবা কষ্ট করে তার বিয়ে দিচ্ছে, সে কোন মুখে আবার টাকা চাইবে ? লজ্জায়-অপমানে একদিন সে আত্মহত্যা করে খবর হয়ে উঠলো। অথবা স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করে যা হত্যা হিসেবে পত্রিকায় স্থান পায়। আমরা তো দেখেছি প্রকৌশলী স্বামী যৌতুকের জন্য স্ত্রী হত্যা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে দিনের পর দিন নির্যাতন করেছে। এভাবে দেখতে গেলে দেখা যাবে ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহর-গ্রাম সর্বত্র যৌতুকের অভিশাপ মেয়েদের ভাগ্যকে বিরম্বিত করে দিচ্ছে।
আমাদের দেশে যৌতুকবিরোধী আইন রয়েছে, কিন্তু কার্যকর নয়। বিচারের রায় পাল্টে দেয়া হয় অর্থ-বিত্ত-প্রভাব খাটিয়ে। আর দরিদ্র ঘরের মেয়ের না হয় বিয়ে, না পায় শিক্ষা ও কাজ। ফলে ধর্ষণের শিকার হয়, অথবা দেহ ব্যবসায় বাধ্য হয়।
সেদিন এক মহিলা বললেন, তার জামাই মেয়েকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছে ঈদের কেনাকাটার খরচ এবার বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসো। মেয়ের মুখ চেয়ে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। কিন্তু জামাই খুশি হয়নি। আর একজনের কথা জানি, একটি অন্ধ মেয়েকে বউ করে এনেছিল ছেলের মা এক শর্তে ঘরে বসে কোরান শরীফ ও নামায পড়তে হবে। এই শর্ত শুনে অনেকেই অন্ধ মেয়েটির স্বার্থে দান-খয়রাতের সাহায্য দিয়ে ঘটা করে বিয়ে দেন। বিয়ের দু'মাস পর সব টাকা, কাপড়, বিছানা, রেডিও, হাড়ি পাতিল কেড়ে নিয়ে মেয়েটিকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। আর বিয়ের অনুষ্ঠানে যৌতুকের টাকা ও সামগ্রী না দেয়ায় অনেক বিয়ে ভেঙ্গেও যায়। বরের বাপ সদর্পে বরকে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায়। এই আমাদের সামাজিক অবস্থা। মধ্যযুগীয় চিন্তাধারা নিয়ে তারা আবার সভ্য বলে বড়াই করে থাকেন।
আমি এই যৌতুকের মানসিকতা নিয়ে অনেকের কথা বলেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ছেলের মা-বাপ মনে করেন এতো কষ্টে ছেলেকে মানুষ করলাম। মানুষ হ্ওয়ার পর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক বা সরকারি চাকুরিজীবী হলো সুতরাং মেয়ের বাপ তার মেয়ের সুখের জন্য কেন অর্থ খরচ করবে না ?
আমার প্রশ্ন হলো মেয়ের বাপও তো মেয়েকে মানুষ করেছে। লেখাপড়া-ঘর সংসারের উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছে। তাহলে যৌতুক চাওয়া কেন ?
২. ছেলে বা ছেলেপক্ষ মনে করে মেয়েটি তাদের ঘরে এসে উঠবে, থাকবে খাবে – তাহলে আসার সময় কিছু অর্থ ও বিত্ত নিয়ে আসুক ! আমাদের কথা হলো, এটা একটা ঘৃণ্য মানসিকতা। মেয়েটি বরের স্ত্রী ও পরিবারের একজন সদস্য হয়ে আসছে। সেও তো এই পরিবারের কাজ-কর্ম, দেখা-শোনার সব দায়িত্ব নিচ্ছে। এমনকি বংশধরের জন্মও দিচ্ছে, তাহলে আবার সঙ্গে 'কিছু না কিছু' নেবার প্রশ্ন ওঠে কেন ?
৩. মেয়েটি যদি বরের চেয়েও শিক্ষা-চাকুরীতে উপযুক্ত হয় – তবুও তারা যৌতুক চেয়ে বসে।
আমাদের কথা হলো-তারা কি একবারও চিন্তা করে না যে, এই উপযুক্ত মেয়ে তাদেরও পরিবারের গর্ব ও গৌরব। সে তার নিজের আয়ের অর্থ তো স্বামী ও তার পরিবারের জন্য খরচ করে থাকে।
আমার কাছে অনেক মেয়ে বলেছে বেতনের পুরো টাকা ব্যাংকে জমা পড়লেও স্বামী তুলে নেয়। তার হাতেই সব খরচ। আমি মা-বাবা ভাই বোনদের কিছুই দিতে পারি না।
অনেক বিয়ে ঠিক হবার সময় দুপক্ষই বড় বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, 'বিয়েতে যা ইচ্ছে দেবেন। আমাদের কোন দাবি-দাওয়া নেই।' কিন্তু বিয়ের সময় মেয়ের গায়ের গহনা কতখানি ঠিকই তারা মাপ-জোক করেন। আবার মেয়েপক্ষ ছেলেপক্ষের আনা বাকস দেখে মুখভার করে। এটা একটা বদাভ্যাস। কুটনামি ও পরদিনন্দাচর্চা আমাদের জীবনের রক্তে রক্তে ঢুকে গেছে। দুই পক্ষের এই টানাপোড়েনে মেয়ে ও ছেলের ওপর চাপ ফেলে-ফলে অশান্তির সৃষ্টি হয়। আমরা দেখেছি ছেলে ও মেয়ে প্রেম করে বিয়ে ঠিক করেছে। সেখানেও দেয়া-নেয়ার প্রশ্ন ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের বাপ ধনী হওয়ায় মেয়েকে ইচ্ছেমতো দিয়ে থাকেন – সেটাও ছেলের ঘরে প্রভাব ফেলে এবং এক সময় ছেলে বাপ-মা ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়তে বাধ্য হয়। এটা বেদনায়ক হয়ে দেখা দেয়।
আজকাল অনেক দরিদ্র পরিবারের বিয়েতে বরপক্ষ অর্থ ও সাইকেল দাবি করে। পঞ্চাশ-ষাট বরযাত্রী নেবার কথা বলে একশজন নিয়ে খেতে বসে। মধ্যবিত্ত পরিবার তো আশায় থাকে ছেলের বিয়েতে কি যৌতুক চাইবেন। উত্তরবঙ্গে যৌতুকহীন বিয়ের কতা শোনাই যায় না। একজন সরকারি চাকুজীবী, অধ্যাপক হলেই তিন থেকে দশ লক্ষ টাকা দাবি করে থাকে। মেয়ের বাপের সামর্থ হোক না হোক এটা কোন বিবেচনা হতে পারে ?
আমার কাছে মনে হয়েছে লোভ থেকেই যৌতুকের সৃষ্টি। পুত্র মানেই যেন ধন-সম্পদ, সুতরাং তাকে দেখেই যেন মেয়ের বাপ-মা সবকিছু উজার করে দেবেন। আমার কাছে এ প্রবনতা সবসময় মনে হয়েছে নীচু মনের পরিচয়। ছেলেপক্ষ কী ভিখিরির জাত যে যৌতুক দাবি করবে বিয়ের পূর্বে এবং পরে? সমাজে ধনী ও বিত্তশালী হবার যে প্রতিযোগিতা চলেছে তা অবশ্য আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে।
যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি শুধু নয়, মরণ ব্যাধি। আমাদের মনে রাখতে হবে, যৌতুক যে দেয়, এবং যৌতুক যে নেয় দুজনেই সমান অপরাধী। এই অপরাধ থেকে উদ্ধার পেতে হলে শুধু সরাকারি আইন, আদালত ও শাস্তি যথেষ্ট নয়। এজন্য ঘরে ঘরে আন্দোলন গড়তে হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে সোচ্চার হতে হবে। নারীর জীবন কেন যৌতুকের অভিশাপে জর্জরিত হবে ? কেন তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে ? তার জীবন তাকে বাঁচাতে শেখাতে হবে। হতাশা বা কোন অবসাদ যেন তাকে গ্রাস না করে সেটা তাকে উপলব্ধি করতে হবে এবং করাতে হবে।
