১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ঐশী নয়, রিমান্ডে গোটা সমাজ

Published : 21 Aug 2013, 06:45 PM

Updated : 01 Jul 2022, 05:50 PM

সম্রাট যখন নতুন পোশাক পরে আছেন মনে করে কোনো পোশাক ছাড়াই সর্বসাধারণের সামনে দিয়ে অহংকারী দৃপ্ত পদক্ষেপে চলছিলেন তখন জনতা চুপ করে ছিল ভয়ে। কিন্তু একটি শিশু প্রকাশ করে দিয়েছিল সত্য। সে চিৎকার করে বলেছিল সম্রাটের গায়ে তো কিছুই নেই।

যুগে যুগে এভাবেই নগ্ন সত্য প্রকাশ করে দেয় শিশুরাই। আমাদের সমাজের আরেকটি নগ্ন সত্য বড় নির্মমভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে আরেকটি শিশু। তার নাম ঐশী। এই শিশুটির দিকে এখন সমাজের মানুষ অবাক চোখে তাকিয়ে রয়েছে। মিডিয়া তাকে মনে করছে নতুন চাঞ্চল্যের খোরাক!

কিন্তু প্রকৃত সত্য কী? কেন একটি শিশু তার সবচেয়ে আপনজন, তার বাবা-মাকে হত্যা করতে যায়? কেনই-বা তার বন্ধুরা তাকে সাহায্য করে?

বলা হচ্ছে ঐশী মাদকাসক্ত। আবার বলা হচ্ছে সে লাগামহীন জীবনযাপন করত। একটি কিশোরী লাগামহীন জীবনযাপনের টাকা পায় কোথায়? তার পুলিশ কর্মকর্তা বাবা কত টাকা বেতন পেতেন যে মেয়েকে এ জন্য টাকা দিতে পারতেন? ইয়াবা খেত বুঝলাম, কিন্তু সেই ইয়াবা কেনার টাকা সে কোথায় পেত? তার যে বন্ধুরা মাদক গ্রহণ করে সেই বন্ধুরাও তো কিশোর-তরুণ। তারাই-বা এত টাকা কোথায় পায়? সেই বন্ধুদের কি কোনো বাবা-মা নেই? তাদের পেশা কী? কাদের ছেলেমেয়েরা ডিজে পার্টিতে যায়?

তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কিশোর-তরুণদের হাতে কীভাবে মাদক পৌঁছায়? স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোরদের হাতে যে ব্যক্তিরা মাদক তুলে দেয় তাদের তো আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার কথা নয়। দেশে এত মাদক চোরাচালান হয়ে আসে, ছড়িয়ে যায় দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আর আইনের রক্ষকরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়! কারণ যারা মাদকের ব্যবসা করে তাদের হাত এতই শক্তিশালী যে সেখানে হাতকড়া পরানো চলে না।

স্কুলে এখন মাদকের নেশা করে ছেলেমেয়েরা। ভাবতে অবাক লাগে স্কুল কর্তৃপক্ষ তখন কী করে? কী শিক্ষা তারা দেয় ছেলেমেয়েদের যে তারা বিপথে যায়!

একটি শিশু যখন দেখে তার বাবা-মা দুর্নীতি ও ঘুষের টাকায় অথবা অন্য কোনো অবৈধ রোজগারের অর্থে ফুর্তিতে মত্ত তখন সে তাদের কাছ থেকে আর কিছু শিখতে পারে না। সে দেখে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা নোংরা রাজনীতির খেলায় ব্যস্ত। ক্লাসে না পড়িয়ে, বাড়িতে কোচিং করছেন। তখন সে শ্রদ্ধা হারাচ্ছে শিক্ষকদের প্রতি।

ওদিকে, ধর্মীয় নেতা ও রক্ষণশীলরা এখন বুক ফুলিয়ে, গলা বাড়িয়ে বলছেন দ্যাখো পাশ্চাত্যের শিক্ষার কুফল। কিন্তু শিশুকে মানসিক আশ্রয় দেবে কে? শিশুরা তো দেখছে আমাদের তথাকথিত ধর্মীয় নেতারা আসলে ধর্মব্যবসায়ী মাত্র। তাদের একাংশ রাজাকার, আরেক অংশ অশালীন বিকৃত রুচির মানুষ মাত্র। আবার আমাদের রাজনৈতিক নেতারাও ভ্রষ্ট আর নষ্ট। তারা চায় ক্ষমতা, যে কোনো মূল্যে। মোট কথা, গোটা সমাজের কেউ আমরা শিশু-কিশোরদের সামনে কোনো মহৎ আদর্শ রাখতে পারিনি।

ঐশী আজ তার বাবা-মায়ের তথাকথিত খুনি বলে তাকে নিয়ে এত আলোচনা। কিন্তু তার বয়সী শিশু-কিশোররা রাজনীতির নামে রাস্তায় বোমা ছুঁড়ছে, গাড়িতে আগুন দিচ্ছে, সহপাঠীকে হত্যা করছে, মাদক বা জঙ্গীবাদের নেশায় বুঁদ হচ্ছে। আর শিশুদের হাতে অস্ত্র, টাকা তুলে দিয়ে তাদের খুনি, নেশাগ্রস্ত, জঙ্গী বানাচ্ছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা। এ দায় সব দলের। ধরা পড়লে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ায় তথাকথিত অপরাধী শিশু-কিশোর-তরুণ। আর যারা তাদের এ পথে ঠেলে দেয় তারা রয়ে যায় যবনিকার আড়ালে। মঞ্চের কুশীলবরা হয়তো ধরা পড়ে, কিন্তু দলের অধিকারী রয়ে যায় দৃষ্টির আড়ালে।

ঐশী তো একদিনে বিপথে যায়নি। সে তো নিজে নিজে ইয়াবা তৈরি করেনি। সে যখন ধীরে ধীরে অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছিল তখন তার বাবা, মাম, শিক্ষক কেউ খেয়াল করলেন না! তার বন্ধুদের বাবা-মায়েরাই-বা কী করছিলেন বা করেছেন? তারা কেন তাদের শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হলেন? না কি তারা নিজেরাই আঁধার পথের পথিক?

যে শিশু অন্তরে নিঃসঙ্গ সেই তো কুসঙ্গে পড়ে।

ঐশী একটি প্রতীক মাত্র। আমার, আপনার সন্তানও যে কোনোদিন এই পথে পা বাড়াবে না কে তার গ্যারান্টি দেবে? হ্যাঁ, গ্যারান্টি আবার দিতে পারি আমরাই। বাবা-মা যখন টাকার নেশায় মত্ত, যখন শিশুকে সময় না দিয়ে সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত, শিক্ষক যখন শিশুকে নৈতিক শিক্ষা না দিয়ে আরও বেশি কোচিং, আরও বেশি টাকার নেশায় উন্মত্ত– তখন শিশু যদি বিপথে যায় তার দায়দায়িত্ব আমাদের সবাইকেই নিতে হবে। এ দায় কোনো শিশুর একার হতে পারে না। কিছুতেই না।

শিশুর হাতে আমরা বই তুলে দিইনি, তুলে দিয়েছি লাখ টাকা দামের পোশাক আর কম্পিউটার গেমস যেখানে ভায়োলেন্সের ছড়াছড়ি। নিজেরা সময় না দিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে তার হাতে তুলে দিয়েছি অবৈধ রোজগারের টাকা। তার সামনে বা আড়ালে খুঁজে নিয়েছি এমন সব বিনোদন যেখানে যৌনতাই প্রধান। তাহলে শিশু কী শিখবে আর কী আচরণ করবে?

মিডিয়ার যে সাংবাদিকরা ঐশীর ইয়াবা সেবন আর অনাচারের কাহিনি সবিস্তারে তুলে ধরছেন তারা কি একবারও ভাবছেন যে এই মেয়েটি তার নিজের মেয়েও হতে পারত। হতে পারত তারই শিশু সন্তান। ঐশী তো একটি শিশুমাত্র। আমার তো চোখে ভাসছে আমার পনের বছর বয়সী সন্তানের মুখ।

ঐশী এই সমাজের মুখোশ উন্মোচন করেছে। আমরা দেখছি নিজেদের চেহারা আয়নায়। সে এই সমাজের ঘুষ, দুর্নীতি, অনাচার, ভ্রষ্টাচার ও ভণ্ডামির বলি। সে ঘোষণা করেছে যে প্রলয়ের মেঘ জমা হয়েছে আকাশে। নিনেভা নগরীর ধ্বংস ঠেকাতে জাগতেই হবে আমাদের। ঐশীর মতো আর কোনো শিশু যেন এই সমাজের বলি না হয়।

পাশাপাশি বলব, যে পুলিশ অফিসার ও তার স্ত্রী খুন হলেন, এখানে প্রকৃত খুনি কে সেটিও আসলে একটি প্রশ্ন বটে। একদল শিশু তাদের খুন করেছে এটা ধরে নেওয়া মুশকিল। এমন কি হতে পারে যে, তাদের খুন করেছে মাদক ব্যবসায়ী চক্র যেটির প্রশ্রয়দাতা আইনের রক্ষকরাই! নাকি দুর্নীতির টাকা আর মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ধারক এই সমাজই খুনি?

খুনের রহস্য উদঘাটনের জন্য দু-তিনটি শিশুকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। আমরা বলব, রিমান্ডে নেওয়া উচিত এই সমাজের সমাজপতিদের। তবেই যদি কিছু হয়।

শান্তা মারিয়া: সাংবাদিক, কবি।