যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং নিজামীদের ‘ইসলাম’

শাহরিয়ার কবিরশাহরিয়ার কবির
Published : 8 Dec 2009, 04:54 PM
Updated : 8 Dec 2009, 04:54 PM

'৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামীর মজলিশে শুরার অধিবেশনে মতিউর রহমান নিজামী সরকারকে আবারও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করার কথা বলেছেন। ৭ ডিসেম্বর দলের এই শীর্ষ বৈঠকে তিনি কলের গানের পুরনো ভাঙা রেকর্ডটি আবারও বাজিয়েছেন – জামায়াতি নাকি '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনও গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, নাকি এর কোনও প্রমাণ নেই। নিজামী আরও বলেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নাকি ইসলামবিরোধী! একই সঙ্গে '৭১-এর সংবিধানকেও নিজামী ইসলামবিরোধী বলেছেন।

নিজামীদের ইসলাম আর প্রকৃত ইসলাম যে এক নয় এ কথা জামায়াতের জন্মের পর থেকেই উপমহাদেশের আলেম সম্প্রদায় বলে আসছেন। নিজামীদের ইসলামে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুণ্ঠন, গৃহে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি যাবতীয় জঘন্য অপরাধ হচ্ছে জায়েজ এবং ওয়াজেব। যারা এসব নৃশংস অপরাধের জন্য দায়ী তাদের সমালোচনা কিংবা বিচারের কথা বলা জামায়াতের ফতোয়া অনুযায়ী ইসলামবিরোধী।

জামায়াতের ইসলাম অনুযায়ী পাকিস্তানের সমালোচনা করাও ইসলামবিরোধী। '৭১ –এ জামায়াতের বর্তমান আমীর মতিউর রহমান পাকিস্তানকে 'আল্লাহর ঘর' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ভাগ্যিস পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে 'ব্লাসফেমি আইন' নেই। থাকলে জামায়াত, পাকিস্তান ও নিজামীদের সমালোচনার জন্য আমাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত।

'৭১-এর যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে জামায়াতের মিথ্যাচার ও মোনাফেকি শুনতে শুনতে আমরা বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেছি। '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত কীভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পক্ষে ছিল, কীভাবে এসব নৃশংস অপরাধে তাদের প্ররোচিত করেছে এবং কীভাবে নিজেরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পাকিস্তান ও ইসলাম রক্ষার কথা বলে রাজাকার-আলবদর ইত্যাদি ঘাতক বাহিনী গঠন করে হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন লুণ্ঠনে অংশগ্রহণ করেছে তার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাবে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের এলাকার ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে।

লিখিত প্রমাণ পাওয়া যাবে জামায়াতের দলীয় মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এর তখনকার ফাইল এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের দলিলপত্র থেকে। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা কীভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যাবতীয় দুষ্কর্ম সমর্থন করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কী কুৎসিত ভাষায় গালিগালাজ করেছে তার শত শত বিবরণ পাওয়া যাবে '৭১-এর দৈনিক সংগ্রাম-এ।

স্বাধীন বাংলাদেশের বিএনপির বদৌলতে জামায়াত যখন থেকে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে তখন থেকে দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন: '৭১-এ আমরা ভুল করিনি।

জামায়াতের বিবেচনায় হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন যেহেতু ইসলামের সমার্থক ও জায়েজ সেহেতু এ কথা তারা বলতেই পারে যে '৭১-এ তারা কোনও ভুল করেনি।

কিন্তু জামায়াত যখন বলে মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল, হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন-লুণ্ঠন কিছুই করেনি তখন বলতেই হবে: সকল ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ আইনে এসব অপরাধের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে তা ঠিক নয়।

আমাদের পেনাল কোড সংশোধন করে লিখতে হবে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন-নির্যাতন অন্য সকলের ক্ষেত্রে অপরাধ হলেও জামায়াত করলে কখনও তা অপরাধ হবে না, কারণ জামায়াতের যাবতীয় কাজ ইসলামের জন্য।

জামায়াত যখন বলে '৭১-এ আমরা ভুল করিনি, তখন তা বুঝতে অসুবিধে না হলেও যখন বলে '৭১ এ জামায়াত যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল না তখন প্রশ্ন করা যেতে পারে – '৭১ এ জামায়াত যে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অধীনে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রিসভায় দুটি পদ হাতিয়ে নিয়েছিল এবং রাজাকার, আলবদর বাহিনী গঠন করেছিল তার উদ্দেশ্য কী ছিল?

জামায়াত নিশ্চয়ই আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি করার জন্য শান্তিকমিটি বা রাজাকার-আলবদর বাহিনী গঠন করেনি? '৭১-এ রাজাকাররা কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালিদের 'ভারতের চর', 'ইসলামের দুষমন' ও 'দুষ্কৃতকারী' আখ্যা দিয়ে হত্যা করেছিল তার সংবাদও '৭১-এর দৈনিক সংগ্রাম-এ পাওয়া যাবে।

'গণহত্যা', 'যুদ্ধাপরাধ', 'মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ' ও 'শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ' সংজ্ঞায়িত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। তবে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, নির্যাতন প্রভৃতি যে দণ্ডনীয় অপরাধ তা সকল ধর্মীয় আইন ও ধর্মনিরপেক্ষ আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

'হত্যা সব ধর্মেই মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। যুদ্ধের সময় নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ইসলামী আইন ও বিধানে। 'হত্যা' ছাড়া ও কোরানে অন্য যে সব অপরাধকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলা হয়েছে তার ভেতর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা', 'সন্ত্রাস,' 'লুণ্ঠন' ও 'ধর্ষণ'।

'৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াত কোরানে বর্ণিত মৃত্যুদণ্ডযোগ্য সকল অপরাধ করেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ইসলামবিরোধী বলার অর্থ শুধু ইসলামবিরোধিতা বা ধর্মদ্রোহিতা নয়, এটি ধর্মনিরপেক্ষ আইনেও পরিপন্থী, একই সঙ্গে বাংলাদেমের সংবিধানেরও বিরুদ্ধাচারণ।

নিজামীরা মনে মনে নিজেদের যাই ভাবুন প্রকাশ্যে তারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব মেনে নিয়েছেন। তারা বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় নাম লিখিয়েছেন, বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েছেন, নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, সাংসদ ও মন্ত্রীও হয়েছেন।

বাংলাদেশের যে কোনও নাগরিক এদেশের সংবিধান মানতে বাধ্য। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম বাক্যেই বলা হয়েছে ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।

'৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ দেশটি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখলে। তাদের দখল থেকে মুক্ত করার জন্য বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করেছে। ভারত মিত্র হিসেবে '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হতে আমাদের সাহায্য করেছে।

এই যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু ছিল পাকিস্তান। যারা তখন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল তারাও ছিল বাংলাদেশের শত্রু। জামায়াত '৭১-এ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এবং এদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত পাকিস্তানের পক্ষে থেকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা করেছে, যা ইসলামী আইন কিংবা বাংলাদেশের প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ আইনেও মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। কেউ কোন অপরাধীকে রক্ষা করতে চাইলে সে ব্যক্তিও অপরাধে সহযোগিতার দায়ে শাস্তি পাবে।

জামায়াত একদিকে বলছে তারা যুদ্ধাপরাধ করেনি, অপরদিকে বলছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যাবে না। জামায়াত যদি যুদ্ধাপরাধ না করে – বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছে কেন? নিজামীরা যদি নিরাপরাধ হন তাহলে আদালতে দাঁড়িয়ে কেন তা প্রমাণ করেন না। ২০০১ সালে নিজামীরা ক্ষমতায় এসে আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার ও বন্দি করেছিলেন।

তখন দেশে ও বিদেশে বহু সংগঠন ও ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে মুক্তির দাবি জানিয়েছিলেন।

'এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল' ও 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ' সহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা মামলা প্রত্যাহার করে আমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিল। আমার আইনজীবীরাও মামলা প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন।

আমি আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, আমি মামলা প্রত্যাহারের পক্ষে নই। আমি এই মামলা লড়তে চাই এটা প্রমাণ করার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহী আমি নই, যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে তারাই রাষ্ট্রদ্রোহী। নিজামীরা পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

বহু চেষ্ট করে বহু লোককে ভয়/প্রলোভন দেখিয়ে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী বানাবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পাঁচ বছরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও আমার বিরুদ্ধে কোনো চার্জশিট তারা আদালতে দাখিল করতে পারেননি। অপরাধী না হলে আদালতকে কারও ভয় পাওয়া উচিৎ নয়?

মহাজোট সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ করেছে মাত্র, এখনও কোন ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়নি। সরকার মুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলেছে, নিজামী বা নিজামীদের বিচারের কথা বলেনি। কে যুদ্ধাপরাধী, গঠিতব্য ট্রাইবুনালে কার কার বিচার হবে এ বিষয়ে যারা তদন্ত করে অভিযোগনামা তৈরি করবে সেই তদন্ত সংস্থাও এখন পর্যন্ত গঠন করা হয়নি।

অথচ ঠাকুরঘরে কলা খাওয়ার প্রবচনের মতো নিজামীরা শুরু থেকেই চেঁচামেচি শুরু করেছেন – তারা যুদ্ধাপরাধ করেননি, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যাবে না, আগে কেন আওয়ামী লীগ বিচার করেনি ইত্যাদি ইত্যাদি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য জামায়াত ও তাদের আন্তর্জাতিক মুরুব্বিরা জঙ্গী মৌলবাদীদের লেলিয়ে দিয়েছে মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে।

গত এগার মাসে যে সব জঙ্গী নেতা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা কবুল করেছে তারা কীভাবে জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কীভাবে জামায়াত বিএনপি ফ্রিডম পার্টির নির্দেশে ও সহযোগিতায় ২০০৪-এর ২১ আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্বকে তারা হত্যা করতে চেয়েছিল, কীভাবে তারা এখনও শেখ হাসিনা সহ শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবিদের হত্যার পরিকল্পনা করছে।

গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গী নেতাদের জবানবন্দি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে জামায়াত '৭১-এর অবস্থান থেকে এতটুকু সরে আসেনি। '৭১-এর পরাজয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০০৮ সালের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি। এই গ্লানি জামায়াতের প্রতিহিংসার আগুনকে আরও উস্কে দিয়েছে।

নিজামীরা বুঝে গেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া আরম্ভ হলে তাদের অতীতের যাবতীয় দুষ্কর্ম তরুণ প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত হবে। অর্থ ও অস্ত্রের জোরে যেটুকু অবস্থান তারা এখনও আঁকড়ে ধরে আছেন এই বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

তাই '৭১-এর মতো তারা ইসলাম ধর্মের আড়ালে আত্মরক্ষা করতে চাইছেন। জামায়াতের নেতাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য তারা ইতিহাস থেকে কখনও শিক্ষা গ্রহণ করেন না। '৭১ এ ইয়াহিয়া, ইসলাম, আমেরিকা কিছুই জামায়াতকে রক্ষা করতে পারেনি।

যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকেও জামায়াতকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের সামনে একটাই পথ খোলা আছে বিচারে ফাঁসি থেকে রেহাই না পেলেও অনন্তকাল দোজখের আগুন থেকে বাঁচতে চাইলে '৭১-এর অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে, তিরিশ লক্ষ শহীদের পরিবারের কাছে এবং বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া।

জঙ্গী মৌলবাদীদের গডফাদার, যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারত না যদি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া তাদের আশ্রয় প্রশ্রয় না দিতেন, এমপি মন্ত্রী না বানাতেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে খালেদা জিয়া আগের মতো তাদের মাথায় তুলে নাচবেন কি না এটাও আমরা দেখতে চাই।

নিজামীর মতো খালেদাও যুদ্ধাপরাধকে 'ইসলামসম্মত' বলে ফতোয়া দেন কিনা বিজয়ের মাসে সেটাও আমাদের জানা দরকার।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক