Published : 02 Sep 2026, 12:59 PM
সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক বড় সরদারবাড়িতে ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর শুটিং নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে কেবল একটি শুটিংয়ের অনুমতি কিংবা একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের বিরোধ হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যাবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনা, জনগণের সাংস্কৃতিক অধিকার, কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির মৌলিক প্রশ্ন।
অভিযোগ উঠেছে, ঐতিহাসিক বড় সরদারবাড়িতে কয়েক দিন ধরে গানের ভিডিও ও কর্পোরেট বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত শুটিং হয়েছে। ভারী ক্যামেরা, জেনারেটর, আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম এবং বিপুলসংখ্যক কলাকুশলীর উপস্থিতিতে সেখানে বড় আয়োজন করা হয়। সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ রক্ষার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, শুটিংয়ের কারণে স্থাপনার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভিযোগকারীরা শুটিংয়ের অনুমোদন, অর্থপ্রাপ্তি এবং শুটিংয়ের আগে ও পরে স্থাপনার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বাণিজ্যিক শুটিংয়ের নীতিমালা মেনেই স্থানটি ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে এবং কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
কোনটি সত্য, তা নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্বের প্রথম শর্ত হলো—তদন্ত, নথি এবং স্বচ্ছতা। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বক্তব্য দিয়ে এই বিতর্কের নিষ্পত্তি হতে পারে না।
প্রশ্নগুলো খুবই সাধারণ: বড় সরদারবাড়িতে শুটিংয়ের অনুমতি কে দিয়েছে? কোন নীতিমালার অধীনে দিয়েছে? প্রত্নতত্ত্ব ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি? শুটিংয়ের আগে স্থাপনাটির অবস্থা নথিবদ্ধ করা হয়েছিল কি? শুটিংয়ের ঝুঁকি মূল্যায়ন হয়েছিল কি? জায়গাটি ব্যবহারের বিনিময়ে কত অর্থ নেওয়া হয়েছে? কী শর্তে জায়গাটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে? জনগণ এসব প্রশ্নের উত্তর চাইতেই পারে।
কারণ বড় সরদারবাড়ি কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনও কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাস, লোকঐতিহ্য ও জনগণের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
কর্তাব্যক্তির ইচ্ছা নয়, জনগণের অধিকার
জাদুঘর বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা দিয়ে জাতীয় ঐতিহ্যের ব্যবহার নির্ধারিত হতে পারে না। তার দায়িত্ব নিজের রুচি প্রতিষ্ঠা করা নয়; আইন, নীতিমালা ও জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ পরিচালনা করা।
এ কারণেই কোনো বাণিজ্যিক শুটিংয়ের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত প্রশাসনিক ক্ষমতার বিষয় হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। জনগণের সম্পদ কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তার একটি স্বচ্ছ নীতি থাকতে হবে এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তি জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পাওয়া মানে ক্ষমতার মালিক হওয়া নয়; বরং জবাবদিহির দায়িত্ব নেওয়া।
বড় সরদারবাড়ির ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি নিছক একটি পুরোনো ভবন নয়। একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার মূল্য তার ইট-পাথরে যতটা, তার চেয়ে বেশি স্মৃতি, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।
অভিযোগের জবাবে মামলার হুমকি কেন?
এই বিতর্কের আরেকটি দিক আরও উদ্বেগজনক। যারা বড় সরদারবাড়ির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতিবাদ করেছেন এবং সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অভিযোগ সত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হতে পারে। অভিযোগ ভুল হলে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করা যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে নথি থাকে, প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে, এমনকি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকে। ফলে নাগরিকের প্রশ্নের জবাবে প্রথম প্রতিক্রিয়া যদি হয় মামলা বা মামলার হুমকি, সেটি উদ্বেগের কারণ হবেই। বিশেষত যখন প্রশ্নকারীরা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত ব্যক্তি এবং তাদের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি।
প্রতিবাদ করা অপরাধ নয়। সংবাদ সম্মেলন করা অপরাধ নয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের হিসাব চাওয়া অপরাধ নয়। বরং গণতন্ত্রে এগুলো নাগরিক অধিকারের স্বাভাবিক প্রকাশ।
প্রশ্নের জবাব দিতে না চেয়ে প্রশ্নকারীকে ভয় দেখানো হলে তার প্রভাব শুধু কয়েকজন মানুষের ওপর পড়ে না; অন্যরাও ভয় পেতে শুরু করে। তারা ভাবে—ঐতিহ্য নিয়ে প্রশ্ন করলে মামলা হতে পারে, প্রশাসনের সমালোচনা করলে বিপদ হতে পারে। এভাবেই জনপরিসর সংকুচিত হয়। অগণতান্ত্রিকতা সব সময় বন্দুক হাতে হাজির হয় না। কখনো তা আসে প্রশাসনিক ক্ষমতার পোশাকে, মামলা করার হুমকিতে, কিংবা ‘সংস্কৃতিসেবা’র মিষ্টি ভাষায়।
যখন রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারের বস্তুতে পরিণত হয়, তখন গান হয়ে ওঠে ‘কনটেন্ট’, শিল্পী হয়ে ওঠেন ‘ব্র্যান্ড’, লোকঐতিহ্য হয়ে ওঠে বিপণনের উপাদান এবং ইতিহাস হয়ে যায় বিজ্ঞাপনের পটভূমি।
যে স্থাপনা মানুষের ইতিহাস ও স্মৃতির ধারক, তাকে যদি বারবার পণ্যের বিজ্ঞাপনের পটভূমি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে তার সামাজিক অর্থও বদলে যায়।
ঐতিহ্য ধ্বংস সব সময় ইট-পাথর ভেঙে হয় না; কখনো তার অর্থ বদলে দিয়েও ঐতিহ্যকে ক্ষয় করা যায়।
আজ বড় সরদারবাড়ি, কাল অন্য কোথাও
আজ বড় সরদারবাড়ি, কাল অন্য কোনো জমিদারবাড়ি, পুরোনো মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার, প্রত্নস্থল কিংবা লোকঐতিহ্যের কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
যদি রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সীমা না থাকে, তবে একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে আমরা ইতিহাস সংরক্ষণ না করে তার ‘লোকেশন ভ্যালু’ নির্ধারণ করব।
রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তখন জাদুঘর বা ঐতিহ্যকেন্দ্রের চেয়ে বেশি হয়ে উঠবে শুটিং লোকেশন। এটি কেবল প্রশাসনিক ভুল হবে না, পুরো সাংস্কৃতিক দর্শন বদলানোর কারণ ঘটাবে।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই হলো বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও কারুশিল্পকে সংরক্ষণ করা এবং মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট রাখা। সেই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক স্থাপনাকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হলে প্রশ্ন উঠবেই—রাষ্ট্র কি তার সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করছে, নাকি বাজারের কাছে দরজা খুলে দিচ্ছে?
সংস্কৃতিকে ঘরে বন্দি করার রাজনীতি
সোনারগাঁয়ের ঘটনাটি আরেকটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে—আমরা সংস্কৃতিকে কীভাবে দেখি?
আজ মানুষ ঘরে বসেই গান শুনতে পারে, নাটক দেখতে পারে, ইতিহাস জানতে পারে। ইউটিউব, ফেইসবুক ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম পৃথিবীর অসংখ্য সাংস্কৃতিক উপাদানকে মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। এটি প্রযুক্তির বড় অর্জন। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য শুধু দর্শক তৈরি করা যথেষ্ট নয়।
মানুষকে মেলায় যেতে হবে, গানের আসরে বসতে হবে, নাটক দেখতে হবে, জাদুঘরে যেতে হবে। ঐতিহাসিক স্থাপনা নিজের চোখে দেখতে হবে। অন্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে, ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণ জনপরিসর।
বিচ্ছিন্ন মানুষ সহজেই ভোক্তায় পরিণত হয়; সংগঠিত মানুষ হয় সচেতন ও চেতনা সমৃদ্ধ। তাই মানুষকে ঘরে বন্দি রেখে কেবল পর্দার সামনে সংস্কৃতি উপভোগ শেখানো নিছক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। সংস্কৃতির কাজ মানুষকে একত্র করা। ঐতিহ্যের কাজ কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের পটভূমি সরবরাহ করা নয়, মানুষকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করা।
কারণ জাতীয় ঐতিহ্যের কোনো বাজারমূল্য নির্ধারণ করা যায় না। কয়েক দিনের শুটিং থেকে রাষ্ট্র কিছু অর্থ পেতে পারে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান পেতে পারে দৃষ্টিনন্দন ভিডিও। কিন্তু ইতিহাসের একটি স্থাপনা যদি সামান্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই ক্ষতি কোনো অর্থ দিয়েই পূরণ করা যায় না।
আর যদি জনগণের প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হুমকি-ধমকি এলে ক্ষতি আরও গভীর হয়—সেটি শুধু একটি স্থাপনার নয়, পুরো গণতান্ত্রিক জনপরিসরের। প্রশ্নটি তাই শেষ পর্যন্ত খুব সরল। সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্য কার? রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তার, কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের, নাকি জনগণের?
কাজল কানন কবি ও সংবাদকর্মী। ই-মেইল: urejaomon@gmail.com
কোক স্টুডিওর শুটিংয়ে সোনারগাঁয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার ক্ষতির অভিযোগ