১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

পশ্চিম এশিয়ায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি: চুক্তি কি সংঘাতের নতুন প্রচ্ছদ?

প্রতিটি চুক্তির কালি শুকানোর আগেই তা লঙ্ঘিত হচ্ছে—বাস্তবতা হলো কাগজে চুক্তি, মাটিতে সংঘাত।

পশ্চিম এশিয়ায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি: চুক্তি কি সংঘাতের নতুন প্রচ্ছদ?
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির মারপ্যাঁচে গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ শব্দটাই এখন এক বড় প্রহসন। ছবি: রয়টার্স

শিপ্রা বিশ্বাস শিপ্রা বিশ্বাস

Published : 12 Aug 2026, 02:54 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এখন অদ্ভুত অবস্থানে দাঁড়িয়ে—যুদ্ধ ঘোষিতভাবে থেমে গেছে, কিন্তু শান্তি আসেনি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ত্রিমুখী সংঘাত, গাজার রক্তক্ষরণ, লেবাননের অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নতুন করে জোট বাঁধার প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এখন এমন এক ক্রান্তিকালে রয়েছে, যেখানে প্রতিটি চুক্তির কালি শুকানোর আগেই তা লঙ্ঘিত হচ্ছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা এপ্রিলের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি এবং জুনের পাকিস্তান মধ্যস্থতায় সমঝোতা স্মারকের পরও প্রকৃত অর্থে শেষ হয়নি। জুলাইয়ে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার ঘটনায় সংঘাত ফের মাথাচাড়া দেয়; এবং অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে হুতিদের হামলা ও লোহিত সাগরে জাহাজডুবির মতো ঘটনা প্রমাণ করছে যে, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যত ভঙ্গুর।

ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ‘ইতিবাচক দিকে’ এগোচ্ছে বলে তেহরান দাবি করলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একে বারবার ‘শেষ সুযোগ’ বলে অভিহিত করছেন—যা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার নাজুকতাই স্পষ্ট করে।

একই সঙ্গে লেবানন ফ্রন্টও অস্থির। জুনের যুদ্ধবিরতির শর্ত চূড়ান্ত করতে রোমে ইসরায়েল-লেবানন সপ্তম দফা আলোচনা চললেও, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নতুন করে জনসাধারণকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ও বিমান হামলা প্রমাণ করছে যে, ইরান-কেন্দ্রিক বৃহত্তর সংঘাতের একটি নতুন ফ্রন্ট যেকোনো সময় খুলে যেতে পারে। হিজবুল্লাহ এই আলোচনার বিরোধিতা করছে, যা ইঙ্গিত দেয়—ইরানের প্রভাব-বলয়ের প্রতিটি শাখা এখনো অভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না।

২০২৫ সালের অক্টোবরে সম্পাদিত গাজা যুদ্ধবিরতি নয় মাস পার করেও তার দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। জুলাইয়ের শেষে ট্রাম্প ঘোষিত নতুন রোডম্যাপ—যেখানে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরায়েলকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে—বাস্তবে উভয় পক্ষের অসম্মতিতে আটকে আছে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, চুক্তি ‘কেবল কাগজেই’ সীমাবদ্ধ, কারণ ইসরায়েলি হামলা থামেনি। অগাস্টের প্রথম সপ্তাহেও খান ইউনিস ও আল-বুরাইজে হতাহতের ঘটনা এবং জনবসতি ধ্বংসের খবর আসছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েলের অক্টোবরের নির্বাচনের আগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার ইচ্ছা করে এই চুক্তি বাস্তবায়ন বিলম্বিত করছে, কারণ গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার তার রাজনৈতিক ভিত্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে গাজার বাস্তবতা হলো—কাগজে চুক্তি, মাটিতে সংঘাত।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য—সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা—এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শর্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে; কিন্তু রিয়াদ তার অবস্থানে অনড়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য পথরেখা ছাড়া কোনো স্বাভাবিকীকরণ নয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের সরাসরি অংশগ্রহণ সৌদি আরবের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে জটিল করে তুলেছে—একদিকে ইরানি হুমকি হ্রাস পাওয়ায় তাদের নিরাপত্তা-স্বার্থ মিলে যাচ্ছে, অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েলের আচরণ জনমতের কাছে স্বাভাবিকীকরণকে আরও অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এই দ্বিমুখী চাপে সৌদি আরব এখন বিকল্প পথ খুঁজছে—আরব-মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব নিরাপত্তা-হেজিং কাঠামো গড়ে তোলা, যা ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমাবে। অন্যদিকে কাজাখস্তান ও সুদানের মতো দেশ চুক্তিতে যুক্ত হওয়ায় আব্রাহাম চুক্তির কাঠামোগত সম্প্রসারণ ঘটেছে বটে, কিন্তু তার কৌশলগত মূল লক্ষ্য—সৌদি অন্তর্ভুক্তি—এখনো অধরা।

আব্রাহাম চুক্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল এবং কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য স্বাক্ষরিত একটি কূটনৈতিক চুক্তি। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মধ্যে এই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। পরে মরক্কো এবং সুদানও এই চুক্তিতে যোগ দেয়।

ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূ-কৌশলগত প্রভাব দেখা যাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে—মস্কো ও বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সমীকরণে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া, ইরান ও চীন তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় জোটে রূপ দেয়; যদিও এটি ‘ন্যাটো’র মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তার সামরিক জোট নয়। তবে এই চলমান যুদ্ধ থেকে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে রাশিয়া—জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ১২০ থেকে ১২৬ ডলারে উঠে যাওয়ায় ক্রেমলিন ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় সামলানোর জোরালো রসদ পেয়ে গেছে।

অন্যদিকে চীন প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বললেও, ইরানের মূল তেলক্রেতা এবং কথিত স্যাটেলাইট তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে সংঘাত টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এই ত্রিদেশীয় অক্ষ কোনোভাবেই নিশ্ছিদ্র নয়—চীন চায় দ্রুত শান্তি ও বাজার স্থিতিশীলতা, আর রাশিয়া চায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে তেলের বাজার ও কৌশলগত সুবিধা বজায় রাখতে। এই স্পষ্ট স্বার্থগত বিভাজনই প্রমাণ করে যে, রাশিয়া ও চীনের বহুল চর্চিত ‘নো-লিমিটস পার্টনারশিপ’ বা সীমাহীন অংশীদারত্ব বাস্তবে বেশ কিছু স্পষ্ট সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে।

পশ্চিম এশিয়া এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা-উদ্বেগগুলো বৈশ্বিক শক্তি-প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে গেছে—ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল এখন রুশ গোয়েন্দা তথ্য ও চীনা বাজারের ওপর নির্ভরশীল, আবার ইসরায়েলের নিরাপত্তা-কৌশল মার্কিন সামরিক প্রতিশ্রুতির ওপর ন্যস্ত। প্রতিটি রাষ্ট্রই এখানে জাতীয় স্বার্থের হিসাবে অস্থায়ী মিত্রতা গড়ছে, নীতিগত অবস্থানে নয়—সৌদি আরবের ‘হেজিং’ কৌশল কিংবা চীনের দ্বৈত ভূমিকা তারই প্রমাণ। আর নেতানিয়াহুর গাজা-নীতিতে দেশীয় রাজনীতি, বিশেষ করে আসন্ন অক্টোবর নির্বাচন, আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে—অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিল একে অপরকে প্রভাবিত করছে।

তিনটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, পশ্চিম এশিয়ায় এখন কোনো একক, স্থায়ী শান্তি-কাঠামোর বদলে খণ্ড খণ্ড, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সমাহার তৈরি হয়েছে—ইরান, গাজা, লেবানন—প্রতিটি অঞ্চলই নিজস্ব লঙ্ঘন-চক্রে আবদ্ধ। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক জোট রাজনীতি রৈখিক পথ ছেড়ে বহুমুখী হয়ে উঠছে—সৌদি আরব একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, ইসরায়েলি ট্র্যাক খোলা রাখছে, আবার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিকল্প নিরাপত্তা-কাঠামোও গড়ছে। তৃতীয়ত, রাশিয়া-চীন-ইরান অক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রভাবকে ক্ষয় করলেও তা কোনো সংহত বিকল্প বৈশ্বিক শৃঙ্খলা তৈরি করছে না—বরং এটি এক ধরনের ‘সুবিধাবাদী জোট’, যেখানে প্রতিটি পক্ষ নিজের হিসাব কষছে। সব মিলিয়ে অঞ্চলটি স্থায়ী সমাধানের দিকে নয়, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা ও পর্যায়ক্রমিক উত্তেজনার দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

শিপ্রা বিশ্বাস কবি ও কলামলেখক। ই-মেইল: shipu.biswas@gmail.com