১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আমন্ত্রণ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পৌঁছাতে পারেননি তিনি

তাকে বরণের জন্য প্রস্তুত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু ততক্ষণে অন্যলোকের অভিযাত্রী হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সকালে প্রকাশিত খবরের কাগজের পাতা উল্টে দেখা।

আমন্ত্রণ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পৌঁছাতে পারেননি তিনি
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগমন উপলক্ষে দৈনিক বাংলা ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ও ক্রোড়পত্রের কোলাজ।

রাহাত মিনহাজ রাহাত মিনহাজ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Aug 2026, 02:45 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

ইতিহাসের গতিপথ প্রহেলিকাময়। কার জীবনে সময়ের স্রোতে, পথের বাঁকে কোন অমোঘ বিধান লেখা থাকে, তা বোঝা বড় মুশকিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট এক শ্রাবণ সকালে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। যেজন্য এক মাস ধরে সাজসজ্জা ও বিশাল প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শ্রাবণ মাসের ৩০ তারিখ (১৫ অগাস্ট ১৯৭৫) সকালে যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে মধ্যমণি হয়ে সভা আলোকিত করার কথা, সেদিন সেই সময় তার মরদেহ তখন পড়েছিল ৩২ নম্বরের অন্ধকার সিঁড়িতে। স্ত্রী, সন্তান, পুত্রবধূ ও শিশুপুত্রের বিদেহী আত্মার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান তখন অন্যলোকের হতভাগ্য অভিযাত্রী। ছিন্নভিন্ন বত্রিশের সংসার খেলাঘর।

যদিও শ্রাবণের সেই সকালে তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অপেক্ষায় ছিল তাজা ফুল, সাজানো মঞ্চ, তোরণ আর রঙিন কাগজে মোড়ানো রবীন্দ্র রচনাবলি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবিগুরুর প্রতি অনুরাগ সবার জানা ছিল। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের আচার্য শেখ মুজিবুর রহমানকে রবীন্দ্র রচনাবলি উপহার দিতে চেয়েছিলেন। রচনাবলির সেই খণ্ডগুলো কাগজে ঠিকই মোড়ানো হয়েছিল, কিন্তু নিয়তির অমোঘ লিখন—তা প্রাপকের হাতে ওঠেনি।

১৫ অগাস্ট ১৯৭৫; সেই ট্র্যাজিক সকালের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতা।

১৫ অগাস্ট ১৯৭৫; সেই ট্র্যাজিক সকালের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতা।

শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও শাসনকাল বিশ্লেষণ করলে সমাজ ও রাজনীতিতে তার ভাবমূর্তির একাধিক মাত্রা ফুটে ওঠে। সমর্থক ও অনুসারীদের কাছে তিনি ছিলেন এক পরম আস্থা ও আশ্রয়স্থল। তাদের কারও কাছে তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ দেবতা। স্বাধীন বাংলাদেশে তার কাছে পৌঁছাতে পারলে সব মুশকিল আসান হতো, অনেক অপরাধ মাফ হতো, দুর্ভিক্ষের দেশে দাক্ষিণ্য মিলত অকাতরে—রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনা অযৌক্তিক নয়। অনুসারীদের প্রতি তার অগাধ স্নেহ ও বিশেষ শিথিলতা রাজনীতির ময়দানেও বহুল চর্চিত বিষয়।

তবে বিপরীত কোণে, তৎকালীন রাজনৈতিক গতিধারার এক বৃহৎ অংশের চোখে তার সিদ্ধান্ত ও শাসনপদ্ধতি বিতর্কিত হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে মুজিববিরোধী রাজনৈতিক দল, তৎকালীন জাসদের তরুণ সমাজ এবং অতি বাম ও ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের কাছে তার সরকারের কঠোর পদক্ষেপগুলো চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়। সরকারের বিশেষ করে রক্ষীবাহিনীর কঠোর ভূমিকা ও প্রশাসনিক চাপ তৎকালীন রাজনীতির পরিবেশকে অনেকের জন্য দমবন্ধকর ও দুর্বিষহ করে তুলেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৫ অগাস্টের সেই বিষাদময় সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতি ও উদযাপনকে ঘিরে দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠার খবর।

১৫ অগাস্টের সেই বিষাদময় সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতি ও উদযাপনকে ঘিরে দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠার খবর।

একই সঙ্গে, গণমানুষের হৃদয়ে তার পরিচয় ছিল টুঙ্গিপাড়ার সহজ-সরল ‘মিয়া ভাই’ হিসেবে, যা সময়ের আবর্তে রূপান্তরিত হয়েছিল ‘শেখ সাহেব’ এবং পরিশেষে কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে। এক অনন্য সাহস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে কোটি কোটি বাঙালি তার ওপর নিঃসংকোচে আস্থা রেখেছিল। গুণ আর সীমারেখার সমাহারে একজন রক্তমাংসের মানুষ হয়েও নেতৃত্বের অনন্য উচ্চতায় তিনি ছাপিয়ে গিয়েছিলেন সমসাময়িক বহু রাজনীবিদকে। শত বছরের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র বাঙালি জাতির মুক্তি ও আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক—ইতিহাসের পাতায় যা এক মহাকাব্যিক অধ্যায়।

গরিব দেশের এই নন্দিত ও সমালোচিত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের আগমন উপলক্ষে ১৫ অগাস্ট নানা আয়োজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংবাদপত্রের ভাষ্য থেকে জানা যায়, ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েই শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে অবস্থিত শহীদের মাজার জিয়ারত ও মাজারে ফুলের মালা দেওয়ার কথা ছিল। সাত সকালে তাজা ফুলে সেই মালাগুলোও তৈরি করা হয়েছিল। ওই দিন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা তাদের প্রধান শিরোনামের সংবাদে লিখেছিল: “ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি পাঠ করা ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ হইতে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা ও ক্রেস্ট, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির এলবাম উপহার দেওয়া হইবে। এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের পক্ষ হইতে বাকশাল সদস্যপদের জন্য আবেদনপত্র পেশ করা হইবে।” (১৫ অগাস্ট ১৯৭৫, দৈনিক ইত্তেফাক)

এখানেও বাকশাল ছিল। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগমন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আগে থেকেই চুনকামের কাজ চলছিল। লেখা হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করে নানা স্লোগান। মুজিববাদ নিয়ে ব্যানার-ফেস্টুন টাঙানো হয়েছিল মোড়ে মোড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনের দেওয়ালে বড় করে লেখা হয়েছিল, “বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব সফল হোক”। এই দ্বিতীয় বিপ্লব বা বাকশাল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ মুজিব যে একা হয়ে পড়েছিলেন বলে মনে হয়, সেটা হয়তো তিনি টের পাননি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন উপলক্ষে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন উপলক্ষে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র।

ফেরত আসা যাক ১৫ অগাস্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এদিন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের চার ঘণ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা ছিল। সম্মান জানানোর কথা ছিল জগন্নাথ হলে ১৯৭১ সালের শহীদদের গণকবরে। এছাড়া ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর কথা ছিল রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের। যার জন্য কিছু শিশু-কিশোরকে প্রস্তুত করা হয়েছিল। কে শেখ মুজিবকে ফুলের মালা পরাবে, কে হ্যান্ডশেক করবে—সব প্রস্তুতি সম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু হায়! সব আয়োজনই বৃথা যায় প্রধান অতিথির অনুপস্থিতিতে। ঘাতকের বুলেটে সেই সকালে আর শিশুদের সান্নিধ্যে আসা হয়নি শেখ মুজিবের।

একজন পরিবারপ্রধান, দলের নেতা, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবেরও সীমাবদ্ধতা ছিল। কোনো মানুষই সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে নন। কিন্তু বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে তার অবদান তো ভুলবার নয়।

সাহসী ও সংবেদনশীল লেখক আহমদ ছফা শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে লিখেছিলেন, “আজ থেকে অনেক অনেক দিন পর হয়তো কোনো পিতা তার শিশুপুত্রকে বলবেন, জানো খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলেন, যার দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালোবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্নারাতে রূপালী কিরণধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে তা হলো তার ভালোবাসা। জানো খোকা তার নাম? শেখ মুজিবুর রহমান।” (পৃষ্ঠা: ২৩২, প্রবন্ধ: নাম তার শেখ মুজিবুর রহমান, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স)

রাহাত মিনহাজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক। ই-মেইল: minhaz_uddin_du@yahoo.com