১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ হাসিনার ফেরা-২: ঝুঁকি, জনসমর্থন ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি

বিদেশের মাটিতে প্রাণক্ষয়ের চেয়ে দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের ঝুঁকি নেওয়া কি শেখ হাসিনার নতুন কৌশলের অংশ?

শেখ হাসিনার ফেরা-২: ঝুঁকি, জনসমর্থন ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
দেশে ফিরে বিচারপ্রক্রিয়া ও আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নাদিম মাহমুদ নাদিম মাহমুদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Aug 2026, 08:48 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

বাংলাদেশের রাজনীতির জটিল সমীকরণে আদালত, নির্বাচন এবং জনসমর্থন—এই তিনটি উপাদান সবসময়ই একটি অন্যটির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের পাতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এ দেশে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অনেক রাজনৈতিক নেতা আইনি প্রক্রিয়ায় খালাস পেয়েছেন এবং পরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন।

কাজেই দেশে ফিরে বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া শেখ হাসিনার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক আদালতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আর দেশের বিচারে ঝুলে থাকা মৃত্যুদণ্ড—সব হিসাব বদলে দিতেই হয়তো তিনি দেশে ফেরার এমন ঘোষণা দিয়েছেন। সর্বোপরি নিজের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা হতে পারে তার এই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের আসল রাজনৈতিক অনুঘটক।

দেশে ফিরে আসতে পারলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি ও তার দলের নেতারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চাইবেন। একই সঙ্গে তাদের সমর্থকেরাও এটিকে রাজনৈতিক সাহসের প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। অবশ্য সেটি নির্ভর করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও আইনি ঘটনাপ্রবাহের ওপর।

আন্তর্জাতিক পরিসরে বার্তা

জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির করা এক তদন্ত প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা অপশাসনের কথা বলা হয়েছে। চব্বিশের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হত্যার পাশাপাশি তাদের নিজেদের দলের নেতা-কর্মী হত্যার তথ্য সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থপাচার, গুম, হত্যাসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তির দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ছুড়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ফলে চব্বিশের আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যেমন নজর রাখছে, তেমনি আওয়ামী লীগের ‘লিগ্যাল ফ্যালাসি’ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

যদিও শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থা প্রশ্ন তুলেছে। বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে তিনি যদি দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হন, তবে আদালতের নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন ও সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ আন্তর্জাতিক নজরদারিতে আসবে। একই সঙ্গে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নিজের নৈতিক অবস্থানও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হবে। তখন দেখার বিষয় হবে—দমন-পীড়নের গম্ভীর অভিযোগগুলো তিনি ও তার দল কীভাবে আইনিভাবে খণ্ডন করেন।

একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতা-কর্মীদের দেশে ফেরায় বর্তমান সরকার যদি বাধা তৈরি করে—যেমন ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিতে কড়াকড়ি আরোপ করে—তবে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই কঠোরতা আন্তর্জাতিক মহলে যেমন সমালোচনার জন্ম দিতে পারে, তেমনি পরোক্ষভাবে লিগ্যাল ব্যাটল গ্রাউন্ডে আওয়ামী লীগের অবস্থান ও যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

শেখ হাসিনার ফেরায় কার সমর্থন কাজ করছে?

রয়টার্সের সাক্ষাৎকার ও পরবর্তীতে দিল্লিতে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “আমি ফিরে গেলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি আমাকে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। তবুও আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ রকমের দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে। যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমি চাই সেটি আমার নিজের মাটিতেই আসুক, যেখানে আমার মা-বাবা শায়িত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছিল।”

তিনি সেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি এবং কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয় বলে মন্তব্য করেছেন। নিজের শাসনামলের ভুল-ত্রুটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের ভালো-মন্দের চূড়ান্ত বিচার করার অধিকার একমাত্র জনগণের। জনগণই সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করবে বলে উল্লেখ করে তিনি সেই বিচারের ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিতে চান। তার এই বক্তব্যই কি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, জনগণের ওপর ভর করেই ফিরতে চান শেখ হাসিনা?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় সেই সংকট প্রশমনের একটি আশা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের আশা আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে বোঝা যাচ্ছে।

শেখ হাসিনা মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মীর সঙ্গে এই দুই বছর অনলাইনে বৈঠক করেছেন বলে তার দলের নেতারা বিভিন্ন সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে বলে আসছেন। ফলে জনগণ ছাড়া আওয়ামী লীগের ভরসা করার জায়গা খুব একটা নেই। তবে সেই জনগণের সিদ্ধান্ত কতটুকু প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ মিলবে, তা নির্ভর করছে বিএনপি সরকার কতটুকু উদার রাজনৈতিক চর্চার সুযোগ তৈরি করে তার ওপর।

ধারণা করা অমূলক হবে না যে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে যেন বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন, সেই জন্য ফেরার আগেই মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করবেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সেই চেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছে।  

ঝুঁকি ও তৃণমূল পুনর্গঠন

অন্যদিকে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরতে আগ্রহী হওয়ার কারণ হিসেবে শেখ হাসিনা মনে করছেন, বিচারিক সিদ্ধান্ত তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আবার দেশে না ফিরলেও রাজনৈতিকভাবে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি আছে। একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য মৃত্যুর ঝুঁকিটি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য তখনই হবে, যখন দলটির নেতা-কর্মীরা তাকে মৃত্যুর পরও স্মরণ রাখার পথরেখা তৈরি করেন। বিদেশের মাটিতে প্রাণক্ষয়ের চেয়ে দেশের মাটিতে আইনি লড়াইয়ে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের ইচ্ছা পোষণের জায়গা থেকেও এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে কি তিনি গত দুই বছর ভার্চুয়াল বৈঠক করে তৃণমূলের নেতৃত্ব তৈরি করেছেন, যাদের ভরসায় তিনি দেশে ফিরতে চান?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে সারাদেশে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়েছে। এখনও তা চলছে, সর্বশেষ ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠী হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দলটির নেতা-কর্মীদের নামে যেসব গায়েবি ও রাজনৈতিক মামলা হয়েছে, অসংখ্য নেতা-কর্মীর জেলখানায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে—তা দেশের বাইরে থেকে দেখেও তার বোধোদয় হতে পারে যে, তার কারণে যদি এইসব নেতা-কর্মী প্রাণ দেন, তবে তিনি কেন দেশের বাইরে থাকবেন?

শেখ হাসিনার সমর্থক গোষ্ঠিগুলো মনে করছে, তাদের দল ক্ষমতায় থাকাকালে অনেক ভুলভ্রান্তি করেছে; আমলারা তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে কেড়ে নিয়েছে, আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চলেছে। ফলে দলটি তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও চব্বিশের শিক্ষা তাদেরকে একত্র করেছে। তবে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতারা যেন ফের আওয়ামী লীগে স্থান না পান, সেই বিষয়ে তারা আহ্বান জানাচ্ছেন বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে।

দুর্নীতিবাজ নেতারা যখন ভিনদেশে দুশ্চিন্তাহীন জীবনযাপন করছেন, তখন দেশের ভেতরে থাকা নেতাদের কষ্টে সহমর্মিতা প্রকাশের জায়গা থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নৈতিক অবস্থান তৈরি হতে পারে। গুঞ্জন রয়েছে, দুর্নীতিবাজ ও অর্থলোপাটকারীদের ফেলে দিয়ে তিনি তৃণমূলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ গড়তে চান। কিন্তু তিনি কি আদৌ গত দুই বছর সেইসব নেতাদের আর আশ্রয়-প্রশ্রয় দেননি?

শেখ হাসিনা কেন দেশে ফিরতে চান, এর নির্দিষ্ট উত্তর এই মুহূর্তে আমাদের কারও কাছেই নেই এবং তিনি নিজে প্রকাশ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের আলোচনা মূলত রাজনৈতিক বিশ্লেষণই থেকে যাবে। আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, তিনি জনগণ ও তার সমর্থক গোষ্ঠির ভরসাতেই দেশে ফিরতে চাইছেন।

ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: nadim.ru@gmail.com

আগের পর্ব: শেখ হাসিনার ফেরা-১কতটুকু বাস্তবকতটুকু কৌশল