Published : 11 Aug 2026, 09:37 AM
মাথায় ঝুলছে মৃত্যুদণ্ডের রায়। বয়স আশি ছুঁই-ছুঁই। প্রায় ছয় শতাধিক মামলার আসামি। তবু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, আসছে ডিসেম্বরেই ফিরছেন দেশে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এমন ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের কয়েকদিন পর চব্বিশের কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে যে গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম হয়, সেই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতে অবস্থানকালে প্রথমবারের মতো দিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের সংগঠন ‘ফরেইন করেসপন্ডেন্টস অব সাউথ এশিয়া’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে অনেকেই রাজনৈতিক ফাঁকা আওয়াজ হিসেবে দেখছেন; কেউ কেউ দাবি করছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর এমন ঘোষণা দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফেরানোর প্রয়াসমাত্র।
ভারতে অবস্থানকালে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমগুলোতে ই-মেইলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার রেওয়াজ ছেড়ে প্রথমবারের মতো রয়টার্সকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এমন কিছু শব্দ ও বাক্য বলেছেন, যেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করলে অনুমিত হয় যে শেখ হাসিনা সত্যিই আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে চাইছেন। রয়টার্সের পর আরও কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রায় একই ভাষায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। তার দেশে ফেরার কথাটিকে গুরুত্বহীন মনে করার কোনো সুযোগ নেই। তবে কেন তিনি দেশে ফিরতে চান, সেই বিষয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।
চব্বিশের কোটা আন্দোলনের উত্থান থেকে ক্ষমতা হারানো দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরে বিএনপি সরকার সংসদে ওই আদেশের বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী দেশান্তরী কিংবা আত্মগোপনে থাকার কারণে দৃশ্যত আওয়ামী লীগ বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারেনি।
রাজনীতির মাঠে অদৃশ্য হওয়া আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফেরার সুযোগ যেমন তৈরি হয়নি, তেমনি রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মূল মাঠ হিসেবে পরিচিত ‘জাতীয় নির্বাচনে’ অংশগ্রহণের সুযোগ মিলেনি দলটির। ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের কোনো কৌশল মানুষ জানতে পারছে না।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কার্যালয়গুলোতে তালা ঝুলছে। এতে দলটির মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তা ও শক্তিমত্তা জানার সুযোগ না থাকার পরও কেন শেখ হাসিনা ফিরতে চান—তার কিছু সম্ভাব্য দিক নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন বটে। বিশেষ করে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে অনুরোধ করার পরও যখন কোনো সদুত্তর মিলেনি, তখন শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফিরে আসার ঘোষণা ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করছে। শেখ হাসিনা কেন এই বছরই দেশে ফিরতে চান, তার কিছু সম্ভাব্য কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক।
আদালত মোকাবিলা করা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বয়স এখন প্রায় আশি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে হত্যার পর দীর্ঘদিন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা নির্বাসনে ছিলেন। আশির দশকে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল যখন ধরেন, তখন তার বয়স ছিল চল্লিশের নিচে। ফলে ওই বয়সে আওয়ামী লীগের জন্য যতটা রাজপথে তিনি থাকতে পেরেছেন, বয়সের কারণে এই আশি বছরে ততটা পেরে উঠবেন না। ফলে ভারতের আশ্রয়ে তিনি দেশের বাইরে থেকে তার রাজনৈতিক মামলা মোকাবিলা করতে যত বিলম্ব করবেন, রাজনীতির মাঠের পাশাপাশি শারীরিক বার্ধক্যের সন্নিকটে অবস্থান করবেন।
ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকলেও তিনি হয়তো ভেবেছেন, দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ায় নিজের বক্তব্য তুলে ধরাই এখন সেরা পথ। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই রাজনৈতিকভাবে নিজের অবস্থান আবার মজবুত করা সম্ভব—এমন আশা থেকেই তিনি দেশে ফেরার কথা ভাবতে পারেন। তাই তিনি দ্রুত দেশে ফিরে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো লড়তে আগ্রহী হতে পারেন। বাংলাদেশে সম্ভবত এই প্রথম একক কোনো ব্যক্তির নামে এত বেশি—প্রায় ছয় শতাধিক মামলা হলো। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, বর্তমান বিএনপি সরকার এবং অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি কি তাকে সেই সুযোগ সত্যিই দেবে?
আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের চেষ্টা
পঁচাত্তরে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ-পরবর্তী সময়ের চেয়েও চব্বিশের আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ভয়ানক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর নানা অভিযোগে দলটি চব্বিশের আন্দোলনের আগেই তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। আমলাতান্ত্রিক গহ্বরে চলা দলটির নেতৃত্ব নিয়ে চরম অসন্তোষ ছিল। বিরোধীদলের পাশাপাশি নিজ দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরাও আওয়ামী লীগের শাসনামলে দমন-পীড়নে বাদ পড়েননি। ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরে ক্ষমতালোভী ও অর্থলোভীদের দাপটে দলটি নিস্তেজ হয়ে যায়; চব্বিশের ধাক্কা সামাল দেওয়ার নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। যদিও এই সময়ের মধ্যে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’-এর গুঞ্জন উঠলেও তা কার্যত দৃশ্যমান হয়নি; এমনকি শেখ হাসিনাকে ফেলে বড় কোনো নেতা দলটি ছেড়ে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটির তৃণমূল গোছানোর কাজটি চলছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
এরপরও দলটি মাঠে দাঁড়াতে পারছে না মূলত দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মী দেশের বাইরে অবস্থান করার কারণে। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিদেশে অবস্থান করে স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে বিচ্ছিন্নভাবে নেতা-কর্মীরা মাঠে নামার চেষ্টা করলেও তাতে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের কাজ দৃশ্যমান হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হওয়া গায়েবি মামলা ও দমন-পীড়নে কার্যক্রম নিষিদ্ধের ধকলে আওয়ামী লীগ কার্যত নিষ্ক্রিয়। এ অবস্থায় দলটিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন জরুরি বলে অনেক দেশি ও বিদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন। তবে অনেকেই মনে করছেন, দেশে ফিরলে সেটি রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে ভেবে শেখ হাসিনার এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যদিও দেশে ফেরা মানেই দলের সাংগঠনিক পুনর্জাগরণ হবে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; তবু তার উপস্থিতি কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে দলীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জনপ্রিয়তা
জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকার পরও দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার জন্য অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক বিএনপিকে ভোট দিয়েছে বলে ধারণা করা যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বেশ কিছু জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ প্রশংসাও করছে। ফলে এই সরকারের সময় বাড়ার সঙ্গে বিএনপির জনপ্রিয়তা বাড়ার সম্ভাবনা থেকে সাধারণ মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফেরানোর কৌশল দলটির নেতা-কর্মীদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এই জায়গা থেকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণার চ্যালেঞ্জ বিএনপির কাছেও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। যে কারণে সরকারের তথ্য অধিদপ্তর গত মাসে শেখ হাসিনার (বিদ্বেষমূলক) বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রচারে আদালতের বিধিনিষেধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার পাশাপাশি দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব দেশে ফিরে এলে, তাদের সমর্থক গোষ্ঠিগুলোর মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত মিছিল-সমাবেশ মোকাবিলা করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কঠিন হয়ে যেতে পারে; দেশ সহিংসতার দিকে ধাবিতও হতে পারে। হয়তো তারপরেও সাধারণ মানুষের কাছে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তার এসিড টেস্ট দেখার সুযোগ মিলতে পারে ডিসেম্বরে।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: nadim.ru@gmail.com