Published : 05 Aug 2026, 01:40 PM
কিছুদিন আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিউটি রাণী পালকে সংহতি জানাতে শিক্ষক-অশিক্ষক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকেই দেখা গেল নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ড সঙ্গীত ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি ব্যাকগ্রাউন্ডে যুক্ত করে রিলস বানাতে। এই রিলসগুলো দেখতে দেখতে ভাবছিলাম—বাহ! বেশ তো! প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেক দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনা যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও; প্রাথমিক শিক্ষকের কোলে ছোট শিশু পুলিশের ছুড়ে মারা পানিতে ভিজছে—এমন মানবেতর ছবিও দেখা গেছে।
এসব দাবিদাওয়া ও দুঃখ-দুর্দশার তুলনায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নীল শাড়ির আঁচল উড়িয়ে মন উদাস হওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় ট্রোলড হওয়াকে কী বলা যায়? গ্ল্যামারাস ক্রাইসিস বললে কি ধৃষ্টতা হবে? হলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। পরে অবশ্য জানা গেল—একজন পুরুষ বিউটি পালের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিদ্বেষের জেরে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে ভাইরাল করেছিল। অথচ সকল স্তরের শিক্ষকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই (নারী) শিক্ষকদের রিলস বানানোর অধিকারের পক্ষে দাঁড়ালেন। যা হোক, প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে সকল স্তরের মানুষের একজন শিক্ষকের প্রতি এমন সংহতি জানানো অভূতপূর্ব ঘটনা।
আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েনের সঙ্গে প্রায় এই একই ধরনের অবমাননাকর ঘটনা ঘটেছে। অথচ সে প্রসঙ্গে তেমন কোনো আলোড়ন দেখতে পাচ্ছি না। খবরের শিরোনাম বলছে, “জুলাইযোদ্ধা তন্বীকে নিয়ে ‘অশোভন মন্তব্য’ করেছেন অধ্যাপক কাবেরী গায়েন।”
এই খবর পড়ে আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া—কোথাও কোনো বড় ধরনের গণ্ডগোল হচ্ছে।
কাবেরী গায়েন শিক্ষার্থীদের নিয়ে মনগড়া মন্তব্য করার মানুষ নন। তার ওপর যদি সেই শিক্ষার্থী হন নারী, তাহলে তো তিনি আরও বেশি সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ করবেন। ফেইসবুকে যুক্ত থাকার সুবাদে কাবেরী গায়েনের সেই পোস্টটি আমিও দেখেছি। পোস্টে কারো নাম ধরে কোনো মন্তব্য ছিল না। নিউজ পোর্টালের খবর সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেন তিনি।
অধ্যাপক কাবেরী সব সময়ই স্পষ্টভাষী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জীবনের করুণ দশা সম্পর্কে তিনি সর্বদা উচ্চকণ্ঠ। তাদের দিয়ে পঞ্চাশটা সরকারি কাজ করানো, বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস না করে সব শিক্ষককে দিয়ে সব বিষয় পড়ানো—এসব মানবেতর চর্চার কথা সবাই জানে, কিন্তু মুখে আনে না। কাবেরী গায়েন বলেন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যখন মাধ্যমিক পর্যায়ের নানা বিদ্যালয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষকদের বেছে বেছে লাঞ্ছনা করছিল শিক্ষার্থীরা, সে সময়েও তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। সাবেক আওয়ামী সরকারের সময়ে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে অনেকেই নানা অবস্থান নিয়েছিলেন। কাবেরী গায়েন কিন্তু নিষিদ্ধকরণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কারোই রাজনৈতিক অধিকার নষ্ট করা যাবে না। নিষিদ্ধ করলে দলটি গোপনে কার্যক্রম চালাবে, যা হবে আরও বিপজ্জনক।
মজার বিষয় হচ্ছে—ঘটনা কিন্তু সেটাই ঘটেছে, তবে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে নয়, ছাত্রলীগের সঙ্গে। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার পরিণতি তো আমাদের চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে।
যে ডাকসু নেতারা আজ কাবেরী গায়েনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার দাবি করছেন বানোয়াট অভিযোগে, তারা হয়তো জানেনই না—ডাকসু সচল করার দাবিতে উচ্চকণ্ঠ শিক্ষকদের মধ্যে কাবেরী গায়েন ছিলেন অন্যতম। অথচ তিনি শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির সমালোচনা করেছেন সমানভাবে। তিনি মনে করেন—শিক্ষকেরা পড়াবেন, গবেষণা করবেন, শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অবদান রাখবেন; সেটাই প্রকৃত শিক্ষকের দায়িত্ব।
কাবেরী গায়েনের বিরুদ্ধে কমিটি গঠন হওয়ার সংবাদটি জানার পর এ-ও জানতে পারলাম, ‘একদল শিক্ষার্থী’ বিশাল তালিকা তৈরি করেছে। শিক্ষকদের নামের তালিকা। এ নিয়ে বিবৃতিও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এমন সংবাদের শিরোনামও চোখে পড়ছে, যেখানে অধ্যাপক সাদেকা হালিমের ছবি ও শিরোনামে বলা হচ্ছে ‘অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ ৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে’ অভিযোগ, বরখাস্তের দাবি ইত্যাদি।
অধ্যাপক সাদেকা হালিম এবং অধ্যাপক কাবেরী গায়েন সব সময়ই নারী প্রশ্নে সরব থেকেছেন। তাদের মতো শক্তিমতী নারীরা জামায়াত-শিবিরের মতো নারী প্রশ্নে পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণার রাজনৈতিক দলের পক্ষে বড় হুমকি। এরা নারীকে ঘরে বন্দি করে রাখার জন্য কী না বলেছে, কী না করেছে—তা আমরা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেখেছি।
তবে আশার কথা, এখন সেই অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতায় রয়েছে নির্বাচিত সরকার এবং এই দলের নেতারা প্রজন্ম ধরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হয়ে আসছেন। ক্ষমতায় এসে তারা যদি একই রকম দমন-পীড়ন প্রশ্রয় দিতে থাকেন, তাহলে কি সাপের নিজের লেজ খেয়ে ফেলার মতো অবস্থা দাঁড়াবে না?
যে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানাচ্ছে, তাদের সাক্ষাৎকার দেখলেই বোঝা যায়—তারা কিছু মুখস্থ বুলি আউড়ে যাচ্ছে। তাদের শক্তিশালী কোনো যুক্তি নেই, তা তারাও জানে। এসব দেখে আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ের কথা মনে পড়ল। তখন দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নতুন এসেছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা মুখ বাঁকিয়ে বলত—তারা নাকি চাইলেই গ্রেডিং বা মূল্যায়ন বাতিল করে শিক্ষক পরিবর্তন করতে পারে। শুনে কেমন যেন আহত হয়েছিলাম। সত্য বটে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মাঝেমধ্যে নানা রকম অন্যায্য ক্ষমতার চর্চা করেন শিক্ষার্থীদের ওপর; তবে মূল্যায়ন দিয়ে শিক্ষক বদলে ফেলা যায়? এমন অদ্ভুত নিয়ম কীভাবে চলে?
ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি মা-বাবার পরেই শিক্ষকের স্থান। শিক্ষকতা এখন সাধারণ পেশা হয়ে উঠলেও আগের দিনে নিয়ম ভিন্ন ছিল। শিক্ষকের আশ্রয়ে অবস্থান করে তার সেবাযত্ন করে তবেই পাওয়া যেত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ। শিক্ষককে গুরুদক্ষিণা দিয়ে স্নাতক হয়ে বিদায় নিতে হতো।
বিশ বছরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চর্চা কেমন যেন উল্টো হয়ে গেছে। এখন আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধনী পরিবারের সন্তানদের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়; শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত ও রাজনীতি সচেতন শিক্ষার্থীদেরই ভিড় সেখানে। এর প্রমাণ আমরা ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালে সরকার পতনের রূপ নেওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলনেও দেখেছি।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা উগ্র মতাদর্শের বিস্তার দেখতে পাচ্ছি।
আমার লেখার শিরোনাম কাব্যিক—গানের সুনির্দিষ্ট লাইন। প্রেমের গান। অর্ঘ্য নামের দাড়িওয়ালা সুদর্শন তরুণ ‘সোডিয়াম বাতির গান’ নামের প্ল্যাটফর্মে চোখ বুজে গানটি গায়। গানটির সুন্দর মিউজিক ভিডিও আছে। সাদাকালো কিছু নান্দনিক দৃশ্য জোড়া দিয়ে বানানো চমৎকার কাজ। গানটি যখন প্রথম শুনি, শুনেই কাবেরী ম্যামের কথা মনে পড়েছিল; তাকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন।
ব্যাকবেঞ্চার স্টুডেন্ট হওয়ায় শিক্ষকদের এড়িয়ে চলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোটা সময়। কিন্তু মাস্টার্স থিসিসের সময় কাবেরী গায়েনের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয় আমার। পড়াশোনা করে ক্লাসে আসা, সময়মতো ক্লাসে আসা, দুষ্টুমি করলে প্রিয় ছাত্রকেও ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া, অ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইন না বাড়ানোর মতো কঠোর শৃঙ্খলার বাইরেও স্নেহময়ী কাবেরী গায়েনকে আমি সে সময় দেখেছি। আমার থিসিসের জন্য আমার চেয়ে বেশি পড়াশোনা তিনি করতেন। যখনই তার বাসায় যেতাম, আমাকে ভালমন্দ খাওয়াতেন; আমার পাঁচ বছরের ছেলের জন্য বক্সে করে মিষ্টি পাঠাতেন।
অধ্যাপক কাবেরীর জন্য ভালোবাসা ও সংহতি জানানোই যথেষ্ট নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক চক্রান্ত চলছে। জুলাইয়ের নাম ভাঙানো কিছু লোক মানুষের—বিশেষভাবে নারীদের—মুক্তস্বর চেপে ধরার পাঁয়তারা নিয়ে কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে এসব দুরভিসন্ধিমূলক কার্যকলাপ রদ করতে হবে। মানুষের মুক্তচিন্তা বন্ধ করতে চাইলে কেমন পরিণতি হয়, তা ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট স্পষ্ট দেখা গেছে।
লেখার শিরোনামে ব্যবহৃত গানের লিরিকটা দেওয়া হলো—
কাবেরী এই শীতে ফেটে যাওয়া ঠোঁট নিয়ে তোমার কাছে এসেছি
যদি তুমি বলো (আমি) নিস্পৃহ, তবে তাই
ঘুরে তোমার কাছে এসেছি।
কাবু হয়ে ঘরে ফেরার দিন শেষ
যুদ্ধের অবশিষ্ট আগুনে পুড়ে গেছে আমাদের বয়স।
কাফের দিল নাজরানা, নদী ভরা উত্তাল যৌবন
কাবেরী তোমার ছবি আমি আজও বুক পকেটে নিয়ে ঘুরি।
সংশয়ে বিমান আর মরুঝড়ে আটকে পড়া বেদুঈন
আমরা বহন করছি কিছু অন্তঃসারশূন্য গান
পৃথিবীর একপক্ষ করে খেয়ে ফেলা রাজনীতি
মগজে ধোঁয়া লাগিয়ে বলে আমার শিল্প বলীয়ান।
কাবেরী চলো এর চেয়ে শুয়ে পড়ি নিভিয়ে ঘরের বাতি
কাবেরী চলো এবার শুয়ে পড়ি নিভিয়ে ঘরের বাতি।
কার্তুজ ভর্তি পকেট আমার
নিঃস্ব পিস্তল হাতে নিয়ে যুদ্ধের এই ময়দান
যেখানে হৃদয়ের খুব কাছে বারুদ আর গোলাপের সুবাস
কাবেরী তোমার দেয়া চাদরেই আমার বসবাস।
উম্মে রায়হানা কবি ও সাংবাদিক। ই-মেইল: ummedotrayhana@gmail.com