Published : 20 Aug 2026, 11:05 AM
বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রসঙ্গ উঠলেই যে ভাবনা ঘুরেফিরে আসে; ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কি গোপনে বালুচ বিদ্রোহীদের মদত জোগাচ্ছে? এ বিষয়ে পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন ধরনের সংবাদ দেখা যায়। কিন্তু এমন অভিযোগের কি কোনো শক্ত ভিত্তি আছে? বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই তিন দেশের ক্ষেত্রে অভিযোগের ধরন একরকম নয়। রাজনৈতিক সহানুভূতি, কূটনৈতিক অবস্থান, গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠিকে সরাসরি অর্থ-অস্ত্র সহায়তার বিষয়গুলোকে একসাথে গুলিয়ে ফেলে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
প্রথমে আসি ভারতের আলোচনায়। তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের ভিত্তি কী? ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান একাধিকবার গুরুতর অভিযোগ তুললেও তার স্বপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেনি। যেটুকু আলোচনা আছে, তার সবই অনুমাননির্ভর। যেমন ২০১৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে সরাসরি বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি নিপীড়নের প্রসঙ্গ তোলেন, যা ভারতের পূর্ববর্তী কূটনৈতিক নীতি থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি ছিল। একই বছর বেলুচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের (বিএলএফ) নেতা আল্লাহ নজর বালোচ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, তারা ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রত্যাশা করেন। তবে একই সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলে দেন, মোদী সরকারের কাছ থেকে তার সংগঠন কোনো অর্থ পায়নি।
এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার, বালুচ নেতার ভারতের কাছে সাহায্য চাওয়া আর ভারতের বাস্তবে ওই সাহায্য দেওয়া—দুটি এক জিনিস নয়।
এই বিষয়ে ভারতের কুলভূষণ যাদবের ঘটনাটি প্রায়ই আলোচনায় আসে। পাকিস্তানের দাবি, তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর হয়ে বেলুচিস্তানে গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতা চালাচ্ছিলেন। ভারতের বক্তব্য, তিনি ইরানে ব্যবসা করতেন এবং সেখান থেকেই তাকে অপহরণ করা হয়। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এই ঘটনার বিরোধ নথিভুক্ত করলেও তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রের হয়ে বেলুচিস্তানে বিদ্রোহ পরিচালনা করছিলেন কিনা, ওই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। মামলাটি মূলত ভিয়েনা কনভেনশনের কনস্যুলার-অ্যাক্সেস সংক্রান্ত ছিল এবং আদালত পাকিস্তানকে ভারতের কনস্যুলার অধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করে। বালুচ বিদ্রোহীরা ভারতীয় সাহায্য চেয়েছে সত্য, কিন্তু ভারত বাস্তবে ওই সাহায্য দিয়েছে কিনা তার স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই।
কৌশলগত যুক্তির দিক থেকে ভারতের বেলুচিস্তান নিয়ে আগ্রহী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে এবং তা স্পষ্টও। পাকিস্তানকে পশ্চিম সীমান্ত থেকে চাপে রাখা, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) ও গোয়াদর বন্দরে চীনা উপস্থিতি মোকাবিলা করা এবং কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের কৌশলের পাল্টা হিসেবে অসম চাপ তৈরি করা। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বেলুচিস্তান বিদ্রোহ ও সিপিইসি-বিরোধী সহিংসতার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে। অতএব, ভারতের কৌশলগত অবস্থান থাকা একটি যুক্তিসঙ্গত ধারণা, কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের মাধ্যমে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) সরাসরি অর্থ বা অস্ত্র দেওয়ার প্রকাশ্য কোনো প্রমাণ নেই।
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, পাকিস্তান ভাঙতে বালুচদের স্বাধীনতা আন্দোলনে তারা পরোক্ষভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছে। কীসের ভিত্তিতে এমন দাবি করা হয়? এর পেছনে দুটি বিষয়ের যোগ টানা হয়। প্রথমত, ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘মেমরি’-এর (মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট) বেলুচিস্তান সংক্রান্ত একাধিক প্রকাশনা, যার প্রতিষ্ঠাতা ইগাল কারমনের সাবেক মোসাদ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-এ প্রকাশিত হোসে লেভ আলভারেজ গোমেজের একটি লেখা, যেখানে স্বাধীন বেলুচিস্তানকে ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থের অনুকূল বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই তথ্যগুলো ভিত্তিহীন নয়; ‘মেমরি’ সত্যিই বছরের পর বছর ধরে এমন প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে যেখানে স্বাধীন বেলুচিস্তানকে পশ্চিমা বিশ্বের স্বাভাবিক মিত্র ও ইরান-বিরোধী কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এখানেই মূল সমস্যা। ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট একটি গবেষণা সংস্থা বা লেখক কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে অনুকূল বিশ্লেষণ প্রকাশ করলেই তা প্রমাণ করে না যে ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে ওই আন্দোলনকে অস্ত্র বা অর্থ দিয়ে সহায়তা করছে।
গোমেজের লেখাকে একজন ইসরায়েলি ব্যক্তির ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণভিত্তিক বিশ্লেষণ হিসেবে যুক্তিসংগতভাবে দেখা যেতেই পারে, কিন্তু ইসরায়েল রাষ্ট্রের নীতি হিসেবে নয়। ইসরায়েলি স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে লেখালেখি করলেই তা ইসরায়েলি সরকারের অস্ত্র বা অর্থ সহায়তার প্রমাণ হয়ে যায় না।
তবে তাদের ভূ-রাজনৈতিক যুক্তিটি একেবারে অমূলক নয়। ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ইরান, আর বেলুচিস্তানের একটি বড় অংশ ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের সীমান্তবর্তী। ফলে তেহরানের পূর্ব সীমান্তে একটি ইরান-বিরোধী রাজনৈতিক পরিবেশ ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। এছাড়া, গোয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সিপিইসির মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ায়, তা কমাতে আগ্রহী যে কোনো শক্তির কাছে বেলুচিস্তান একটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। এই কারণগুলো ইসরায়েলের সম্ভাব্য কৌশলগত আগ্রহ ব্যাখ্যা করে বটে, কিন্তু বাস্তবে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে অস্ত্র সরবরাহের প্রমাণ মেলে না। ফলে একটি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধকে চিন্তার খোরাক হিসেবে নেওয়া যায়, কিন্তু সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সমীচীন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আলোচনার কারণ কী? তারা কি বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলছে?
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের দাবিটি খুবই দুর্বল। ২০১৪ সালে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে কিনা। জবাবে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে এবং বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করা মার্কিন প্রশাসনের নীতি নয়। এটিই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের স্পষ্ট ঘোষণা।
এর বিপরীতে ২০১২ সালে কংগ্রেসম্যান ডানা রোরাবাখারের আনা প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে বেলুচ জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও নিজস্ব সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের অধিকারকে সমর্থন করা হয়েছিল। কিন্তু এটি ছিল মাত্র তিনজন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যানের (রোরাবাখার, গোহমার্ট ও কিং) উত্থাপিত একটি প্রস্তাব, যা কমিটিতে পাঠানোর পরপরই আটকে যায় এবং কখনো ভোটে ওঠেনি।
মার্কিন দূতাবাস ও প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রস্তাব থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান পুনর্ব্যক্ত করে। অর্থাৎ এটি কয়েকজন ব্যক্তি-কংগ্রেসম্যানের অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পররাষ্ট্রনীতি নয়। আরও উল্লেখযোগ্য, ২০১৯ সালের অগাস্টের কাছাকাছি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে, যা প্রকাশ্য প্রমাণকে গোপন সমর্থনের বিপরীত দিকেই নিয়ে যায়। কতিপয় মার্কিন কংগ্রেসম্যান বেলুচ স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন সত্য, কিন্তু মার্কিন প্রশাসন বিএলএকে সহায়তা করছে, এমন প্রমাণ নেই।
সৌদি আরব, আফগানিস্তান এবং ইরানও বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন করছে না। বিশ্লেষক জেমস ডর্সি সৌদি গণমাধ্যমে বেলুচ জাতীয়তাবাদী নেতাদের ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন এবং ইরান-বিরোধী কৌশলগত প্রেক্ষাপটের কথা টেনে তিনি সৌদি আরবের সহানুভূতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ২০১৯ সালে। তবে এটিও কোনো সিদ্ধান্তমূলক প্রমাণ নয়। আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে ঐতিহাসিকভাবে বেলুচ নেতাদের অবস্থান থাকলেও, বর্তমান তালেবান প্রশাসন বিএলএকে সমর্থন করছে, এমন কোনো তথ্য নেই। আর ইরান নিজেই তার সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচদের কঠোরভাবে দমন করে; ফলে তাদের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা এমনিতেও শূন্য।
যে কথাটা জোর দিয়ে বলা দরকার—বেলুচ বিদ্রোহকে শুধু 'বিদেশি ষড়যন্ত্র' তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করলে মস্ত ভুল হবে। বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সংঘাত, জোরপূর্বক গুম, সামরিক অভিযান, অর্থনৈতিক অনুন্নয়ন, বৈষম্য ও বেলুচ জাতীয়তাবাদই এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। বিদেশি স্বার্থ এই আন্দোলনকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু আন্দোলনটির মূল উৎস শতভাগ অভ্যন্তরীণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইসরায়েল-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র গোপনে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করছে—এমন দাবি প্রমাণসিদ্ধ নয়। ভারতের ক্ষেত্রে বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চিন্তা থাকতে পারে; অন্যদিকে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এটি কেবলই কৌশলগত আগ্রহের প্রচারণামূলক প্রকাশ। তবে সবকিছুর সঙ্গেই রাষ্ট্রীয় সহায়তার যে সরাসরি প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে, তা এখন পর্যন্ত অপ্রমাণিত।
মঞ্জুরে খোদা লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com