Published : 02 Apr 2026, 11:47 AM
নকশি কাঁথা, নামটি শুনলেই যে কোনো বাঙালির মনে রঙিন সূতায় ভরা একটি নকশা করা কাঁথার ছবি ভেসে ওঠে। এটি আমাদের নিজস্ব সম্পদ, দেশীয় ঐতিহ্য এবং গর্বের বিষয়। যেখানে সাধারণ কাঁথা কেবল প্রয়োজনের অনুষঙ্গ, সেখানে নকশি কাঁথা আমাদের অস্তিত্বের নিপুণ কারুকাজ। এটি আমাদের নিজস্ব সম্পদ, আমাদের অহংকার এবং হাজার বছরের লালিত কৃষ্টির এক জীবন্ত দলিল। কারুশিল্পীদের নিপুণ হাতের অসাধারণ সৃষ্টি এই নকশি কাঁথা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নকশি কাঁথার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
যশোরের নকশি কাঁথার ঐতিহ্য প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো। নারীরা তাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা ও বেদনা সূচের ফোঁড়ে গেঁথে তৈরি করেন এই কাঁথা। যে মানুষগুলো এসব কাঁথা গায়ে দেয় তারা জানতেও পারে না কি পরম মমতা মেশানো গল্প বা কোনো বেদনার অথবা রঙিন কাহিনী এর প্রতিটি ফোঁড়ে বোনা আছে। কোনো মা তার সন্তানের জন্য কিংবা স্ত্রী তার স্বামীর জন্য মমতা মিশিয়ে বোনেন এই শিল্প। মাঠ, নদী, নৌকা, গরু, উৎসব—গ্রামীণ জীবনের সব অনুভূতি উঠে আসে এর রঙিন নকশায়। নকশি কাঁথা এমন একটি শিল্প যা আমাদের নিজস্বতার অহংকার করার সুযোগ দেয়। ২০২৪ সালে জামালপুরের নকশি কাঁথা ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত আখ্যানকাব্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ প্রকাশের পর এই নামটি আরও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত সমাজের কাছে নকশি কাঁথার শৈল্পিক রূপ প্রকাশ পায় এবং এর কদর বাড়তে থাকে। গ্রামের অশিক্ষিত গৃহবধূদের হাতের নিপুণ কাজ শহরের নামীদামি ফ্ল্যাটে স্থান করে নেয়। একসময় এই বাংলায় প্রতিটি ঘরেই নকশি কাঁথা তৈরির চল ছিল। তখন বেশিরভাগই নিজেদের ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও এটি ছিল সৌখিনতা ও শিল্পের এক অনন্য উদাহরণ। কাঁথা তৈরি মূলত একটি শিল্প, আর নকশি কাঁথা তার মধ্যে সবচেয়ে শৈল্পিক ও নিপুণ কাজ। শিল্পী যেমন কাগজে ছবি আঁকেন, তেমনি গ্রামের গৃহবধূরা কাপড়ের ওপর জীবন্ত ছবি ফুটিয়ে তোলেন।
নকশি কাঁথা নিঃসন্দেহে একট গ্রামীণ ঐতিহ্য। সাধারণ কাঁথার সাথে এর পার্থক্য হলো সেলাইয়ের ধরন, রঙ-বে রঙয়ের সুতা এবং নকশার ভিন্নতায়। নকশি কাঁথার মূল বিষয় হলো নকশা। এর ঐতিহ্যবাহী নকশা মোটিফের মধ্যে আছে জীবনবৃক্ষ, পদ্ম, সূর্য, চাঁদ, কলকা, স্বস্তিকা, বুটি, মাছ, বিভিন্ন ধরনের ফুল, গরু-ছাগল, ময়ূর, বিভিন্ন ধরনের পাখি, মানুষের অবয়ব, গ্রামীণ জীবনের দৃশ্য ইত্যাদি। বিভিন্ন অঞ্চলে নকশি কাঁথার বিভিন্ন ফোঁড়ে এসব নকশা আঁকা হয়ে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। কোনো অল্প শীতের কুয়াশা জড়ানো শীতে এরকম একটি নকশি কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকার ছবি এই দেশে মাত্র এক দশক আগেও ঘরে ঘরেই ছিল। এরপর শহর থেকে গ্রামে গায়ে উঠল কম্বল। এখন মানুষ কাঁথার চেয়ে কম্বলেই বেশি অভ্যস্থ। এটা নকশি কাঁথার দোষ নয়, এটা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। যতটা সফলভাবে এর বিকল্পকে উৎসাহিত করেছি।
নকশি কাঁথা যাদের হাত ধরে তৈরি হয় ওই পল্লী গাঁয়ের বধূদের কোনোদিনই মূল্যায়ন করা হয়নি। তাদের প্রশিক্ষণ অথবা আর্থিক স্বচ্ছলতার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে ওই শিল্পীরা এখন নকশি কাঁথা ছেড়ে বিকল্প কাজে ঝুঁকেছেন। এই শিল্প আরও জোরালো করার তেমন কোনো উদ্যোগও নেই। আজকাল গ্রামে-গঞ্জে গৃহবধূদের করার মতো বিবিধ ধরনের কাজ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কিছুদিন আগেও রেহানা খানম বিথী নকশি কাঁথা সেলাই করতেন, এখন তিনি নিষিদ্ধ চায়না দোয়ার তৈরির কাজ করছেন। কারণ অল্প পরিশ্রমে এখানে অনেক বেশি আয় হয়। যথাযথ পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের অভাবে এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
তারপরও কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগ এখনো চলমান এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে। পাবনার বেড়া উপজেলায় ‘জয়ন্তী-লতা নকশি কাঁথা ঘর’ নামে এমন একটি উদ্যোগ চোখে পড়ে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী জয়ন্তী এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা লতা—এই দুই স্বাবলম্বী নারী মিলে নকশি কাঁথা তৈরি করে ঢাকার নামীদামি শোরুমে বিক্রি করেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় কাটান এই শিল্পে। কিন্তু সার্বিক চিত্র খুবই উদ্বেগজনক।
যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর ও দিনাজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নকশি কাঁথার নিজস্ব ঘরানা ও স্বতন্ত্র নকশা গড়ে উঠেছে। এর ঐতিহ্যবাহী মোটিফের মধ্যে রয়েছে জীবনবৃক্ষ, পদ্মফুল, সূর্য, চাঁদ, কলকা, স্বস্তিকা, মাছ, ময়ূর, বিভিন্ন পাখি, মানুষের অবয়ব এবং গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব নকশা সূচের ফোঁড়ে ধরে রাখা হয়েছে।
নকশি কাঁথা শুধু আবেগিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বিশাল। কিন্তু একটি নকশি কাঁথা তৈরি করতে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সময় লেগে যায়। ফলে নারীরা সহজ ও লাভজনক বিকল্প কাজের দিকে ঝুঁকছেন। যেসব নারী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
এই অমূল্য শিল্পকে বাঁচাতে ও জাগিয়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটে নকশি কাঁথা প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক মেলায় স্টল দেওয়া, নারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সঠিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। তবেই নকশি কাঁথা শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের গর্ব হয়ে টিকে থাকবে এবং গ্রামীণ নারীদের আয়ের একটি টেকসই উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।