Published : 31 Jul 2026, 07:00 PM
বাংলাদেশের জনজীবনে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের পরিচয় কোনো একক পেশা বা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা তাদের কর্ম, নৈতিক অবস্থান এবং জনস্বার্থে অবিচল অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্র অতিক্রম করে সামগ্রিক মূল্যবোধে পরিণত হন।
প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (৩১ জুলাই ১৯৩১–৯ অগাস্ট ২০২৪) সেই বিরল মানুষদের একজন। তিনি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাঠামো প্রকৌশলী, আবার একই সঙ্গে জনস্বার্থে আপসহীন নাগরিক, জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের নৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল প্রতীক। তার জীবন আমাদের সামনে এমন মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—পেশাগত সাফল্যের প্রকৃত অর্থ কী? ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা, নাকি সেই সাফল্যকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করার সক্ষমতা?
১৯৩১ সালের ৩১ জুলাই খুলনার দৌলতপুরে জন্ম নেওয়া শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ শৈশব থেকেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ১৯৫৪ সালে আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক অর্জন তার মেধার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। তার প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে পরবর্তী ছয় দশকের কর্মজীবনে। কাঠামোগত প্রকৌশল, ভবনের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং রেট্রোফিটিং প্রযুক্তিতে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা তাকে দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রকৌশলীতে পরিণত করেছে। তার প্রতিষ্ঠিত ‘শহীদুল্লাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ এবং পরবর্তীকালে ‘শহীদুল্লাহ অ্যান্ড নিউ অ্যাসোসিয়েটস’ বাংলাদেশের স্ট্রাকচারাল কনসালটেন্সি খাতের অন্যতম অগ্রদূত প্রতিষ্ঠান। দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনার কাঠামোগত নকশা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, পুনর্বাসন ও রেট্রোফিটিংয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির অবদান আধুনিক প্রকৌশলচর্চায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। বিশেষ করে পুরোনো ভবন ভেঙে না ফেলে তার কাঠামোগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রেট্রোফিটিং প্রযুক্তিকে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পথিকৃৎ ভূমিকা পালন করেন।
শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর জীবনকে কেবল সফল প্রকৌশলীর জীবন বলে ব্যাখ্যা করা তার প্রতি অবিচার হবে। তার পেশাগত সাফল্য কখনোই ব্যক্তিগত গৌরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান ও দক্ষতার প্রকৃত মূল্য নিহিত মানুষের কল্যাণে তার প্রয়োগে। এই বিশ্বাসই তাকে দেশের তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখে পরিণত করে। প্রকৌশল তার পেশা ছিল, তবে জনস্বার্থ ছিল তার জীবনব্রত।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে বিতর্ক যখন ক্রমশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নে রূপ নিতে থাকে, তখন শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ধারাবাহিকভাবে মৌলিক নীতি সামনে আনেন—জাতীয় সম্পদের প্রকৃত মালিক জনগণ; রাষ্ট্র তার অভিভাবক মাত্র। তাই এসব সম্পদের ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার ও উন্নয়ন হতে হবে জাতীয় স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জনগণের অধিকারকে কেন্দ্র করে। এই অবস্থান থেকেই তিনি তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যতম প্রধান স্থপতি ও নৈতিক নেতৃত্বে পরিণত হন। তার নেতৃত্বে আন্দোলন কেবল প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তথ্য, যুক্তি ও পেশাগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুদৃঢ় জনমত গঠনের ধারায় রূপ নিয়েছিল।
তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল গ্রহণযোগ্যতা। আদর্শগত ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন বামপন্থি দল, প্রগতিশীল সংগঠন, পেশাজীবী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজকে অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে সক্ষম হন। ব্যক্তি হিসেবে তার সততা, নির্লোভ জীবনযাপন এবং যুক্তিনিষ্ঠ অবস্থান তাকে এই নৈতিক নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। কোনো পদ বা ক্ষমতার জন্য নয়, বিশ্বাসযোগ্যতার শক্তিতেই তিনি মানুষকে একত্রিত করেছিলেন।
তার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল তার দর্শনেরই সম্প্রসারণ। একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার শক্তির উৎস কী। তিনি হাসিমুখে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী স্মরণ করেছিলেন—“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” এই বাক্যই যেন তার সমগ্র জীবনকে ব্যাখ্যা করে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা তার কাছে কোনো বিমূর্ত নৈতিক শিক্ষা ছিল না; তা ছিল কর্মের প্রেরণা। মানুষের সেবা তার কাছে ঈশ্বরসেবার সমার্থক ছিল।
তার জীবনদর্শনের আরেকটি ভিত্তি ছিল গীতার সেই বহুল উদ্ধৃত বাণী—“কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়।” তিনি ফলের প্রত্যাশায় নয়, কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করেছেন। একবার পুনর্জন্মের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেছিলেন, পুনর্জন্মে তার বিশ্বাস নেই। তবে আবার জীবন পেলে প্রকৌশলীই হতে চাইতেন, কারণ পেশাগত জীবনে যা সৃষ্টি করেছেন, তা মানুষের কাজে লাগে। একই সঙ্গে তার আক্ষেপ ছিল, রাজনৈতিক চেতনার বর্তমান অবস্থানে আরও আগে পৌঁছানো উচিত ছিল। এই স্বীকারোক্তি তার আত্মসমালোচনার ক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
আরও একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল উদ্যোগে নীরবে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে তিনি কী পেয়েছেন। তার উত্তর ছিল অত্যন্ত সরল—“একা যতটুকু করা যায়, একসঙ্গে তার চেয়ে অনেক বেশি করা সম্ভব। অর্থ ও শ্রম মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।” এরপর তিনি যোগ করেছিলেন, “আফসোস, আরও বেশি করতে পারলাম না।” এই বাক্য তার চরিত্রের গভীরতম দিকটি উন্মোচন করে। তা কোনো ব্যর্থতার আক্ষেপ নয়; আরও বেশি মানুষের জন্য কাজ করতে না পারার বিনয়ী বেদনা।
আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, মানুষের জন্য এই বিনিয়োগ কখনো ব্যর্থ হয়েছে কি না। তার উত্তর ছিল দৃঢ় ও নির্ভার—“মানুষের কল্যাণে করা কোনো বিনিয়োগ কখনও ব্যর্থ হয় না।” আজকের আত্মকেন্দ্রিক সময়ে এই বিশ্বাস কেবল নৈতিক অবস্থান নয়; তা রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনও বটে। তিনি মনে করতেন, সমাজ পরিবর্তন একার পক্ষে সম্ভব নয়; সমষ্টির শক্তিই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি।
তার নৈতিক দৃঢ়তার আরেকটি দিক প্রকাশ পেয়েছে রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ে। পাকিস্তান আমলে বামপন্থি রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তিনি গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও কারাবরণের শিকার হন। পরিবার দুর্ভোগের মুখে পড়লেও তিনি তার আদর্শ থেকে সরে আসেননি। সত্যের প্রতি এই অটল নিষ্ঠাই তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি নিজের বিশ্বাসকে কখনো সুবিধাবাদের কাছে সমর্পণ করেননি।
নিজে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ সদস্য না হলেও প্রগতিশীল রাজনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের উদ্যোগগুলোর প্রতি তার সমর্থন ছিল গভীর। সেই সমর্থন কেবল বক্তব্য বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যক্তিগত আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি নিয়মিতভাবে সমাজ পরিবর্তনে নিবেদিত ব্যক্তি, সংগঠন ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের জন্য ব্যয় করেছেন। তার কাছে সম্পদ ভোগের উপকরণ ছিল না; তা ছিল জনকল্যাণে ব্যবহারের সামাজিক দায়িত্ব।
আজকের বাংলাদেশে শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর জীবন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। এমন সময়ে আমরা বাস করছি, যখন পেশাগত সাফল্যকে প্রায়ই সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়, যখন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দেন, একজন প্রকৌশলী, শিক্ষক, চিকিৎসক বা যে কোনো পেশাজীবীর প্রকৃত সার্থকতা কেবল দক্ষতায় নয়; সেই দক্ষতা মানুষের কল্যাণে কতটা নিবেদিত, তার ওপর নির্ভর করে।
তার জীবন আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—নৈতিক নেতৃত্ব কখনো ক্ষমতা থেকে আসে না; আসে বিশ্বাসযোগ্যতা, সততা এবং আত্মত্যাগ থেকে। তিনি কোনো রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ ছিলেন না, কোনো বড় রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তবুও জনস্বার্থের প্রশ্নে তার বক্তব্য সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কারণ মানুষ তার কথার সঙ্গে তার জীবনের মিল খুঁজে পেয়েছে।
শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর উত্তরাধিকার কেবল প্রকৌশল বা কোনো আন্দোলনের ইতিহাস নয়। তার উত্তরাধিকার হলো মূল্যবোধ—যেখানে জ্ঞান মানুষের জন্য, সম্পদ সমাজের জন্য, রাজনীতি জনকল্যাণের জন্য এবং জীবন সেবার জন্য। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ বা সম্পদ নয়; তার নৈতিক অবস্থান।
তার জীবনদর্শনকে সংক্ষেপে বলা যায়—সেবা ছিল তার প্রেরণা, কর্ম ছিল তার সাধনা, মানুষ ছিল তার শক্তি, আর জনকল্যাণ ছিল তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আজ যখন আমরা তাকে স্মরণ করি, তখন কেবল সফল প্রকৌশলীকে নয়, এমন মানুষকে স্মরণ করি, যিনি তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন—মেধা তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তা নৈতিকতা দ্বারা পরিচালিত হয়; আর নৈতিকতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের কল্যাণে নিবেদিত থাকে।
শুভ কিবরিয়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: kibria34@gmail.com