১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ইকোসিস্টেমে বিউটি পালের হাওয়া

নোট-গাইড বই আর কোচিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ পাওয়া তথাকথিত ‘স্মার্ট’ প্রজন্ম কি সত্যি মুক্তচিন্তার অধিকারী হতে পারছে? নাকি আমরা সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্ন্‌তার মধ্য দিয়ে এমন জাতি তৈরি করছি যা সহজেই অন্যের দ্বারা চালিত হবে?

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ইকোসিস্টেমে বিউটি পালের হাওয়া
পুথিগতবিদ্যার বাইরে গিয়ে সৃজনশীলতায় শিশুদের মন বিকশিত করা নাম জানা-অজানা শিক্ষকদের প্রতিনিধি—বিউটি রাণী পাল, আব্দুল মাজেদ ও মাতঙ্গিনী খান।

আলমগীর খান আলমগীর খান

Published : 04 Aug 2026, 06:22 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

শিক্ষা ও সংস্কৃতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মূলত শিক্ষা নিজেও সংস্কৃতির বিশাল উপাদান। শিক্ষা সংস্কৃতিকে নির্মাণ করে আর সাংস্কৃতিক বিকাশ শিক্ষাকে শক্তিশালী করে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মিলে যে ইকোসিস্টেম তৈরি হয়, সে সম্পর্কে আমাদের দেশে ধারণা নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের ধারণায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভাবনাটা এখানে সীমাবদ্ধ থাকলেও একরকম চলত; কিন্তু এই ধারণা অনুযায়ী শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরস্পরবিরোধী কোনো বস্তু। আমাদের সমাজপতি ও শিক্ষা কর্মকর্তাগণ শিক্ষার সুস্বাস্থ্যের জন্য এতই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, শিক্ষাগৃহে যাতে কোনোভাবে সংস্কৃতির বাতাস প্রবেশ না করে, সেজন্য সদা উদগ্রীব।

সাম্প্রতিককালে যেন তাতেও অনেকে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। একটি গানের সঙ্গে শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটু নাচ নিয়ে তাই কত কিছু যে ঘটে গেল। অচিরেই বোঝা গেল, বিউটি পাল কেবল এক দমকা হাওয়া নন, এক ঝড়ো বাতাসের নাম। এই ঝড়ো বাতাস মানুষের বিকাশের জন্য প্রয়োজন; কূপমণ্ডূকের কাছে যতই আতঙ্কজনক হোক না কেন। বোঝা গেল, বিউটি পালের মতো ধুলাবালি ও দমকা হাওয়া ঠেকাতে গেলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটাকেই এমন পরিষ্কার-ঝকঝকে করতে হবে যে, এরপর যা পড়ে থাকবে, তাকে শিক্ষা বললে অন্ধকারই হেসে লুটোপুটি খাবে।

এ বিষয়ে আর কাউকে না হোক, অন্তত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থাকে (ইউনেস্কো) আমরা কিছুটা পাত্তা দিতে পারি। এই আন্তর্জাতিক সংস্থার ‘ফ্রেমওয়ার্ক ফর কালচার অ্যান্ড আর্টস এডুকেশন: ইমপ্যাক্টিং গাইডেন্স’-এর সারমর্ম শুরু হয়েছে এভাবে— “শিল্প ও সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো সৃজনশীলতা, তার্কিক বুদ্ধিমত্তা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে লালন করে; যা শিক্ষার্থীদের বিশ্বের সঙ্গে সার্থকভাবে যুক্ত করতে এবং ন্যায়পরায়ণ, টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণে সক্ষম করে। কিন্তু বিভিন্ন দেশ এখনও শিক্ষার সর্বস্তরে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চাকে একীভূত করেনি।”

ইউনেস্কোর এই ফ্রেমওয়ার্কের মুখবন্ধে বলা হয়েছে: “বিশ্বায়ন, দেশান্তর ও দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে বিশ্বব্যাপী সমাজসমূহ নানা গভীর ও দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে মানুষকে জলবায়ু সংকট থেকে শুরু করে যুদ্ধ ও ব্যাপক অসাম্যের মতো অনেক জরুরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এসবের মুখোমুখি হওয়ার কেন্দ্রীয় শক্তি শিক্ষার মাঝে নিহিত: কেবল জ্ঞানের বাহন হিসেবে নয়, পরিবর্তনের শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবেও। শিক্ষাকে হয়ে উঠতে হবে এমন, যাতে শিক্ষার্থীদের প্রাসঙ্গিক জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও আচরণ দ্বারা এমনভাবে সক্ষম করা যায়, যেন তারা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অনুধাবন করতে পারে, জীবনের জটিলতা মোকাবিলা করতে পারে এবং শান্তিপূর্ণ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক শক্তিশালী করা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”

সেই ১৯৬৩ সালের ৭ জুন ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ একটি লেখার শিরোনাম ছিল: ‘স্কুলস ইন জাপান স্ট্রেস মিউজিক অ্যাট অ্যান আর্লি এজ; টু আওয়ারস আ উইক এভরিওয়ান প্লেজ সামথিং’ (জাপানের বিদ্যালয়সমূহ প্রাথমিক পর্যায়েই সংগীতের ওপর জোর দেয়; সপ্তাহে দুই ঘণ্টা প্রত্যেকে কিছু না কিছু বাজায়)। স্কুলে সংগীত শেখানোর উদ্দেশ্য কিন্তু সংগীতবিশারদ জাতি তৈরি নয়; উদ্দেশ্য ছিল—গানবাজনার ক্লাস তাদেরকে আরও মনোযোগী করে তুলবে ও অঙ্ক শিখতে সহায়তা করবে।

আমাদের দেশের কারো ছেলেমেয়ে জাপানের কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলে তার মা-বাবা চারদিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে এই সংবাদ ছড়াবেন; অথচ এই দেশে কোনো গরিব ছেলেমেয়ে স্কুলে গিয়ে গান শিখবে শুনলে হয়তো তারাই আবার ‘শিক্ষা গেল গেল’ বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চেঁচামেচির হাট বসাবেন। কেন? নিজের সন্তান জাপানে অথবা ইউরোপে পড়ার সুযোগ পেলে গর্ব করে বেড়াবেন যেখানে ওই সংস্কৃতি; তাই বলে এখানকার ছেলেমেয়ে কেন সেই সুযোগ পাবে—এই গোপন হিংসা নয় কি?

আমাদের দেশে অনেকেই যখন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সংস্কৃতিকে উচ্ছেদ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন, তখন সংগীত সম্পর্কে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলে, তা খানিকটা দেখা যাক। বিখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এ (২০ মার্চ ২০২৬) ‘ইজ প্লেইং মিউজিক গুড ফর দ্য ব্রেইন?’ শীর্ষক লেখায় বলা হয়েছে, “২০২০ সালের গবেষণায় দেখা গেছে যে, সংগীতশিল্পীদের মস্তিষ্কের নির্বাহী ক্ষমতা উন্নত, যা পরিকল্পনা ও সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। ২০১৭ সালের মেটা-অ্যানালিসিস থেকে জানা যায়, সংগীতশিল্পীদের স্মৃতিশক্তি ভালো। গত বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, তারা ব্যথায় কম কাতর হন। ... ২০১০ সালের প্রবন্ধে দেখা গেছে, সাত বছর বয়সের আগে যারা সংগীত শেখা শুরু করে, তাদের মস্তিষ্কের করপাস ক্যালোসাম বড়—যা মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধের স্নায়বিক সেতুস্বরূপ।”

ইকোনমিস্টে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে মস্তিষ্কে সংগীতের যতগুলো প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে, তা শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্জনে বাধা দেয়, নাকি সহায়তা করে? শিক্ষাক্ষেত্রে শিল্প-সংস্কৃতির সকল বিভাগেরই অনুরূপ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতির ভূমিকার বাইরেও তার আরও এক বিরাট পরিচয় আছে—শিল্প-সংস্কৃতি শিক্ষারও বাহন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাত্রা-কথকতাকে লোকশিক্ষার বাহন মনে করতেন।

পৃথিবীর বহু দেশে শিল্প-সংস্কৃতিকে শিক্ষা বিস্তারের জন্য শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সম্প্রতি ‘জ্যাকোবিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত (১ অগাস্ট ২০২৬) কিউবার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী আবেল প্রিয়েতোর সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে দেশটির অনন্য অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকারটির শিরোনামেই এর মর্মার্থ প্রকাশিত: ‘দ্য কিউবান রেভল্যুশন ওয়াজ আ রেভল্যুশন ইন আর্ট অ্যান্ড কালচার’ (কিউবার বিপ্লব ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির বিপ্লব)।

প্রিয়েতো বলেছেন, “ফিদেল নিশ্চিত ছিলেন যে, মানুষকে গড়ে তোলা যায়—যাতে তারা শৈল্পিক ও সাহিত্যিক উপাদানগুলো বুঝতে ও উপভোগ করতে পারে। চাবিকাঠি শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে। তাঁর মতে—যা তিনি হাজারবার বলেছেন—সংস্কৃতি ছাড়া স্বাধীনতা সম্ভব নয়। এ হলো সংস্কৃতি ও মুক্তি সম্পর্কে মার্তিয়ান ধারণা। হোসে মার্তি (কবি, দার্শনিক ও কিউবার জাতীয় বীর) বলেছিলেন, মুক্ত হওয়ার একমাত্র উপায় সংস্কৃতিবান হওয়া। ফিদেল বলেছেন, সংস্কৃতি ছাড়া স্বাধীনতা সম্ভব নয়; কেননা সংস্কৃতি ব্যতীত সহজেই চালিত হওয়ার সমূহ বিপদ বিদ্যমান।”

বই পড়া নিজেই সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিউবা কীভাবে বই পড়াকে উৎসাহিত করেছে, সে সম্পর্কে প্রিয়েতো ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আর এই দেশ পাঠকের দেশে পরিণত হলো। এখানে আমরা ফিওদর দস্তয়েভস্কির বই ছেপেছি বিশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার কপি—সমস্ত শ্রেষ্ঠ রুশ সাহিত্য। আবার বেনিতো পেরেজ গালডোস, ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারেবলস’ এবং মার্ক টোয়েন থেকে গোর ভিদাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যসমূহ।”

আমাদের দেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাঝে যে বিভেদের দেয়াল খাড়া আছে আর যাকে এখন আরও পাকাপোক্ত করা হচ্ছে, তা এই পুরো ইকোসিস্টেমেই ধস নামাবে। মনে হবে শিক্ষা খুব এগোচ্ছে। অবশ্যই, তবে তা যে উল্টো মুখে এগোচ্ছে, তা বুঝতে বুঝতে অনেক সময় পেরিয়ে যাবে!

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বই হচ্ছে কেবলমাত্র স্কুল-কলেজের পাঠ্য বিষয়—পরীক্ষা পাসের জন্য প্রয়োজনীয়। সে কারণে টেক্সটবুক ছাড়া বাকি সব ‘আউট বই’, যা পড়ালেখার ক্ষতি করে; অতএব না পড়াই ভালো! আর টেক্সটবুকের চেয়েও বেশি কদর নোট-গাইড বইয়ের; ছাত্রছাত্রীর কাছে যত কদর, শিক্ষকের কাছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

আর শিল্প-সংস্কৃতি তো আরও বেশি আউটের বিষয়। তৈরি হচ্ছে নোট-গাইড বইয়ে ঠাসা ও কোচিংয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক ‘স্মার্ট’ প্রজন্ম। তারা কি স্বাধীনতা লাভ করছে? এমন স্বাধীন, যে কারো দ্বারা ব্যবহৃত হবে না? শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হোসে মার্তির স্বপ্নের মতো স্বাধীন মানুষ হতে পারছে কি?

তেমন মানুষ তৈরি করতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শ্রেণিকক্ষে পাঠের ধরন, দৃষ্টিভঙ্গিসহ বহু কিছুর পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রয়োজন বিউটি রাণী পাল, মাতঙ্গিনী খান ও আব্দুল মাজেদের মতো নাম জানা-অজানা আরও অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা; যারা শ্রেণিকক্ষকে শিশুর কাছে করে তোলেন আনন্দময় স্বপ্নের জগৎ।

আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkhan@gmail.com