১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সিফাতের প্রতিবাদ, শফিকুরের সমর্থন এবং রাজনৈতিক ভাষার সংকট

সরকারে থাকলে অন্যায্য ভাষা ‘আইনশৃঙ্খলার হুমকি’ আর বিরোধী অবস্থানে থাকলে ‘জনগণের ক্ষোভ’—এই দ্বৈত নীতি দিয়ে কি রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো সম্ভব?

সিফাতের প্রতিবাদ, শফিকুরের সমর্থন এবং রাজনৈতিক ভাষার সংকট
সিফাত আব্দুল্লাহ: ভাইরাল হওয়া মানেই কার্যকর প্রতিবাদ নয়, অশালীন আক্রমণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কোনো সুস্থ ধারায় নিয়ে যায় না।

খালিদুর রহমান খালিদুর রহমান

Published : 06 Sep 2026, 10:07 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ, সরকারের কাছে জবাবদিহির দাবি এবং সেই ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা নিয়ে সিফাত আব্দুল্লাহর গ্রেপ্তারের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। তাকে গ্রেপ্তারকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বিতর্ককে আরও বিস্তৃত করেছে। প্রশ্ন এখন শুধু একজন তরুণ কী ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো নাগরিকের ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার কোথায়, রাষ্ট্রের জবাবদিহির সীমা কী এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদের নৈতিক মানদণ্ড কেমন হওয়া উচিত।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গাজীপুরের আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহ নিজের বাসায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে। ৪ হাজার ও ৫ হাজার টাকার বিল দেখিয়ে সে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে আটক করা হয়। পরদিন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রতিবাদের নামে অশালীন ও আক্রমণাত্মক ভাষার এমন প্রয়োগ কিন্তু সিফাতের মাধ্যমে তৈরি হয়নি এবং সিফাত নিজেও কাণ্ডটা এবারই প্রথম করেননি। ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই রাজনৈতিক ভাষার এই সংকট যেন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি কিংবা এনসিপির শীর্ষ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতো উদীয়মান তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য ও হুঙ্কার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—তাদের ব্যবহৃত ভাষা ও শব্দচয়ন অনেক সময়ই রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে চরম আক্রমণাত্মক ও অবমাননাকর রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যে ভাষার চর্চা তারা তৈরি করেছেন, সিফাত আব্দুল্লাহর ব্যবহৃত অশালীন ভাষা তারই এক ধারাবাহিক রূপান্তর মাত্র।

সিফাতের গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার উত্তর আইন ও আদালতের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কোন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেই মামলার সঙ্গে সাম্প্রতিক ভিডিওর সম্পর্ক কী, গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না, এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। তবে গ্রেপ্তারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কখনো তার ব্যবহৃত অশালীন ভাষাকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে না। একইভাবে তার ভাষার সমালোচনা করাও রাষ্ট্রের সম্ভাব্য অন্যায়, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা নাগরিক অভিযোগের তদন্তের প্রয়োজনীয়তা বাতিল করে না।

বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক বেশি আসার অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া নাগরিকের অধিকার। কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়েছে, আগের বিলের সঙ্গে পার্থক্য কত, মিটার রিডিং সঠিক কি না, বিল তৈরিতে কারিগরি ত্রুটি হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি ও লোডশেডিং মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প, কৃষি এবং পারিবারিক ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে জনদুর্ভোগের অভিযোগকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

কিন্তু জনদুর্ভোগ বাস্তব হলেই অশ্লীলতা প্রতিবাদের বৈধ ভাষা হয়ে যায় না। সরকারের কঠোর সমালোচনা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে কঠিন প্রশ্ন তোলা নাগরিক সাহসের পরিচয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশও স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান, কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ এবং মর্যাদাহানিকে রাজনৈতিক সাহসের প্রতীক বানানো হলে প্রতিবাদের নৈতিক শক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তির জায়গা যখন গালাগালি দখল করে, তখন মূল অভিযোগও অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।

এই জায়গায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলনেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যও সমালোচনার দাবি রাখে। মতিঝিলে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে তিনি সিফাতের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করে বলেছেন, সিফাতের ব্যবহৃত ভাষা তিনি সমর্থন করেন না, কিন্তু যে বিষয়ে সে প্রতিবাদ করেছে, সেই বিষয়ে দেশের মানুষ তার মতো করে ক্ষোভ প্রকাশ করবে। ভাষাগত আপত্তি স্বীকার করার পরও একজন ব্যক্তির অশালীন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে আবেগঘন সমর্থন দেওয়া বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

একজন রাজনৈতিক নেতার দায়িত্ব শুধু জনতার ক্ষোভের প্রতিধ্বনি করা নয়; সেই ক্ষোভকে গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল ও নৈতিক পথে পরিচালিত করাও তার দায়িত্ব। সিফাতের বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান হতে পারত বিলের তথ্য প্রকাশ, তদন্ত দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের নিয়ে সংগঠিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। অশালীন ভাষাকে কেন্দ্র করে তাকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করা সেই মূল দাবিকেই দুর্বল করতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে সিফাতকে ‘ভালোয় ভালোয় ছেড়ে দেওয়া’র দাবি জানিয়ে বলেছেন, “যদি না ছাড়েন, তাহলে মনে রাখবেন, এক নূর হোসেন, এক ইয়াসমিন, এক ডাক্তার মিলন অনেকের গদিকে একদম উলটপালট করে দিয়েছিল। কখন যে পচা শামুকে পা কাটবে, কেউ বলতে পারবে না।”

জনমত সংগঠনের প্রয়োজনে এমন তুলনা করা হলে বক্তব্যের দায়িত্বশীলতা আরও বেশি প্রয়োজন। একটি তরুণের অশালীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যকে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আবহে উপস্থাপন করা উত্তেজনা বাড়াতে পারে, কিন্তু সমস্যার সমাধান নাও করতে পারে।

১১ দলীয় জোটের লংমার্চে বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকটের সমাধান, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং রাজনৈতিক দলীয়করণের অবসানের মতো দাবি উঠেছে। এসব দাবি জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু রাজনৈতিক দাবির শক্তি নির্ভর করে তথ্য, যুক্তি, প্রমাণ এবং বাস্তবসম্মত কর্মসূচির ওপর। স্লোগানের তীব্রতা নয়, দাবির যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত জনসমর্থন ধরে রাখে।

সিফাতের ঘটনা তাই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও আত্মসমালোচনার সুযোগ। প্রতিপক্ষের মানুষের মুখে যে ভাষা অগ্রহণযোগ্য, নিজের পক্ষের মুখেও সেই ভাষা অগ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। ক্ষমতায় থাকলে অশালীন বক্তব্যকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা, আর বিরোধী অবস্থানে থাকলে একই বক্তব্যকে গণমানুষের ক্ষোভ হিসেবে ব্যাখ্যা করা দ্বৈত মানদণ্ড। এমন নীতি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সুস্থ করতে পারে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গালাগালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও উত্তেজক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিউ, শেয়ার ও ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের চেয়ে আক্রমণাত্মক ভাষাকে বেশি দৃশ্যমান করে। কিন্তু ভাইরাল হওয়া আর কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিবাদ এক নয়। মুহূর্তের উত্তেজনা তৈরি করা সহজ; দীর্ঘস্থায়ী জনমত গড়ে তোলা কঠিন।

তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক গণআন্দোলনগুলো দেখিয়েছে, স্লোগান, দেয়াললিখন, পোস্টার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। সেই শক্তিকে যদি গালাগালি, ব্যক্তিগত অপমান ও প্রতিহিংসার ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হয়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের অভিযোগ শুনে তার যথাযথ তদন্ত করা এবং আইন প্রয়োগে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব জনতার ক্ষোভকে দায়িত্বশীল কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব উত্তেজক বক্তব্যের পাশাপাশি তার তথ্যগত ভিত্তি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর দায়িত্বও জনপ্রিয়তাকে সত্যের বিকল্প হতে না দেওয়া।

সিফাত আব্দুল্লাহর ঘটনায় তাই চারটি প্রশ্ন আলাদা করে দেখা জরুরি। বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ সত্য হলে তার তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তার ব্যবহৃত ভাষা অশালীন হলে তার নৈতিক সমালোচনা করতে হবে। গ্রেপ্তার আইনসম্মত হয়েছে কি না, তার বিচারিক নিষ্পত্তি হতে হবে। একই সঙ্গে শফিকুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতারা যে ভাষায় ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করছেন, সেই ভাষা রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বশীল কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

গণতন্ত্রে সরকারের কঠোর সমালোচনা থাকবে, জনদুর্ভোগের প্রতিবাদ থাকবে, ক্ষোভ থাকবে এবং জবাবদিহির দাবি থাকবে। কিন্তু প্রতিবাদের নামে ব্যক্তিগত অপমান ও অশ্লীলতাকে রাজনৈতিক সাহস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে ক্ষতি হয় সবার। সিফাতের অভিযোগের সত্যতা যাচাই যেমন জরুরি, তেমনি তার প্রতিবাদের ভাষার নৈতিক মূল্যায়নও জরুরি। শফিকুর রহমানের উচিত ছিল সিফাতের অভিযোগের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া, একই সঙ্গে তার অশালীন ভাষাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং রাজনৈতিক সমর্থনকে আইনি ও গণতান্ত্রিক ন্যায়ের দাবিতে সীমাবদ্ধ রাখা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন শুধু কে কী বলেছেন, সেখানে থেমে থাকলে চলবে না। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেমন রাজনৈতিক ভাষা চায়। এমন ভাষা, যেখানে ক্ষমতাকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করা যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া যায়, জনদুর্ভোগের প্রতিবাদ করা যায়, অথচ মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।

খালিদুর রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ই-মেইল: khalid_sust@yahoo.com